পাক-আফগানের উলামারা কীভাবে ভুলবেন মাওলানা সামিউল হকের অবদান!

ওমর ফারুক

আফগানের আকাশ এখন বেদনায় নীল। শোকে পাথর শত শত মর্মাহত হৃদয়, শত শত চোখে অশ্রুর ধারা। কোটি হৃদয়ে উচ্চারিত হচ্ছে একটিমাত্র নাম– মাওলানা সামিউল হক। থেকে থেকে জ্বলে উঠছে মাওলানা সামিউল হকের বিয়োগ বেদনা।

আজ বাকরুদ্ধ মাওলানার প্রিয় ‘জামিয়া হক্কানিয়া’র হাজারো তালেবে ইলম। হতভম্ব তার ভক্তকূল। তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে আর ফিরে আসবেন না ইতিহাসের এই নক্ষত্র। হয়তো তিনি এখন পরপারে স্বর্গীয় ঘুমে আচ্ছন্ন! উড়ছেন জান্নাতের বাগিচায়। পবিত্র কুরআন আর প্রিয় নবী (সা.) এর হাদীস তো আমাদের এই বার্তাই দিয়ে যায়।

কে ছিলেন তিনি? কেন তাঁর বিয়োগ বেদনা এত কাঁদাচ্ছে সবাইকে? কী তার পরিচয়? মিসকিন এ কলমের কালিতে হয়তো তা তুলে আনা অসম্ভব। তবে তিনি যে ছিলেন পাক আফগান আলেমদের জন্য এক টুকরো শীতল ছায়া, তা হয়তো অস্বীকার করা যাবে না কোনভাবেই। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অপবাদে জেহাদের যে চেতনা বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সেই চেতনাকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি। ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও জেহাদ ও সত্যের পথে লড়াইয়ের কথা বলেছেন, সত্যের পথে বাইয়াত নতুন শান দিয়েছে ইসলামের স্বপ্নবান লড়াকুদের প্রাণে। তরুণ বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারি বৈধতা নিয়ে পাক আফগানের ভূমিতে ছড়িয়েছেন সত্যের চেতনা। ফলে পশ্চিমারা তাকে উপাধি দিতে বাধ্য হয়েছে ‘ফাদার অব তালেবান’। পশ্চিমারা তাঁকে ‘ফাদার অব তালেবান’ নামে ডাকলেও সত্যের লড়াকুরা তাকে চিনেন ‘ফাদার অব জেহাদ’ নামে। গত শুক্রবার আততায়ীর ছুরিকাঘাতে সামিউল হক শহীদ হন। তাঁর এমন শাহাদাত কী বার্তা দিয়ে যায়? তিনি কী সেই খোলাফায়ে রাশেদিনের পথ ধরেই শেষ বিদায়ের পথে হাঁটলেন? এমন সৌভাগ্য আজ ক’জনের কপালে জোটে?

মাওলানা সামিউল হকের কর্ম ও রাজনৈতিক তৎপরতা

মাওলানা সামিউল হককে তালেবান আন্দোলনের প্রধান নেপথ্য পুরুষ হিসেবেও গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন এ আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের শিক্ষক । মাওলানা সামিউল হক পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একাংশের নেতা ও পাকিস্তান সিনেটের সাবেক সদস্যও ছিলেন। শেষ বয়সে পাকিস্তানে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।

তালেবান আন্দোলনের সঙ্গে মাওলানা সামিউল হকের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পরিচালিত ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’ মাদরাসায় পাকিস্তান সরকার কখনো কোনো হস্তক্ষেপ করেনি; বরং মাদরাসা পরিচালনায় পাকিস্তানের আঞ্চলিক সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থও বরাদ্দ দিতো। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে পাকিস্তানের এক সময়ের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের সাথেও তার সম্পর্ক ছিল ভালো। রাজনৈতিক ও মতাদর্শগতভাবে বিভিন্ন ইসলামী কাজে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।

১৯৩৭ সালে জন্ম নেয়া মাওলানা সামিউল হক পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে গড়ে উঠা ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’ মাদরাসাটির পরিচালক ছিলেন। ১৯৪৭-এ এটি প্রতিষ্ঠা করেন তারই বাবা মাওলানা আব্দুল হক। মানুষ এ ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’কে ‘জিহাদ বিশ্ববিদ্যালয়’ নামেই বেশি চেনে। তিনি ৪০-টিরও বেশি সংগঠনের জোট ‘দিফা-ই-পাকিস্তান’ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। হাফিজ সাঈদের নেতৃত্বাধীন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘জামায়াতুত দাওয়া’-ও এর অন্তর্ভুক্ত।

ক্ষুরধার বাগ্মিতা

মাওলানা সামিউল হকের বক্তৃতা ছিল চমৎকার। মানুষ তার বক্তৃতা শোনার জন্য ভিড় করতো। মঞ্চে উঠলে তাকে চেনা কঠিন হতো। তার সুবিন্যস্ত, স্পষ্ট ও ধারালো বক্তৃতায় সম্মোহিত হয়ে যেত হাজারো মানুষ। বহু বিখ্যাত ছাত্র তৈরি করে গেছেন তিনি। হাজার হাজার তালিবে ইলম তার মাদরাসা থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তালেবান নেতা মোল্লা ওমর, আমির খান মক্কি, মাওলানা আহমদ জং, মোল্লা খায়রুল্লাহ খায়েরসহ অনেক শীর্ষ তালেবান নেতা তার ছাত্র ছিলেন। এখনও আফগানিস্তানের অনেক ছাত্র তার মাদরাসায় পড়ছে।  আফগানিস্তানকে রাশিয়া হুমকি দিলে মাওলানা সামিউল হক আফগানিস্তানে তার ছাত্রদের তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা করেন। পশতু ভাষায় দেয়া সে বক্তৃতায় তিনি বলেন, অতীতে কেবলমাত্র ইসলামের অবসান ঘটানোর জন্য হুমকি এসেছিল; এখন হুমকি এসেছে মুসলিম ও ইসলাম, মসজিদ ও মাদরাসাকে বিলীন করার জন্য। তাই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাশিয়ার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে তালেবানরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আফগানিস্তানে রাশিয়া হস্তক্ষেপ করলে পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইলে মাওলানা সামিউল হকের পরামর্শে পাকিস্তানের তালেবানরা তাদের সহযোগিতা করেছিল।

মৃত্যুর একদিন আগেও মাওলানা সামিউল হক খাইবার পাখতুনখোয়ার ‘চরসাদ্দা’ জেলার টঙ্গি অঞ্চলে একটি সম্মেলনে তার শেষ বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত তার ছাত্র ও অনুসারীরা জিহাদের ওপর তার হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাদের যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দেন।

যেভাবে তাঁর শাহাদাত বরণ

মাওলানা সামিউল হক শুক্রবার আসর নামাজের পর নিজ বাড়িতে নিজ কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন দু’জন ব্যক্তি তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসেন। এরা আগেও তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। মাওলানা সামিউল হকের ব্যক্তিগত কর্মচারী তাদের জন্য দোকান থেকে কিছু নাস্তা পানি নিয়ে আসতে যান। ফিরে এসে দেখেন মাওলানা সামির নিধর দেহ বিছানায় পড়ে আছে। তার চারপাশ রক্তের ডোবায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে হাসাপাতালে নেওয়া হলে তিনি সেখানেই শাহাদাতৎ বরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক নেতাদের শোক

তালেবান নেতাদের এ আধ্যাত্মিক উস্তাদের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাৎক্ষণিক শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে পাকিস্তান একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা হারিয়েছে। এ শূন্যতা পূরণীয় নয়। মাওলানা সামিউল হকের ত্যাগ ও অবদান মানুষ সবসময় স্মরণ রাখবে।’ পাশাপাশি তিনি মাওলানা সামিউল হকের উপর এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় তালেবানদের সঙ্গে প্রস্তাবিত আলোচনার যে মিশন শুরু হয়েছিল সেটিরও নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা সামিউল হক। তিনি বলেন, ‘দেশের একজন বিশিষ্ট আলেমের এভাবে শহিদ হওয়া বড়ই দুঃখের বিষয়। এর উপযুক্ত বিচার হওয়া দরকার।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একাংশের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি তার মাদরাসা দারুল উলুম হাক্কানিয়াতে ৮ বছর পড়াশোনা করেছি। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। আমি তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

মাওলানা সামিউল হককে কেন ভয় করতো আফগান সরকার?

মাওলানা সামিউল হকের ছেলে হামিদুল হক দাবি করেন, তার বাবা আফগান সরকারের জন্য আতঙ্ক ছিলেন। কারণ, তিনি আফগানিস্তানকে পশ্চিমা শাসকদের থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন অপশক্তিদের জন্য আতঙ্ক ছিলেন, যারা জেহাদ ও মাদরাসা শিক্ষার বিরোধী। হামিদুল হক অভিযোগ করেন, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার টার্গেটে ছিলেন মাওলানা সামিউল হক। বিষয়টি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে জানানোও হয়েছিল। তারা নিরাপত্তাও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি বাবার পছন্দ না হওয়ার কারণে হয়ে উঠেনি।

যে শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি মাওলানা সামিউল হকের

মহানবী (সা:) কে কটূক্তির দায়ে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে খ্রিষ্টান নারী আসিয়া বিবিকে খালাস করে দেয়ার প্রতিবাদে গত কয়েক দিন ধরেই পাকিস্তানে বিক্ষোভ চলছিল। শুক্রবার তিনি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। তবে রাস্তাঘাট অবরোধ থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেননি। এটাই ছিল তার জীবনের নিকটতম শেষ ইচ্ছে। মহানবী (সা.) এর প্রতি এ ভালোবাসা মনে নিয়েই পরপারে পাড়ি জমালেন এই ইতিহাসখ্যাত মনীষী।