শীতের ঋতুর অতিথি পাখি

কাজী মাহবুবুর রহমান

প্রতি বছর শীত নামার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের খাল, বিল, হাওড় আর নদী অঞ্চলগুলি ভরে যায় নানা রঙের অতিথি পাখিতে। প্রতিদিন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি কাগজের প্লেনের মতো নামতে থাকে। বহু দূরদেশ থেকে অতিথি পাখিরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাখায় ভড় করে উড়ে আসে আমাদের দেশে। ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। একটা মানুষের পক্ষে যা অসম্ভব, তা-ই যেন সম্ভব করে দেখায় পাখিগুলো। আল্লাহপাকের অসীম কুদরত পরিলক্ষিত হয় এখানে। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সব জায়গায় যখন পাখিরা ছড়িয়ে পড়ে আমরা অপার মুগ্ধতা নিয়ে এদেরকে দেখি। মনে হতে থাকে এ বুঝি নিছকই এক সুন্দরের লীলাখেলা। কিন্তু এর পেছনেও একটা দুঃখের গল্প জড়িয়ে আছে। অতিথি পাখিরা আমাদের মনে আনন্দ দিলেও তারা দেশ ছেড়ে আসে মূলত নিজেদের জীবন বাচানোর তাগিদে। শীতপ্রধান দেশগুলিতে এই সময়ে শীতের তীব্রতায় টিকতে না পেরে প্রাণ বাঁচানোর লক্ষ্যে তারা অপেক্ষাকৃত উষ্ণ দেশগুলির উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ে। ক্রমাগত দুই মাস তারা শুধুই উড়ে বেড়ায়। প্রতিদিন দুপুরের দিকে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যা নামতেই আবার আকাশে পাখা মেলে। আমরা ঘুম ভেঙে নতুন এক জলাভূমিতে শুনতে পাই হাজার হাজার অতিথি পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। দেখি রং-বেরঙের পাখিদের কোলাহলে প্রকৃতি মেতে উঠেছে।

অতিথি পাখিরা তাদের দেশ ছেড়ে আমাদের দেশে এসে আবাস নেয় প্রায় দুই মাসের মতো। তারপর আবার কোনো এক সকালে আমরা ঘুম ভেঙে দেখতে পাই পাখিরা আগের জায়গায় আর নেই। তারা এক রাতের পথ অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে নিজেদের গন্তব্যের দিকে। বসন্তের সময় অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিলের দিকে তারা শীতপ্রধান নিজেদের যেই অঞ্চল ছেড়ে এসেছিল, সেই অঞ্চলের  বরফ গলতে শুরু করে। কিছু কিছু গাছপালা জন্মাতে শুরু করে। আর ঘুম ভাঙতে শুরু করে পুরো শীতকালে ঘুমিয়ে থাকা অনেক প্রাণীদের। ঠিক এরকম এক সময়ে অতিথি পাখিরা  ফিরে যায় দলবলসহ। কিন্তু তারা কোথায় যায়? তারা কি নিজ বাড়িতে ফিরে যায় , নাকি প্রকৃতি বদলের সঙ্গে ঘুরতে থাকে দেশান্তরে? এখানে বেশ মজার একটা ব্যাপার আছে। তারা ফিরে গিয়ে ঠিক  ঠিক তাদের বাড়িটি চিনে নেয়। গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রের নাবিক যেমন কম্পাস ব্যবহার করে পথ চলে, এই পাখিদের দেহে সেরকম কিছু একটা জন্মগতভাবেই আছে, যা তাদের পথ চলার সময় দিক চিনতে সাহায্য করে। তাছাড়া তারা সূর্য ও তারার অবস্থানের উপরই নির্ভর করে। পরিষ্কার মেঘমুক্ত রাতে যখন আকাশে নক্ষত্র দেখা যায়, তখন পাখিরা নির্বিঘ্নে পথ চলতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকলে নক্ষত্র ঢাকা পড়ে। এ সময় এসব পাখিরা আকাশ থেকে নিচে কোনো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে চলা পাখিরা এ ক্ষেত্রে দিকভ্রান্ত হয়। তাদের সঙ্গে ঘটে দুঃখজনক এক ঘটনা। এ সময় অনেক দূরের কোনো লাইটহাউসের শক্তিশালী আলোর দিকে পথ ভুল করে তারা চলে আসে দলে দলে। মেঘলা কুয়াশাচ্ছন রাতে লাইটহাউজের গ্লাসে আঘাত পেয়ে হাজার হাজার পাখি মারা পড়ে।

যে পাখিটি একবার ফিরে গেল তার ঘরে, পরবর্তী বছর শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে সে আবার কোন দিকে যাত্রা করবে? সাইবেরিয়া থেকে যে পাখিটি উড়ে এসেছিল বাংলাদেশে , পরের বছর সে কি আবার বাংলাদেশেই ফিরে আসবে? পাখিদের এ এক অদ্ভুত জীবন। ডানায় ভর করে পৃথিবীর মেরু বদল করার জীবন। ভাবতেই অন্যরকম রোমাঞ্চে মন ভরে ওঠে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অতিথি পাখি শিকার করা বারণ। ইসলামি আইনে পাখি শিকার দণ্ডনীয় নয়। পাখি দুর্লভ হয়ে আসার মূল কারণ পাখিহত্যা নয়, বরং পরিবেশ। প্রজনন ও প্রতিপালনের সঠিক পরিবেশ থাকলে কোন প্রাণীই দুর্লভ হবে না। সিম্প্যাথির জায়গা থেকে পাখি শিকার থেকে নিবৃত করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মূল সমস্যাকে আড়াল করা হয়। পরিবেশদূষণ বন্ধ, বন রক্ষা ইত্যাদি প্রকল্পে উদ্যোগ গ্রহন করলে শিকারের পরেও প্রচুর পশু পাখিতে আমাদের বন বাদাড়, হাওড় বিলে ভরে থাকবে।