
সাবের চৌধুরি
এক.
এ বছরের ইজতেমা উপলক্ষ্যে তাবলীগের উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়েছে। যদ্দূর শুনলাম, মাও. যুবায়ের, মাও. উমর ফারুক, সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও খান মুহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে আগামি ১৫, ১৬, ১৭ ফেব্রুয়ারী এক পর্বে যৌথভাবে পরিচালিত হবে এই ইজতেমা। এটাও শুনলাম, ইজতেমা নাকি সম্পূর্ণ উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। উপরোক্ত চারজন যদি মূল পরিচালনায় থাকেন, তাহলে উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে, এই কথাটি বোধগম্য নয়। কে যেন বললো, সবকিছুর ফায়সাল হবেন মাও. যুবায়ের সাহেব। এটাও কতটুকু সঠিক কে জানে।
উভয় পক্ষ এক হয়ে যাক, এটা মনে প্রাণে কামনা করি। এবং এক হয়ে যাওয়া বলতে আমি বুঝতে চাই, অনৈক্যের যে সূত্রগুলো ছিল, সেগুলো মূল থেকে মিট করা। এগুলোকে মিট না করে সন্ধির মত করে এক হওয়ার কোন অর্থ দেখা যাচ্ছে না। তাবলীগের চলমান সংকটের যে উপাদান ও রূপ, এতে বরং বিভক্তিটি নতুন একটি দিকে মোড় নিবে এবং বিশৃঙ্খলা নতুন রকমের মাত্রায় উন্নীত হবে।
বলা হচ্ছে, ইজতেমার স্বার্থে এই সমঝোতা সাময়িক। অন্যথায়, যে আদর্শিক জায়গা থেকে আপত্তি উঠানো হয়েছিল, তা আপন জায়গায় বহাল আছে এবং এর উপর সংশোধনী কাজ চলতে থাকবে ধারাবাহিকভাবেই। এমন হয়ে থাকলে তো ভালোই। কিন্তু, এই সিদ্ধান্তের পিঠে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি দিক সামনে আসছে, সেগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট চিন্তা, বক্তব্য ও কর্মপন্থা ঠিক থাকা উচিত বলে মনে করি।
ক.
ইজতেমা শেষে ময়দান থেকে হাজার হাজার জামাত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। এর মাধ্যমে এতাআতপন্থিগণ বিচ্ছিন্ন অবস্থা থেকে আবার ব্যাপকভাবে মূল ধারায় ঢুকে পড়বে, নিজেদের সুনির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে এবং দেশব্যাপি সকল মারকাজ ও মসজিদগুলোতে অবাধে নিজেদের বিশেষ কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালাতে শুরু করবে। ইজতেমায় আসতে দিবেন, কিন্তু, জামাতবন্দি হওয়া বা মসজিদগুলোতে যেতে দিবেন না, তা-তো হবে না। যদি দেওয়াই হয়, তাহলে এ ঐক্য সাময়িক—এ কথা বলার মানে কী?
হতে পারে, ‘সাদ সাহেব আসবেন না’—এটা তাদের বিশেষ একটা টোপ ছিল। তারা মূলত সাদ সাহেবের একচেটিয়া মসনদকে সম্ভাব্য ও জোরালো করার জন্য এই সমঝোতার মাধ্যমে সময় বের করে নিচ্ছে এবং কর্মের ব্যাপক ফিল্ড পাওয়ার জন্য কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। বিগত কয়েকমাসে আমরা তাদের যে হিংস্র ও বিদ্বেষী চেহারা দেখেছি, সে হিসেবে এটা বাঙলাদেশের মুসলিম সমাজ ও তাবলীগের জন্য কল্যাণকর নয়। এরা মূল ধারায় চলে আসুক, এটা অবশ্যই কাঙ্খিত; কিন্তু, নিজেরা সংশোধিত না হয়ে, বিরোধ ও বিরোধের সূত্রগুলো জিইয়ে রেখে, নির্দিষ্ট প্ল্যাণ নিয়ে এবং নিজেদের বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদেরকে এই সুযোগ করে দেওয়াটা চিন্তার বিষয়।
খ.
