আকাবিরদের রমজান : খলীল আহমদ সাহারানপুরী

আবদুল্লাহ মারুফ : 

রমজান মাসে হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির রুটিন হতো অত্যন্ত মাপা মাপা, খুবই যত্নশীল। সাহরি ইফতার এবং তারাবীতে থাকতো নিজস্ব সূচি। রাতদিনের প্রতিটি মুহূর্ত খরচ করতেন হিসেব করে। কিছুটা সাবধানতা, ভয় এবং আদরের সঙ্গে।

শায়খুল হাদিস যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘আকাবির কা রমজান’ কিতাবে হযরত সাহারানপুরীর রমজানের রুটিন উল্ল্যেখ করেছেন। কীভাবে তিনি পবিত্র রমজানমাসের মুহূর্তগুলো  অতিবাহিত করতেন, আমরা এই লেখায় কিছুটা আলোকপাত করবো।

সাহরি ও ইফতার

সুবহে সাদিক হওয়ার প্রায় তিনঘণ্টা পূর্বে হযরত জেগে যেতেন। তাহাজ্জুদ পড়ে সাহরি খেতে বসতেন। সাহরি খেতে সময় লাগতো পনেরো কি বিশ মিনিট। সুবহে সাদিকের আধঘন্টা পূর্বেই তিনি খাবার শেষ করে ফেলতেন।

সাহরিতে দুধকলা বা এই জাতীয় খাবারের তেমন গুরুত্ব ছিলো না। যদি কেউ এগুলো হাদিয়া পাঠাতো, তাহলে হযরত ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। অবশ্য এক-দু-চামচ নিজে পান করতেন। সাহরিতে সাধারণত রুটি খেতেন। রুটি গোশত, বা চা দিয়ে রুটি। গরম গরম রুটি তৈরি করা হতো সাহরিতে। তবে সাহরিতে মাঝেমধ্যেই বিরিয়ানি পাকানো হতো।

এই জিনিসটা আবার কান্ধলাহ ও গাঙ্গুহে ব্যতিক্রম ছিলো। তারা ইফতারি বা সাহরিতে পোলাও বা বিরিয়ানি খাওয়াকে অপছন্দ করতেন। তারা বলতেন, পোলাও বা বিরিয়ানি খেলে দিনভর পিপাসা লাগে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে। এসব কারণে তারা বিরিয়ানি অপছন্দ করতেন। কিন্তু হযরত সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মাঝেমধ্যেই সাহরিতে বিরিয়ানি খেতেন। ইফতারিতে আবার বিরিয়ানির বিরোধী ছিলেন।

ইফতারিতে খেজুর এবং জমজম পানির অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। হজ থেকে কেউ এসে যদি খেজুর-পানি হাদিয়া দিতো, তাহলে সেগুলো রমজানের জন্য অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করতেন। খেজুর দীর্ঘদিন পর্যন্ত থেকে যদি নষ্ট হয়ে যাবার মতো হতো, তাহলে কিছু রেখে বাকিগুলো বিলি করে দিতেন। কিন্তু পানি তো আর নষ্ট হবে না, তাই জমজম পানি রমজানপর্যন্ত সযত্নে সংরক্ষণ করতেন।

তারাবী

জীবনের শেষ দুইবছর ছাড়া বাকি প্রত্যেক বছর তারাবীতে তিনি কুরআন কারীম তিলাওয়াত করেছেন। শেষ দুইবছর বার্ধক্য এবং নানান রোগশোকে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। নইলে মাদরাসায়ে কদীমে তিনি নিজে তারাবী পড়াতেন। দারুত তালাবা প্রতিষ্ঠা হবার পর সেখানে তারাবী পড়িয়েছেন সুস্থ থাকা অবস্থায়।

অধিকাংশ সময় ২৯ তম রাতে খতম করতেন। শুরুর কিছুদিন সোয়াপারা পড়ে শেষপর্যন্ত এক পারা করে পড়তেন। এখানে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, যদি রমজান উনত্রিশ দিনে হতো, তাহলে তিনি শুরুর একদিন দুই পারা পড়ে বাকি দিনগুলোতে একপারা করে পড়তেন। আর যদি রমজান হতো ত্রিশ দিনে, তাহলে প্রথম থেকেই এক পারা করে পড়তেন।

শাহ আবদুল আজীজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তারাবীর প্রথম রাতে একপারা পড়ে লোক পাঠাতেনㅡ হযরত সাহারানপুরী কয়পারা পড়ছেন দেখে আসো তো। যদি খবর পেতেন দ্বিতীয় পারা শুরু করছেন, তাহলে শাহ সাহেব নিজেও দুই পারা পড়তেন। আর বলতেন, এবার তাহলে রমজান হবে উনত্রিশটা। একে গায়েব না বলে আমরা ইলমে কাশফ বলবো। হযরত সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাশফের মাধ্যমে বুঝতে পেরে তারাবীতে এই তারতম্য করতেন।

মজার ঘটনা

হযরত সাহারানপুরী রাহিমাহুমুল্লাহর রুটিন ছিলো তারাবীর পর কিছুসময় ভক্তবৃন্দের সঙ্গে বসা। মিনিট দশেক হবে বা পনেরো মিনিট, এই সময়টা তিনি মুরিদানদের সঙ্গে তারাবী নিয়ে কথা বলতেন। আয়াতের নির্বাচিত কোনো ঘটনা, মাসআলা, বা কেউ যদি ভুল লোকমা দিয়ে দিতো তাহলে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। এই সময়টায় তিনি একটু খোশমেজাজে থাকতেন।

