কেমন আছেন রোহিঙ্গারা?

মাওলানা গাজী ইয়াকুব। ইসলামি ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব। রাজনীতির পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে তাঁর কর্মতৎপরতা এবং তাঁদের সেবায় কয়েক বছর ধরে নিরলস যে পরিশ্রম করছেন, তা উপমাতুল্য। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান হালচাল নিয়ে তাঁর সঙ্গে আজ কথা বলেছেন হামমাদ রাগিব।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা-শরণার্থী শিবিরের অবস্থা বর্তমানে কেমন? এখন তো প্রচণ্ড শীত, কীভাবে কাটছে তাদের দিনকাল?

সার্বিকভাবে বিচার করলে রোহিঙ্গারা মোটামুটি ভালোই আছে এখন। নতুন পুরনো মিলিয়ে মোট ১২টা ক্যাম্প আছে সেখানে। এর মধ্যে পুরনো দুটো জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের জীবনযাপনের সার্বিক চাহিদা যথাসম্ভব মেটানো হচ্ছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে। বাকি যে ১০টা ক্যাম্প রয়েছে, সেগুলো জাতিসংঘের নিবন্ধনে যায়নি এখনও, বাংলাদেশ সরকার এগুলোর সার্বিক দেখভাল করছে বর্তমানে।

বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকেও তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাছাড়া রোহিঙ্গা প্রবাসীদের থেকেও বড় একটা রেমিট্যান্স আসছে তাদের কাছে। কারণ বর্তমানে সেখানে যদি ১২ লক্ষ রোহিঙ্গার অবস্থান হয়, তার মধ্যে ছয় থেকে সাত লক্ষ রোহিঙ্গার কোনো না কোনো আত্মীয় বাইরের দেশে কাজ করছে। তো তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সগুলোও কিন্তু, ব্যাংকের মাধ্যমে হোক কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে, বাংলাদেশে আসছে এবং রোহিঙ্গারা পাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু সংগঠন আছে বহির্বিশ্বে, সেগুলো থেকেও যথেষ্ট অর্থায়ন পাচ্ছে তারা। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকেও সরকার মারফত কিছু তহবিল আসে। যা নানাভাবে তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

শীত নিবারণের জন্যও যতটা জানি এনজিও সংস্থাগুলো তাদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করছে। কিন্তু সবমিলিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় যা কিছুর প্রয়োজন হয়, সে প্রয়োজন রোহিঙ্গাদের বেলায় মিটছে না, এবং মেটা বোধহয় সম্ভবও না।

আমরা কি তাদের প্রতি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করতে পারছি?

সর্বশেষ বিতাড়নের সময় আমরা যেভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তার একশ’ ভাগের মধ্যে এখন দুই ভাগও নাই। আমাদের ঘরানার সক্রিয়তা তখন খুব বেশি ছিল এ ব্যাপারে, কিন্তু এখন তা আর নেই। অনেকে অস্থায়ী মসজিদ-মাদরাসা গড়েছিলেন, কিন্তু পরে কিছুদিন যাওয়ার পর এখন আর কোনো খবর রাখছেন না। ফলে অনেক মসজিদ-মাদরাসা কেবল পরিচালনার অভাবে বিরান পড়ে আছে। দায়িত্বের জায়গাটা থেকে যদি বলি, বিশেষ করে আমাদের ঘরানাকে উদ্দেশ্য করে, তবে আমরা কিছুই করতে পারছি না তাদের জন্য। যদি করতাম তাহলে আমাদেরই গড়া মসজিদ-মাদরাসাগুলো বিরান পড়ে থাকত না।

তাদের সাহায্যের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী কী কী করা যেতে পারে?

দীর্ঘ মেয়াদী সাহায্য তো একটাই, তাদেরকে তাদের মাতৃভূমিতে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা এবং সেখানে তাদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচের কারণে অদূর ভবিষ্যতে তা সম্ভব কি-না বলা মুশকিল। বহির্বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে যদিও কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করছে কিন্তু এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে তারা নিস্ক্রিয়। এ দিকে ভারত ও চীনের মতো পরাশক্তি বার্মার পক্ষে থাকার কারণে বাংলাদেশ কিংবা তুরস্কসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও কিছু করতে পারছে না।

ক্যাম্পগুলোতে বিদেশিরা ঠিক কী করছে, তাদের ভূমিকা কেমন সেখানে?

সেবার জন্য বিদেশি যেসব সংস্থা সেখানে কাজ করছে তারা একটা লক্ষ্য নিয়ে গেছে সেখানে। সাধারণত এসব চ্যারিটি সংস্থার ডোনার যারা থাকে, তারাই ঠিক করে দেয় লক্ষ্যটা ঠিক কী৷ শরণার্থী ক্যাম্পে এনজিওদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করছে, তাদের ম্যাক্সিমামদের লক্ষ্য কৌশলে মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনা করা।

এ ক্ষেত্রে তারা যেটা করেছে, শিক্ষামাধ্যমটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। তাদের নিজস্ব সিলেবাসে পাঠদান করা হয়। ধর্মকে যেটা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নারীদেরকেও বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয় তারা। পাশাপাশি দৈনন্দিন যোগাযোগ ও আলাপচারিতার মাধ্যমে তাদের সঙ্গর একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে নেয়। ফলে নারী ও শিশুর মানসিকতায় তাদের চিন্তার বীজ বপণ হয়ে যায়।

ধর্মহীনতা ও ধর্মান্তরিত করার সংবাদ আসছে সেখান থেকে। এর সত্যতা ও পরিমাণ কতটুকু?

