আহমাদ ইয়াসিন : ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের অপরাজিত সিপাহসালার

হামমাদ রাগিব

(আজ ১৫ মে। ঐতিহাসিক নাকবা দিবস। অধিকারহারা ফিলিস্তিনি মুসলমানদের অনিঃশেষ বেদনা, লাঞ্চনা, দুঃখ আর গ্লানির দিন। নৃশংসতম ধ্বংসের এই অন্ধকারতম দিনকে তারা কখনোই ভুলতে পারবে না। .১৯৪৮ সালের এ দিন একদিকে যেমন তাদের মাতৃভূমির ওপর ইহুদি সন্ত্রাসীরা অবৈধ দখলরাজ কায়েম করেছে, অপরদিকে একই দিনে আট লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে নিজেদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে এ বঞ্চনা বয়ে বেড়াচ্ছে তাঁরা। এ থেকে রেহাই পেতে, ইসরায়েলি সন্ত্রাসীদের রুখে দিতে গত সত্তর বছরে অসংখ্য ফিলিস্তিনি জীবন ও রক্ত দিয়েছেন। অনেকে বরণ করেছেন পঙ্গুত্ব। কারও কারও ভাগ্যে জুটেছে ইসরায়েলের জিন্দানখানা। অকুতোভয় এসব সংগ্রামীকে নেতৃত্ব দিতে যুগে যুগে এসেছেন অমর অনেক সিপাহসালার। তাঁদেরই অন্যতম শায়খ আহমদ ইয়াসিন। ফিলিস্তিনের শাদামাটা পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রতিবন্ধী এক যুবক কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের সিপাহসালার, কীভাবে হারাম করে দিয়েছিলেন দখলদার ইসরায়েলের সুখনিদ্রা–সেই গল্প বলেছেন হামমাদ রাগিব। বয়ান করেছেন আহমাদ ইয়াসিনের শাহাদাতের করুণ কাহিনিও। বেদনাময় নাকবা দিবস উপলক্ষে ফাতেহের পাঠকদের জন্য লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো।)

সে রাতে বিছানায় যাওয়া হয়নি তাঁর। সাংগঠনিক ব্যস্ততায় কেটে গেছে অর্ধেকেরও বেশি রাত। তারপর তাহাজ্জুদ।

দুই ছেলে তাঁর সাথেই ছিলেন। ফজরের আগে আগে ছেলে দু’জন গোপন সূত্রে জানতে পারলেন আজ ভোরে বাবার ওপর হামলা করা হতে পারে। বাবা তখন তাহাজ্জুদে। রবের সাথে গভীর আলাপে নিমগ্ন।

তাহাজ্জুদ শেষ হতেই ছেলে দু’জন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে, ‘বাবা, আজ ফজরের নামাজে আপনার জন্য বোধহয় মসজিদে যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট এই মাত্র জানাল, ইসরায়েলিরা আপনাকে হত্যার জন্য ফজরের সময় মসজিদে হামলা চালাতে পারে।’

ছেলেদের সতর্কীকরণ কথায় তিনি মুচকি হাসলেন। সাহসী কিন্তু উদাস কণ্ঠে বললেন, ‘আক্রমণ করলে তো ভালোই। আমাদের এই যে এতো প্রচেষ্টা, এতো মেহনত, এর উদ্দেশ্য তো শাহাদতই! বস্তুত আমাদের সবাইকে আল্লাহ তায়ালার কাছেই ফিরে যেতে হবে।’

খানিক পর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আজানের সুমধুর ধ্বনি। ছেলে ও সহকর্মীদের তিনি নির্দেশ দিলেন নামাজের প্রস্তুতি নিতে।

গাজা স্ট্রিপ জামে মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য বের হয়েছেন তিনি। হুইল চেয়ারে করে। পেছন পেছন আসছেন তাঁর ছেলে আর অন্যান্য সহকর্মী। ছেলেরা হুইল চেয়ার ঠেলে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন।

তখনও তাঁরা মসজিদে পৌঁছাননি। হঠাৎ হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে ছুঁড়ে মারা হলো ‘হেলফায়ার মিসাইল’। মিসাইলের আওয়াজে কেঁপে উঠল গাজা স্ট্রিপ রোডের পুরো এলাকা।

ইসরায়েলিদের অভিযান সফল। তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। শাহাদত বরণ করেছেন দুই সন্তান আর সঙ্গে থাকা ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ৯ জন জানবাজ কর্মী নিয়ে। ফিলিস্তিনের আকাশে ২০০৪ সালের ২২ মার্চ সকালের সূর্য উদিত হলো ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের অকুতোভয় বীর শাইখ আহমাদ ইয়াসিনের শাহাদতের শোকাবহ বার্তা নিয়ে।

