শোকরানা মাহফিলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি : যা বললেন হাইয়াতুল উলইয়ার নেতৃবৃন্দ

ওমর ফারুক :

গতকাল রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শোকরানা মাহফিল’। কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান দেওয়ায় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে এ শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করেন হাইয়াতুল উলইয়ার নের্তৃবৃন্দ। হাইয়াতুল উলয়ার চেয়্যারম্যান আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই শোকরানা মাহফিলের প্রধান অতিথি ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় হাজারো আলেম ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ক্রেস্ট ও স্মারক সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী ও আল্লামা আহমদ শফীর হাতে।

একধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝেই এ সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছিল। ফলে সর্বশ্রেণির মানুষেরই কৌতুহল ছিল শোকরানা মাহফিল নিয়ে। আলেমদের একটি শ্রেণি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন শোকরানা মাহফিল যেন শুধু শোকর-গুজারিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। রাজনৈতিক কোনো স্বার্থে যেন তা ব্যবহৃত না হয়। আয়োজকদের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দও এমনটাই আশ্বাস দিয়েছিলেন। সে প্রতিশ্রুতি তারা কতটা রক্ষা করতে পেরেছেন, তা নিয়েও কওমিসহ নানা মহলে চলছে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হাইয়াতুল উলইয়ার শরিক কওমি মাদ্রাসার ৬ বোর্ডের শীর্ষ নেতৃত্বসহ দেশবরেণ্য উলামায়ে কেরাম ও মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ। তাদের মধ্যে বিশেষ করে ‘বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গহরডাঙ্গা’ বোর্ডের সভাপতি ও গওহরডাঙ্গা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতী রুহুল আমিনের প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি-জননী’ খেতাব দেওয়া নিয়ে চলছে নানারকম আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই এটিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন, কেউ কেউ ব্যাপারটিকে দেখছেন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এমনকি হাইয়াতুল উলইয়ার অনেক নেতৃবৃন্দ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে আল্লামা আহমদ শফীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর হ্যান্ডশেক এবং মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদকর্তৃক আল্লামা আহমদ শফিকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেওয়ার আবেদন নিয়েও। সবকিছু মিলিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। কেবলমাত্র স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমী-জননী’  ঘোষণা দেওয়াটা তরুণ আলেমসমাজ বাড়াবাড়ি বলে মনে করছেন। বড়দেরও কেউ কেউ রয়েছেন তরুণদের সাথে। মঞ্চে উপস্থিত কারো কারো অতিরঞ্জিত ও অতি উৎসাহী বক্তব্যে বিরক্ত তারা নিজেরাও। ফলে শোকরানা মাহফিলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

বক্তব্যে মুফতি রুহুল আমীন বলেছিলেন, ‘এই চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থীর জননীর ভূমিকা আপনি পালন করেছেন। আজ আমি এই জনসমুদ্র থেকে আপনাকে উপাধি দিলাম, আপনি কওমি-জননী।’

মুফতী রুহুল আমিনের এই বক্তব্য জাতীয় গণমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। দাবি করা হচ্ছে, কওমি আলেমদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে এ খেতাব দেয়া হয়েছে। এতে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন অনেকেই। কানাঘুষা শুরু হয়েছে মাহফিল অঙ্গনেই। দেশের একাধিক শীর্ষ আলেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ফাতেহ২৪ কে তারা জানান, এমন খেতাব আল হাইয়াতুল উলইয়ার কোনো খেতাব নয়। এটি কোনো ব্যক্তি বিশেষের বক্তব্য। আল হাইয়াতুল উলইয়া এমন খেতাবের সঙ্গে একমত নয়।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সদস্য মুফতী নূরুল আমিন শুকরানা মাহফিলের প্রাপ্তির ব্যাপারে বলেন, ‘স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতাস্বরুপ এ শোকরগুজারি মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদের গেজেট আল্লামা শাহ আহমদ শফীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ মাহফিল থেকে উচ্চারিত হয়েছে আল্লাহ ও তার রাসুলকে নিয়ে কটূক্তির ফলে শাস্তির কথা। তাছাড়া হেফাজতের যতো নেতাকর্মীদের নামে মামলা মোকাদ্দামা রয়েছে তাও তুলে নিতে আমরা একটি তালিকা প্রদান করেছি। আশা করি সেটাও নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।’

কিন্তু এর মাধ্যমে কওমি ঐতিহ্যের কোনো ক্ষতিসাধন হলো কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখানে হারানোর কিছু নেই। আল্লামা শাহ আহমদ শফী মনে করেছেন এ স্বীকৃতির বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানানো কওমি মাদরাসাগুলোর জন্যই মঙ্গলজনক হবে। তিনি এ ভেবেই এ মাহফিলের আয়োজন করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

কৃতজ্ঞতা আদায়ের ভাষা কি ‘কওমি-জননী’ হতে পারে, এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি যিনি করেছেন তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। আল হাইয়াতুল উলইয়ার কোনো বক্তব্য নয়। এছাড়া হেফাজত ও আল হাইয়াতুল উলইয়া এক নয়। দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। যারা শাপলার বিষয়কে স্বীকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলছেন তাদের কাছে কি ডকুমেন্টস রয়েছে যে, সে রাতে কতোজন মানুষ মারা গিয়েছিল? শোনা কথা আর কাগজের কথা এক নয়। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি এ তালিকা তৈরি করার জন্য। কিন্তু কেউ এমন অভিযোগ আনেনি। তারা কেন অভিযোগ আনেনি তারাই ভালো জানেন।’

তবে এ দায় কি এড়িয়ে যেতে পারবে আল হাইয়াতুল উলইয়া? এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা আনোয়ার শাহ বলেন, ‘আল হাইয়াতুল উলইয়া কেমন করে এর দায় এড়াবে? তারা তো এমন বক্তব্য দিতে যেয়ে কারও পরামর্শ নেয়নি। সিদ্ধান্তও মানেনি।’ তিনি বলেন, ‘এসবের জন্য আমরা আজ পরিস্থিতির শিকার। বলতেও পারি না, কিছু করতেও পারি না।’

এ পরিস্থিতিটি কেন তৈরি হয়েছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,  ‘এমন একটা পরিস্থিতিতে আজ আমরা অবস্থান করছি যে, আমাদের সবার কণ্ঠ এক নয়। অথচ এক কণ্ঠকেই আমাদের সবার কণ্ঠ বলে মনে করা হয়।’ শোকরানা মাহফিল থেকে কওমিসমাজ কী পেল আর কী হারাল, তা নিয়ে বিতর্ক সহজে থামবার নয়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ উলামা-তলাবার এই সমাবেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে দিচ্ছে নতুন বার্তা। বিভিন্ন ধর্মবিদ্বেষী মহল ব্যাপারটিকে তাদের পরাজয় হিশেবে দেখছে।’

দিনভর নানারকম তুচ্ছ ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে মূলধারার মিডিয়াগুলি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর পরিবেশন করে গেছে। মাহফিলে আলেমদের নানান দাবিদাওয়া পূরণের আশ্বাস এবং তাদের সাথে সরকারের অন্তরঙ্গতায় অনেকেই নিজেদের স্বার্থ হারানোর ভয়ে ভীত৷ ৫ মে ২০১৩ সালে, শাপলা চত্ত্বরের ঘটনার পরে, রাষ্ট্রের সাথে কওমিসমাজের যে অতি বৈরীভাব তৈরি হয়েছিলো, তা থেকে ফায়দা লুটছিলো অনেক স্বার্থান্বেষী মহল। সোশাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মাদ্রাসাছাত্রদের জাদুঘর, শহীদ মিনার, টিএসসিসহ আরো নানান দর্শনীয় স্থানে হাসিমুখে ঘুরে বেড়ানোর অনেক ছবি। রাষ্ট্রের সাথে আলেমসমাজের তরুণতর প্রতিনিধিদের এই সহজ ও সহাস্য সম্পর্ক আখেরে কেমন ফল বয়ে আনে, তা তো সময়ই বলবে।