দূরদুরান্ত থেকে লোকেরা হযরত সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পেছনে তারাবী পড়ার জন্য ছুটে আসতো। হাফেজরা আসতো। তাঁর ভক্তিমাখা তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হতো।

হযরত যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘একদিন হযরত তারাবীতে সুরা তালাকের শুরুর আয়াতটা আরম্ভ করেছিলেনㅡ يا ايها النبي إذا طلقتم النساء فطلقوهن এইটুকু মাত্র পড়েছেন, অমনি আমি লোকমা দিয়ে দিছিㅡ يا ايها الذين آمنوا إذا طلقتم النساء فطلقوهن …।

সেদিন তারাবীতে হযরত হাফেজ মুহাম্মদ হোসাইন, হযরত আব্দুল লতিফ সাহেব এবং আমার চাচাজান উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা তিনজনই একসঙ্গে বলে উঠেনㅡ يا ايها النبي…

তারাবী শেষ হবার পর অজিফা শেষে প্রাত্যহিক বৈঠকে বসে হযরত আমাকে বলেন, ‘মৌলভী যাকারিয়া, ঘুমিয়ে ছিলে নাকি?’ তারপর হাসতে থাকেন।

আমি বলি, ‘জ্বি-না হযরত, আমি ভেবেছিলামㅡ إذا طلقتم النساء فطلقوهن, واحصوا العدة واتقوا الله ربكم لا تخرجوهن সবগুলো জমার সীগা, বহুবচনㅡ তাহলে يا ايها النبي মুফরাদ হবে কেন? তাই জমার সীগা ভেবে ايها الذين آمنوا লোকমা দিয়েছি।  এই কথার পর বৈঠকে হাসির রোল পড়ে।

দিন এবং রাতের নেজাম

ইফতারের সময় হযরত মেহমান নিয়ে ইফতার করতেন। পনেরো-বিশজন মেহমান সবসময় তাঁর সঙ্গে ইফতার করতো। দশমিনিট পর নামাজে দাঁড়াতেন। মাগরিবের নামাজ পড়ে আউয়াবিনে তারাবীতে যেই পারাটা পড়বেন, সেটি পড়তেন। বাকি, সারাবছর রুটিন ছিলো আউয়াবিনে সোয়াপারা করে পড়তেন। কিন্তু রমজান মাসে পড়তেন তারাবির পারাটা।

আউয়াবিন পড়ে খাবার খেতে যেতেন। বিশ-পঁচিশ মিনিট খরচ হতো। এই সময়টায় খুবই অল্প খেতেন। তারপর ইশার নামাজে দাঁড়াতেন। তারাবীর পর ভক্তকুলের সঙ্গে কিছুসময় থেকে ঘরে যেতেন। পনেরো-বিশমিনিট ঘরের লোকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। মাসতুরাতের জামাত এলে তাদেরকে নসিহত করতেন। তারপর দুই-তিন ঘন্টা ঘুমোতেন।

তাহাজ্জুদে কমপক্ষে দুইপারা পড়ার নিয়ম ছিলো। কমবেশ হতো, তবে প্রায়শই এই পরিমাণ পড়তেন।
তারপর সাহরি খেয়ে ফজরের পর ইশরাক পর্যন্ত আমল করতেন। অজিফা আদায় করতেন। মোরাকাবা করতেন। ইশরাকের পর বুখারী এবং তিরমিজি শরীফের সবক পড়াতেন। লেখালেখি করতেন।

কিন্তু রমজানমাসে ইশরাকের পর একঘন্টা আরাম করতেন। তারপর লিখতে বসতেন। গ্রীষ্মকাল হলে একটা পর্যন্ত লিখতেন। আর যদি বর্ষাকাল হতো তাহলে বারোটা পর্যন্ত লেখালেখি করতেন। তারপর জোহরের আজান পর্যন্ত কায়লুলা করতেন।

জোহরের পর তারাবীতে যেই পারাটা পড়বেন, সেটি হাফেজ মুহাম্মদ হোসাইন সাহেবকে শোনাতেন। কখনো কখনো হযরত যাকারিয়া কান্ধলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইকে শোনাতেন। আছর পরও কুরআন কারীমের হিফজ শোনাতেন।

হযরত যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘আমি কখনো তাঁকে দেখে পড়তে দেখি নি। মুখস্থ পড়তেন। প্রয়োজন হলে শুধু দেখতেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি হযরতকে অসুস্থতার দুই বছর বাদে বাকি কখনো ইতিকাফ তরক করতে দেখি নি। সবসময় তিনি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’

ইতিকাফে থাকা অবস্থায়ও তিনি লিখতেন। হযরত যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি বলেন, ‘ইতিকাফে বসে তিনি লেখালেখি বন্ধ করেছেন আমি এমনটা দেখি নি। মসজিদের পর্বপাশে একটি হুজরা ছিলো। লেখালেখি সংক্রান্ত সকল কিতাব বিশ তারিখে সেখানে জমা করা হতো। ফজরের পর কিতাবগুলো উঠিয়ে আমি মসজিদে রেখে আসতাম। লেখা শেষ হলে আবার হুজুরায় নিয়ে রেখে আসতাম।’

রমজানের পূর্বে পত্রপত্রিকা দেখতেন। কিন্তু রমজানমাসে সব বন্ধ রেখে জিকির আজকার আর তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। হাতে সর্বদা একটি তাসবিহ থাকতো। নীরবে ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে জপে যেতেনㅡ ‘সুবহানআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার…’