ফিলিস্তিন জুড়ে নেমে এলো শোকের ছায়া। প্রিয় নেতাকে হারানোর শোকে মুহ্যমান ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলিদের অমানবিক এ নিষ্ঠুরতায় হতবাক মুসলিম বিশ্বও।

ইসরায়েলের সব দুশ্চিন্তা এবার ঘুচল। এ লোক খুব ভয়ংকর ছিলেন তাদের কাছে। তাদের অস্তিত্বের জন্য এক মহা হুমকি ছিলেন তিনি।

ফিলিস্তিনের বামপন্থী মুক্তিকামীরা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছে, কিন্তু শাইখ আহমদ ইয়াসিন কখনোই এদের অস্তিত্ব পর্যন্ত বরদাশত করেননি। নিজ দলকেও তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেভাবে।

তাঁর ঘোষণা ছিল, ‘আমাদের পথ হয়তো বিজয়ের নয়তো শাহাদাতের। ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত এ দু পথ ছাড়া তৃতীয় কোনো পথে আমরা হাঁটব না।’

দুই
তাঁর পুরো নাম শাইখ আহমাদ ইসমাইল হাসান ইয়াসিন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার ছোট্ট গ্রাম আল-জাওরায় জন্ম। বাবা আবদুল্লাহ ইয়াসিন তাঁকে খুব ছোট রেখে মারা যান। ৪ ভাই আর ২ বোনের মধ্যে আহমদ ছিলেন সবার বড়।

ছোট ছোট ৭ সন্তানকে নিয়ে মা সা’দা আল-হাবিলের ছিল অভাবের সংসার। আল-জাওরার ছোট্ট বাড়িটিতে আহমাদ বেড়ে উঠছিলেন ভাই-বোন আর মায়ের সাথে। অভাব-অনটন থাকলেও নিজের বাড়িতে ছিলেন, মাথা গোজার ঠাঁই ছিল–এও অনেক কিছু।

কিন্তু ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলিরা তাঁদের তাড়িয়ে দেয় নিজের আবাস ভূমি থেকে। হাজারো গ্রামবাসীর সাথে তাঁরাও নিজেদের মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে ফেলেন। ইসরায়েলিরা কেড়ে নেয় সবকিছু।

উদ্বাস্তু হয়ে মা আর ছোট্ট ৬ ভাইবোনকে নিয়ে কিশোর আহমাদ এসে আশ্রয় নেন গাজা সিটির আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে। তখন তাঁর বয়েস সবে ১১। ১১ বছর বয়েসের বালক আহমদের ভেতর সেই যে ইহুদিদের প্রতি চরম ঘৃণা আর ক্ষোভ জন্মেছিল, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা বেড়েছে বৈ কমেনি।

ছেলেবেলায় মল্লযুদ্ধ আর কুস্তিতে পারঙ্গম ছিলেন আহমাদ। বিকেলে শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে সমবয়েসিদের সাথে মেতে উঠতেন শক্তি ও সাহস প্রদর্শনীর এসব খেলায়। খেলতে খেলতে স্বপ্ন দেখতেন, তিনি যখন বড় হবেন, এই সাহস আর শক্তি দিয়েই ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেবেন ইহুদিদের।

একদিন ঘটে গেল দুর্ঘটনা। আহমাদের বয়েস তখন ১২। বন্ধু আবদুল্লাহ খতিবের সঙ্গে উদ্বাস্তু শিবিরের পাশে সেদিন তিনি মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আবদুল্লাহর কাছে হেরে যান আহমাদ। শুধু হার নয়, আবদুল্লাহ তাঁকে মারাত্মক জখমিও করে ফেলেন।

আঘাতটা লেগেছিল গলায়। গুরুতর অবস্থা। আঘাতের তীব্রতায় গলায় প্লাস্টার করাতে হয়। ৪৫ দিন পর প্লাস্টার যখন খোলা হলো, আহমাদকে ততোদিনে প্যারালাইসিস হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে। পুরো জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান তিনি।

হুইল চেয়ারেই তখন থেকে তাঁর চলাফেরা।

আহমাদের মনখারাপ হয়ে যায়। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বড় হয়ে ইসরায়েলিদের তাড়িয়ে দেবেন এ ভূখণ্ড থেকে। কিন্তু এখন যে তিনি পঙ্গু! নিজেই চলাফেরা করতে পারেন না, শত্রু তাড়াবেন কী করে? তাঁর স্বপ্ন কি তবে অঙ্কুরেই ধ্বংস হয়ে গেল? তিনি কি আর ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে যোগ দিতে পারবেন না?

