শাইখুল হাদিস রহ. এর রাজনৈতিক ভূমিকা

মুফতি শহীদুল ইসলাম

একজন কর্মবীর তার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে প্রস্থানের জন্য যেমন থাকেন আমরা হযরত শাইখুল হাদীস রহ. কে সে অবস্থায় দেখেছি। হযরত শাইখুল হাদীস রহ. মূলত ইলমী ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠেন। জীবনের লম্বা একটি সময় ইলমের সাগরে সাতার কেটেছেন। পরবর্তীতে ইলমে নববীর চেতনা ও স্বীয় উস্তাদগণের প্রেরণা থেকে তিনি সিয়াসত তথা ইসলামী রাজনীতির মাঠে আসেন। সেই হিসেবে শাইখুল হাদীস রহ. জীবনের পুরো সময় রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকাল থেকে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য শাইখুল হাদীস রহ. অনেক আন্দোলন করেছেন। এর আগে বৃটিশ খেদা আন্দোলনে শায়েখ রহ. এর ভূমিকা কি ছিল সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। স্বাধীনতার পর যখন বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী রাজনীতির ক্রান্তিকাল চলছিল তখনও শাইখুল হাদীস রহ. অনূকুল পরিবেশ তৈরির জন্য ওয়ায নসীহতের মাধ্যমে বিশেষ অবদান রাখেন। সর্বশেষ হাফিজ্জি হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে শাইখুল হাদীস রহ. সারা দেশের সকল স্থরের মানুষের নিকট বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

উলামায়ে কেরামের মাঝে কেউ কেউ তো সিয়াসতকে কোন পাত্তাই দেন না, আবার অনেকে একেই মনে করে দ্বীনের সবকিছু। শাইখুল হাদীস রহ. এর অবস্থান ছিলো ভ্রান্তি ও প্রান্তিকতার মাঝামাঝি। দ্বীনের অন্যান্য হুকুমের ন্যায় তিনি সিয়াসতকেও একটি হুকুম মনে করতেন এবং সে হিসেবে অন্যান্য কাজের সাথে এটিও ছিল তার একটি দ্বীনি কাজ। তিনি ছিলেন সিদ্দিকী চেতনায় উজ্জীবিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তিরোধানের পর ইসলামের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ দেখা দেয় যা ইরতিদাদ এর ফেতনা হিসেবে খ্যাত। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহচর হযরত সিদ্দিকে আকবর রা. এর দৃঢ় মনোবলের কারণে সে কালো মেঘ কেটে যায়।তার বক্তব্য ছিল “আ ইয়ানকুসুদ দ্বীন ওয়া আনা হ্যাই” আমি আবু বকর জীবিত থাকবো আর আল্লাহর দ্বীন ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবে! তা হতে পারে না।

ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিটি দুর্যোগপূর্ণ মূহুর্তে শাইখুল হাদীস রহ. এর মনোভাবও ছিল এমন। তার বক্তব্য ছিল আমি জীবিত থাকবো আর কতক পাগল আল্লাহর দ্বীনের ডাল-পালা ভেঙ্গে ফেলবে কতক পাগল তার পাতা ছিড়ে ফেলবে তা হতে পারে না। সরকারের অনৈসলামী কোন কর্মকাণ্ডকেই তিনি বিনাচ্যালেঞ্জ ছেড়ে দেননি।

আজ রাষ্ট্র সরকার যখন ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত, ইসলামের শত্রুদের নানামুখি ষড়যন্ত্রে মুসলিম জনতা দিশেহারা, নাস্তিকতা ও ইরতিদাদের ফেতনায় সবকিছু সয়লাব জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে যুগের আবু বকরের বড্ড প্রয়োজন। কিন্তু কোন আবু বকরের সন্ধান মিলছে না। বন্ধুরা! শাইখুল হাদীসের উত্তরসূরি হিসেবে এই শূন্যতা পূরণে তোমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সিদ্দিকী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উম্মাহর হাল ধরতে হবে। তোমাদেরকেই সূচনা করতে হবে নয়া যমানার নতুন জিহাদের। দীপ্ত কণ্ঠে তোমাকেই ঘোষণা করতে হবে “আ ইয়ানকুসুদ দ্বীন ওয়া আনা হ্যাই”।

তিনি ছিলেন একজন সংগঠক। শুধু সংগঠক নয় সফল সংগঠক। এত ভাঙ্গা-গড়ার মাঝেও জাতীয় ও ধর্মীয় ইস্যুতে তিনি সহজে জাতিকে সংগঠিত করতে পারতেন। বাবরি মসজিদ লংমার্চ, ফতোয় বিরোধী আন্দোলন, কুরআন সুন্নাহ বিরোধী নারী নীতি বন্ধে আন্দোলনের সময় তা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। শাইখুল হাদীস রহ. হাফিজ্জি হুজুরের নেতৃত্বে গড়ে উঠা গণজাগরণকে মজবুত সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামী রাজনীতির তাত্ত্বিক দিকগুলো হযরত শাইখুল হাদীস রহ. এর নখদর্পণে ছিল এবং ইসলামী রাজনীতির উপর তার অগাধ আস্থা ছিল যার দরুণ রাজনীতির ময়দানে তিনি কখনো হীনমন্যতার স্বীকার হননি।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব সচেতনতার উদ্দেশ্যে শাইখুল হাদীস বলতেন ‘যার শরীরে মশা-মাছি বসা হারাম ছিলো সেই মহান ব্যক্তি যে দ্বীনের জন্য উহুদের ময়দানে রক্ত ঝরাইছেন সেই দ্বীন আপনার আমার সামনে ক্ষতিগ্রস্থ হবে আর আপনে আমি চুপ করে বসে থাকবো আর আখেরাতে গিয়ে সেই ব্যক্তির কাছে সুপারিশ চাইবো তিনি আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন তার আশা আমরা কিভাবে করতে পারি! তার অধিকাংশ বয়ানের সূচনাই হতো এই আয়াত দ্বারা “তোমরা কি ধারণা করছো তোমরা জান্নাতে চলে যাবে আর আল্লাহ তায়ালা জেনে নিবেন না তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছো আর কে ধৈর্য ধারণ করেছো।’

ওয়াযের প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে আসার জন্যও তিনি জোর তাগিদ দিতেন বলতেন- উলামায়ে কেরাম আপনারা ওয়াযের ধারা পাল্টান। আজ তিনি আমাদের রেখে চলে গেছেন। আমরা দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার এবং সত্যের পথে সংগ্রামের যে ধারা তিনি চালু করে গেছেন হিম্মতের সাথে সে পথে অগ্রসর হওয়ার তৌফিক দান করুন আমীন।

আগের সংবাদইমরান খানকে সমর্থন করায় বিভক্ত জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান
পরবর্তি সংবাদবিআরটিএ কার্যালয়ে আবেদন বেড়েছে দ্বিগুণ