১ ডিসেম্বর সাধারণ মুসল্লি ও উলামা-তলাবাদের উপর হিংস্র আক্রমণ করে যে অপরাধ করেছিলো, এবং এর ফলে দেশব্যাপী তাদের ব্যাপারে যে কোনঠাসা আবহ তৈরী হয়েছিল, এই সমঝোতার আবহে এই অবস্থাটি দ্রুতই কাটিয়ে উঠবে। একটা গোষ্ঠি এমন রকমের জঘন্য একটি অপরাধ করার পর স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে যাওয়া শুভকর নয়; সুখকরও নয়।
গ.
এই সমঝোতার মাধ্যমে টঙ্গি হামলার বিচারের বিষয়টি চাপা পড়ে যাবে। অথচ, এর বিচার হওয়া এবং বিচার হওয়ার আগ পর্যন্তত তাদের উপর এর চাপটি জারি থাকা অনিবার্য ছিল। এ দাবির ব্যাপার চুপ হয়ে যাওয়াটা আশংকাজনক।
ঘ.
এতাআতপন্থিগণ ‘সাদ সাহেব আসবেন না’—শুধু এটুকু মেনে নিয়েছে। কিন্তু, তার একচেটিয়া অনৈতিক আনুগত্য থেকে কি বের হয়েছে? হয়নি। বিশ্বব্যাপী উলামায়ে কেরামের বক্তব্যকে মেনে নিয়ে সাদ সাহেবের বিভ্রান্ত চিন্তাসমূহ থেকেও ফিরে এসেছে? আসেনি। নিদেনপক্ষে বিদ্বেষ-প্রোপাগাণ্ডা-দলবাজি-তথ্যসন্ত্রাস ও হিংস্র মনোভাব থেকে ইস্তফা দিয়েছে? দেয়নি।
অথচ, জাতীয় মিডিয়াগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করছে—দু’দলের মাঝে মিট হয়ে গেছে। এতাআতপন্থিগণও অনলাইলনে-অফলাইনে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে এটি। সাধারণ মানুষ, সাধারণ তাবলীগের সাথীসহ সকলের মাঝে ব্যাপকভাবে “সমঝোতা হয়ে গেছে”-চিন্তাটি প্রতিষ্ঠা পেলে, পরবর্তীতে আর তাদের ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। বললেও মানুষ একে ভালোভাবে নেবে না। অর্থাৎ, তাবলীগের সূত্রে চলে আসা সংশোধনী বক্তব্যগুলো অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাটাতনে নৈতিক ভীত হারিয়ে ফেলবে। অথচ, ভেতরে সমস্যা যা ছিল, তা তো রয়েই গেছে। এগুলোসহই যদি সমঝোতাটি প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে এতো কিছু না করে শুরু থেকেই তা হলো না কেন? মাঝখান থেকে উলামায়ে কেরামকে একটা তৃতীয়পক্ষ হিসেবে গন্য করা শুরু করবে মানুষ। কাকরাইলের মুরুব্বিগণসহ উলামায়ে কেরামের ওজাহাতিজোড়, দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা-চেষ্টা-প্রচেষ্টা, ছাত্রদের মাইর খাওয়া ইত্যাদির কী হবে?
ঙ.
সাদ সাহেব আসবেন না—এটা কিন্তু কাকরাইলের মুরুব্বিগণ শর্ত দিয়ে মানাতে পারেননি। তারা নিজেরাই প্রস্তাব করে মেনে নিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা নিজেদের সুনির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা যতই বলি, সবকিছু মূল ধারার মুরুব্বিদের নিয়ন্ত্রণে হবে, কিন্তু, সময়ে গিয়ে তারা মোড় ঘুরিয়ে ফেলবে না বা নিজেদের অনুকুলে অন্যায় পরিস্থিতি তৈরী করবে না—এর গ্যারান্টি কী? সরকার ও প্রশাসনকে বিশ্বাস করার কোন অর্থ নাই। অতীতে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ইজতেমার সুফল সাদপন্থিগণ কড়ায়-গণ্ডায় উঠিয়ে নেবে। কিন্তু, উলামাপন্থীগণের বেনিফিট কী? সাদ সাহেব ছাড়া ইজতেমা হচ্ছে–এটা একটা দিক। কিন্তু, এর বিনিময়ে তারা যে অবস্থানে চলে আসবে, যোগ-বিয়োগে উনার না আসাটা বাংলাদেশ তাবলীগের জন্য খুব বড় অর্জন বলে মনে হচ্ছে না৷ তাছাড়া শেষ পর্যন্ত সাদ সাহেবকে আনার জন্য তারা প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাবে, এটা নিশ্চিত। হয়তো দেখা যাবে, শেষ দিকে গিয়ে এই ইস্যু নিয়ে তারা গোল বাঁধিয়ে বসবে।
