
কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ
পথশিশুদের জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে সারাবছর অনেক কাজ, অনেক ফটোসেশন, অনেক ইভেন্ট চোখে পড়ে। বেশ কিছু কবিতাও হয়, গল্প হয়, নাটক-সিনেমাও হয়। কিন্তু পথশিশুদের জন্য কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা কি আদৌ গ্রহণ করা হয়?
বছরের বিভিন্ন সিজনে যারা পথশিশুদের জন্য কাজ করেন, তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলব, এই ব্যবস্থাপনাগুলি সাময়িক আনন্দের; মোটেই দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর কোন ব্যবস্থা নয়। গরমের সিজনে বাচ্চাদের জন্য সিজনাল ফল, বিশেষ দিনগুলিতে খাবারের ব্যবস্থা, আর শীতকালে শীতবস্ত্র দান, সবই প্রশংসনীয়, কিন্তু এতে কি পথশিশুদের অভাব ঘুচবে? পথশিশুর সংখ্যা কি কমে যাচ্ছে? মোটেই তা নয়।
যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তারা তাদের জায়গা থেকে বেশ ভালো কাজ করছেন, ব্যক্তিগত কিংবা যে কোন ছোট পরিসরের উদ্যোগে এর বেশী সম্ভব না। মুষ্টি ভিক্ষায় দারিদ্র যাবে না। এখানে এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রের।
দেশে পথশিশুর সংখ্যা এখনো এত বেশী নয়, যাদের ভরণপোষণ দিতে রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাবে। কেবল ঢাকাতেই জোন ভিত্তিক ব্যবস্থা নিলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ তাদের সকল অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব। ভাগ্য তাকে পথশিশু বানিয়েছে, কিন্তু ক্ষুধা তো তাকেও পোড়ায়। এই দহন থেকে তাকে মুক্তি দেবে কে, আমাদের সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কি দূর্বলকে রক্ষা করার জন্য নয়?
নিউমার্কেটের সামনের ফুটপাথে বসে ছিলাম। একটা আট নয় বছরের ছেলে পাশে এসে দাড়াল। গায়ে বার্সেলোনা ক্লাবের জার্সি। আপাদমস্তক ময়লা। ও এসে আমার কাছে টাকা চাইল। সারাদুপুর কিছু খায়নি। এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি প্রায় প্রতিদিনই হতে হয়। সবারই। এদের সঙ্গে দাতা গ্রহীতার সম্পর্ক রাখতে কেমন বাধো বাধো ঠেকে। তাই ওর সঙ্গে কথা বলে সহজ হবার চেষ্টা করলাম।
একটা সময় ছিল, পথ শিশুদের সঙ্গে কথা নানান কথা জিজ্ঞাসা করতাম। বাবা মা কোথায়, কার সঙ্গে থাকা হয়! এখন আর এসব কিছু জানতে চাই না। জানতে চাওয়াটা বোধয় উচিতও না। তাছাড়া গল্পগুলি এখন প্রায় সবই মুখস্থ। নতুন করে জেনে আর কি হবে।
ফুটপাথে সেই ছেলেটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওর চেয়ে ছোট আরো তিনজন এসে ভিড় করল। ওরাও টাকা চায়। আমার আর্থিক সঙ্গতি তেমন ছিল না। ছেলেটাকে দেয়ার জন্য যেই টাকা স্থির করেছিলাম, পরে ওদেরকে সেই টাকাই ভাগ করে দিলাম। খুব সামান্যই। ছেলেটা হয়ত বুঝতে পারল অন্যরা এসে জুটার কারণেই তার ভাগে কম পড়ল। সে কি রাগ করল?
একটা দুঃখজনক অভিজ্ঞতার কথা বলি। বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত টেলিকম কোম্পানি একটা ক্যালিওগ্রাফি প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। যারা পুরস্কার জিতলেন তাদের ভেতর আমার নিকটতম এক বন্ধু ছিলেন। টেলিকম কোম্পানিটি তাদের হাতে কিছু নামে মাত্র অর্থ তুলে দিয়ে বললেন, বাকি টাকা পথশিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের ঈদের পোশাকের জন্য ব্যয় করা হবে। তারা পথশিশুদের কথা শুনে মেনে নিলেন।
কিন্তু ঈদের দিন দেখা গেল, সেই বিখ্যাত কোম্পানিটি শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাদের কোম্পানির বিজ্ঞাপন সমেত ফিনফিনে সস্তামুল্যের কিছু গেঞ্জি। শিশুদের মুখে হাসি ফুটল কিনা জানিনা। এতবড় সাফল্যে কর্তৃপক্ষের মুখে হাসি ফুটেছে নিশ্চয়ই। এত এত দুঃখ-কষ্ট, আবেগের জায়গাগুলোতে এমন শুভংকরের ফাঁকি খুব বেমানান। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবী, পথশিশুদের অধিকার নিশ্চিত করুন। তাদের প্রতি করুণা নয়, ভালবাসাই কাম্য আমাদের।
