কেবল ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে’ গ্রেপ্তার ডা. আকাশের স্ত্রী, পরকীয়া কি অপরাধ নয়?

হামমাদ রাগিব

চট্টগ্রামের তরুণ ডাক্তার মোস্তফা মোরশেদ আকাশ স্ত্রীর পরকীয়া-প্রেমের জ্বালাতন সহ্য করতে না পেরে দুদিন আগে শরীরে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস আপ করে সেখানে তাঁর আত্মহত্যার জন্য নিজের স্ত্রী ও স্ত্রীর মা-বাবাকে দায়ী করেন। এবং পরপুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর অবৈধ মেলামেশা ও পরকীয়ার কথা উল্লেখ করে পরকীয়া-প্রেমিকদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কিছু ছবিও আপ করেন তিনি।

এরই সূত্র ধরে পুলিশ আকাশের স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, মিতুর পরকীয়া-প্রেমের অভিযোগ বাদ দিয়ে নিরেট আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগটাকেই কেন হাইলাইট করা হচ্ছে? পরকীয়া কি কোনো অপরাধ নয়?

প্রচলিত আইনে স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক করলে একে বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু এতে যে যার সঙ্গে নিজের দৈহিক ও আত্মিক একক সম্পর্কের কমিটমেন্ট প্রতিষ্ঠিত, সেই বৈধ জীবনসঙ্গীর অধিকার খর্ব হচ্ছে, প্রচলিত আইনে এর কোনো সুষ্ঠু সুরাহা পরিলক্ষিত হয় না।

অধুনাবাদীদের দেখা যায়, পরকীয়ার এ সম্পর্ককে সম্পর্ককারীর ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বলে তাঁরা থোড়াই কেয়ার করেন। কিন্তু এতে যে সুন্দর ও অনাবিল বৈবাহিক জীবন-প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত ও নির্মম বিপর্যয় নেমে আসে, সে ব্যাপারে তাঁরা মুখ বন্ধ করে থাকেন।

এ বিষয়ে আজ কথা হয়েছিল কয়েকজন তরুণ আলেমের সঙ্গে। সর্বজনীন জীবনব্যবস্থা ইসলামের ব্যাখ্যা মতে পরকীয়ার মতো সর্বগ্রাসী অপরাধ মোটেই ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং সামাজিক বিষয়। তাই তাঁরা জানিয়েছেন, নিজের ইচ্ছায় পরকীয়ায় জড়ালেও সামাজিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে পরকীয়ায় লিপ্ত উভয় পক্ষই বড় ধরনের অপরাধী বলে বিবেচিত হবে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়িস্থ জামিয়া আবু বকরের মুফতি মাওলানা রেজাউল করীম আবরার বলেন, ‘আমাদের প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় এটি একটি বড় ঘাপলা। বড় অপরাধকে খাটো করে ছোট অপরাধ হাইলাইটস করা। ডা. আকাশের যে বিষয়টা, এখানে স্ত্রী অনেকগুলো অপরাধ করেছে। স্বামী থাকার পরও অন্য একাধিক পুরুষের সাথে পরকীয়া করেছে। তাদের সাথে হোটেলে রাত্রিযাপন করেছে। জানি না আমাদের প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় এর কোনো বিচার আছে কি-না। তবে ইসলাম বিয়ের আগে হোক বা পরে, ব্যভিচারের জন্য চূড়ান্ত শাস্তি নির্ধারণ করেছে। ইসলামি খেলাফতকালে সেগুলো বাস্তবায়নের সুফল পুরো পৃথিবী দেখেছে। পরকীয়া এবং অবৈধ প্রেমে দগ্ধ হয়ে নীরবে কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়নি সে-কালে। মিতুরাও শাস্তির ভয়ে এমন মারাত্মক অশ্লীলতায় মত্ত হওয়ার আগে নিজের জীবন নিয়ে একবার চিন্তা করত। কারণ অপরাধ প্রকাশ ও প্রমাণিত হয়ে গেলেই তার মৃত্যু তখন নিশ্চিত ছিল।’