এখানে কেউ এসে বলতে পারেন, আপনারা কি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন? এতাতিরা কি কাফের-মুশরিক? তো, এ ধরণের লোকদেরকে আমি সবসময় ভয় পাই। আসলে, যতটা না ভয় পাই, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত হই। এরা সাধারণত ঘটনার আগেও থাকে না, পিছেও থাকে না, মাঝখানে বেমক্কা একটা সরলিকরণ করে বসে।
সব দিক মিলিয়ে এবার ইজতেমা হওয়াটা খুব জরুরী কিছু ছিল বলে মনে হয় না। তবু, সিদ্ধান্ত যখন হয়েছে, আল্লাহ তাআলা একে কামিয়াব করুন। এর মাধ্যমে নতুন কোন ফিতনার উদ্ভব যেন না হয়, নিষ্ঠুর হিংস্রতার বলি যেন না হয় আর কোন প্রাণ, এই দোয়া করি। কিন্তু, মনে রাখতে হবে, চলমান এই ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যাটিকে মূল থেকে সমাধানের জন্য কাজ করতে হবে। চিন্তা ও কৌশলগত দিক থেকে যার মাঝে যে সমস্যা আছে, তা দূর করতে হবে। অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তিগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর উপর জোর দিয়ে কাজ করার বিকল্প নাই।
দুই.
তাবলীগের ব্যাপার কাকরাইলের হকপন্থি মুরুব্বি ও উলামায়ে কেরাম অনেকদিন যাবত যে কর্মতৎপরতা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছেন, তা অনেকটা শুদ্ধি অভিযানের মত। এটা যেহেতু শুরু করাই গেছে, একে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া এখন একান্ত আবশ্যক। এখানে সাদ সাহেব আসা না-আসাই শুধু ফ্যাক্ট না; সমস্যার নানা দিক আছে। সাদ সাহেবের বিভ্রান্তিকর আলোচনা ও বিশ্বাস, কাকরাইলে আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব, বিশ্বসংগঠন-তাবলীগের পরিচালনা ও নেতৃত্ব, তাবলীগের সাধারণ সাথীদের মধ্যে গড়ে উঠা নানা বিভ্রান্তিকর চিন্তা-রুচি-মেজাজ ও কর্ম। উলামায়ে কেরাম শুধু সাদ সাহেবের বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও একটা সময় গিয়ে বর্তমান বাঙলাদেশে সমস্যাগুলোর সমীকরণ হয়ে দুটো পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এজন্য, আমার মনে হয়, এখন আর শুধু সাদ ইস্যুতে সীমিত না থেকে উলামায়ে কেরামের উচিত হবে পুরো তাবলীগের বিষয়টিকে ডিল করা।
এ উদ্দেশ্যে সামনের পয়েন্টগুলো লক্ষ্য করার মত—
ক. তাবলীগের চলমান সংকটের সাথে উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে অনেকের মধ্যে কিছু অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি আছে। এরা হলো মূল এতাআতপন্থি, তাদের সাথে সাথে সম্পৃক্ত সাধারণ তাবলীগি, এবং তাবলীগের সাথে সম্পৃক্ত নন, এমন সাধারণ অনেক মানুষ। নানা মাধ্যমে এই অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তিটি তৈরী করছে মূল এতাআতপন্থিগণ। এ উদ্দেশ্যে তারা কিছু সূত্রকে অত্যন্ত ভুলভাবে প্রয়োগ করছে।
যেমন—
১. তাবলীগই হলো একমাত্র নবীওয়ালা দীনের কাজ। এর বাইরে আর যা আছে, সেগুলো তেমন মূল্যবান কিছু নয়। এ হিসেবে উলামায়ে কেরাম দীনের মূল কাজ নিয়ে চলছেন না। তো, যাদের নিজেদেরই ইসলাহ দরকার, তারা আমাদেরকে ইসলাহ করতে আসবে কোন যুক্তিতে?
২. উলামাগণ তাবলীগের কাজে সময় দেন না। মাদরাসা-মসজিদ-খানকা ইত্যাদি নিয়ে থাকেন। সুতরাং, আমাদের বিষয়ে তারা নাক গলাবেন কেন?
