কওমি মাদরাসার ছাত্রদের সাধারণ শিক্ষাধারায় অংশগ্রহণ, আমি যেভাবে দেখি : সাবের চৌধুরী

সাবের চৌধুরী 

বর্তমান সময়ে কোনো কোনো মাদরাসা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে তাদের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে। ব্যাপারটিকে মূল্যায়ন করার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষাগত দিক থেকে আমরা একটা অসঙ্গতি ও অদ্ভুত বিভাজনের ভেতর আছি। আমাদের দেশে ইসলাম-বান্ধব একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নেই। যার ফলে নানা সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। আমরা এ সঙ্কটগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে সমাধান করার চেষ্টা করছি। মাদরাসা-শিক্ষার্থীরা এ পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারটি সে বিচ্ছিন্ন চেষ্টার ধারাবাহিকতা। এবং এটা মৌলিক কোনো সমাধান নয়। খুব লাগসই সমাধানও নয়; অগত্যা মেনে নেওয়ার মতো একটি ব্যাপার। আমার মনে হয় যারা এর আয়োজন করছেন, তাঁরাও এ বিষয়টি স্বীকার করবেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পথে হাঁটা কতটুকু লাভজনক? কোনো আপত্তির দিক আছে কি-না, এবং যারা এতে অংশগ্রহণ করছে, তাদের মধ্যে এর প্রভাব কী রকম দেখা যাচ্ছে?

এর জন্য আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে কেন? আমি মনে করি এর দুটো দিক হতে পারে। প্রথমত আধুনিক পৃথিবীর একজন নাগরিক হিসেবে জেনারেল শিক্ষার সর্বনিম্ন একটা লেভেল পূরণ করতে হয়। তাছাড়া আলেম হিসেবে আপন দায়িত্ব পালন করার জন্যও এ লেভেলটা পূরণ করা একান্ত আবশ্যক।

বর্তমানে বেফাক বা অন্যান্য বোর্ড থেকে এর জন্য যে সিলেবাস দেওয়া হচ্ছে, তা সে চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই দিক বিবেচনায় এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাটা লাভজনক। কিন্তু আপত্তির দিকটি হলো, যখন এটা ব্যাপকভাবে প্রয়োগ হতে থাকবে, তখন আমাদের অনেক মেধাবী ছেলে সরাসরি জেনারেল শিক্ষায় চলে যাবে। অথবা মূলটায় কোনো রকম টিকে থেকে সেদিকে বেশি মনোযোগী হয়ে যাবে। ফলে আমরা অনেক মেধাবীকে হারাব।

দেখুন, সমাজ থেকে মাদরাসায় আসছে খুব সামান্য পরিমাণ ছেলে। সবাই স্কুল-কলেজেই যাচ্ছে। তো এই সামান্য থেকেও যদি আমরা দিতেই থাকি তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটা খুবই আশঙ্কাজনক।

আপনি এখানে আদর্শের বয়ান দিয়ে খুব একটা লাভবান হবেন না। এক তো টিনএজটা হলো অস্থিরতার সময়, ছেলেদের ভেতরে সেসময়ে একটা ঝড়ো বোঝ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, এই চলে যাওয়ার পেছনে শক্তিশালী না প্রণোদনা কাজ করে। এজন্য আমার কাছে সঠিক সমাধান মনে হয়, নিজেদের সিলেবাসকে পুনর্গঠন করে এ অভাবটা পূরণ করা।

এখানে একটা আপত্তি থাকতে পারে যে, পরীক্ষার চাপ না থাকলে শিক্ষার্থীরা এগুলোতে মনোযোগ দেবে না। এটা আসলে কোনো সমস্যা না। এর জন্য বোর্ড ও মাদরাসার পক্ষ থেকে জোরালো চাপ তৈরি করতে হবে। আমাদের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা খুবই সম্ভব।

বর্তমানে দেখা যায়, আমাদের ভেতরেই কোনো সমন্বয় নেই। কোনো কোনো শিক্ষক এসবকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখালেও অন্যজন এসে গুরুত্বহীন করে দেন। ফলে মানসিকভাবে ছাত্ররা একটা অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতার ভেতরেই থাকে। তাই আমাদের ভেতরে চিন্তাগত দিক থেকে আগে সমন্বয় তৈরি করা দরকার।

দুই. এ পরীক্ষা দেওয়ার পেছনে আরেকটা চিন্তা কাজ করতে পারে, তা হলো, সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের ছেলেদের থেকেও কিছু ছেলে জেনারেল শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতে জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত একটা গুড মুসলিম প্রজন্ম আমরা পাব। এটা সমাজের জন্য যেমন লাভজনক, মাদরাসাশিক্ষার জন্যও লাভজনক। এবং সামগ্রিকভাবে এ দেশের ইসলামি স্বার্থের পক্ষেও কল্যাণকর।

এ চিন্তাটায় আমার আপত্তির পরিমাণ আগেরটা থেকে বেশি। আপত্তির কারণ আগে যা বললাম তা তো আছেই, তাছাড়া গুড মুসলিম প্রজন্ম তৈরির যে চিন্তা, আমি মানছি এটা অবশ্যই কল্যাণকর, তবে এর জন্য মাদরাসাশিক্ষায় ভাঙ্গন না ধরিয়ে, আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষ ও বিত্তশালীদের সমন্বয়ে ইসলামসম্মত স্কুল-ভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পথে যেতে হবে। আমি মনে করি এটাই এর সঠিক সমাধান। এবং সদিচ্ছা থাকলে এর বাস্তবায়ন খুব কঠিন কিছু নয়।

এখানে দুটো প্রশ্ন উঠবে। এক হলো আমরা আমাদের শিক্ষা দিয়ে ছেলেদেরকে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। এখন একটা পর্যায়ে গিয়ে ইসলামিক নলেজ নিয়ে আমাদের ছেলেদের মধ্যে যদি কিছু যদি কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে, তাহলে তো এটা মাদরাসাশিক্ষার জন্য ইতিবাচক!

এর উত্তরে আমি বলব, আমাদের কর্মসংস্থানের যে সমস্যা, এটার জন্য আলাদা করে সম্মিলিত ভাবনা দরকার। আমি মনে করি না, কর্মসংস্থানের জন্য এটা কোনো ভালো সমাধান।

দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা উঠবে, মাদরাসাশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এমন আছে, যারা এই শিক্ষাকে অপছন্দ করে না, কিন্তু নিজেরা পুরোপুরি ‘মৌলভি’ হতে চাচ্ছে না। আমরা আমাদের প্রোগ্রামের মাঝামাঝি থেকে যদি সেদিকে যাওয়ার একটা পথ রাখি, তবে এই শ্রেণিকে ধরে রাখা সম্ভব। অন্যথায় এ ছেলেগুলো না এদিকে থাকতে পারছে, না সরাসরি সে লাইনে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারছে। বাস্তবতা হলো, এরা একসময় ‘খারাপ ছেলে’র তকমা নিয়ে একটা অসম্পূর্ণ জীবনের গ্লানিতে পড়ে যায়।

এ ব্যাপারে আমার কথা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নানারকমের অভাব তৈরি হয়েছে। আমরা যদি সুস্থিরভাবে সম্মিলিত বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে একে সংস্কার করে বিশ্বমান দিতে পারি, তাহলে আমি মনে করি, এ অনাগ্রহের ব্যাপারটি অনেকাংশে কেটে যাবে।

হ্যাঁ, এটা ঠিক, শক্তি ও অর্থের দিক থেকে আমাদের অক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাদের সক্ষমতার ভেতরেও অনেক কাজ আছে, যেগুলো আমরা করছি না। তো, সেগুলো করে পাশাপাশি সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টায় ধারাবাহিক কাজ করে গেলে এ সব খুবই সম্ভব। এরপরও যারা এ লাইনে থাকতে চাইবে না, তারা শুরু থেকেই ইসলামিক স্কুলগুলোতে পড়ুক।

বর্তমানে যারা স্কুলে পরীক্ষা দিচ্ছে, আমি উপরে যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছি, ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে সেগুলো তাদের মধ্যে বিদ্যমান দেখতে পেয়েছি।

লেখক : আলেম ও গবেষক