তাবলিগ সঙ্কট : মতাদর্শিক বিরোধ কি চিরকালই সমাধানের অযোগ্য?

তুহিন খান

তাবলিগ জামায়াত নিয়ে বাঙলাদেশে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সহসাই সহজ হয়ে আসবে বলে মনে হয় না। প্রায় চার বছর আগে দৃশ্যমান হওয়া এই বিবাদ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এর জের ধরে হয়েছে খুনোখুনিও। ফলে আলেম-ওলামা, কলেজ-ইউনিভার্সিটি-মাদ্রাসার লাখো শিক্ষার্থী এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এখন একটাই প্রত্যাশা—তাবলিগ জামায়াতের উপর থেকে এই বিভেদের কালোমেঘ কেটে যাক। আবারো সম্মিলিত আমলে মুখর হয়ে উঠুক মারকাজ-মসজিদগুলি। সম্মলিতভাবে আবার মানুষ অংশগ্রহণ করুক বিশ্ব ইজতেমায়। ওলি-আওলিয়াদের এই পূণ্যভূমি আবারো সিঞ্চিত হোক লাখো মুমিনের শেষরাতের চোখের জলে। কিন্তু বলা যত সহজ, ভাবা বা চাওয়া যত সোজা, ব্যাপারটা ঠিক ততটাই জটিল হচ্ছে দিনে দিনে।

কেন এই বিভেদের ক্ষত?

তাবলিগ জামায়াত নিয়ে চলমান সঙ্কটটি বেশ গভীর। যেকোন সামাজিক সঙ্কটের গোড়াই বেশ গভীরে থাকে, এবং সঙ্কটগুলি খুব লিনিয়ার কিছু হয় না; সামাজিক সমস্যাগুলি স্বভাবতই মাল্টিলেয়ার—বহুস্তরিক। আর তাবলিগ জামায়াত নিয়া চলমান সঙ্কট কেবল সামাজিক সমস্যাই না, একটি গুরুতর ধর্মীয় সমস্যাও বটে। তাই মোটাদাগে এর ‘সূচনা’ বা ‘কারণ’ বলা মুশকিল।

সংক্ষেপে কিছু কথা বলা যাক। তাবলিগ জামায়াতের চলমান সঙ্কটের দুইটি দিক আছে। সঙ্কটের দৃশ্যমান সূচনা এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু, প্রত্যক্ষ কারণের বাইরে, কিছু পরোক্ষ কারণও এই বিভেদের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল। পরোক্ষ কারণগুলোর বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আমরা দুটি বিষয় খতিয়ে দেখব—

এক. তাবলিগ জামায়াত কী? তাবলিগ জামায়াত কোন নতুন চিন্তা, ফেরকা বা দল না। এখন যাই মনে হোক, অন্তত সূচনাকালে ব্যাপারটা এমন ছিল না। বৃটিশ ভারতে একদিকে মুসলমানদের অধঃপতিত জীবনযাপন, অন্যদিকে সেক্যুলার চিন্তাপ্রভাবিত সমাজব্যবস্থায়, মুসলমানদের ভেতরে ধর্মীয় আইডেন্টিটির ক্রাইসিস দেখা দেয়। নামে তো তারা মুসলমানই থাকে, কিন্তু কাজে তার কোন প্রমাণ থাকে না। মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার জন্য ওলামায়ে কেরাম সাধারণত তাদের ঈমান-আমলের দুরাবস্থাকে দায়ী করে থাকেন। তাই, নামে মাত্র মুসলিমদের মধ্যে দ্বীনের মৌলিক মেজাজ ও বোধ তৈরি করা এবং সমাজের প্রত্যেক মুসলমান যেন ন্যূনতম মাত্রায় ইসলামকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করে—এই লক্ষ্য নিয়েই মূলত তাবলিগের যাত্রা শুরু।

দুই. তাবলিগ জামায়াতের সাথে আলেমদের সম্পর্ক কী এবং এই সম্পর্কের ধরণ কেমন? এটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। মাওলানা ইলিয়াস রহ. যখন তাবলিগ জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেন, দ্বীনের প্রতি দায়িত্বের খাতিরেই ওলামায়ে কেরাম এই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যাপারটি নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা করেন। এবং, সেসময় ইলিয়াস রহ. চাইতেন, ওলামায়ে কেরাম যেন এই জামায়াতকে স্রেফ মেনে নেন। দ্বীনের কাজের এই পন্থাকে যেন তারা এপ্রুভ করেন। তাবলিগ জামায়াত সাধারণ মানুষদের নিয়ে কাজ করার জন্যেই প্রধাণত গঠিত হয়েছিলো, আলেম-ওলামারা ছিলেন এই জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক।