না, পঙ্গুত্বকে তাঁর জয় করতে হবে। শারীরিকভাবে তিনি অচল, কিন্তু মন এবং চিন্তার দিক থেকে তো পূর্ণ সবল। আহমাদ শপথ নিলেন, মেধা এবং চিন্তাকে কাজে লাগিয়েই তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগুবেন।

আহমাদ গভীর মনোনিবেশ করলেন পড়াশোনায়। প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পেরিয়ে এলেন। উচ্চতর পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলেন মিশরের বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

উদ্যম নিয়ে আল-আজহারে ভর্তি হলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেখানে তিনি আর ক্লাস চালিয়ে যেতে পারলেন না। বাধ্য হয়েই তাঁকে আল-আজহার বাদ দিতে হয়।

আহমাদ তারপরও দমে যাবার পাত্র নন। অসাধারণ মনোবল তাঁকে ঘরে বসে বুনিয়াদি বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা চালিয়ে যেতে সাহায্য করে। ধর্ম, দর্শন, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে ঘরে বসে একা একা পড়াশোনা করেই তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেন।

সাথে সাথে নিজের বাকশক্তিকে কাজে লাগিয়ে হয়ে ওঠেন একজন সুবক্তা।

গাজা সিটির জামে মসজিদে শাইখ আহমাদ ইয়াসিন প্রতি জুমাবার খুতবা দেয়া শুরু করেন। মানুষ তো অবাক, প্রতিবন্ধী একটা লোক, অথচ কী তেজস্বী আর ঈমানদীপ্ত আলোচনা! দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কী সাহসী আর সোচ্চার উচ্চারণ!

শাইখ আহমাদ ইয়াসিনের প্রতি মানুষ অল্প দিনেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ তেজস্বী বক্তৃতা ফিলিস্তিনিদের জুলুম-নির্যাতন আর নিষ্পেষণের ক্ষতকে তাজা করে তোলে।

শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এক জোয়ান হয়ে ওঠেন মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের প্রেরণার বাতিঘর।

তিন
শাইখ আহমাদ ইয়াসিন আশির দশকে গাজা সিটির ইসলামি কমপ্লেক্সের নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। গড়ে তোলেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনী।

ইসরায়েলি সেনারা ১৯৮৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ইসরায়েল রাষ্ট্র উৎখাতের জন্য তিনি ষড়যন্ত্র করছেন, এই হলো তাঁর অপরাধ। এ অপরাধের শাস্তি দেয়া হলো ১৩ বছর কারাদণ্ড। শাইখ আহমাদ ইয়াসিন ১৩ বছর বন্দী থাকবেন ইসরায়েলের কারাগারে।

কিন্তু ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের প্রিয়নেতাকে এত দীর্ঘ সময় আটকে রাখার শক্তি ইহুদিদের কোথায়? দু’বছর যেতে না যেতেই ১৯৮৫ সালে পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি) ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করে। ইসরায়েলকে তারা বার্তা পাঠায়, এদের যদি ফিরিয়ে নিতে চাও তবে শাইখ আহমাদ ইয়াসিনকে মুক্তি দাও।

ইসরায়েল নিজেদের লোকদের মুক্তির জন্য শাইখ আহমাদ ইয়াসিনকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। আহমাদ ইয়াসিন বীরের বেশে বেরিয়ে আসেন ইহুদিদের জিন্দানখানা থেকে।

শাইখ আহমাদ ছিলেন আপাদমস্তক ইসলামি ভাবধারায় উজ্জীবিত। পিএফএলপির সাথে তাঁর চিন্তার অমিল ছিল নানা জায়গায়। পিএফএলপি বামধারার সংগঠন। তাঁদের সাথে কাজে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। তিনি ইসরায়েলের সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা কিংবা আলোচনার ছিলেন ঘোর বিরোধী। অবৈধভাবে এসে আমাদের ভূমি দখল করে রাষ্ট্র বানিয়েছে, আমাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে জীবনটাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, এর জবাব একমাত্র অস্ত্র দিয়েই দেয়া হবে। আলোচনায় বসা মানে তাদের দখলকৃত এলাকাকে রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেয়া–এটা অসম্ভব। এই ভূমি থেকে ঝেটিয়ে বদায় করাই তাদের একমাত্র প্রাপ্য, এ ভূমির এক ইঞ্চি মাটির ওপরও কোনো হক নেই তাদের, তাদের সাথে কিসের আলোচনা?