৩. উলামাগণ মাদরাসায় পড়িয়ে, জুমআর নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করে টাকা নেন। আর, তাবলীগ হলো পুরোপুরি নিঃস্বার্থ মেহনত। সুতরাং, টাকার বিনিময়ে দীনের কাজ করে আমাদেরকে সংশোধনমূলক কিছু বলার তাদের অধিকার নেই।
৪. উলামাগণ রাজনীতি, ঘরাণা, আঞ্চলিক ব্যক্তিদ্বন্দ্ব, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনসহ নানা আন্দোলন ইত্যাদির সূত্রে নিজেরাই শতধা বিভক্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে, তাদের নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে তাবলীগের কাজ নিরাপদ নয়। আলেমগণ এখন যা করছেন, তা মূলত তাদের রাজনীতি ও নেতৃত্ব ধরে রাখার লড়াই।
৫. উলামাগণ দীনি শিক্ষার নামে ভিক্ষাবৃত্তি করে নিজেদের পেট চালানোর প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদেরকে ব্যবহার করছেন এবং অনেকেই মানুষের টাকায় আয়েশী জীবনযাপন করছেন। গণমানুষের দীনি উন্নতি ও সমাজে দীন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সত্যিকার অর্থে কিচ্ছুটি করছেন না। ওয়াজ-মাহফিল আর পীর-মুরিদীর নামে যা করছেন, তা-ও মূলত নিজেদের রুটি-রুজির ধান্দা।
তারা কথা-বার্তায় প্রকাশ করে, এলেম ও আলেমের ফজীলতকে তারা অস্বীকার করে না। তাদের আপত্তি হলো বর্তমান উলামায়ে কেরাম সত্যিকার অর্থে আলেম কিনা তার উপর। এ জন্য আমার মনে হয়, সবার আগে মানুষের সামনে এ বিষয়গুলো পরিস্কার করা উচিত, ব্যাপকভাবে। ক্ষিপ্ত না হয়ে এবং ক্ষিপ্তভাষ্য পরিহার করে ঠাণ্ডা মাথায় যোক্তিক আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে মোলিক জিনিসগুলো বোঝানো। এখানে মূল বক্তব্যগুলো কী এবং ঠিক কোন জায়গাটিতে তারা বিভ্রান্তি তৈরী করছে।
খ.
চলমান সমস্যাগুলোর মাঝে কিছু তো আছে প্রকাশ্য। সাদ সাহেবের বিভ্রান্ত বয়ান। তার একনায়কতন্ত্র-প্রবণতা—ইমারত। কাকরাইলে ওয়াসিফ-নাসিম গংয়ের দৌরাত্ব। কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে, যা তাবলীগের কেন্দ্রিয় চরিত্রের ভেতর ঢুকে গেছে। এই সমস্যাগুলো এতাআতপন্থিদের মধ্যে তো আছেই, এমনকি উলামাপন্থি সাথীদের অনেকের মধ্যেও বিদ্যমান। প্রকাশ্য সমস্যাগুলোর পাশাপাশি ভেতরগত এই সমস্যাগুলোসহ সমস্ত সমস্যাকে চিহ্নিত বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
যেমন—
১. তাওয়াক্কুলের ভুল অর্থ করা।
২. উপায়-উপকরণ অবলম্বনের ব্যাপারে চিন্তাগতভাবে জাবরিয়া মনোভাব পোষণ করা। সেখান থেকে বীগণ ও সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে নানা ভুল বিশ্বাস ও বিভ্রান্ত বক্তব্য৷
৩. তাবলীগের চলমান পদ্ধীতকেই একমাত্র দীনের কাজ মনে করা। এর বাইরে সমস্ত কাজকে ভুল বা অনেকটা হাস্য-পরিহাসের দৃষ্টিতে দেখা।
৪. জিহাদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা ও অবস্থান।
৫. সহীহ তাসাওফকে খারাপ চোখে দেখা।
৬. উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে অন্যায় বিদ্বেষ লালন করা।
৭. দীনের বিভিন্ন বিষয়ে নিজের ইচ্ছেমত মনগড়া বিশ্লেষণ প্রদান ও ভিত্তিহীন বিভিন্ন ইজতেহাদ ও সূক্ষ্ম কথা বের করা। বিশেষ করে হিজরত-নুসরাত, ইমারত-এতাআত ইত্যদির মত ব্যাপক ও গভীর বিষয়গুলোকে চলমান তাবলীগের পদ্ধতির ভেতরেই সীমিত করে ফেলা এবং এসবের মনগড়া বিশ্লেষণ করা।