মূলত তাবলিগ ও আলেম-ওলামার সামাজিক দায়িত্বের ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাবলিগের কাজ সামাজিক স্তরে; যাবতীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সঙ্কট ও সংঘর্ষ থেকে দূরে থেকে, মানুষের মাঝে ন্যূনতম দ্বীনের মেজাজ তৈরি করাই তাবলিগের মূল দায়িত্ব। আলেমদের কাজ আরো ব্যাপক ও ক্রিটিকাল। মানুষের মাঝে দ্বীনপ্রতিষ্ঠা ছাড়াও, দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানের রক্ষণাবেক্ষণ, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেটা বিশ্বস্তভাবে পৌঁছে দেওয়া, ধর্ম নিয়ে আধুনিক বিশ্বের যাবতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলা করা—আলেমদের কাজের পরিসর এরকম বৃহৎ ও বিস্তৃত। এনজিও আর বুদ্ধিজীবীর মধ্যে যে মৌলিক তফাত, তাবলিগ আর আলেম-ওলামার কাজের ধরণের তফাত অনেকটা সেরকমই।

কিন্তু একটা সময় গোল বাঁধলো। তাবলিগের কাজ যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বব্যাপী, তখন দ্বীনের প্রশ্নে তাবলিগও হয়ে উঠলো এক ধরণের ‘অথরিটি’। ধরেন, আপনি আলেম, কিন্তু ‘সাল’ লাগান নাই। তাহলে একজন তাবলিগি সাথীর কাছে আপনার এলেমের গুরুত্ব একটু কম। যদি ‘সাল’ লাগান, তাহলে আপনার এলেম কম হলেও গুরুত্ব বেশি। তাবলিগ দ্বীনপ্রচারের একটি সহায়ক/পরিপূরক পন্থা হওয়ার বদলে, ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীনকে সাজিয়ে ফেললো, এবং একটা নির্দিষ্ট জীবনযাপনধারা, নির্দিষ্ট চিন্তা, নির্দিষ্ট কিছু স্বভাব ও শব্দ, নির্দিষ্ট কিছু তরিকা ও পদ্ধতি—এগুলোকে দ্বীনের জন্য অপরিহার্য মনে করতে লাগলো। প্রত্যেক কাজেরই নির্ধারিত পন্থা থাকে, অর্গানাইজড মডিউল থাকে, আমি এটার সমালোচনা করছি না। কিন্তু এই অর্গানাইজড পথ ও পন্থা যদি নিজেকে সর্বাত্মক এবং স্বয়ম্ভূ দাবি করে, তখন বিপত্তিটা হয়। কেমন বিপত্তি?

তখন তাবলিগের কোন সাথী হয়ত ভাবেন যে, তাবলিগ জামায়াতের বাইরে দ্বীন নাই। বা থাকলেও ‘আধুরা’। মসজিদের বাইরে দ্বীনের আলোচনা হলেও সেটা ‘প্রকৃত’ দ্বীন না। দ্বীনের আলাপ মসজিদ্ভিত্তিকই হতে হবে। আলেমরা এলেম তো শিখছেন, কিন্তু তাতে নূর পয়দা করবে তাবলিগ। পিরের দরবারে যাওয়ার চাইতে তাবলিগে সময় দেওয়া ভালো। বা, তাবলিগের এই জীবনধারায় প্রবেশ করলেই হয়ত একজন মানুষ ‘দ্বীনদার’ হয়ে যায়। এই বিপত্তির ফলাফলটা হয় ভয়াবহ। আলেমরা নিজেদের তাবলিগের পৃষ্ঠপোষক ভাবতেন, তাই নিজেদের কাজের জন্য তাবলিগে তেমন সময় দিতে না পারলেও তাবলিগের হামদর্দি তারা সবসময়ই করেছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ‘তাবলিগ জামায়াত’ নামে একটি সর্বাত্মক অথরিটি যে গড়ে উঠছে, সেই টের তারা পান নাই। পেলেও বৃহত্তর স্বার্থ ইত্যাদি কারণে কখনই এসব ব্যাপারে কিছু বলেন নাই। কিন্তু তাবলিগ জামায়াত যখন ধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ অথরিটি হয়ে উঠলো, এবং উপলক্ষ্য থেকে একটা সর্বাত্মক লক্ষ্য হয়ে উঠলো, আলেমসমাজ যখন টের পেলেন, কেবল আলেম হলেই এই গোষ্ঠীর কাছে অথরিটি হওয়া যাচ্ছে না, এদের কাছে দ্বীনের অথরিটি হওয়ার অন্যতম শর্ত তাবলিগের অথরিটি হওয়া, এমনকি আলেমদের ধর্মীয় অথরিটিকে এরা রীতিমত ‘চ্যালেঞ্জ’ করছে, তখন আলেমসমাজ নড়েচড়ে বসলেন।

