‘আমি যে কারণে দেশবিভাগের বিপক্ষে’ : হুসাইন আহমদ মাদানীর ব্যাখ্যা

অনুবাদ : আবদুল আজিজ :

(আমরা, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভারতবিভাগের আজাদিকেই সমর্থন করে এসেছি। যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই লেখা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য তাই ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ ; এতে কোন বিশেষ আদর্শিক বা রাজনৈতিক অবস্থান প্রচারের ইচ্ছা নেই। অবশ্য মাওলানা মাদানীর অবস্থানও খুব সরল ছিল না, নীচে তার চিন্তাধারা ব্যাখ্যায় আরেকটি লেখা সংযুক্ত করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন।  ) 

মাদানী ও মওদূদী : উপমহাদেশের দুই মনীষী কেন পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন?

আমার মুহতারাম ও শ্রদ্ধেয় হযরত মাওলানা সাহেব দা. বা.৷ আসসালামু আলাইকুম।

সালামে মাসনুনের পর আরজ এই যে, অনেক দিন যাবৎ আমার মাথায় এ চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, আমরা কংগ্রেসে শামিল হয়েই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারব, বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয় — আচ্ছা, হিন্দুদের নেতৃত্বেই কেবল মুসলিমরা স্বাধীনতা-আন্দোলনের চেষ্টা করতে পারে? আজকে যখন মাওলানা মওদূদী সাহেবের লেখা পড়লাম, তখন এ বিশ্বাস স্থির হয়ে গেল, মুসলমানরা যদি অমুসলিমদের নেতৃত্বে কোন প্রয়াস চালায়, তাহলে সেটা ব্যর্থ হবে৷ যদি কখনও সাফল্য আসেও, তবে সেটা হবে ভাসাভাসা এবং ইসলামী নীতির খেলাফ৷

তাৎক্ষনিকভাবে আমার মাথায় এ চিন্তা এলো, যখন আমাদের অনেক মান্যবর উলামা কংগ্রেসে যোগদান করেছেন, তাহলে আমরা  পেছনে থাকি কী করে? তবে কংগ্রেসে শামিল হবার আগে ভাবলাম, আসল হেতুটা তো জানা দরকার, যার ভিত্তিতে আমাদের উলামায়ে কেরাম কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন৷ একজন তালিবে ইলম হিসেবে আমাকে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে বাধিত করবেন, কেন আপনারা কংগ্রেসে যোগ দিলেন? উত্তর পেলে আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকবো৷

আমার তুচ্ছ রায় হল, মুসলমানরা একটি পৃথক প্লাটফর্মে যেভাবে হোক সমবেত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে লড়াই করবো এবং অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় আমাদের পিছু পিছু চলবে৷ আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সামনে থেকে কাজ করবো৷ মজলিসে আহরার, মুসলিম লীগ এবং জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ সবার একই উদ্দেশ্য৷ সেটি হল, সামগ্রিক বিচারে ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করা। মুসলমানদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থগুলো রক্ষা করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ময়দানে উন্নতির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা৷ উদ্দেশ্য যখন এক, তাহলে এ বিভেদ ও কপটতার ক্ষেত্র এত প্রশস্ত কেন? এ ক্ষেত্রটা দিন দিন সুপ্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও এটিকে থামানোর কোন প্রয়াস কেন আজ অব্দি গৃহীত হয়নি? মাওলানা মওদূদীর লেখাটিও সাথে পাঠাচ্ছি৷ মেহেরবানি করে জবাব দিয়ে বাধিত করবেন৷

নিবেদক
আহকার আব্দুল ওহহাব গুমথালভী

জবাবি পত্র

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ৷ আপনার পত্র পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি৷ আমি নিতান্তই ব্যস্ত আর আপনার বিষয়টি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ৷ যদি সাক্ষাতের কোন সুযোগ হতো, তাহলে মতবিনিময় করার একটা সুরত হত৷ বিষয়বস্তুর দাবি তো এই যে, লেখা হবে দীর্ঘ। কিন্তু এর সুযোগ নেই৷ মওদুদি সাহেবের লেখাটি বর্তমান প্রেক্ষিতে আমার বুঝে আসছে না৷