কিন্তু পিএফএলপি চাইত তাদের সাথে আলোচনায় বসে একটা সমাধানে আসতে।

শাইখ আহমাদ ইয়াসিন চিন্তাগত এসব মতপার্থক্যের কারণে আন্দোলনকে নিজের মতো করে ইসলামি ভাবধারায় সাজানোর প্রয়াস গ্রহণ করেন। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাঁর এ সংগ্রামকে তিনি জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পিএফএলপির কাছে যেটা নিছক মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৮৭ সালে শুরু হয় প্রথম ইন্তিফাদা। এই সময়টাতেই শাইখ ইয়াসিন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর সংগঠন ‘হরকতুল মুকাওয়ামাতিল ইসলামিয়্যাহ’। এই সংগঠনই পরবর্তীতে ‘হামাস’ নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

চিন্তার মতপার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিনি অন্যান্য মুক্তিসংগঠনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইতেন শাইখ ইয়াসিন। তিনি বলতেন, আমাদের শত্রু অভিন্ন, শত্রুর মোকাবেলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নিজেদের মধ্যে বিবাদ করে সময় ও শক্তি খরচ করলে প্রকারান্তরে শত্রুকে সহযোগিতা করা হবে।

১৯৮৯ সালে ইসরায়েলি সেনারা আবারও গ্রেপ্তার করে তাঁকে। সেদিন ছিল ১৮ মে। বিনা বিচারে টানা তিন বছর অন্তরীণ রাখে এভাবে। আর অমানুষিক নির্যাতন।

১৯৯২ সালে এসে আদালতে তোলে। ইসরায়েলি আদালত ইসরায়েলি বিচারপদ্ধতি। ১৫ বছরের কারাদ-। সাথে নির্যাতনের স্টিম রোলার।

এ ক’বছর প্রতিবন্ধী এ মুজাহিদের ওপর এতটাই অমানুষকি নির্যাতন চালানো হয়, তিনি চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

৯২ সালে তাঁর ১৫ বছর কারাদণ্ডের রায়ের পর হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের সদস্যরা ইসরায়েলি এক সৈন্যকে অপহরণ করে এর বিনিময়ে আহমদ ইয়াসিনের মুক্তি দাবি করে। ইসরায়েলিরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো ওই সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় কয়েকজন হামাস মুজাহিদ শহিদ হন। নিহত অপহরণকৃত ইহুদি সৈন্যটাও।

প্রিয় নেতাকে মুক্ত করার এ কৌশলে হামাস ব্যর্থ হয়। ৯৭ সালে তারা আবারও একটা সুযোগ পায়।

তখন জর্দানে ছিলেন হামাস নেতা খালেদ মাশাল। তাঁকে হত্যার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ এক ইহুদি গোয়েন্দাকে। হত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় গোয়েন্দা। হামাস এর বিনিময়ে শাইখ আহমদ ইয়াসিনের মুক্তি দাবি করে।

গোয়েন্দাটি ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা এর বিনিময়ে শাইখ আহমদ ইয়াসিনকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। প্রায় ৯ বছর পর আহমাদ ইয়াসিন মুক্তি লাভ করেন ইসরায়েলের জিন্দানখানা থেকে।

এম্নিতেই শারীরিকভাবে অচল ছিলেন, ইহুদিদের এ ক’বছরের ধারাবাহিক নির্যাতনে শরীরের অবস্থা আরোও কাহিল হয়ে পড়েছিল। চোখ দু’টো তো নির্যাতনের কারণে ডেমেজ হয়েছে কয়েক বছর আগেই।

শাইখ আহমাদ ইয়াসিন এরপরও মানসিকভাবে ছিলেন পুরো নওজোয়ান। তাঁর উদ্যম, সাংগঠনিক তৎপরতা আগের মতোই অদম্য ছিল। বরং এই সময়টাতে পূর্বের চেয়েও আরো তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে একের পর এক জোরদার সব আক্রমণ পরিচালনা শুরু করেন হামাসের সদস্যদের দিয়ে।

ইসরায়েলিরা দেখল, এ লোককে গ্রেপ্তার করে কোনো লাভ নেই। কোনো না কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। একে মুক্তভাবেই কোথাও আক্রমণ করে শেষ করে দিতে হবে।

এরপর থেকে তাঁর ওপর ইসরায়েলিদের শুরু হয় হত্যাচেষ্টা হামলা। বেশ কয়েকটা হামলা চালিয়ে তারা ব্যর্থ হয়।

অবশেষে ২০০৪ সালের ২২ মার্চ ভোরে তাদের সেই হীনচেষ্টা আলোর মুখ দেখে। ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রেরণার প্রতীক চিরতরুণ শাইখ আহমাদ ইয়াসিন নিস্তব্ধ হয়ে যান চিরদিনের জন্য।

লেখক : ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমের সহযোগী সম্পাদক