জাতীয় শিক্ষক দিবস আজ, কেমন আছেন কওমি মাদরাসার শিক্ষকেরা?

হামমাদ রাগিব

আজ ১৯ জানুয়ারি। জাতীয় শিক্ষক দিবস। কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে তাঁদের অনেকে এই দিবসের কথা জানেনই না। জানেন না তাঁদের পেশা ও পরিশ্রমের মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের জন্য প্রতি বছর বিশেষ একটা দিবস পালিত হয়। মর্যাদা ও অধিকারের ব্যাপারে বিশেষ কোনো ভাবনাও পরিলক্ষিত হয়নি তাঁদের মধ্যে।

কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কওমি মাদরাসার শিক্ষকেরা ছাত্রদের পেছনে মেহনত ও শিক্ষাদানে যথেষ্ট বেশি মনোযোগী। এবং নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে তাঁরা শিক্ষাদানে ব্রতী হওয়ার ব্যাপারেও সচেষ্ট। যার দরুণ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরেও ছাত্রদের পড়াশোনা ও সার্বিক দেখভালের দিকে বিশেষ মনোযোগী হয়ে থাকেন তাঁরা।

চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুতাওয়াসসিতাহ পর্যায়ের একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ। ২০১৭ সালে রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে সেখানে সাধারণ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে যথাক্রমে সরফ-নাহুর ক্লাস নেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, মাদরাসা-শিক্ষাব্যবস্থায় সরফ-নাহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় প্রতিদিন নির্ধারিত ক্লাসের বাইরেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে ছাত্রদেরকে তিনি অনুশীলন করান।

কওমি শিক্ষাধারার প্রায় মাদরাসারই চিত্র এমন। শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে যোগ্য ও আদর্শ আলেম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মাদরাসার নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও প্রচুর সময় দিয়ে থাকেন।

শিক্ষাদানকে তাঁরা কেবল পেশা হিসেবেই নেন না, বরং এটাকে ধর্মীয় দায়িত্ব ও এবাদত মনে করেন। তবে পরিশ্রমের তুলনায় তাঁদের সম্মানী অনেক অল্প। কোনো কোনো মাদরাসায় সে অল্প সম্মানীটাও নিয়মিত পান না তাঁরা। মাওলানা হাবিবুল্লাহ জানিয়েছেন, সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে তাঁর মাসিক সম্মানী পাঁচ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু সেটা নিয়মিত ক্লিয়ার হয় না। বেশ কয়েক মাসের বকেয়া পড়ে আছে।

কিন্তু এ নিয়ে তাঁর মধ্যে খুব একটা অসন্তোষ লক্ষ করা যায়নি। চাকরির চেয়ে এটাকে ‘দীনের খেদমত’ হিসেবে দেখতেই বেশি আগ্রহী মাওলানা হাবিবুল্লাহ। যার দরুণ আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও মাদরাসার-বেতন ভাতার অনিয়মিতির ব্যাপারে তাঁর বিশেষ কোনো অভিযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা একভাবে তো চালিয়ে নিচ্ছেন, তাই এ ব্যাপারে বেশি ভাবি না।’

তবে বেতন-ভাতার স্বল্পতা ও অনিয়মিতির ব্যাপারে অনেকের মধ্যে অসন্তোষও আছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেটের দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত এক মাদরাসার শিক্ষক জানিয়েছেন, প্রতিদিন সাতটি ক্লাস করিয়ে তাঁর মাসিক সম্মানী তিন হাজার টাকা। সেটাও নিয়মিত নয়। বিভিন্ন বন্ধ ও ছুটিতে মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ অল্প কিছু টাকা শিক্ষকদের হাতে ধরিয়ে দেয়। সেটাও দিনমান অপেক্ষার পর বিকালের দিকে অনেক গড়িমসি করে দেওয়া হয়।

অধিকাংশ মাদরাসায় দেখা গেছে কমিটি ও প্রিন্সিপালের ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। পুরো মাদরাসা জুড়ে তাঁদের থাকে একচ্ছত্র আধিপত্য। শিক্ষকদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণেরও অভিযোগ আছে কোনো কোনো মাদরাসা থেকে। কোনো কোনো মাদরাসায় তুচ্ছ কারণে শিক্ষকদের বিদায় করে দেওয়া হয়। তাই অনেক শিক্ষকই নিজের চাকরির ব্যাপারে অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

মৌলভীবাজারের মাওলানা তাহমীম জানিয়েছেন, কওমি মাদরাসার চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে নরসিংদীর একটি মাদরাসায় আবাসিক শিক্ষক হিসেবে তিনি জয়েন করেছিলেন। মাদরাসার প্রিন্সিপাল তাঁর সঙ্গে খুবই খারাপ এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেছেন। সময়ে অসময়ে নানা ছুঁতোয় তাঁকে ধমকাতেন প্রিন্সিপাল। কিন্তু মাস শেষে বেতনের ব্যাপারে থাকতেন উদাসীন।

মাওলানা তাহমীম আরও জানিয়েছেন, সেখানে জয়েন করার পর থেকে কুরবানি ঈদ পর্যন্ত একাধারে দুই মাস তিনি শিক্ষকতা করেছেন। মাসিক আট হাজার টাকা সম্মানী ধরা হয়েছিল তাঁর নামে। কিন্তু দুই মাসের ভেতর কোনো বেতন তাঁকে দেওয়া হয়নি। ঈদের সময় মাদরাসা বন্ধ হলে বাড়ি আসার জন্য যখন তিনি প্রিন্সিপালের কাছে বেতন চাইলেন, প্রিন্সিপাল নানা অজুহাত দেখিয়ে বলেন, মাদরাসা খোলার পর বেতন দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও কিছু কারণে তাঁর সঙ্গে প্রিন্সিপাল দুর্ব্যবহার করেন।

মাওলানা তাহমীম পরে আর ওই মাদরাসায় যাননি। বর্তমানে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে দারুন নাশাত মাদরাসায় তিনি শিক্ষকতা করছেন। তবে এখনকার মাদরাসার পরিবেশ, কর্তৃপক্ষ এবং সম্মানীর ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এ মাদরাসা-শিক্ষক।

কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নিতর ব্যাপারেও বেশ কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। নিয়োগ ও পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই অধিকাংশ মাদরাসায়ই। কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, কী যোগ্যতা লাগবে—এসবের কোনো রূপরেখা নেই। ফলে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয় অনেক জায়গায়। অনেক জায়গায় যোগ্যরা হন অবমূল্যানের শিকার।

এ ছাড়া জীবনভর শিক্ষকতা করলেও পেনশনের কোনো ব্যবস্থা নেই কওমি মাদরাসাগুলোতে। যার কারণে বৃদ্ধ বয়েসে চাকরি চলে গেলে কিংবা হঠাৎ মারা গেলে বিপদে পড়তে হয় ওই মাদরাসা-শিক্ষকের পরিবারকে।

তবে বিদ্যমান এ সমস্যাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমে আসছে। মাদরাসা-সংশ্লিষ্টরা আগের তুলনায় এখন বেশ সচেতন ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বিশেষত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের বড় বড় মাদরাসাগুলোতে বেতন-কাঠামো ও নিয়মিতি, শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়া ইত্যাদি বেশ সন্তোষজনক হয়ে উঠছে।