
কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ
বছরের একটি ব্যস্ততম দিন কেটে গেল। ফজরের পরই পবিত্র হয়ে ঈদগাহের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। ঈদুল আযহার জামাত সাধারণত আগেই হয়। নামাজের পরে কুরবানী করতে হয়। আজ লক্ষ্য করলাম, আমাদের অলক্ষ্যেই সমাজের অনেক আচার বদলে গেছে। ঈদ নিয়ে উল্লাস কমে গেছে অনেক। বাচ্চারাও কেমন ভারী আচরণ করে আজকাল।
এক সময় দেখেছি, সকাল থেকে মসজিদের মাইকে তাকবিরে তাশরিক শোনা যেত। ইমাম সাহেব দরাজ কন্ঠে আল্লাহু আকবার বলতেন৷ শিশুরা সুন্দর সুন্দর ইসলামী গান গাইত। কুরআন শরীফ পড়ত৷ সে আওয়াজ ঘর থেকে শোনা যেত। সবাই যেন ঈদের আনন্দকে সর্বত্র জাগিয়ে রাখত। সকল পাপী তাপী বান্দাকে ঘর ছেড়ে ঈদগাহে যেতে তাড়া দিত। বুঝতেও পারলাম না, ক্রমে ক্রমে ঠিক কখন এসব থেমে গেল।এখন দেখি সবাই পরিপাটি, গম্ভীর। হয়ত এসবে কিছু এসে যায় না। তবু স্মৃতি আমাদের ভোগায়। কাতর করে ফেলে।
নামাজের পর সর্বত্র বিপুল উৎসাহ, আনন্দ ও প্রিয় পশুটি কুরবানীর ত্যাগের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আযহার মূল উদযাপন শুরু হল। কুরবানী শুধু ত্যাগই নয়, আমাদের মুসলিম কমিউনিটিগুলোর অন্যতম সৌন্দর্য্য।
কুরবানীর পশুগুলোর ভেতরেও স্বাভাবিকের বাইরে একটা মায়া আছে। বছরখানেক লালন পালন করেও একটা পালের মুরগী জবাই করে খেয়ে ফেলতে আমাদের তেমন ভাবায় না৷ বিয়েশাদীতেও আমরা অনায়াসে গরু জবাই করে ফেলি। তখন ভাবনা হয়, গরুটা কিনে ঠকলাম না তো? মাংস ঠিকঠাক হবে তো? কিন্তু কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে হয়ে যায় ব্যতিক্রম।
এক দুইদিন লালন পালন করতেই ব্যাখ্যাতীত এক মমতা জন্মে যায়। জবাই করতে বুক কাপে। চোখে জল আসে। কুরবানীর মহাত্ম্য এখানেই। শুধুই ভোগ নয়। ভালবাসার বিসর্জনও রয়েছে। কুরবানীর পশুতে যতখানি মাংস হবে তার তিন ভাগের এক ভাগ গরিবদের, আরেক ভাগ আত্মীয়দের, আরেকভাগ নিজেরা খাওয়ার বিধান। ইখলাসের পরে আমাদের সবচে বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিৎ এখানেই৷ আজকাল কি সবাই এর প্রতি গুরুত্ব দেয়, কুরবানী এলে তো ফ্রিজ কেনার ধূম পড়ে যায়!
অন্তত আজকের একটি দিনে একজন মানুষও যেন বঞ্চিত না হয়৷ কোন বাবারই যেন সন্তানের কাছে মুখ লুকাতে না হয়। এটা তাদের প্রতি করুণা নয়। একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের অধিকার৷ এই অধিকার স্বয়ং আল্লাহপ্রদত্ব। আমরা যেন ভুলে না যাই পথশিশুদের, এতিমখানার বাচ্চাদের, এবং আমাদেরই প্রতিবেশী যারা মুখ ফুটে চাইতে লজ্জাবোধ করেন, তাদেরও।
