রামপুরা মহিলা মাদরাসায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: অন্তরালে কী?

ওমর ফারুক

রাজধানীর রামপুরায় মহিলা মাদরাসার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। মাদরাসার শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাটি সহজে মেনে নিতে পারছেন না কেউ। প্রকৃত ঘটনা নিয়েও চলছে রহস্য। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এ ঘটনার জন্য একতরফাভাবে মাদরাসার একজন শিক্ষিকাকেই দায়ী করা হচ্ছে।

প্রকাশিত খবরে বলা হয়, মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনতাহার মিম (১৪)। গত শনিবার মাদ্রাসা ভবনের বাথরুম থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় একটি চিঠি। সেটি মুনতাহারের লেখা বলে দাবি করা হয়েছে। এদিকে পুলিশ আদালতকে বলেছে, মাদ্রাসার এক শিক্ষিকার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে এই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। উদ্ধার হওয়া চিঠিতে লেখা, ‘তাছলিমা খালামণি আপনি আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলেন। আপনি আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন তা কারও সঙ্গে করবেন না।’

এদিকে মুনতাহারের বাবার অভিযোগ পাওয়ার পর তাছলিমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জের ধরেই অনুসন্ধান চালিয়েছে ফাতেহ২৪.কম। প্রকৃত ঘটনাটি জানার চেষ্টা হয়েছে। রামপুরার উলনে অবস্থিত এ মাদরাসাটির প্রতিবেশি বাসিন্দারা মনে করেন এ ঘটনায় শিক্ষিকার কোনো দায় নেই। মেয়েটি অন্য একটি সম্পর্কের জের ধরে প্ররোচিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। মিডিয়াগুলো প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছে।

এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও জামিয়া কারিমিয়া উলন মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা সাইফুল ইসলাম ফাতেহ২৪ কে বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি আত্মহত্যাকারী মেয়েটির একটি ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাদরাসায় ভর্তির আগেই তার বাবা মা বিষয়টি টের পেয়ে মাদরাসার ভর্তি করিয়ে দেয়। এবছরই সে এ মাদরাসায় ভর্তি হয়। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পরও সে এ সম্পর্ক কন্টিনিউ করে যাচ্ছিল। বিষয়টি এক পর্যায়ে মাদরাসার শিক্ষকরাও উপলব্ধি করতে পারেন। একজন শিক্ষিকার ভূমিকা থেকেই শিক্ষিকা তাছলিমা বেগম ওই শিক্ষার্থীকে শাসন করেন। এ শাসন মানতে না পেরেই ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।

অনেকটা একই সুরে কথা বলেন মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুমতাজুল করীম মুশতাক। তিনি বলেন, মুনতাহার যে বিভাগে পড়ত সে বিভাগে তাছলিমা ক্লাস নিতেন না। তাছলিমা মাদ্রাসার জেনারেল বিভাগের শিক্ষক। আর মুনতাহার পড়ত অন্য বিভাগে। ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে। এর সঙ্গে আমাদের শিক্ষিকা দায়ী আছে বলেও আমি মনে করছি না। এছাড়া নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মাও এ ঘটনাটি মেনে নিয়েছে। তারা শিক্ষিকার ওপর থেকে অভিযোগ তুলে নিয়েছেন।

একজন কওমি শিক্ষার্থীর আত্মহতার ঘটনাটি কীভাবে দেখছেন দেশের বিজ্ঞ আলেম ও শিক্ষাবিদরা, এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল প্রবীণ আলেম ও জাতীয় মহিলা মাদরাসার সাবেক শাইখুল হাদীস হাফেজ মাওলানা নুরুল হকের সঙ্গে। তিনি এ ঘটনা বিশ্লেষণ করে বলেন, কোনো চাপ নয়, মানসিক সমস্যা থেকেই মেয়েটি আত্মহত্যা করতে পারে। একজন শিক্ষিকার সামান্য চাপে এ ধরণের ঘটনা ঘটানো মানসিক অসুস্থতারই লক্ষণ।

তবে মহিলা মাদরাসার শিক্ষকদের আচার ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ রয়েছে এ বিষয়ে কি বলবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা মিথ্যা নয়। তবে সকল অভিযোগ পুরোপুরি সত্যও নয়। যাই হোক একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একজন শিক্ষকের মায়ের মতো সম্পর্ক থাকা উচিত। মায়ের মতোই তার সুখ দুঃখের সঙ্গী হবে। শিক্ষিকাদের আগ্রাসী মনোভাব দূর করতে হবে।

‘শিশুদের আদর যত্ন করে শাসন করা উচিত। কোনো ক্রমেই যেন এ শাসন সীমার বাইরে না যায়। এছাড়াও মাদরাসায় তাদের রূহানি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ, এসব শিক্ষিকারাই মানুষ গড়ার হাতিয়ার। তাদের সর্বদিক দিয়ে খেয়াল রাখতে হবে। কখনো অতিরিক্ত শাসন করলেও পরে ডেকে আদর করে বুঝাতে হবে।’