মেরে মুহতারাম, কোন মুসলমান এমন পাওয়া যাবে না, যে মুসলিম শাসনের কামনা-বাসনা পোষণ করে না। ঠিক তদ্রুপ কোন হিন্দু, শিখ, পারসিয়ান, খ্রিস্টান এমন নেই, যারা নিজ নিজ জাতি ও ধর্মের শাসন কামনা করে না৷ কিন্তু এ একান্ত প্রার্থিত ও আকাঙ্ক্ষিত বিষয়টিকে আটকে দেয় পারিপার্শ্বিক পরিবেশ৷ যদি পরিস্থিতি অনুকূল হত, তাহলে মুসলমানদের ছয়শ বছরের শাসন কেনইবা ধ্বংস হয়ে গেল? সাধারণ মুসলিমগণ কেনইবা অন্যদের দাসে পরিণত হল?

বর্তমানে পৃথিবীর বুকে নিউইয়র্ক টাইমসের বক্তব্য অনুযায়ী সত্তর কোটি মুসলমান আছে৷ এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি মুসলমান স্বাধীন। শুধু যে ভারতবর্ষের মুসলিমরাই দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ তাই নয়, বরং পুরো আফ্রিকা মহাদেশ, ইউরোপ এমনকি এশিয়ারও অধিকাংশ অঞ্চলে আজ মুসলমানরা নির্যাতিত, নিপীড়িত, বিদেশী শত্রুদের গোলাম ৷ আর যেসব অঞ্চল স্বাধীন, সেখানেও মওদুদি সাহেবের প্রস্তাবিত ‘হুকুমাতে ইলাহিয়া’ একেবারে অনুপস্থিত৷ ভারতীয় মুসলিমরা তো অনেক বেশি নির্যাতিত ও নিপীড়িত ৷

একদিকে আল্লাহর দুশমনদের শাসন, অপরদিকে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা, যা মুসলিমদের বেষ্টন করে রেখেছে৷ ফারাকটাও আবার মামুলি না৷ অমুসলিম পচাত্তর শতাংশ আর মুসলিমরা হল পঁচিশ শতাংশ ৷ এই প্রকাশ্য ও ভেতরগত পার্থক্য ছাড়াও তাদের তথা অমুসলিমদের কামনা-বাসনা, আর শাসকগোষ্ঠীর ডিভাইড এন্ড রুলনীতি যে বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ তৈরী করে রেখেছে যে — আল্লাহর পানাহ — এর উপর দারিদ্র্য, অভাব, ক্ষুধা, অস্ত্রহীনতা ইত্যাদি মুসলমানদেরকে একেবারে অসহায় করে রেখেছে৷ তা সত্ত্বেও উলামায়ে কেরাম নিকট-অতীতে সশস্ত্রভাবে সফলতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন কিন্তু ব্যর্থতা ছাড়া আর কী ফলাফল আসলো? হযরত সাইয়িদ আহমদ শহীদ, মাওলানা ইসমাইল শহীদরা কি চেষ্টা করেননি, ১৮৫৭ তে হযরত হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, মাওলানা কাসিম নানুতুবি, মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গুহী কী করা বাকী রেখেছিলেন? কিন্তু ইতিবাচক ফলাফল আসলো না। ১৯১৪ সালে হযরত শাইখুল হিন্দ কী করেননি, কিন্তু ঘটানাটা কী ঘটল?