৮. অনেক ভিত্তিহীন বানোয়াট হাদীস ও ঘটনা বিশ্বাস করা ও বয়ানে প্রচার করা।
৯. ইকামাতে দীনের ব্যাপারে সঙ্কীর্ণ মনোভাব ও বিশ্বাস পোষণ করা।
১০. কুরআন, উলূমুল কুরআন-উসূলুততাফসীর, হাদীস, উসূলুল হাদীস-উলূমুল হাদীস, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ-উলূমুল ফিকহ, মুজতাহিদ, ইজতেহাদ, মুফতি, ফতোয়া, এখতেলাফ, আকাঈদ ইত্যাদির ব্যাপারে একজন মুসলমানের ন্যূনতম যে ধারণা থাকা উচিত, তা না থাকা।
এখানে উদাহরণস্বরূপ কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো। এর বাইরেও ছোট-বড় আরো অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। এগুলো তৈরী হয়েছে ইলমের সংশ্লিষ্টতা না থাকার কারণে। আমাদের বাংলাদেশে অনেক উলামায়ে কেরাম তাবলীগে সময় দিচ্ছেন, সত্য; কিন্তু, আমার দেখামতে এক তো হলো এই আলেমগণের বেশিরভাগই হলেন এমন, হয় তারা একাডেমিক দিক থেকে খুবই দুর্বল, না হয় এলমের চর্চার সাথে সরাসরি সম্পৃক্তত নন। আর সম্পৃক্ত যে অংশটা রয়েছেন, তারাও সংখ্যা-স্বল্পতা এবং সিস্টেমের বাধ্যবাধকতার কারণে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে, এই সমস্যা ও শূন্যতাগুলো তৈরী হয়েছে এবং বহুদিনের চর্চার ভেতর দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে।
খুব ঠাণ্ডা মাথায়, দীর্ঘ মেয়াদের প্ল্যান নিয়ে এই জায়গাগুলোতে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। এবং এ উদ্দেশ্যে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের বড় একটা দল সরাসরি তাবলীগের ভেতরে ঢুকে পড়তে হবে। দেখুন, ইসলাহ করার জন্য ভেতরে ঢুকতে হবে—এমন শর্তারোপকে আমি ন্যায্য মনে করি না। কিন্তু, বর্তমানের দুঃখজনক বাস্তবটাই এমন।। এ ছাড়া কারো কথা শুনে তারা অনেক দিন যাবত অভ্যস্থ নয়। তারপরও বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে, এটা উলামায়ে কেরামের জন্য বিরাট এক সুযোগ। এখন লক্ষ লক্ষ সাথী তাদের কথা মানতে প্রস্তুত এবং দীনি ইসলাহের জন্য বলতে গেলে মুখিয়ে আছে তারা। তাই, উলামা হজরতগণের কাজ হলো বাইরে এবং ভেতরে—উভয় জায়গাতেই অবস্থান নিয়ে এই বিষয়গুলোর উপর জোরেশোরে কাজ শুরু করা।
দেখুন, সাধারণ মানুষের কাছে পোঁছার জন্য আমাদের হাতে যে মাধ্যমগুলো রয়েছে, বাংলাদেশের আর কারো কাছে এমন শক্তিশালী, ব্যাপক ও কার্যকর মাধ্যম নাই। ইভেন সরকারের হাতেও নাই। এ জন্য ক্ষিপ্তভাষ্য পরিহার করে খুব বুদ্ধির সাথে এগুলোকে কাজে লাগানো উচিত বলে মনে করি।
তিন.
উপরের কাজগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি। ধীরে ধীরে এগুতে হবে। কিন্তু, উপস্থিত পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটাও জরুরী এবং এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ সংকটটির মোকাবেলায় হকপন্থি তাবলীগী সাথী-মুরুব্বি ও উলামায়ে কেরাম মোটামুটি লম্বা একটা জার্নি করেছেন। এর অনেক বেনিফিটও পাওয়া গেছে। কিন্তু, মূল সমাধানটি আসে নি। আপাতদৃষ্টিতে আাসার কোন পথও দেখা যাচ্ছে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি প্রস্তাব প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে—
ক.