সত্যতা ও পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে গেলে তো ইনকুয়ারির প্রয়োজন, সেই জায়গায় তো আর আমরা নেই, তবে সেখানে গেলে তাদের অনেকে যেটা বলে, কিছু কিছু রোহিঙ্গা জীবনমানের উন্নয়ন ও কিছু ভাতার লোভে এ কাজটা করে ফেলে। এদের সংখ্যাও খুব একটা কম না। কুতুপালং ও টেকনাফের কিছু ক্যাম্পে এটা ঘটে থাকে। তবে ধর্মান্তরিত হবার পর সেখান থেকে তাদেরকে সরিয়ে ফেলা হয়। অন্য কোথাও নিয়ে বিশেষায়িত শিক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে শিক্ষিত করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি ইউরোপ কান্ট্রির বিভিন্ন রাষ্ট্রে উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। আমার জানামতে এমন অনেকে আছে, যারা এভাবে ধর্মান্তরিত হয়ে ইউরোপ কান্ট্রিতে বসবাস করছে।

আপনি এখন কীভাবে সাহায্যে অংশগ্রহণ করছেন, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানোর চিন্তা করছেন কি-না?

আমি এখন যে মাদরাসা-মসজিদগুলো সেখানে গড়েছিলাম, তা কোনোমতে পরিচালনা করার চেষ্টা করি। আর দেশি-বিদেশি কোনো ব্যক্তি বা এনজিও যদি সেখানে অনুদান দিতে চায় তাহলে তাদের সঙ্গে অ্যাম্ব্যাসেডর হিসেবে কাজ করি। কিন্তু এ পরিমাণটা আগের তুলনায় একেবারেই কমে গেছে। বলতে গেলে একশ ভাগের মধ্যে এক ভাগ সহযোগিতাও এখন আর আসে না। বরং মসজিদ-মাদরাসাগুলো পরিচালনা করতে এখন আমার পকেটের টাকাই খরচ করতে হয় অনেক সময়। এজন্য আর্থিকভাবে বেশ ঋণগ্রস্তও হয়ে গেছি ইদানীং।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাতে গেলে বিভিন্নভাবে কাঠখড় পোড়াতে হয়, এবং ব্যাপারটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণও। তাছাড়া একটা এনজিও প্রতিষ্ঠা করলে সার্বক্ষণিক খাটনি দিতে হয় এর পেছনে, যা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এরকম কোনো কাঠামো দাঁড় করানোর আপাতত কোনো ইচ্ছে নেই। তবে ব্যক্তিউদ্যোগে এতদিন ধরে যা কিছু চেষ্টা করেছি, চেষ্টাটা অব্যাহত রাখব ইনশাআল্লাহ। তবে এখন আর কারও কাছে এ ব্যাপারে অনুদান কালেকশনের ইচ্ছে নেই। যদি স্বউদ্যোগে কেউ এসে ডাকে, তবে তাঁকে ওয়েলকাম জানাব। এতটুকুই।

সর্বশেষ কবে গিয়েছিলেন সেখানে?

দু-আড়াই মাস আগে। সপ্তাহ খানেকের ভেতর হয়তো আবারও যাওয়া হবে৷ তবে আমি যাই বা না-যাই, আমার লোকজন সেখানে ঠিক করা আছে, তারা বিভিন্নভাবে কাজ করছে। ৯টা মসজিদ এবং ৯টা মকতব সেখানে আমার তত্ত্বাবধানে আছে। যেগুলো বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রথমে তৈরি করা হয়েছিল। এখন আলহামদুলিল্লাহ প্রত্যেকটিই টিনশেড কিংবা পাকা হয়ে গেছে। প্রতিটা মকতবে আড়াই থেকে তিন শো করে বাচ্চা পড়াশোনা করছে। নুরানি সিলেবাসের আলোকে তাদের পাঠদান করা হয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীনি চর্চা জারি রাখার জন্য এ ধরনের মসজিদ-মাদরাসা খুবই প্রয়োজন। কিছু প্রয়োজন শুরুর দিকে পুরা হলেও ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিচালনার অভাবে সেগুলো এখন বন্ধ।

আলেমদের মধ্য থেকে শুরুতে তো অনেকেই কাজ করেছিলেন সেখানে, এবং বেশ ভালোভাবেই করছিলেন, বর্তমানে তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে নিস্ক্রিয়, তাদের উদ্দ্যেশ্যে কিছু বলবেন?

দেখুন নিস্ক্রিয়তার রেজাল্ট কিন্তু আমরা খুব দ্রুত পেয়ে যাচ্ছি। আমাদের নিস্ক্রিয়তার সুযোগে আমাদেরই স্বজাতির ভাইদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে সেখানে। শিশুরা ধর্মহীন শিক্ষায় বেড়ে উঠছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ এটা যেভাবে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে সেখানে, আমাদের একটা ভুখণ্ড হারাতে হয় কি-না সেটা এখন চিন্তার ব্যাপার।

ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে সময় দেওয়ার জন্য অনেক অনেক শোকরিয়া।

আপনাদের জন্যও মুবারকবাদি রইল। আল্লাহ হাফেজ।

আগের সংবাদভারতে অসাম্প্রদায়িকতা ফিরিয়ে আনতে সোচ্চার মোদি-বিরোধীরা
পরবর্তি সংবাদস্থানীয় দুই যুবকের হাতে ধর্ষিত হলো মাদরাসা-পড়ুয়া বালিকা