মুহতারাম, রাজনীতি শুধু দর্শন দিয়ে হয় না, বরং ইতিহাসও লাগে সাথে৷ বাধ্যবাধকতা এই ‘আহওয়ানুল বালিয়্যাতাইন’ (দু বিপদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজটা অবলম্বন করা) এর দিকে টেনে নিয়ে আসে এবং নিয়ে এসেছেও বটে৷ ইসলামেও অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে হুকুম ও বিধান বদলে যায়৷ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকে চোখ বন্ধ করে থাকা ধ্বংস ও আত্মহত্যার শামিল৷

আজ যদি আমরা কঠোরতা অবলম্বন করতে পারতাম, তাহলে বলা যেত যে, সংখ্যালঘু মুসলিমরা নিজেদের উদ্দেশ্যে সফল হতে পারবে৷ কিন্তু এটা তো অসম্ভব৷ যদি আন্দোলন করেই স্বাধীনতা চাইতে হয়, তবে সর্বসাধারণের সঙ্গে একসঙ্গে আন্দোলন করা ছাড়া ভিন্ন আর কী পথ থাকতে পারে? আজ প্রতিটি পদক্ষেপে ইংল্যান্ড থেকে বলা হচ্ছে ভারতবর্ষকে এজন্যই স্বাধীনতা দেওয়া যাচ্ছে না যে, তারা এক নয়; না ধর্মে, না রাজনীতিতে৷ একদল যদি সম্পূর্ণ স্বাধীনতা চায়, অপর দল চায় দেশভাগ, তৃতীয় দল চায় বৃটিশরাজ; তো আরেকদল চায় রামের রাজত্ব, আরেকদল চায় গণতন্ত্র; আবার কেউ চায় সমাজতন্ত্র৷ তাদের পারস্পরিক দলাদলির কারণে সর্বদা বিশৃঙ্খলার আগুন জ্বলে৷ তারা একদল আরেকদলের খুনপ্রত্যাশী ৷

গাভিপূজা নিয়ে এখানে রক্তনদী প্রবাহিত হয়৷ যদি আমাদের স্নেহছায়া এদেশের উপর থেকে উঠে যায়, তবে এটা সাক্ষাত জাহান্নামে পরিণত হবে৷ বিগত দিনের ঘটনাবলীকে এর দলিলস্বরূপ পেশ করা যায়৷ তারপর নিজেদের উদ্দেশ্যে সফল হতে পুরো ভারতবর্ষকে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে এমনভাবে পিষে ফেলেছে যে, এটা প্রাণহীন একটি লাশে পরিণত হয়েছে৷ চারিদিকে দারিদ্র্যের তুফান বইছে, বেকারত্বের মেঘ পুরো আকাশে ছেয়ে যাচ্ছে এবং তার অন্ধকারে সবার সর্বনাশ করে যাচ্ছে৷

ব্যবসা়-বাণিজ্য, কৃষি, শাসনক্ষমতা, চাকুরি, ধর্ম ও রাস্ট্র সবই বরবাদ করা হয়েছে এবং করে ফেলা হচ্ছে ৷ ভারতবর্ষের জীবনোপকরণ, পুঁজি সব নিজেদের দখলে নিয়ে তাদের এ পরিণতি করা হয়েছে৷ এখন ভারতীয়দের হাতে না জাতীয় স্বার্থ আছে, না জাতিগত স্বার্থ৷ ধরে নিলাম যদি আট কোটি মুসলমান সবাই বিভিন্ন দেহ ও একপ্রাণ হয়ে যায়, নিজেদের সম্মিলিত শ্লোগানের মাধ্যমেও কি সফল হতে পারবে? মওদূদী সাহেব যে দর্শন পেশ করেছেন এর মাধ্যমে কি এ দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এ ঐক্য কি বিদেশী ইস্পাতের পাঞ্জা ভেঙে দিতে পারবে? শুধু এর মাধ্যমেই কি রাষ্ট্রের অন্তর্গত ফিতনাগুলো দমন করা যাবে? উপকরণের পৃথিবীতে আসবাব ও উপকরণকে উপেক্ষা করা যায় না৷ শরিয়তও এ উপেক্ষার অনুমতি দেয়নি, বিবেক ও ইতিহাসও নয়৷

