ভোটের রাজনীতিতে কেন পিছিয়ে ইসলামি দলগুলো?

ওমর ফারুক :

সম্প্রতি তিন সিটিতে একযোগে অনুষ্ঠিত হলো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে বড় দলগুলোর পাশাপাশি ইসলামপন্থী দলগুলোরও আগ্রহ উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। বিশেষ করে বরিশালকে কেন্দ্র করে ইসলামী আন্দোলন ও জোট শরিক ইসলামি দলগুলোর মাঝে ব্যাপক বাকযুদ্ধ দেখা গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেক অরাজনৈতিক আলেমরাও তাদের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রচারণায় সাড়া ফেলেছিল ইসলামি আন্দোলন। জোট শরিক নেতারাও জোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু আশানুরূপ ভোট পায়নি কোনো দলই। অতীত ইতিহাসেও একই চিত্র দেখা যায়।

জাতীয় কিংবা স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই আলেম ওলামা কেন্দ্রিক দলগুলো শতকরা ২ দশমিকের কাছাকাছিও ভোট পায়নি। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আলেম সমাজের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হাফেজ্জী হুজুর ভোট পেয়েছিলেন ১ দশমিক ৭৯ ভাগ। তারপর থেকে এ পর্যন্ত কোনো ইসলামি দলই এ পরিমাণ ভোটের কাছাকাছি যেতে পারেনি। এমন ব্যর্থতার কারণ নিয়ে কী, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। কেউ বলছেন রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও নেতৃত্বের অভাব, কেউ বলছেন গলাবাজি ও শুধু মিছিল মিটিং, সমাবেশ আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকার কারণেই এই ফলাফল।

এমন প্রশ্ন নিয়ে বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক শরীফ মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,  ইসলামি ভোটার বা ইসলামি দলগুলোর ভোট ব্যাংক বাংলাদেশে প্রচুর রয়েছে। ইসলামপন্থীদের ভোটার নেই, এটা আমি মনে করিনা। কিন্তু দেশে নির্বাচনগুলোর সময় যে মেরুকরণ ঘটে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মেরুকরণ বলতে জোটবদ্ধতা, জোটভাঙ্গা, প্রতিপক্ষ ও প্রতিরোধের বিষয়টি নির্বাচনে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। দেশে যখন ইসলামি আদর্শ ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী কোনো প্রতিপক্ষ দল থাকে ও সেই প্রতিপক্ষ দলটি মজবুত হয়, তখন তাদের ঠেকানোর জন্য, প্রতিরোধের জন্য ও নির্বাচনে জয়ের জন্য, ভোটগুলো একটা বাক্সে গিয়ে জমা হতে থাকে। এটা ঠেকানোর ভোট। বাংলাদেশে এ ফলটা বিএনপি পায়। তারা মানুষের দৃষ্টিতে কিছুটা  এন্টি সেক্যুলার,এন্টি ইন্ডিয়া ও এন্টি আওয়ামী লীগ হওয়ার কারণে ভোটগুলো তাদের বাক্সে যেয়ে জমা হতে থাকে।

‘অর্থাৎ প্রাপ্ত সব ভোট বিএনপি বা জাতীয় পার্টির নিজের নয়। বরং আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্য জাতীয়তাবাদী দলগুলো ভোট পেয়ে থাকে। আর এর কারণে মানুষের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গিটা বা সমর্থনটা উহ্য হয়ে যায় বা চাপা পড়ে যায়। তাদের ভোটটা তখন সম্ভাব্য দলগুলো পেয়ে থাকে। তাই এ ফলাফলের ভিত্তিতে ইসলামপন্থীদের সমর্থন কম, আমি এটা মনে করি না। বরং তাদের ভোটটা মেরুকরণের ফলে হারিয়ে  যায়।’

শরীফ মুহাম্মদ বলেন, যদি বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের ব্যাপক নেতৃত্ব বা  সমর্থনে ৫০ টি সিট থাকতো এবং বিশেষ সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে এখানেও একটি মেরুকরণ তৈরি হতো। তখন জাতীয়তাবাদী ভোটগুলা এখানে চলে আসতো বা এন্টি আওয়ামী ভোটগুলোও এখানে চলে আসতো। এ জায়গাটি তৈরি করতে আমাদের ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব ও কৌশলে দুর্বলতা রয়েছে। অথবা অপরিণত অবস্থায় রয়েছে। এ জায়গায় যেতে পারলে ইসলামপন্থীদের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতো ও মেরুকরণের বিষয়টিও ইসলামপন্থীদের হাতে চলে আসতো।

এ বিষয়ে লেখক ও সাংবাদিক নোমান বিন আরমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আজও পর্যন্ত ইসলামি দলগুলোর কোনো জনভিত্তি তৈরি হয়নি। নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দায়বদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা আসেনি। ভাঙন, পাল্টা ভাঙন ও বারবার ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইসলামপন্থী দলগুলো। ভোটার বাড়া-কমা নিয়ে খুব একটা ভাবনাও তাদের নেই। সভা-সমাবেশের উপস্থিতি নিয়েই সন্তুষ্ট তারা।

‘দু’চারশ’ লোক দেখলে তারা ভাবেন হাজার হাজার জনতা, হাজার লোকের সমাবেশ হলে লাখ লাখ  জনতা; এর নীচের কোনো সংখ্যাই গুণতে চান না তারা। তিনি বলেন, ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর  রাজনৈতিক কর্মসূচির যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে হেফাজতে ইসলামকে অরাজনৈতিক দলই বা কেন বলা হবে, আর ইসলামি দলগুলোকেই বা কেন রাজনৈতিক দল বলা হবে?  হেফাজতে ইসলাম যে ইস্যুতে মাঠে নামে, ইসলামি দলগুলোও একই ইস্যুতে মাঠে নামে। তাহলে তাদের মাঝে পার্থক্য কী?’

‘আমি বলছি না ইসলামি দলগুলোর এসব ইস্যুতে মাঠে নামা দরকার নেই। তবে ইসলামি দলগুলোকে এসবের পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায়, মানুষের সুযোগ সুবিধা প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণমূলক কাজগুলোতে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মিছিল মিটিং ও সমাবেশ করে মানুষের মন জয় করা যায় না। তাদেরকে আস্থা ও সম্ভাবনার জায়গাটি তৈরি করতে হবে, গলাবাজি ছেড়ে মানুষের হয়ে কাজ করতে হবে।’

‘তিনি বলেন, সমাবেশের বাইরে তাদের রাজনৈতিক কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কর্মতৎপরতা নেই, দেশ ও দশ নিয়ে ভাবনা নেই। যে দেশের হাটবাজারে সাঁপ খেলা, বানর নাচ , ‘সর্বরোগের’ চিকিৎসক ও কবিরাজকে কেন্দ্র করে শ-পঞ্চাশেক লোক এমনিতেই জড়ো হয়ে যায়, সেখানে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হাজারখানেক লোকের অংশগ্রহণ যে মৌলিক কোনো ফারাক তৈরি করে না, তাৎপর্য বহন করে না, এই সহজ সত্যটা ইসলামি দলগুলো উপলব্ধি করতে চান না। স্থানীয় নির্বাচন হোক বা জাতীয় নির্বাচন হোক, জনভিত্তি কী, ভোটারদের  স্বার্থ ও চাহিদা কী, এসব বিষয়ে তাদের আরও ভাবতে হবে।’