বিশ্বতাবলীগের সংকট নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের তাবলীগকে বিশ্ব তাবলীগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেওয়া। বাংলাদেশে তাবলীগ চলবে শুধু কাকরাইলকে কেন্দ্র করে। তাবলীগের নির্দিষ্ট কাজ আছে, সুনির্দিষ্ট নেসাব আছে। ব্যাস, সেই অনুসারে শুধু কাজ হবে। নিজামুদ্দিন, রায়বেন্ড, সাদ, আলমিশূরা—কোন কিছুর নাম নেওয়া যাবে না। যে এসব অনৈক্যের বিষয় আলোচনায় আনবে, তাকে তাবলীগ থেকে আলাদা করে দেওয়া হবে। সাদ সাহেব যে বিভ্রান্ত বয়ানগুলো করেছেন, তার নাম না নিয়ে সেগুলোর ব্যাপারে সঠিক কথাটি শুধু আলোচনা করা যাবে।
খ.
কাকরাইল চলবে শূরা ভিত্তিক। দেশের উল্লেখযোগ্য দশজন আলেম থাকবেন এর উপদেষ্টা। তাদের কাজ কী হবে এবং কোন পদ্ধতিতে হবে, তা ঠিক করা থাকবে। ইজতেমায় তাবলীগের মুরুব্বিদের পাশাপাশি এই উপদেষ্টা আলেমগণও আওয়ামদের উপযোগী তাবলীগ সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক বয়ান করবেন।
গ.
তাবলীগের ছয় নাম্বার এবং অন্যান্য আমলগুলোতে মাও. সাদ সাহেব সম্পাদনা করে কর্মপদ্ধতি ও বক্তব্যে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন। এগুলো নিয়ে সাদপন্থি ও অন্যান্যদের মাঝে ভালো রকমের একটা বিবাদ আছে। সাদপন্থিগণ বলছেন আমরা সাদ সাহেব যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই মানবো। কিন্তু, অন্যরা বলছেন, পুরনো তিন মুরুব্বি কাজকে যেভাবে রেখে গেছেন, সেভাবেই চলবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ তাবলীগের পুরো মানহাজ ও বক্তব্যগুলো উপদেষ্টা মণ্ডলী বিশ্লেষণ ও গবেষণা করবেন। এরপর কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকে আওয়ামদের মাঝে কাজ করার জন্য উপযুক্ত করে একটা সমন্বিত বক্তব্য ও পদ্ধীত ঠিক করে দিবেন। এই ফর্মা ও বক্তব্যের বাইরে কেউ যেতে পারবে না।
ঘ.
তাবলীগের মূল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ভার থাকবে তাবলীগের সাথে সর্বক্ষণ জড়িত এমন লোকদের হাতেই। এর জন্য জেলা মার্কাজগুলোতে আলাদা কোন নেতৃত্ব বা কমিটি তৈরী করার দরকার নেই। সবকিছু মিট হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদেশী কোন জামাত বাংলাদেশে আসবে না এবং বাংলাদেশের জামাতও বিদেশে যাবে না।
ঙ.
সারা দেশে মাদরাসার ছাত্র-উস্তাদগন সাপ্তাহিক গাশত ও চব্বিশ ঘণ্টার জামাত, এবং বছর শেষে চিল্লায় বের হওয়ার জন্য বিশেষ তাগিদ সৃষ্টি করা হবে। ইমাম ও এলাকার আলেমগণ কাজের সাথে যথাসম্ভব জুড়বেন এবং নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবেন। কোন কর্তৃপক্ষ হিসেবে নয়; স্বাভাবিকভাবে। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, সবসময় উলামায়ে কেরাম এই সংকট মোকাবেলার জন্য ততটুকু জড়িত হবেন, যতটুকু তাদের সামর্থের ভেতরে আছে। এর লিমিট নিয়ন্ত্রণ করবেন উপদেষ্টা মণ্ডলী। এর বাইরেরটুকু আল্লাহর হাওলা করে দিতে হবে।
চ.