এই নড়াচড়ার প্রথম প্রকাশ হলো, ধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাওলানা সা’দ কান্ধলবির কিছু ভুল কথার প্রতিবাদ করা। তাবলিগে এই নানা ধরণের ভুল কথা নতুন কিছু না। ‘বলে যে’ এবং ‘বলা হয় যে’-র শিরোনামে এরকম অনেক ভুল কথা, অহরহ মসজিদের মেম্বারগুলোতে বসে তাবলিগের সাথীরা বলেন। কিন্তু তারা যে এটি ইচ্ছাকৃত বলেন তা না, আলেমরা শুধরে দিলে তারা শুধরে নেবেন, এরকম ধারণা থেকেই এতদিন ওলামারা কিছু বলেন নাই। এবার তারা মুখ খুললেন।

বিভেদের প্রত্যক্ষ কারণ

আগে যে পরোক্ষ কারণ বললাম, সেসবের প্রেক্ষাপটেই, সামনে এলো প্রত্যক্ষ কারণগুলি। সা’দ কান্ধলবির ভুলগুলো দেখিয়ে দেওবন্দের আলেমরা তার বিরুদ্ধে নিজেদের নৈতিক অবস্থানের ঘোষণা দিলেন। আবার, নেতৃত্ব নিয়েও তৈরি হয়েছিলো জটিলতা। তাবলিগ জামায়াত কি একজন ‘সর্বাত্মক নেতা/আমির’-র অধীনে চলবে, নাকি মজলিসে শুরার ভিত্তিতে চলবে? এই প্রশ্নে বিভেদ দেখা গেলো তাবলিগের দুইটি গ্রুপের মধ্যে। একদল ‘আলমি শুরা’ গঠন করলেন, আরেকদল একে ‘নিজামুদ্দিনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র’ বলে প্রচার করতে থাকলেন, সা’দ কান্ধলবিকে ‘সর্বাত্মক নেতা’ মানার উপরে অটল থাকলেন। ফলে ব্যাপারটা রাজনৈতিক মাত্রাও পেল। এবং আলেমরা দেখলেন, ভুল শুধরে দিলেই তারা শুধরে নেবে, ব্যাপারটা এত সহজ আর নাই। তাবলিগের বড় একটি অংশ রীতিমত আলেমদের অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করছেন। যদিও এই দুই পক্ষেই আলেম-ওলামা আছেন, কিন্তু প্রধাণত এই বিভেদটির গোড়ায় ওই ‘তাবলিগি অথরিটি’ বনাম ‘আলেম-ওলামা’ তর্কটিই প্রধান। একদিকে মাওলানা সা’দ তাবলিগকেই বলছেন সর্বোচ্চ অথরিটি এবং এর সাথে সম্পর্ককেই বলছেন দ্বীনের সর্বোচ্চ পর্যায়। অন্যদিকে, আলেমসমাজের দ্বীনী শিক্ষার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার বিরুদ্ধে দিচ্ছেন ফতোয়া, বলছেন—মসজিদের বাইরে অন্য যেকোন জায়গায়ই দ্বীনের আলোচনা হোক, সেটা দ্বীনের কাজ ধরা হবে না, এমনকি ধর্মীয় আলোচনা হলেও। মানে, মসজিদে যে দ্বীনের চর্চা, সেটিই একমাত্র দ্বীন (অর্থাৎ তাবলিগ জামায়াত)। তাবলিগের এই অথরিটি হওয়ার প্রচেষ্টা আলেমদের পছন্দ হওয়ার কথা নয়, কারণ ধর্মীয় জ্ঞানের অথরিটি আলেমরাই ছিলেন সর্বকালে, এটি তাদের নৈতিক দায়িত্বও বটে। তাছাড়া, তাবলিগ কোন অথরিটি নয়, দাওয়াতি কাজের রকটি পন্থা মাত্র। ফলে তারা এর প্রতিবাদ করলেন। অন্যদিকে এতদিনে তাবলিগের ভেতর থেকে যে ‘অথরিটি’ তৈরি হয়েছিলো, তারাও বেঁকে বসলেন। সাধারণ মানুষ যারা তাবলিগের সাথে জড়িত, তারা বরাবরের মত এখানেও দ্বিধান্বিত, অসহায়।

তুরাগ তীরের ট্রাজেডি : এই রক্ত কার?

মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে দেওবন্দের অবস্থান সবিস্তারে জানতে বাঙলাদেশের আলেমসমাজ ও তাবলিগের অথরিটিদের—দুই গ্রুপেরই—একটি দল, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দেওবন্দে যান। মাওলানা সা’দ দেওবন্দের কাছে তার রুজুনামা পেশ করেছেন ততদিনে, কিন্তু দেওবন্দ তাতে আশ্বস্ত হতে পারে নাই। ফলে প্রতিনিধিদল দেশে ফিরে আসে আগের অবস্থানের কোন পরিবর্তন ছাড়াই। দেশে ফেরার পরে গত জানুয়ারিতে উত্তরায় আলেমদের এক সমাবেশে দেওবন্দের লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়। সেখানে বলা হয়, দেওবন্দ মাওলানা সা’দের ব্যাপারে আশ্বস্ত না। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৮ এর ইজতেমায় মাওলানা সা’দকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়৷ তারপরেও মাওলানা সা’দ বাঙলাদেশে আসলে আলেমরা এর বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে অবস্থান নেন এবং নানারকম বিক্ষোভ-আন্দোলন করতে থাকেন। মাওলানা সা’দ ইজতেমায় যোগ না দিয়েই সরকারি হস্তক্ষেপে দেশত্যাগ করেন।

এই ঘটনার পরপরই তাবলিগের বিভেদ আরো প্রকট হতে থাকে। মসজিদে-মসজিদে, মহল্লায়-মহল্লায় দুই গ্রুপের বিভেদ বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে গতবছর জুলাইয়ে মোহাম্মদপুরে হয় ‘ওজাহাতি জোড়’, যেখানে বিপুল পরিমাণ ওলামার অংশগ্রহণে সা’দ সাহেব ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ‘ওজাহাত’ বা বিরোধিতার কারণ দর্শানো হয়। বিভেদ প্রকট হওয়ার জন্য নাম জরুরি। তাবলিগের বাড়তে থাকা বিভেদটি এবার একটা নাম পেয়ে যায়, ‘এতায়াতি-ওজাহাতি দ্বন্দ্ব’৷ ২০১৮ সালব্যাপী, নানাভাবে, নানা মাত্রায় এই বিভেদ বাড়তে থাকে। দুই পক্ষই বিভেদ মেটাতে সরকারের ঘনিষ্ঠতা ও হস্তক্ষেপ কামনা করছিলেন। এমনকি, এও শোনা যায় যে, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শোকরানা মাহফিলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল তাবলিগ ইস্যুতে সরকারের ঘনিষ্ঠতা কামনা। যেহেতু, এদেশে সা’দপন্থী বলে পরিচিতরা আগে থেকেই সরকারের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ, ফলে এছাড়া আলেমদের আর তেমন কোন উপায়ও ছিল না।

ফেতনাকে কুরানে হত্যার চাইতে খারাপ বলা হয়েছে। কারণ—ফেতনার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হলো হত্যা ও রক্তপাত। শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো। গতবছর ডিসেম্বর নাগাদ, এতায়াতি-ওজাহাতি, দুই ভাগে তাবলিগের বিভক্তির কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এবার বিশ্ব ইজতেমার প্রশ্ন। ২০১৭ সালে একত্রে ইজতেমায় অংশ নিলেও, এবার দুই গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে ইজতেমায় অংশগ্রহণের কথা জানান এবং নিজেদের পক্ষে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ৩০ অক্টোবর থেকে ৪ ডিসেম্বর—এই ৫ দিন এতায়াতিদের জোড় বা সম্মেলনের তারিখ ধার্য করা হয়। কিন্তু ৭ তারিখ থেকে ১১ তারিখ আলেম-ওলামার জোড়ের তারিখ থাকায়, এবং প্রশাসনের আগাম আশ্বাস পাওয়ায়, আলেম-ওলামারা আগে থেকেই ইজতেমার ময়দানে অবস্থানরত থাকেন। শেষ পর্যন্ত ১ ডিসেম্বর সা’দপন্থীরা ইজতেমা ময়দানে প্রবেশের জন্য টঙ্গি অভিমুখে যাত্রা করেন। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বাবুসসালাম মাদ্রাসার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন সা’দপন্থীরা।