যদি ইমামত ও নেতৃত্বের অর্থ তাই হয়, যা মওদূদী সাহেব বলেছেন, এবং মুসলমানদের জন্য অমুসলিম শাসকদের অধীনে থাকা হারাম ও নাজায়েয হয়, তবে মিউনিসিপ্যাল বোর্ডসমূহ, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডসমূহ, এসেম্বলী, কাউন্সিলগুলো, ব্যবসায়িক,কারিগরী ও বিভিন্ন পরিচালনা বোর্ডসমূহে মুসলমানদের অংশগ্রহণ করা হারাম হবে৷ কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা অমুসলিম৷ এরকমভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে, চাই সেটা সামরিক বিভাগ হোক, নির্বাহী বিভাগ হোক, শিক্ষা বিভাগ হোক, অর্থ বিভাগ হোক — ইত্যাদি সব কিছুতেই অংশগ্রহণ অবৈধ হয়ে যাবে৷ সবার চাকুরিই হারাম ও নিষিদ্ধ? কেননা সবার নেতাই যে অমুসলিম৷

সে যে আইন প্রণয়ন করতে চায়, যেভাবে চায় ইচ্ছেমত পরিচালনা করে৷ সব কর্মচারীদের তার হুকুমেই চলতে হবে ৷ অন্যথায় চাকুরির গুড়ে বালি৷ এভাবে চলতে থাকলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ধ্বংসাত্মক কষাঘাতে শিশু ও পরিবারকে ধ্বংসের কূপে নিক্ষেপ করতে হবে৷ শুধু তাই নয়, মুসলিম সম্প্রদায়কে সর্বপ্রকার বরবাদি ঘিরে ফেলবে ৷ সামান্য চিন্তা করুন আর ভাবুন, ইমামতের যে ব্যখ্যা মওদুদি সাহেব করেছেন, সে হিসেবে কোন অমুসলিম ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণ, কোন অমুসলিম ইঞ্জিনিয়ার ও মিস্ত্রির নির্মাণ, অমুসলিম ব্যবস্থাপকদের অধীনে কাজ করা মুসলিমদের জন্য নাজায়েয হয়ে যায়৷ তাহলে কি সবাইকে হারামের কলমে নিষিদ্ধের ফতোয়া জারি করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে?

মুহতারাম, এ সময় পর্যন্ত আপনাদের ঐক্যশক্তির প্রয়োগ করে নিজেকে, নিজের সম্প্রদায়কে এসব বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবেন? এবং সমস্ত ঐক্যশক্তি মিলেও কি নিজ কওমকে মুক্তির পথে পরিচালিত করতে পারবেন? সামান্য ভাবুন৷

এরপর আরেকটি প্রশ্ন উঠে, আপনি কি সব মুসলিমদের একই রাস্তায় চালাতে পারবেন? অথচ আপনার কাছে বাধ্য করার মতো কোন শক্তি নেই ৷ প্রত্যেকেই স্বাধীন৷ প্রত্যেকে নিজের সাহস, বুদ্ধিতে অন্যের অনুসরণ করার পক্ষপাতী না৷ আমাদের কাছে ওয়াজ, নসিহত ও দিকনির্দেশনা দেওয়া ছাড়া বিকল্প কী উপায় আছে যার মাধ্যমে আমরা সবাইকে একপথে নিয়ে আসতে পারব? একদিকে যদি পাশ্চাত্য তাদের জাল ফেলে রাখে, অপরদিকে অপাশ্চাত্য তার ডোরাও নিক্ষেপ করে রেখেছে৷ একদিকে শিয়া মতবাদের দৌরাত্ম্য, তো অপরদিকে কাদিয়ানিয়াতের, তৃতীয়দিকে খাকসারী মতবাদ, চতুর্থদিকে গাইরে মুকাল্লিদিয়তের ফিতনা৷ প্রত্যেকেই আপন বোধবুদ্ধিকে প্লেটো ও এরিস্টেটল থেকেও উর্ধ্বজ্ঞান করছে ৷ তাহলে বলুন এর বিহিত কী হবে?

রাজনৈতিক চিন্তাধারা এক নয়, জাতীয় চাহিদাগুলোও ভিন্ন ভিন্ন৷ স্বার্থবাদের এমন জয়জয়কার যে চলছে, সেটা বলাই বাহুল্য৷ তা সত্ত্বেও জমিয়ত যে নসবুল আইন ও মৌলিক নীতিমালা পেশ করে সেদিকে মুসলিম জাতিকে আহ্বান করেছে, সেটা কি এটা নয়? তারপরও বলুন,কেন জমিয়ত ব্যর্থ? কেন আপনার সমালোচনার তুফান জমিয়তের দিকে ধেয়ে আসছে৷ কেন এর মৌলিক নীতিমালার দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না?

এটা একেবারেই ভুল যে, জমিয়ত অমুসলিম কাউকে নিজেদের নেতা বানিয়ে নিয়েছে ৷ এটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান৷ যেসব সিদ্ধান্ত কংগ্রেস বা অন্য কোন রাজনৈতিক পার্টি গ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে জমিয়তের অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কুরআন,হাদিস ও ফিকহের আলোকে গঠিত নিজেদের দিকনির্দেশনার উৎসের আলোকে চিন্তা-ভাবনা করে; এবং সঠিককে গ্রহণ করে ভুলটা ছেড়ে দেয়৷ জমিয়তে উলামা ভুলটাকে না মুসলমানদের সামনে পেশ করে, না নিজেরা এর উপর আমল করে৷ জমিয়তের রেকর্ডগুলো ঘেঁটে দেখুন, এর মধ্যে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ও প্রোগ্রাম দেখবেন, যেগুলোর ব্যাপারে জমিয়ত শুধু একমত না হয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং উল্টো এর প্রতিবাদও করেছে৷

জমিয়ত সেসব রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনে কেবল একসঙ্গে অংশগ্রহণ করছে মাত্র৷ কোন অমুসলিম পার্টি বা কোন অমুসলিম লিডারের চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করছে এমন নয়৷ একসঙ্গে কোন কাজে অংশগ্রহণ আর কারো অনুসরণ করা,  এক কথা নয়৷ এখানে না অমুসলিমের অনুসরণ করা হচ্ছে, না তাদের থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে৷ এটার উদাহরণ হল এমন, যেমন লাহোরগামী সড়কে মুসলিম অমুসলিম সবাই একসাথে পথ চলছে৷ পথে ডাকাত ও চোর-গুন্ডা থেকে পরস্পর-পরস্পরকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ এমন সুরতে সে তথাকথিত ‘ইমামত’ কোথায় পাওয়া যাচ্ছে, এর অপবাদ কীভাবে সঠিক হতে পারে বলুন? বর্তমান প্রেক্ষাপটকে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিন৷

মেরে মুহতারাম, নামাজের মত অকাট্য ও অবশ্যকর্তব্য বিধানে পর্যন্ত পরিস্থিতির বিচারে পরিবর্তন আসে ৷ নিবাসে নামাজের বিধান আর সফরের নামাজের বিধানে কী পরিমাণ পার্থক্য দেখুন৷ সুস্থতা আর অসুস্থতায় নামাজে পার্থক্য দেখুন৷ অক্ষম আর সুস্থ ব্যক্তির নামাজে কত পার্থক্য৷ পরিস্থিতির ভিন্নতায় শুধু নামাজ কেন, রোযা হজ্জ্ব সবই পরিবর্তন হতে বাধ্য৷ বর্তমানে কি আপনি ভারতবর্ষে শরিয়াহর নিয়মমাফিক ব্যাভিচারীকে রজম, চোরের হাত কাটা, নেশাখোর ও অপবাদদাতার জন্য আশি দোররা মারার বিধান প্রয়োগ করতে পারবেন? এরকমভাবে কিসাস, দিয়ত, ডাকাতদের বিপরীতমুখী করে হাত-পা কেটে দেওয়া যেগুলি সরাসরি কুরআনের বিধান, আমরা কি এগুলো বাস্তবায়ন করবো? এ দারুল হারবে কি বর্তমান প্রেক্ষিতে এ বিধানগুলো প্রয়োগ হবে? আমাদের উপর কি এমন মুহূর্তে এ বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা ফরয?

