হিফজখানা : সুবহে সাদিকের পাখিরা

কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ 

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের হিফজখানা বললে খুব করুণ একটি দৃশ্য চোখে ভাসত। গ্রামের দিকের হিফজখানাগুলি এতটাই জরাজীর্ণ ও মলিন ছিল যে বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাসমুহের ভেতর এই একটি অধ্যায় নিয়ে আমাদের কখনো কথা বলা কিংবা ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি।

অপরিণত বয়সে পরিবার দূরে থাকা কিছু শিশু আর শাসনের ছড়ি হাতে বসে থাকা শিক্ষক, এই ছিল হিফজখানার সবচেয়ে ধ্রুপদী দৃশ্য। এর বাইরে আরো নানান হেলা, অবহেলা তো ছিলই।কেবল মৃত্যুবার্ষিকীগুলোতে তাদের স্মরণ করা হত, অতিথি নয় বরং পরকালের পুণ্যের আশায় তাদের আহার করানো, দশ বছর আগের কথা ভাবলেও এই স্মৃতিই কেবল ফিরে আসে।

কিন্তু সময়টা বদলে যাচ্ছে।একাধারে বেশ কয়েক বছর যাবত তারা আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে সোনার পদক অর্জন করে চলেছেন। তারা কুড়েঘর থেকে বের হয়ে বিশ্বকে ছুঁয়ে দেখতে এলেন, এবং জয় করলেন।

প্রথমেই হিফজখানার পড়াশোনার ব্যবস্থা নিয়ে একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরীর চেষ্টা করি। পবিত্র কুরআন শরীফ মহান আল্লাহ তায়ালার কালাম। এই গ্রন্থটি অর্থ বুঝে, মর্ম উপলব্ধি করে পড়ার যেমন গুরুত্ব আছে, তেমনি কিছু না বুঝে শুধু বিশুদ্ধ উচ্চারণে পাঠ করে যাওয়া, এবং মুখস্থ করারও তেমন গুরুত্ব আছে। এবং তা অসীম পুণ্যের কাজ। যারা কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন তাদেরকেই হাফেজ বলা হয়। পবিত্র হাদিস শরিফে হাফেজদের উচু মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে। পৃথিবীতে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যার হাফেজের সংখ্যা এত বেশী এবং সর্বযুগেই এর পাঠ ও মুখস্থ করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। এবং উত্তরোত্তর তার উৎকর্ষ ও বিশ্বায়ন বেড়েই চলছে।

কোরআন শরিফের মত এই একটি বৃহৎ কলেবরের কিতাব মুখস্থ করা একটি অলৌকিক এবং অক্লান্ত শ্রমসাধ্য ব্যাপার। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত যাদের মাতৃভাষা আরবি নয় তাদের জন্য এটা কতটা বিস্ময়কর তা সহজেই অনুমেয়। যেখানে একটি দশ লাইনের কবিতা একজন সাধারণ মেধার মানুষের দশ দিন মনে রাখা মুশকিল সেখানে ৭৭,৪৩৬ শব্দের  একটি কিতাব বছরের পর বছর নির্ভুল মুখস্থ রাখা অভাবনীয় একটি বিষয়ই বটে।

বাংলাদেশের হিফজখানাগুলিতে ছেলেদের প্রতিদিন ফজর নামাজেরও এক ঘন্টার বেশী সময় আগে ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনায় লেগে যেতে হয়। সারাদিনে তিনবেলা খাবার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ও দিনে রাতে ঘুম-গোসলের জন্য পরিমান মত বিরতি দেয়া হয়। আর বিকেলবেলা খেলাধুলা, ব্যক্তিগত কাজের জন্য বিরতি থাকে। এছাড়া সুবহে সাদিকের সময় থেকে রাত দশটা পর্যন্ত একাধারে পড়াশোনায় লেগে থাকতে হয়। বছরে পাঁচটি ছুটি আছে, তিনটি পরিক্ষা ও দুই ইদের জন্য। এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একটি ছেলের সাধারণত দুই বছরেরও বেশী সময় লেগে যায় কোরআন শরিফ মুখস্ত করতে। কারো লাগে আরও বেশী সময়।

তারা আমাদের ধর্মীয় বিরাট একটা চাহিদা  পুরা করেন। তবে এর কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ব্যক্তিগত উদ্যোগের বাইরে আমরা তাদের জন্য কিছু করতে পারিনি। ইহলৌকিক জীবনে বাহ্যিক দৃষ্টিতে বড় কোনো ফল বয়ে আনবেনা জেনেও অভিভাবকরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সন্তানদের পড়াচ্ছেন। সমাজের দাতাব্যক্তিরা অনুদান করে যাচ্ছেন কিন্তু রাষ্ট্রের সম্মানের এই জায়গাটিতে রাষ্ট্র সব সময়ই উদাসীন। কিন্তু যারা এই শিক্ষাটির সঙ্গে জড়িত আছেন তারা রাষ্ট্রের এই অবহেলার পরিবর্তে ফিরিয়ে দিয়েছেন সম্মান। অনুল্লেখযোগ্য সীমিত বেতনে চাকরি করে, সবার আগে ঘুম ভেঙে পরিশ্রম করে করে তারা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন। এবং রাষ্ট্রকে জিতিয়েছেন সোনার পদক।

হিফজখানার ব্যবস্থাপনার সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। একটা আট বছরের শিশুকে — যখন তার পিতামাতা, পরিবার এবং চারপাশ থেকে ভালবাসা পাওয়ার সবচে প্রয়োজনীয় সময়। মেধা এবং শারীরিক বিকাশের সময়, তখন তাকে একটা আবদ্ধ পরিবেশে আটকে রাখা হচ্ছে, এও হতে পারে এক প্রশ্ন। আরো নানান অসঙ্গতির কথাও আসতে পারে। কিন্তু এতকিছুর পরেও যারা কোরআনী শিক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, এবং বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের পরিচয়কে উচু করে তুলে ধরছেন তাদেরকে ভালবাসতে আমাদের এতটা কৃপন হওয়া অকৃতজ্ঞতা এবং অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।

বাংলাদেশের হয়ে জাওয়াদদের সঙ্গে সোনার পদক তরিকুলরাও জিতে। জাওয়াদদের সঙ্গে ভালবাসুন তরিকুলদেরও। তাদের সম্মান করুন। তারা আশাহত করবেনা। ফিরিয়ে দিবে বহুগুণ।