পয়লা ডিসেম্বর দিনব্যাপী সংঘর্ষে ১ জন নিহত হন, আহত হন প্রায় পাঁচ শতাধিক। আহতদের মধ্যে অধিকাংশই মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক। এই সংঘর্ষে প্রশাসনের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। সরকারের ডাবল গেমের ব্যাপারটি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায় ওইসময়। মাদ্রাসার ছাত্রদের উপর হেলমেটধারী কিছু লোককেও চড়াও হতে দেখা যায়। আলেমসমাজ দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেন এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। সরকার ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইজতেমার যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত করে।

এখন বর্তমান : ‘যে যার বৃত্তে’

তাবলিগ নিয়ে এই দৃশ্যমান বিভেদের প্রায় দুই বছর কেটে গেলেও, অবস্থার কোন উন্নতি নাই, ঐক্যের বা সমাধানের কোন দৃশ্যমান পথও দেখা যাচ্ছে না। বরং ক্রমশই এই বিভেদ আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। ১ ডিসেম্বরের ঘটনার পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এতায়াতি-ওজাহাতি দ্বন্দ্ব হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়, বিভিন্ন মাদরাসা থেকে এতায়াতিদের সন্তানদের নিয়ে যাওয়া ও বের করে দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিষয়টা এতটাই নাজুক পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছে, চিন্তাশীল ও দরদি আলেমরা এই ইস্যুতে কথা বলতেও দ্বিধা করছেন, চুপ থাকছেন—পাছে তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করে তাকে বিতর্কিত করে ফেলা যায়।

নির্বাচনের পরে সা’দপন্থীরা আবারো ১১-১৩ জানুয়ারি, পূর্বনির্ধারিত এই তারিখে ইজতেমা করার ঘোষণা দেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আবারো উত্তেজনা তৈরি হয়। সর্বশেষ গত রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পৃথক বৈঠকে দুই গ্রুপই তাদের ইজতেমার কার্যক্রম স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে। আগামি ১৫ জানুয়ারির মধ্যে আবারো দুই গ্রুপের কিছু দায়িত্বশীল এবং সরকারের একজন দায়িত্বশীলের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল দেওবন্দ যাবেন। কিন্তু দেওবন্দ সফরের ফলাফলের তাবলিগ-সঙ্কট নিরসনে কতটা প্রভাব রাখবে, বা আদৌ কোন প্রভাব রাখবে কিনা, তাও হলপ করে বলা যায় না। সা’দপন্থীদের একজন বাঙলাদেশি মুখপাত্র, জিয়া বিন কাসিম, ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন—দেওবন্দের সিদ্ধান্ত মানতে তারা বাধ্য না। এবং দেওবন্দ যেকোন সিদ্ধান্ত দিলেই তারা মেনে নেবেন, ব্যাপারটা তেমন না। কারণ, দেওবন্দ তাবলিগের অথরিটি না, তাবলিগের অথরিটি নিজামুদ্দিন। হযরতজি ইলিয়াস রহ. তাবলিগের ব্যাপারে আলেমদের পৃষ্ঠপোষক মানলেও, মাওলানা সা’দের পক্ষের লোকেরা এখন আর আলেমদের অথরিটি মানতে চাইছেন না, এবং এইটিই তাবলিগের বর্তমান সঙ্কটের পরোক্ষে মৌলিক একটি কারণ, যা আমরা আগে বলে এসেছি। আর জিয়া বিন কাসিমের কথায় এখন এটা পষ্ট যে, আলেমদের যেকোন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে এখন আর তারা প্রস্তুত নন, বরং তাবলিগের কাজটিকে এখন তারা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আলাদা কাজ ভাবেন, যার সাথে আলেমদের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নাই বলে তাদের ধারণা ও অভিমত। ফলে, ইজতেমার পুরো ব্যাপারটিই এখন এক ধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। যে যার বৃত্তে থেকে, আমরা কেবল বৃত্ত ও ব্যবধান বাড়িয়ে চলেছি।

‘আসিতেছে…..শুভদিন?!’