আচ্ছা বলুন তো হালতে ইযতিরার তথা বাধ্যবাধকতায় মৃত জন্তু ভক্ষণ করা, মদ পান করা ও শুকরের গোশত খাওয়া আর ইচ্ছে করে খাওয়ার বিধান কি সমান? এরকম শত শত নযির ও দৃষ্টান্ত ইসলামে আছে৷ সবগুলোকে এক লাঠিতে হাঁকানো যায় না৷

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের প্রাক্কালে আবদুল্লাহ বিন উরাইকিতকে নিজের রাহবার হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে কি আমাদের জন্য শিক্ষা ও আলো নেই? নবীজির তো তখন জানের-খতরা৷ সে যে পথ দিয়ে সবার মুক্তি মনে করেছে, সে পথ দিয়েই তো নিয়ে গেছে। নবীজি তো তার উপর ভরসা করে তার অনুগামী হয়েছেন৷ কারণ সে রাস্তা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল৷ হিজরত ফরজ ছিল৷ সুতরাং এ রাহনুমায়ি আর অনুসরণে আমাদেরটায় কী পার্থক্য? এটাকে এড়িয়ে যাওয়া কি ইনসাফের কথা হতে পারে?

মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছে নবীজি মদীনার ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, পাশাপাশি মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন৷ হুদাইবিয়ায় মুশরিকদের সঙ্গে সন্ধি করেছেন আর ইহুদিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন৷ এখানে কি আমাদের জন্য আলো নেই? আমরা কখনও বৈধ মনে করি না যে, শরিয়তের বিধিবিধানে সামান্যতম পরিবর্তন করা হবে; অথবা কোন অমুসলিম নেতৃত্বের অধীনে থেকে কোন শরঈ বিধান ছেড়ে দেওয়া হবে৷ একারণেই সবসময় জমিয়তের প্রতিষ্ঠাকে জরুরি মনে করি৷ মুসলমানদের জন্য আবশ্যক মনে করি, তারা জমিয়তের দিকনির্দেশনার উপর আমল করবে৷ আমরা আবশ্যিক মনে করি, শরঈ বিষয়ে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগণ চিন্তা-ভাবনা করে, পূর্ণ শ্রম ব্যয় করে মুসলমানদের দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন৷ যতটুকু আমরা বুঝি, জমিয়ত অদ্যাবধি এ নীতি অবলম্বন করে আসছে৷ জমিয়ত বাতিল-শক্তির কাছে পরাভূত হয়ে শরঈ বিধানে কোন পরিবর্তন করে না, আজ পর্যন্ত করেওনি৷ ঠিক তদ্রুপ কোন লোভের বশবর্তী হয়ে কারো প্রতি নমনীয়তা অবলম্বন করে না, এবং এখনও পর্যন্ত করেনি৷

শরিয়ত সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নিজেদের বুঝ অনুযায়ী সমালোচনা ও আপত্তির ঝড় তুলে আসছে ৷ এরা রিসালতের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বদেরও কি ক্ষমা করেছে? তাহলে আজ তাদের কাছে কী-ইবা আশা করা যেতে পারে?

আমার আবেদনগুলি থেকে আপনি পরিস্কার বুঝতে সক্ষম হবেন, মুসলিম দলগুলোর পারস্পরিক বিভেদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মস্বার্থ, প্রবৃত্তির অনুসরণ, শরিয়তের অনুসরণ না করা এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা সবই নেতৃবৃন্দের চাহিদা ও কামনার ভিত্তিতেই হচ্ছে৷ যেটা অভিজ্ঞতার আলোকে সহজেই পরীক্ষা করা যায়৷ আফসোস, আজকাল ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত একেবারেই কম অথবা দুর্লভ৷ দাবি তো অনেক, শব্দ তো প্রচুর; কিন্তু এর রূহ ও প্রাণশক্তি একেবারেই উধাও ৷ সাদাসিধে মানুষরা ধোঁকায় নিপতিত হয়ে আছে৷

নঙ্গে আসলাফ
হুসাইন আহমদ গুফিরালাহু
পহেলা মুহাররম, ১৩৬১ হিজরি৷