‘আন্তর্জাতিক হাফেজ’ : শিশুদের নিয়ে ব্যবসা?

রাগিব রব্বানি 

বিভিন্ন আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রে অনেকগুলো দেশের অংশগ্রহণে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা। অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধি হিসেবে এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেন সে-দেশের শিশু কিংবা কিশোর হাফেজে কুরআন। আরব রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি অনারব বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিযোগীও থাকেন এসব প্রতিযোগিতায়।

মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকেও শিশু-কিশোর হাফেজেরা তুমুল উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করছেন আন্তর্জাতিক মানের এ প্রতিযোগিতাগুলোতে। এবং আরব আজম মিলিয়ে অনেকগুলো দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্থান দখল করে উজ্জ্বল করছেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে। প্রতি বছরই একাধিক এমন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশি শিশু-কিশোর হাফেজেরা সেরা তিনের ভেতর অধিষ্ঠিত করছেন নিজেদেরকে। উজ্জ্বল করছেন বাংলাদেশি মুসলমানের ভাবমূর্তিকে। এটা যেমন ধর্মীয় অঙ্গনের জন্য আনন্দের, তেম্নি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিটা বাংলাদেশি মুসলিমের জন্য গৌরবেরও।

গত দশকের শেষ ও চলতি দশকের শুরু থেকে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি হাফেজদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। প্রাইভেট ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা বিশেষায়িত কিছু মাদরাসাই মূলত তাদের বাছাইকৃত ছাত্রদেরকে এসব প্রতিযোগিতায় নিয়ে যায়।

হিফজভিত্তিক প্রতিযোগিতা—স্থানীয় জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক—সকল ক্ষেত্রেই সম্প্রতি বেড়েছে। বিশেষত আমাদের বাংলাদেশে। ছাত্রদেরকে বিশেষ লাহনে কুরআন তেলাওত রপ্ত করানো, ভালো ইয়াদের জন্য মেহনত করানো এবং যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্য করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠছে স্বতন্ত্র হিফজ মাদরাসা।

ছাত্রদের আবাসিক খরচ বিভিন্ন বিশেষায়নের কারণে সাধারণ হিফজ মাদরাসা থেকে কয়েকগুণ বেশি ধরা হলেও খানিক বিত্তশালী অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানকে ভালো এবং ‘আন্তর্জাতিক’ মানের হাফেজ বানানোর আশায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝুঁকছেন। ভালো-মন্দ মিশ্র ফলাফল থাকলেও দিনশেষের বাস্তবতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের সুবাদে ভালো মানের হাফেজ তৈরি হচ্ছেন এবং স্থানীয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতাগুলোতে তারা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য তুমুল সুনাম কুড়িয়ে আনছেন।

কিন্তু সচেতন মহলের অনেকেরই অভিযোগ, মেধাবী ও প্রতিভাবান এ সকল হাফেজ বিশ্বজয়ী হাফেজ হতে পারলেও তাঁদের অনেকেই ওই মানের বা নিদেনপক্ষে সাধারণ মানেরও আলেম হতে পারেন না। এর পেছনের কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একজন শিশু বা কিশোর হাফেজ যখন কোনো প্রতিযোগিতায় সফল ও জয়ী হয়ে যান, পুরো দেশে তাঁর সুনাম ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আসতে থাকে নানা প্রোগ্রামের দাওয়াত। বয়েস ও বোঝের অপরিপক্কতার কারণে নিজেকে তখন অনেক কিছু মনে হয় তাদের কাছে। যার ফলে মেধা ও প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনার আগ্রহ তাদের নষ্ট হয়ে যায়।

কেউ কেউ ছাত্রদের এই অনাগ্রহ তৈরির পেছনে দোষছেন সংশ্লিষ্ট মাদরাসা ও এর শিক্ষকদের। বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া মূলত তাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এবং পুরষ্কারপ্রাপ্ত এসব ছাত্রদের মাধ্যমে নিজের মাদরাসার মার্কেটিংও করেন তারা। এমনকি হিফজ শেষ হবার পর আরও দুই/তিন বছর তাদের হিফজে রেখে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়া হয়। এতে করে কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ বয়েসের কয়েক বছর শুধু শুধু নষ্ট হচ্ছে, পাশাপাশি তারা হারাচ্ছে পড়াশোনার আগ্রহ।

এসব অভিযোগকে সামনে রেখে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ও পুরস্কার বিজয়ী অনেক হাফেজের শিক্ষক, মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যশনালের প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ নেসার আহমদ আন-নাছিরীর সঙ্গে।

