শ্রমিক-অধিকার আন্দোলনে ইসলামপন্থীরা নেই কেন?

মুসান্না মেহবুব

অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা এবং বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে নিরীহ শ্রমিকদের মারধরের প্রতিবাদসহ বকেয়া বেতনভাতা পরিশোধ, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বৃদ্ধি ইত্যাদি দাবি নিয়ে দু’দিন ধরে রাজধানীর গার্মেন্ট-শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন।

শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এইসব আন্দোলনে বামধারা প্রভাবিত বিভিন্ন সংগঠন শ্রমিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। উলামায়ে কেরামের ভূমিকা এখানে খুব একটা চোখে পড়ে না। অথচ ইসলামে শ্রমিক-অধিকারের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। এবং শ্রমিককে সমতাভিত্তিক যে অধিকার ও মর্যাদা ইসলাম দিয়েছে আর কোনো মতবাদই অমনটা পারেনি। তাই ইসলামের রিপ্রেজেন্টোর ও ব্যাখ্যাকার হিসেবে উলামায়ে কেরামকে শ্রমিক অধিকার বিষয়ক আন্দোলনগুলোতে সবচেয়ে সক্রিয় ও সুসংহত ভূমিকা রাখার কথা ছিল।

কিন্তু এমনটা হচ্ছে না কেন?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রে শ্রমিক আন্দোলনের যে ধারণা, তার সাথে আলেমদের সম্পর্কিত হবার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা আছে। এই সমস্যা আলাদা কিছু না। আধুনিক রাষ্ট্রে আলেমদের রাজনীতির সামগ্রিক সমস্যার মধ্যেই এটা অন্তর্ভুক্ত। আলেমদের রাজনীতির কিছু বৈশিষ্ট্য তো আছে। আধুনিক রাষ্ট্রের যে কাঠামো এবং  ব্যবস্থা, সেই হিসাবে সাধারণ মানুষ আলেমদের চাইতে, অনেক ক্ষেত্রে, সেক্যুলারদেরই বেশী যোগ্য মনে করে। ফলে আলেমদের রাজনীতি কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে এর বাইরে গিয়ে তাঁরা রাজনীতি করেন না। করলেও সেটা যে খুব ফলপ্রসূ হবে এমনও মনে হয় না।

দ্বিতীয়ত সংগঠন বা ইন্সটিটিউশন। শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ততার জন্য শক্তিশালী ফোরাম লাগবে, ইন্সটিটিউশন লাগবে। আলেমরা আধুনিক রাষ্ট্রে এক কওমি মাদরাসা ছাড়া আর তেমন কোনো ফলপ্রসূ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারেননি। তাবলিগ জামাতের সাথে অনেক শ্রমজীবী মানুষ যুক্ত, ঠিক আছে, কিন্তু পেশা ও অধিকারের জায়গায় এদের সঙ্গে আলেমরা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হতে পারেননি।

তৃতীয়ত শ্রমিক আন্দোলনের একটি কমিউনিস্ট চরিত্র ও ডিসকোর্স অনেক আগে থেকেই সমাজে প্রচলিত। এ দেশে বড় একটা সময় শ্রমিক আন্দোলনের স্টেকটা কম্যুনিস্টদের হাতে ছিল। আলাদাভাবে শ্রমিক আন্দোলনের উপর জোর না দেওয়ার এও এক কারণ।

আসল ব্যাপার হলো, শ্রমিক আন্দোলন কারা করবে? যারা রাজনীতি করেন, তারাই। আলেমসমাজ এদেশের শ্রমজীবী সমাজকে সবচে কাছ থেকে দেখেন, তাদের সাথে আলেমসমাজেরই সবচে ঘনিষ্ট ওঠাবসা। কিন্তু, ধর্মীয়ভাবে এদের উজ্জীবিত করলেও, রাজনৈতিকভাবে এদের অধিকারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা আলেমরা ভাবেনই নাই, এটা সেক্যুলারদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। ব্যাপারটা এদেশের আলেমদের সীমাবদ্ধতা তো বটেই, একইসাথে, এটা ইসলামপন্থারও সীমাবদ্ধতা।

