আলোর পথের রাহবার (৩য় পর্ব)

[হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি (র)-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]
মূল : মুহাম্মাদ হাসান আনসারি
ভাষান্তর : মওলবি আশরাফ
কোরআন দিয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা 
হযরত মাওলানা তাঁর রচিত ‘দাওয়াতে ফিকর ও আমল’ কিতাবে লিখেন :
‘আমি কোরআনের এক নগন্য তালেবে ইলম। আমার শিক্ষাজীবন কোরআন পাঠ দিয়েই শুরু হয়েছে। মহান আল্লাহ আমার ভাগ্যে এমন এমন ওস্তাদ দিয়েছেন, যাঁদের ইমানের প্রকৃত স্বাদ ও কোরআনের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধ হয়েছিল। শায়খ খলিল বিন মুহাম্মদ ইয়ামানি (রহ) কোরআন মাজিদ পড়াতেন ও তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ত। আমার মনে প্রথম যে-বিষয়টি রেখাপাত করেছিল, তা তাঁর দরদ মাখা স্বর। এ আমার সৌভাগ্য যে, একদম প্রথম শিক্ষক হিসেবে এমন একজনকে পেয়েছিলাম যিনি নরম দিলের মানুষ এবং খুব মায়া করতেন। তিনি আমাকে কোরআন মাজিদের কিছু সুরা পাঠ করান। বিশেষ করে আল্লাহর একত্ববাদের সুরাসমূহ পড়ানো শুরু করেন।… তারপর লাহোর গিয়ে মাওলানা আহমদ আলি (রহ)-এর কাছে কোরআন মাজিদ পুরোটা পড়ি। এখানেও যে-বিষয়টি আমাকে প্রভাবিত করে, তা তাঁর কোরআনের নির্দেশমাফিক জীবনযাপন।… কয়েকদিন দারুল উলুম দেওবন্দেও ছিলাম।… মাওলানা সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ)-এর কাছে আর্জি করেছিলাম যে,— ‘যে-সমস্ত আয়াতে আমার প্রশ্ন জাগে, যার সমাধান সাধারণ তফসিরের কিতাবে পাওয়া যায় না, সেই সব আয়াত আমি আপনার সামনে পেশ করব।’  তিনি আমাকে শুক্রবার সময় দিতে পারবেন জানান। এইভাবে আমি তাঁর থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাই।
মাওলানা সাইয়িদ সুলায়মান নাদবি (রহ) থেকেও উপকৃত হওয়ার সামান্য সুযোগ পাই। তারপর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় ওস্তাদ হিসেবে নিযুক্ত হই, তখন বিশেষভাবে কোরআন মাজিদের ক্লাস আমাকে দেওয়া হয়।
আঁচে করদাম হামা আয দওলতে কুরআঁ করদাম— যা কিছুই করেছি, কুরআনের অফুরন্ত দৌলত থেকেই করেছি।
আমার লেখার তানা বানা [১২] কোরআন মাজিদ থেকেই তৈরি হয়। আমি সবচেয়ে বেশি কোরআন থেকে তত্ত্ব নিই, তারপর ইতিহাস থেকে। এবং আমি ইতিহাসকে কোরআনেরই তফসির মনে করি।
রাজস্থানের কাফেলা টঙ্ক মসজিদে এক ভাষণে আলি মিয়াঁ নদবি বলেন :
সাইয়িদ আহমদ শহীদ (রহ)-এর ভাতিজার পৌত্র হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবদুর রাজ্জাক কালামি— যিনি এই এলাকাতেই থাকতেন, তিনি ‘ফুতুহুশ শাম’ কিতাবের অনুবাদ করে ‘সমসামুল ইসলাম’ নাম দেন। তার মাঝে পঞ্চাশ হাজার শে’র (দ্বিপদী কবিতা) ছিল। সেখানে যুদ্ধের চিত্র এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আমাদের পরিবারে এবং সম্ভবত এই এলাকাতেও নিয়ম ছিল— যখনই কেউ কোনো দুর্ঘটনার মুখে পড়ত, বিশেষ করে মহিলাদের কারো যদি সন্তান বা স্বামী ইন্তেকাল করে, তাহলে তাঁকে শক্ত হবার জন্য ওষুধ হিসেবে ‘সমসামুল ইসলাম’ পড়তে দেওয়া হতো। স্পষ্ট মনে আছে, বাড়িতে সব মহিলারা একত্র হতো, আমার হাফেজা খালা খুব আবেগ উদ্যমে তা পড়ে শোনাতেন।
