ওয়াজ মাহফিলে বিধি-নিষেধ: যেভাবে দেখছেন ওয়ায়েজ ও ধর্মপ্রাণ জনগণ

ওমর ফারুক

আগামী ৩০ ডিসেম্বরের আগে নতুন করে ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি না দিতে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণকে সামনে রেখে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া পূর্ব নির্ধারিত ওয়াজ মাহফিলও প্রশাসনের অনুমতিক্রমে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসির নির্দেশনা আসার পর থেকেই বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন বাংলাদেশের আলেমসমাজ ও ওয়ায়েজিনে কেরাম। তারা ইসির এ সিদ্ধান্তকে সংবিধান বিরোধী আখ্যা দিয়ে বলছেন, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওয়াজ-মাহফিল আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা আলেম সমাজ মানবে না। ওয়াজ-মাহফিল নিয়ে কমিশনের এটা হঠকারি নির্দেশনা। সংবিধানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশে ওয়াজ মাহফিল বন্ধের নির্দেশ দেয়ায় তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশ বরেণ্য ওলামাদের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদও। তারা বলেন, বাংলাদেশে অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নির্বাচন হয়েছে তবুও কোনো নির্বাচন কমিশন যুগ যুগ ধরে চলমান ইসলাম প্রচারের মাধ্যম এই ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করেনি বা কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। তাওহিদপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া ওয়াজ-মাহফিল বন্ধ করে দেয়া একধরনের ধৃষ্টতা। কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কাজ, যা সরকারের জন্য হবে আত্মঘাতী।

ফাতেহ২৪ এর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে দেশের একসময়ের খ্যাতিমান ওয়ায়েজ ও আলেম মুফতী ইমরান মাযহারি বলেন, আল্লাহর দ্বীন প্রচারের ব্যাপারে কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই। ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে কুরআন হাদীসের আলোচনা। অতএব, কুরআন হাদীসের আলোচনার ব্যাপারে কোনো দল ও ক্ষমতারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।

বিশিষ্ট ওয়ায়েজ ও লেখক আ ফ ম খালিদ হোসেন ফাতেহ২৪কে বলেন, বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করে দেওয়ার ইতিহাস নেই। এটা ইসির মাঝে কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তাদের কাজ। ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে বা ভোটে প্রভাব ফেলবে বলেও আমি মনে করি না। এতে নাগরিক হিসেবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক বক্তব্য না দেওয়ার শর্ত আরোপ করা যেতে পারতো। আমি মনে করি এতে সাধারণ মানুষের মাঝেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। ইসি নতুন করে বিষয়টি বিবেচনায় এনে এ বিষয়ে আবারও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে ইসির এ নির্দেশনা আসার পর দেশের কয়েক জায়গায় পূর্ব নির্ধারিত ওয়াজ প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ কাজ করছে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসিলম সমাজেও।

 

এ্যপেরাল সোরসিং বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জনাব আল আমীন বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিককে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন বা প্রচারের অধিকার দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সে অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, গান-বাদ্য, খেলাধুলা,  অনুষ্ঠান সবই চালু আছে, শুধু বন্ধ করতে বলা হয়েছে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন । কমিশনের মনে রাখা উচিত শীত মৌসুমে এ দেশে প্রচুর পরিমাণ ওয়াজ মাহফিল হয়। যার মাধ্যমে দেশের মানুষ দ্বীন সম্পর্কে নানা বিষয়ে জানতে পারে। মাহফিল ও ওয়াজের আয়োজন করে থাকে মাদরাসাগুলো। মূলত এক বৎসর আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। এই মাহফিলগুলোর বাস্তবায়ন না করা গেলে মাদরাসাগুলো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হবে সামাজিক ও আর্থিকভাবে। তারা নির্বাচনের অযুহাতে ওয়াজ মাহফিল বন্ধের নামে প্রকারান্তরে কোরআন হাদিসের আলোচনাকেই বন্ধ করে দিতে চায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়ালি খান রাজু বলেন, বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিল একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য। নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের ওয়াজ মাহফিল বন্ধের সিদ্ধান্ত আমি সমর্থন করি না। সাধারণত আমাদের দেশে শীতের মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ওয়াজ মাহফিল তথা ধর্মীয় সমাবেশের দেখা মিলে। ঠিক এই সময়েই এমন সিদ্ধান্ত দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দেবে। ওয়াজ মাহফিল ঘিরে নির্বাচন কমিশনের যেই শঙ্কা কাজ করছে আমি মনে করি ওয়াজ মাহফিল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করেও প্রশাসনের মনিটরিং এর মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হত।

নরসিংদীর সিদ্দিক নগর মদিনাতুল উলুম কারিমিয়া ইসলামিয়া হাফিজিয়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা এটা সরকার এবং সিইসি উভয়কেই বিতর্কিত করবে৷ কারণ এদেশের মানুষ ধর্মীয় ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ৷ কোন যৌক্তিক কারণেও যদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ করে তাহলে সাধারণ মানুষ এটাকে ভালো চোখে দেখবেনা৷ বরং এতে সরকারের ভোট ব্যাংক আরো কমে যেতে পারে৷ সাথে সিইসিও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে৷ তাই এ বিষয়ে সিইসির নতুন করে ভাবা উচিত৷

ওয়াজ মাহফিল বন্ধের সংবাদটি শুনতে পেয়ে খুবই মর্মাহত ও ব্যথিত হয়েছেন কুমিল্লার অধিবাসী ইকরাম রাসেল। তিনি বলেন, একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে বিষয়টি নিয়ে খুব খারাপ লাগছে। ওয়াজ আমাদের সমাজে শীতকালীন উৎসবের মতো কাজ করে। সাধারণ মানুষও বিপুল আগ্রহ নিয়ে ওয়াজ মাহফিলে যেয়ে থাকেন। নির্বাচনের কথা বলে এমন ধর্মীয় আয়োজনে বাধা দেওয়া ধর্ম বিরোধী উদ্যোগ।

তবে কিছুটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বি-বাড়ীয়ার কসবা জামে মসজিদের ইমাম আমিনুল হুসাইনি। তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক কারণেই ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করা হয়ে থাকলে বিষয়টি দুঃখজনক বলে মনে করছি। তবে আমার মনে হয় তা নয়। ইদানীং ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে প্রায় জায়গায়ই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। একেক বক্তা একেক মতাদর্শের কথা বলে সমাজে বিভক্তি ছড়াচ্ছে। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় গিয়াস উদ্দিন তাহেরি নামে এক বক্তা এই কারণেই নিষিদ্ধ হয়েছেন। আবার কেউ কেউ আছেন যারা মাহফিলকে রাজনৈতিক প্রচারমাধ্যম বানান। রাজনৈতিক কুৎসা চর্চা করেন। ফলে ওয়াজের মাঠ টগবগে রাজনৈতিক ময়দানে পরিণত হয়ে ওঠে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ইসি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পুরোপুরি ঠিক না হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হবে বলে আশা করি। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি মাহফিল পুরোপুরি বন্ধ না করে প্রশাসন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মাহফিল করানো হয়।