পুরো ব্যাপারটাকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের প্রধানত দুটি ধারা সক্রিয়। ঐতিহ্যবাদী ধারা ও আধুনিক ধারা।

ঐতিহ্যবাদী ধারা প্রধানত মসজিদ, মাদরাসা ও মাহফিল-কেন্দ্রিক নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাদের রাজনীতিতেও এই কাঠামোবদ্ধতার একটা প্রভাব আছে। তারা শ্রমিক ইস্যুকেও এর মধ্য দিয়ে সমাধান করতে চান। শ্রমিক ও মালিকরা নিয়মিত মসজিদে নামাজ আদায় করলে, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে তাদের মধ্যে নৈতিকতা বিকশিত হবে। ফলে তারা অধিকার প্রশ্নে বঞ্চনা বা বিশৃঙ্খলার শিকার হবেন না। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থার বিকাশের ধারায় তারা এরচে বিস্তারিতভাবে অধিকার প্রশ্ন মোকাবেলা করতে পারেননি। তবে এ নিয়ে তাদের মধ্যে অনুশোচনা আছে। নতুন নেতৃত্ব এসব নিয়েও ভাবছেন।

ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থীদের রাজনীতির শুরুটা হয়েছে আত্মপরিচয় ও বাহ্যিক ধর্মীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্য। ইসলাম বিরোধিতার প্রতিবাদের জন্য। ফলে প্রথাগত ধর্মীয় প্রশ্নের বাইরে গিয়ে অধিকার প্রশ্ন নিয়ে কাজ করার তেমন একটা সুযোগ তারা পান না। ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থীদের মূল বিস্তার আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। বিশেষত বড় মাদরাসা ও মারকাজের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। আমরা একটু খেয়াল করলে দেখবো, শিল্পাঞ্চলগুলোতে তাদের তেমন একটা প্রভাব নেই।

পাশাপাশি আধুনিক নাগরিক সমাজের বিকাশের ফলে ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সমাজের প্রভাব অনেক ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাদের আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের অধিকার রক্ষা ও জুলুম প্রতিরোধী আন্দোলনের সুযোগ আধুনিক রাষ্ট্রে নেই। নিজের পরিসর থেকে বের হয়ে ভিন্ন পরিসরে আন্দোলনের পরিবেশ তারা এখনো তৈরি করতে পারেন নি। ফলে তাদের হস্তক্ষেপের সুযোগ কম। তবে ঐতিহ্যবাদী ধারার বিকেন্দ্রীকরণও ঘটছে। ফলে শিল্প অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আধুনিক ইসলামপন্থীদের মূল বিকাশ আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলিয়া মাদরাসা ও গ্রামীণ অঞ্চলে। অধিকার আন্দোলন তাদের প্রস্তাবনায় থাকলেও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্ষমতা বিষয়ে তারা এতটাই ব্যস্ত থেকেছেন যে তাদের পক্ষে অধিকার আন্দোলনে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। হলেও সেগুলো ফ্যাক্ট হয়ে উঠতে পারেনি। পাশাপাশি শ্রমিক ইউনিয়নগুলোতে ব্যাপকভাবে বামদের প্রভাব বিস্তারিত হয়েছে, তাদের সাথে কুলিয়ে উঠা যায়নি।

পাশাপাশি আধুনিক ইসলামপন্থীদের মধ্যে জাগতিক শিক্ষা ও অর্থনীতি এতোটা গুরুত্ব পেয়েছে যে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে অশিক্ষিত ও গরীব শ্রমিকদের সাথে তাদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা মতে, শিক্ষা ও ক্ষমতার সঙ্কট থেকেই শ্রমিক জুলুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই শিক্ষিত হতে হবে, ক্ষমতা দখল করতে হবে। পরবর্তী সময়ে এর সমাধান আসবে।