আমরা ছোটরা পয়সা আনার জন্য মায়েদের কাছে আসতাম। মন চেয়েছে, চলো মা’র কাছ থেকে পয়সা এনে কিছু কিনে আনি। কিন্তু এখানে এসে মনের নকশা পালটে যেত। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ত। এবং চেহারার রঙ এমন হয়ে যেত যেন আমরা যুদ্ধের ময়দানে সশরীরে হাজির, চারদিকে চিরনিদ্রায় শায়িত শহীদেরা। পয়সা চাওয়ার আর সাহস হত না। নিজেরাও শোনার জন্য বসে যেতাম। [১৩]
আলি মিয়াঁ নদবির তালিম ও আত্মশুদ্ধির নির্দেশনার ক্ষেত্রে বড়ভাই ডক্টর মাওলানা সাইয়িদ আবদুল আলি ও মা খায়রুন্নিসা বেহতর (রহ)-এর হেদায়াত ও উপদেশমূলক চিঠিপত্রের বড় ভূমিকা ছিল। তাঁর মা যেসমস্ত অনুশাসনমূলক চিঠিপত্র লিখেছেন, তার একটি নমুনা :
আলি!
তুমি কারো কথায় চলবে না। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর এবং আমার হক আদায় করতে চাও, তাহলে ওই সমস্ত মহাপুরুষদের দিকে লক্ষ্য কর যাঁরা ইলমে দীন অর্জনের জন্য জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এবং দেখ তাঁদের কী সম্মান ছিল।
শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবি সাহেব, শাহ আবদুল আজিজ সাহেব, শাহ আবদুল কাদির সাহেব, মওলবি মুহাম্মদ ইবরাহিম সাহেব এবং তোমার মুরুব্বি খাজা আহমদ নাসিরাবাদি সাহেব ও মওলবি মুহাম্মদ আমিন সাহেব (রহমাতুল্লাহি আলাইহিম) প্রমুখদের দেখ, যাঁদের জীবন ও মরণ ছিল ঈর্ষণীয়। কেমন শানশওকতে দুনিয়া উপার্জন করেছেন। এবং কী আশ্চর্য সুন্দরতার সাথে ইহজীবন ত্যাগ করেছেন।
এই সম্মান কীভাবে অর্জন করতে হয়, তাঁদের জীবনকর্ম থেকে শিখো।  ইংরেজি পড়ে প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী তোমাদের বংশে অনেকেই হয়েছে এবং হবে, কিন্তু তাঁদের মতো দু’জাহানেই সম্মান ও মর্তবার অধিকারী কেউ নেই।…
আলি, আমার যদি একশ সন্তানও থাকত, আমি তাদের এই শিক্ষাই দিতাম। এখন তুমি আছ। আল্লাহ তায়ালা আমার নেক নিয়তের ফল দিলে তোমার থেকেই একশ সন্তানের কর্ম ও উৎকৃষ্টতা পাব। এবং রত্নগর্ভা হিসেবে আমি পাব ইহকালে ও পরকালে চেহারায় ঔজ্জ্বল্য ও সুনাম।
আল্লাহ কবুল করুন। আমিন, সুম্মা আমিন ইয়া রব্বাল আলামিন।
এই চিঠি ওই সময় লেখা, যখন আলি মিয়াঁ নদবির ইংরেজি পড়ার প্রতি ঝোঁক উঠেছিল এবং মেট্রিক কোর্সের বই শেষ করে ইন্টারমিডিয়েটের বই পড়া শুরু করেছিলেন। এখনো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ হয়নি, এরই মধ্যে এই চিঠি এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি ইংরেজি পড়া ছেড়ে দেন।…
কিন্তু ওই অল্পসময়ের চর্চাতেই তিনি ইংরেজি ভাষায় অসামান্য দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।
টীকা :
[১২] কাপড় বোনার আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি সুতা।
[১৩] তা’মিরে হায়াত, জানুয়ারি ২৫, ১৯৯৪
আগের সংবাদমসজিদে তারাবি পড়া যাবে, ইফতার করা যাবে না
পরবর্তি সংবাদবর্ষীয়ান ইসলামি রাজনীতিবিদ মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস আর নেই