হাফেজ নেসার আহমদ নাছিরী বলেন, একসময় এই অভিযোগ করা হতো যে, ভালো হাফেজরা ভালো আলেম হতে পারে না, একসময় ব্যাপকভাবে ছিল এ অভিযোগ। তবে এখন তা কাটতে শুরু করেছে। আমার মাদরাসা থেকে যতটা ছাত্র ভালো হাফেজ হয়েছে, যতটা ছাত্র আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে, সকলকেই আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি ভালো আলেম বানাবার। এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের খোঁজখবরও নিই। আমাদের ছাত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত হাফেজ সাদ সুরাইল এখন মিশরের জামে আজহারে পড়াশোনা করছে। এরকম আরেকজন এবার কওমি মাদরাসার মেশকাতে পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আলিম পরীক্ষায়ও জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। মোটকথা আমার কাছে যাঁরাই পড়েছে, ভালো করেছে, প্রায় সকলেই ভালো আলেম হচ্ছে। তাই ভালো ও পুরষ্কারপ্রাপ্ত হাফেজেরা ভালো আলেম হতে পারে না, এই কথাটা এখন আর ওইভাবে বাস্তব না।

হাফেজ হয়ে যাবার পরও ভালো ছাত্রদেরকে আরও দুই/তিন বছর হিফজখানায় রেখে দেওয়ার ব্যাপারে হাফেজ নাছিরী বলেন, একজন ছাত্রকে আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অনেক পরিশ্রমের দরকার পড়ে। ছাত্রকেও যেমন পরিশ্রম করতে হয়, তাঁর ওস্তাদদেরকেও তেমন মেহনত করতে হয়। আপনারা যে প্রতিবছর দেখেন বিশ্বের বহুদেশকে পেছনে ফেলে আমাদের ছেলেরা পুরস্কার ছিনিয়ে আনে, সেটা কি এম্নি এম্নি? হাফেজ হবার পর আমরা তাঁর পেছনে এই দুই/তিন বছর মেহনত করি, তাঁরাও পরিশ্রম করে, বারবার দাওর (রিভাইস) শোনায়, তারপর সে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয় এবং আল্লাহ চাইলে বিজয়ী হয়ে আমাদের মুখকে উজ্জ্বল করে।

কিন্তু অভিযোগ আছে, আন্তর্জাতিকভাবে বিজয়ী হাফেজদেরকেও আপনারা কিতাবখানায় না দিয়ে আরও এক দুই/বছর নিজেদের মাদরাসায় রেখে দেন এবং তাঁদের নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে হাফেজ নাছিরী জানান, এমনটা অন্তত আমার মাদরাসায় কেউ দেখাতে পারবে না। আন্তর্জাতিকভাবে বিজয়ী হলে বা ছাত্রটির ইয়াদ পাকাপোক্ত ও আন্তর্জাতিক মানের হয়ে গেলে বছর শেষে আমরা তাকে আর রাখি না, ভালো কোনো মাদরাসার কিতাবখানায় ভর্তি হবার পরামর্শ দিয়ে বিদায় জানাই।

অভিযোগ আছে আন্তর্জাতিকভাবে যেসব ছাত্রকে আপনারা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন বা প্রতিযোগিতায় নিয়ে যান, তাদের সঙ্গে আপনাদের একটা চুক্তি থাকে যে, বিজয়ী হলে পুরস্কারের এত পার্সেন্ট মাদরাসায় দিতে হবে। এ অভিযোগের জবাবে হাফেজ নাছিরী বলেন, এটা অপবাদ বৈ কিছু না। এ রকম চুক্তি কোনো প্রতিযোগীর সঙ্গে কখনও আমরা করেছি, এমনটা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। বরং অনেক সময় বহির্দেশে প্রতিযোগিতার জন্য ছাত্র নিয়ে গিয়ে নিজের পকেট থেকে আরও আমার খরচ করতে হয়। এই তো গত রমজানে তুরস্কে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। আমার এক ছাত্রকে নিয়ে গিয়েছিলাম। কারি আহমদ বিন ইউসুফও ছিলেন এই সফরে। ঘটনাক্রমে আমার ছাত্র বিজয়ী হতে পারেনি। এদিকে যাতায়াত খরচের টাকা দেবার সামর্থ নেই তাঁর। দুলাখ টাকার প্রয়োজন, আমার কাছে ১ লাখের মতো ছিল। ছাত্রকে এই জিনিসটা বুঝতে দিইনি। তাকে বলেছি, মনখারাপের কিছু নেই, টাকা নিয়েও তোমাকে ভাবতে হবে না৷ আমি আরও ১ লাখ টাকা তখন কারি আহমদ বিন ইউসুফের কাছ থেকে কর্জা নিয়ে সফর শেষ করেছি। আমরা কখনোই পুরস্কারপ্রাপ্ত ছাত্রের কাছ থেকে পুরস্কার বাবদ কোনো টাকা নিই না। বিজয়ী হবার পর সাধারণত তাদের বাবা বা নিকটাত্মীয় কারও একাউন্টেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় পুরস্কারের টাকা। পরে ছাত্রের অভিভাবক যদি খুশি হয়ে মাদরাসায় কিছু দেন, আর তিনি যদি স্বচ্ছল হন, তবে আমরা সেটা গ্রহণ করি। এর বাইরে আকারে ইঙ্গিতেও আমরা এ ব্যাপারে কিছু বলি না, আশাও করি না।