বিশ্ব ইজতেমা হবে কি হবে না, এই প্রশ্ন তোলা থাকুক। আপাতত যেই বড় প্রশ্নটি সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটি হলো—তাবলিগ জামায়াতের ভবিষ্যত কী? সব কি আগের মত হবে? আবার কি মাদ্রাসার তালেবুল ইলম আর তার তাবলিগি পিতা একইসাথে গাশতে যেতে পারবেন, একইসাথে বসে শুনতে পারবেন ইজতেমার বয়ান? বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষ তাবলিগের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। আবার কওমি মাদ্রাসাগুলি বহুকাল ধরেই এদেশের ধর্মীয় অথরিটি এবং তাবলিগের পৃষ্ঠপোষক। ফলে এই দ্বন্দ্ব এখন আক্ষরিক অর্থেই ভাই-ভাই, পিতা-পুত্র, শ্বশুর-জামাই দ্বন্দ্বে রুপ নিয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে তাবলিগ ও মাদ্রাসার সাথে জড়িত প্রতিটি পরিবারে, যার পরিণতি ভয়াবহ। সব কী আগের মত হবে, নাকি না?—এই প্রশ্নের মুখে এখন দিশাহারা সাধারণ মানুষ।

দেশে আবারও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। গত বছর সরকারের সাথে আলেম-ওলামার সম্পর্ক ছিল রাজনীতির ময়দানের অন্যতম প্রধান আলাপের বিষয়। শত বিরোধিতা, বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও আলেমসমাজ সরকারের সাথে একটি সমঝোতায় গিয়েছেন। কিন্তু ১ ডিসেম্বরে প্রশাসনের ভূমিকার পরে, এবং সামগ্রিকভাবেও এই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, সরকার কি আলেমদের সাথে এই সুসম্পর্ক কন্টিনিউ করবে, নাকি এটি কেবলই পলিটিকাল অ্যাফেয়ার? সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এখন আর তাবলিগ ইস্যুর সমাধান সম্ভব না, কারণ সা’দপন্থীরা গোড়া থেকেই সরকারী প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে আসছেন। ফলে আলেমরাও স্বভাবতই চাইবেন সরকারীভাবেই এটি সমাধান হোক। কিন্তু, সমাধানটা কী?

সমাধান কী, তা বলা মুশকিল। ব্যাপারটি এখন অথরিটি এবং নেতৃত্বের প্রশ্নেই কেবল নেই, এটি এখন হয়ে উঠেছে আকিদার প্রশ্নও। এতায়াতিদের ‘ভ্রান্ত’ আখ্যা দিয়ে অনেকেই তাদেরকে তাদের মত থাকতে দেওয়ার কথা বলছেন। সা’দ সাহেব তার মত থেকে সরে আসবেন কিনা, এ ব্যাপারে বলা কঠিন। বিশ্ব তাবলিগের অথরিটির যে জায়গায় সা’দ সাহেব আছেন, তার একটি সিদ্ধান্ত এখন পুরো বিশ্বে এই বিভেদের আগুনকে নিভিয়ে দিতে পারেন। তবে জিয়া বিন কাসিমের বক্তব্য থেকেই ধারণা করা যায়, তিনি তার জায়গায় ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে দাওয়াত ও তাবলিগের একটি বড় দল তার সাথেই থেকে যাবে। হয়ত এদের ভ্রান্ত আখ্যা দেওয়া হবে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু কী হবে? এভাবে আর কত ভ্রান্ত ফরিক আমরা তৈরি করব নিজেদের ভেতরে?

আলেমসমাজ যদি পুরো দাওয়াত ও তাবলিগকে আবারো ঢেলে সাজাতে না পারেন, মানুষকে তাবলিগের মূল মাকসাদ, দ্বীন ও তাবলিগ জামায়াতের ফারাক বুঝাতে না পারেন, তাহলে কিছুতেই কিছু হবে না বলে মনে করছেন অনেকে। অনেকের মতে, তাবলিগ জামায়াত একসময় ছিল না, ভবিষ্যতেও হয়ত থাকবে না। তাতে দ্বীনের কিছু হবে না। হয়তো সেটাই সত্যি। কিন্তু যে বিপুল প্রতিশ্রুতি, সম্ভাবনা ও শক্তি তাবলিগ জামায়াতের ছিল বা আজও আছে, তার পতন হলে, সেটা হবে বিশ্ব মুসলিমের জন্য বিশাল এক ট্রাজেডি। এর হাত থেকে বাঁচতে দোয়া ছাড়া আমাদের আর কীবা করার আছে!

লেখক : কবি ও ক্রিটিক