
হামমাদ রাগিব
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষাসমাপণী এবং জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আজ। পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণ করেছিল কওমি মাদরাসারও অনেক শিক্ষার্থী।
আলিয়া বা জেনারেল শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে একসময় কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা ছিল কওমি শিক্ষাধারায়। কোনো কোনো মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো শিক্ষার্থী দাখিল বা আলিম পরীক্ষা দিয়েছে জানতে পারলে তার ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। কিন্তু কওমি শিক্ষার্থীদের অনেকেই তারপরও লুকিয়ে-চাপিয়ে অংশগ্রহণ করত জেনারেল ধারার পরীক্ষাগুলোতে। এবং সারা বছর ক্লাস না করেও তাদের অধিকাংশই পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করত।
কিন্তু সময়ের পালাবদলে আগের সেই কড়াকড়ি এখন আর খুব একটা নেই। এখন দেশের অনেক কওমি মাদরাসা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের ছাত্রদেরকে প্রাথমিক পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ রেখেছে। কোনো কোনো মাদরাসায় এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলকও করা হয়েছে।
তেমনই একটি মাদরাসা সিলেট শহরের ঝেরঝেরিপাড়া জামেয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া। গত ৬ বছর ধরে এই মাদরাসা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের ছাত্রদেরকে পিএসসি, জেডিসি ও দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাচ্ছে। এবং এ অংশগ্রহণ ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক। মাদরাসার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্ররা পিএসসিতে, হেদায়াতুন নাহু জামাতের ছাত্ররা জেডিসিতে এবং শরহে জামির ছাত্ররা দাখিল পরীক্ষায় প্রতি বছর অংশগ্রহণ করেন।
আজ ২০১৮ সালের জেডিসি ও পিএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ঝেরঝেরিপাড়া মাদরাসার শিক্ষাসচিব মাওলানা হারুনুর রশীদ আল আজাদ ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, জেডিসি ও পিএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী তাদের শিক্ষার্থীরা শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছেন এ বছরের পরীক্ষায়। এবং ৬ বছর ধরে প্রতি বছরই তাদের শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে শতভাগ সাফল্য অর্জন করে আসছেন।
রাজধানীর মাদরাসা দারুর রাশাদ মিরপুর, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া নিউ মালিবাগ, জামিআতুল আজিজ-সহ আধুনিক ধারার অনেক কওমি মাদরাসাই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের শিক্ষার্থীদেরকে অংশগ্রহণ করিয়েছে এবারের পিইসি ও জেডিসি পরীক্ষায়।
জেনারেল শিক্ষাধারার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কারণে কওমি সিলেবাসের নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনায় ছাত্রদের কোনো ঘাটতি হচ্ছে কি-না জানতে চেয়ে মুঠোফোনে কথা বলেছিলাম মাদরাসা দারুর রাশাদের প্রবীণ উস্তাদ, দৈনিক নয়া দিগন্তের সহকারী সম্পাদক মাওলানা লিয়াকত আলীর সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদেরকে তাঁরা বিশেষায়িত পদ্ধতিতে পাঠদান করেন। যার কারণে নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। জেনারেল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পাশাপাশি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষাগুলোতেও প্রতিবছর ছাত্ররা প্রশংসনীয় ফলাফল অর্জন করেন।
এ উদ্যোগে ছাত্ররা কতটা উপকৃত হচ্ছে জানতে চাইলে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, ‘উপকৃত তো হচ্ছেই। ওই ধারায় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের বাড়তি অনেক পড়াশোনা করতে হচ্ছে। অংক-ইংরেজি
গুরুত্বের সঙ্গে শিখছে। এতে আলাদা একটা যোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া জেনারেল শিক্ষার সার্টিফিকেট দিয়ে ভবিষ্যতে তারা উচ্চশিক্ষাও অর্জন করার সুযোগ নিতে পারবে।’
এই প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা হারুনুর রশীদ আল আজাদও বলেছেন একই কথা। তবে তিনি আরেকটু যোগ করে জানিয়েছেন, ‘আমাদের এ উদ্যোগের কারণে অভিভাবকদের আগ্রহ অনেক গুণে বেড়েছে। ফলে স্কুলগামী অনেক শিক্ষার্থীও এখন আমাদের মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। তাছাড়া আগ্রহী শিক্ষার্থীরাও ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় এ রকম উভয় ধারায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ সম্পন্ন মাদরাসায় পড়াশোনা করতে আগ্রহ বোধ করে।’
একসময় তো বা এখনও অনেক মাদরাসায় এই ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, এর কারণ কী, জানতে চাইলে মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, ‘আসলে এটা আমাদের অনেক আকাবেরের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁরা আশঙ্কা করেন, ওই ধারায় পরীক্ষা দিতে গেলে কওমি শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাকে ত্রুটি চলে আসতে পারে। এবং অনেকে এক সময় কওমি অঙ্গন ছেড়ে আলিয়া মাদরাসায় নিয়মিত হয়ে যায়। এর বাস্তব উদাহরণও অনেক আছে। তাই আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক নেগরানির মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেছি, যাতে পরীক্ষার পড়াশোনার জন্য তাদেরকে মাদরাসার বাইরে কোথাও ছুটাছুটি করতে না হয়। কারণ, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা আবাসিক নেগরানিতে বিশেষ তরবিয়াতের মাধ্যমে আমল-আখলাকে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে। মাদরাসার নেগরানি না থাকলে অনেক সময় তাদের এই পরিপুষ্টি নষ্ট হয়ে যায়।’