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট লেখক ও আলেম মাওলানা লিসানুল হক শাহরুমী বলেন, ‘কেউ মেনে নিক বা না নিক, ধর্মীয় অনুশাসন মানার মধ্যে যে পরিমাণ শিথিলতা আসবে, ব্যক্তির সে পরিমাণ ইহ ও পরকালীন ক্ষতি হবে; এটি স্বাভাবিক৷ পত্রিকার তথ্যে বলা হয়েছে, বিয়ের অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগেই মিতুর বদ স্বভাবের কথা ডা. আকাশ জানতে পারেন৷ কিন্তু সামাজিকভাবে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে তিনি ওটা গোপন রেখে বিয়ের কাজ সেরে ফেলেন৷ দ্বিতীয়ত, আকাশ মিতুকে সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে বিয়ে করেননি৷ বিয়ের আগে দীর্ঘদিন দুজনের অবৈধ প্রেমের লেনাদেনা চলতে থাকে৷ তাহলে এ ক্ষেত্রে মিতু যে দোষে দুষ্ট একই দোষে আকাশও দোষী৷ এটা কুরআনে কারিমে বর্ণিত আয়াতের সুষ্পষ্ট প্রমাণ৷ পবিত্র নারী পবিত্র পুরুষের জন্যে আর নাপাক নারী নাপাক পুরুষের জন্যে৷ তথাপি সমস্যা যত বড়ই হোক ইসলামে এর খুব সহজ সমাধান রয়েছে৷ কিন্তু আমাদের প্রচলিত শাসনব্যবস্থা তা যেমন মানতে নারাজ, জনগণও তেমন উদাসীন এ ব্যাপারে। সুতরাং আইন নিয়ে কিছু বলে লাভ নেই৷’

সিলেটের ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মুফতি জিয়াউর রাহমান বলেন, ‘মূলত এখানে গুরু পাপকে লঘু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে৷ সমাজের একটি ভয়াবহ ব্যাধিকে খুব কমই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে৷ সুখ-শান্তিতে ভরপুর একটি পরিবার ক্রমেই ধ্বংসের দিকে চলে যায়, যখন পরকীয়ার মতো বিষ সেখানে ঢোকে৷ তাছাড়া ইসলাম এই অপরাধকে হালকাভাবে নেয় না৷ পরকীয়া মানে তো দুইজন বিবাহিত নারী-পুরুষ অবৈধভাবে সম্পর্কে জড়ানো৷ সেই সম্পর্ক গড়ে তুলে যদি কোনো বিবাহিত যুগল ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, আর সেটা শতভাগ প্রমাণিত হয়, তাহলে ইসলাম তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।

‘অপরদিকে একজন উচ্চশিক্ষিত পুরুষের জন্যে আত্মহত্যা করা সম্পূর্ণই কাপুরুষোচিত কাজ হয়েছে৷ তাঁর জন্যে তো বিকল্প অপশন ছিল৷ বিবাহবিচ্ছেদের সুযোগ ছিল৷ কিন্তু সেটা না করে আত্মহত্যার মতো মহাঅপরাধ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়া খুবই দুঃখজনক একটি ঘটনা৷ ইসলামের দৃষ্টিতে একই সঙ্গে গুরুতর পাপও। এমন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই ব্যবস্থা নেয়া আমাদের সকলের কর্তব্য৷ পরকীয়া বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় তা মহামারি আকার ধারণ করবে৷ আমাদের সুন্দর পারিবারিক সিস্টেম ভেঙে একটি অশান্তির রাজ্যে পরিণত হবে এই দেশ৷’

আগের সংবাদওয়াজেহ রশীদ নদভী রহ.-এর জীবন ও কর্ম শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত
পরবর্তি সংবাদশ্বশুর-শাশুড়িকে নির্যাতনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি নারী গ্রেপ্তার