তাবলীগী সাথীদের ইসলাহ ও জ্ঞান-রুচি-মেজাজগত উন্নতির জন্য টঙ্গির জোড়গুলোতে অন্য মুরুব্বিদের পাশাপাশি উপদেষ্টামণ্ডলির আলেমগণও প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক বয়ান করবেন। সঙ্গত মনে হলে বরেণ্য অন্য আলেমগণকেও নেওযা যেতে পারে। এর বাইরে কাকরাইলের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় সারাদেশের মারকাজগুলোতেও মুরুব্বিস্থানীয় আালেমগণকে দিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা করানো হবে।
এই প্রস্তাবের উপর বড় দুটো প্রশ্ন উঠবে।
এক হলো—প্রস্তাবে যা বলা হলো, হুবহু ঠিক এরকম না হলেও, বর্তমানে তো কাছাকাছি কর্মপদ্ধতিই চলছে। কিন্তু, এর দ্বারা কোন রকমের নিষ্পত্তি তো হচ্ছে না।
আমি বলবো, এক তো হলো বর্তমানে হুবহু এমনটি চলছে না। আমার জানামতে, তাবলীগের মুরুব্বি ও উলামায়ে কেরাম প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় ও বড় রকমের কিছু অসঙ্গতি নিয়েই কাজ করছেন। এর বাইরে সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা বা সমাধানমূলক সামগ্রিক কোন প্রস্তাব মাঠ পর্যায়ে ক্রিয়াশীল নয়।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান রূপকাঠামোটিকে আমরা নিরসন-প্রস্তাব আকারে বিশেষভাবে হাজির করিনি বা করা সম্ভব ছিল না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি আকর্ষণ ও আবেদন সৃষ্টি করার জন্য এ বিষয়টি একান্ত আবশ্যক।
সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি দেখা দেবে তা হলো, এ প্রস্তাব সাদপন্থীগণ মানবে কিনা? অবস্থাদৃষ্টে না মানার আশংকা আছে। এ জায়গাটায় আমার কিছু কথা বলবার আছে।
দেখুন, প্রথমত, বর্তমানে তাবলীগী-ননতাবলীগী অর্থাৎ, সমাজের সকল মানুষ এই সংকটের নিরসন চাচ্ছে। ফলে, সবাই অধিকতর কার্যকরী ও শক্তিশালী একটি মিমাংসা-প্রস্তাবের আশায় বসে আছে। যদি এরকম যোক্তিক ও শক্তিশালী একটি প্রস্তাব ঠিক করে সরকারী মধ্যস্থতা বা কোন গ্রহণযোগ্য তৃতীয় কোন পক্ষ একে উভয় দলের সামনে পেশ করে এবং প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলনসহ নানাভাবে একে গণমানুষের সামনে তুলে ধরে, তাহলে অধিকতর যৌক্তিক হওয়ার কারণে এটি মানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্রতা পাবে। ফলে, একে মানার জন্য দেশব্যাপী একটা চাপও তৈরী হবে। যারা মানবে না, তারা পড়বে বেকায়দায়।
ধরা যাক তারা মানলোই না, তো, এখনও তো বিশৃঙ্খলা চলছেই। স্বাভাবিকভাবে নিরসনের কোন পথ দেখা যাচ্ছে না। এখন, কাকরাইল যদি এই আঙ্গিকে কাজ শুরু করে, তাহলে মিমাংসা না হলেও একটি অধিকতর সুসংহত ও মিমাংসাজনক অবস্থানে থাকা যাবে। এতে যারা মানবে না, তারা সবদিক থেকে চাপে থাকবে। এরকম নির্বিবাদ, নিরপেক্ষ ও মিমাংসাজনক একটি জায়গাটায় থেকে উলামায়ে কেরাম যদি উপরে বর্ণিত সংশোধনী কাজগুলো করে যান, তাহলে আশা করা যায় ভালো একটা ফলাফল নিকট ভবিষ্যতেই আমরা দেখতে পাবো। মনে রাখতে হবে, সাদপন্থিগণের সাথে অনেক সাধারণ তাবলীগী আছেন, যাদেরকে ভুল বুঝিয়ে সাথে নেওয়া হয়েছে। এরকম লোকগুলোকে একটু মেহনত করে সহজেই সঠিক পথে নিয়ে আসা সম্ভব। দরকার শুধু সংযমের সাথে পরিকল্পিত একটি কর্মপদ্ধতি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন এবং আমাদেরকে ভাই-ভাই হিসেবে মিলিয়ে দিন। আল্লাহ তাআলার কাছে তো কিছুই অসম্ভব নয়।
লেখক : চিন্তক আলেম, বিশ্লেষক ও তাবলিগের সাথি
