চীন সরকারের জুলুম-নিষ্পেষণ : কেমন আছেন উইঘুর মুসলিমরা

মুসান্না মেহবুব

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলমানদের দিন কাটে চরম শঙ্কা আর নৃশংসতার মধ্য দিয়ে। স্বাধীনভাবে একটু বেঁচে থাকার অধিকারটাও কেড়ে নিয়েছে চীন সরকার। কেবল মুসলমান এবং উইঘুর হবার কারণে পদে পদে তাদেরকে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। জোর করে কমিউনিস্ট বানানো থেকে নিয়ে জেল-জুলুম—নিষ্পেণের এমন কোনো তরিকা নেই যা চীন সরকার তাদের ওপর প্রয়োগ করছে না।

সম্প্রতি এ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনা অপরাধে উইঘুর যুবকদেরকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে চীন সরকারের বিশেষ বাহিনী। বিশ্ব মিডিয়ার চোখের আড়ালে বিশেষায়িত এক ধরনের বন্দীশিবিরে তাদেরকে আটকে রাখা হয়। যেখানে দিনের পর দিন ধরে তাদের ওপর চলে শারীরিক ও মনসিক নির্যাতন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্যানেল এক রিপোর্টে বলেছে, জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১১ লাখ উইঘুর মুসলিমকে বন্দীশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে।

এই অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমের বসবাস। জাতিসংঘের জাতিগত বৈষম্য নিরোধ বিষয়ক কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তা গে ম্যাকডোগাল দাবি করেন, সেখানকার বন্দিশিবিরে আটক উইঘুর মুসলিমের সংখ্যা ২০ লাখও হতে পারে।

এ ছাড়া সেখানে উইঘুর মুসলিমদের বন্দি করার ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। উইঘুর ও মুসলিম হওয়া ছাড়া তাদের বন্দি হওয়ার পেছনে আর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। জাতিসংঘ জিনজিয়াংয়ের বন্দিশিবিরের তথ্য প্রকাশ করার পরপরই মার্কিন ম্যাগাজিন দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে বন্দীদের ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। পূর্বপূরুষের মুসলিম বিশ্বাসের নিন্দা করতে বন্দীদের ওপর জবরদস্তি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের দিয়ে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রচারণামূলক সঙ্গীত গাওয়ানো হচ্ছে। পুরুষ বন্দীদের দাড়ি কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে।

ইসলামে নিষেধ থাকার পরেও বন্দিশিবিরে উইঘুর মুসলিমদের জোর করে মদ ও শূকরের মাংস খাওয়ানো হচ্ছে। বন্দিশিবিরে উইঘুর মুসলিমদের মধ্যে পরিবর্তন এনে কম্যুনিস্ট মতাদর্শ অনুসারে সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী অনুগত চীনা নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। আর এজন্য শারীরিক নির্যাতন, মানসিক ভীতিপ্রদর্শন ও হয়রানির মাধ্যমে উইঘুর মুসলিমদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে ‘মানসিক ব্যাধি’ বলে মনে করে চীন। পাশাপাশি দেশটি ইসলামি ভাবধারায় গড়ে ওঠা উইঘুর সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে।

জিনজিয়াংয়ে যে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মগজ ধোলাই করে কম্যুনিস্ট আদর্শের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে বিষয়টি এমন না। বাবা-মা’র কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেও অনেক উইঘুর শিশুদের এতিমখানায় রেখে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখভাল করছে সরকার। সেখানে তাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা হয়। আর এ শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে উইঘুর শিশুদের সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামি বিশ্বাস ও উইঘুর সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।

স্কুলের মতো গড়ে ওঠা এসব এতিমখানায় চীন উইঘুর মুসলিম শিশুদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। তাদেরকে কম্যুনিস্ট মতাদর্শ অনুসারে নাস্তিক্যবাদ ও হান সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা সরকারের বিশ্বস্ত নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে। পরিপূর্ণ মগজ ধোলাইয়ের পর তাদেরকে পরিবারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সেখানে তারা উইঘুর মুসলিমদের ধ্বংস করতে বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কেননা, এই উইঘুর জনগোষ্ঠীকে চীন জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে।

জাতিসংঘ উইঘুর মুসলিমদের ধ্বংস করার চীনা পরিকল্পনা ও বন্দীশিবিরের খবর দেয়ার পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু উইঘুর নির্মূলে চীনা তৎপরতার তীব্রতার তুলনায় বৈশ্বিক উদ্বেগ ও রাজনৈতিক চাপ খুবই কম।

কেন এমনটি হচ্ছে?

বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর উত্তর পাওয়া যায়। উইঘুরদের ওপর চীনের নির্মূল অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করলে বা চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, বর্তমানে চীন হলো বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি। বেশিরভাগ দেশ বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক মহলের উইঘুর সংকটে হস্তক্ষেপ না করার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেররের’ সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে চীনসহ অন্যদেশগুলোও অনুপ্রাণিত হয়। তারা এতে যোগ দিয়ে মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়িয়ে দেয়। ৯/১১-এর পর সন্ত্রাস দমনের নামে চীন উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে মিয়ানমার ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোও বর্ণবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসলাম-বিদ্বেষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। চীন শুধু এই প্রক্রিয়ায় যুক্তই হয়নি, বরং অভিযান অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো জোরদার করেছে। দেশটি ইসলামবিদ্বেষী বৈশ্বিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। আর তা হলো রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হান জনগোষ্ঠীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় আত্মপ্রত্যয়ী একটি জাতিগোষ্ঠীকে পুরোপুরি মূলোৎপাটন করা।

উইঘুর সম্প্রদায়ে ইসলাম সার্বিক ব্যবস্থার মূলভিত্তির ভূমিকা পালন করে। আর এদিকেই নজর দিয়েছে দেশটির কম্যুনিস্ট সরকার। বেইজিং মনে করে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ইসলামের মূলোৎপাটন করতে পারলে তারা উইঘুরদের ধ্বংস করতে পারবে। আর এজন্যই সবার অজান্তে বছরের পর বছর ধরে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি গত আগস্টে জাতিসংঘ গোটা বিশ্বের সামনে বিষয়টি তুলে ধরার পরেও বিরতিহীনভাবে এ কার্যক্রম চলছে।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদবাবরি মসজিদ অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চ
পরবর্তি সংবাদ‘সড়ক আইন না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে’