কওমি মহিলা মাদরাসা: শিক্ষিকা সংকট কাটছে না

রাকিবুল হাসান নাঈম:

দিনদিন কওমি মহিলা মাদরাসার গুরুত্ব এবং জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাড়ছে এসব মাদরাসা থেকে ফারেগ হওয়া আলেমার সংখ্যাও। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না নারী শিক্ষিকার সংখ্যা। প্রতিটি মাদরাসা নারী শিক্ষিকার সংকটে ভুগছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছ সত্ত্বেও নিয়োগ দিতে হচ্ছে পুরুষ শিক্ষকদের। বিভিন্ন কারণে এই সংকট কাটছে না। সংশ্লিষ্ট:গণ বলছেন, এই সংকট হেফজখানাগুলোতে যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিতাব বিভাগেও। মহিলা মাদরাসায় পুরুষ শিক্ষকদের গণহারে শিক্ষকতার কারণে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে পড়তে হচ্ছে বিভিন্ন জটিলতার মুখেও।

প্রতিবছর গড়ে দশ হাজার আলেমা বের হন কওমি মাদরাসা থেকে। চলতি বছর হাইয়াতুল উলয়ার অধীনে পরীক্ষার্থী ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯,৮৯৫ জন। প্রশ্ন উঠছে, এত আলেমা ফারেগ হবার পরও কেন শিক্ষিক সংকটে পড়তে হয় মাদরাসাগুলোকে?

সংকীর্ণ মানসিকতার প্রভাব

এ প্রসঙ্গে কথা বলেন দারুন নাজাত মহিলা মাদরাসার আলেমা শিক্ষিকা মুনীরা রাহমান তাশফী। তার মতে, সংকীর্ণ মানসিকতার প্রভাবে এই সংকট থেকে যাচ্ছে। এই সংকীর্ণতা বিভিন্ন জায়গা থেকে তৈরী হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো কওমী মহিলা মাদরাসা গড়ে উঠেছে, সেগুলো থেকে এতদিনে বেশ ভালো মানের আলেমারা ফারেগ হয়ে বের হয়েছেন! কিন্তু এত এত যোগ্য আলেমা ফারেগ হওয়ার পরও মহিলা মাদরাসাগুলোতে যোগ্য শিক্ষিকা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মেয়েদেরকে পুরুষদের কাছে পড়তে হচ্ছে এবং যেখানে ফেতনা ঘটার সেখানে তা ঘটেই চলছে! আমি মনে করি, যোগ্য শিক্ষিকা না পাওয়ার অন্যতম কারন হলো: ১. নারীরা শুধুই স্বামী এবং ঘর সামলাবে, এই ধারণার কারণে যোগ্য আলেমার জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে! ২.অধিকাংশ যোগ্য আলেমাদের বিয়ে হচ্ছে যোগ্য আলেমদের সাথেই, তাদের নিরানব্বই শতাংশই তার স্ত্রীকে ঘর ছাড়া অন্য কোনো কাজে দেখতে নারাজ! ৩.মেয়েদেরকে কোনোরকম পড়লেই হয়, অল্প পড়লেও চলে, এই মানসিকতা থেকে যোগ্য আলেমাদেরকে তালাশ করা হয়না!

তিনি আরও বলেন, জানি শতভাগ শিক্ষিকা রাখা সম্ভব না। কিন্তু যেসব আলেমারা বের হচ্ছেন প্রতি বছর, তাদেরকে মহিলা মাদরাসাগুলোর জন্য নির্বাচিত করা উচিত, তাদেরকে উৎসাহিত করা উচিত, তাদের পরিবারগুলোকে সহায়ক হওয়া উচিত উম্মাহর বৃহৎ স্বার্থে! এই ফেতনার যুগে আরও একটু ফেতনা কমানোর জন্য হলেও অন্তত মহিলা মাদরাসাগুলোতে পুরুষ শিক্ষকের সংখ্যাটা যথাসম্ভব সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা উচিত!

বিয়ের পর শিক্ষকতায় বাধা

সাউদা বিনতে জামআহ রা. আন্তর্জাতিক বালিকা মাদরাসার পরিচালক মাওলানা ইসমাঈল হাসানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি হেফজখানায় শিক্ষিকা সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হেফজখানার জন্য ভালো নারী শিক্ষিকা পাওয়া যায় না। এর বড় একটা কারণ, যারা হাফেজা হয়, তারা অনেকে কওমি মাদরাসায় পড়ে। কওমি মাদরাসায় পড়তে পড়তে তাদের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর হেফজখানায় শিক্ষকতার সময় পায় না। কারও পরিবার থেকে অনুমতি থাকে না। কারও কারও আবার হেফজ শেষ করার পরপরই বিয়ে হয়ে যায়। ফলে দেখা যায়, ছাত্রকালে যে মেয়েটি প্রচণ্ড মেধাবী ছিল, এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছিল, সেও শিক্ষকতায় আসতে পারে না। কখনও নিজেই আসে না, কখনও পরিবার দেয় না।

একই সংকটের কথা তুলে ধরেছেন হোমনা থানার একটি মহিলা মাদরাসর পরিচালক মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব। তিনি তার মাদরাসার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘গ্রামের মাদরাসাগুলো এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। ফলে শিক্ষিকাদের ভালো বেতন দেয়া যায় না। তাকমিল পাশ করার আগেই অধিকাংশ ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর পরিবারই তাকে শিক্ষকতায় আসতে দেয় না। ফলে পরিচালকদের হিমশিম খেতে হয়। অভিভাকরা এসে মহিলা শিক্ষিকা খোঁজেন। ফলে মাদরাসা চালাতে হয় নিজের পরিবারের নারীদের দিয়ে। কিন্তু এই সংকট না বুঝে অনেকে বলে ফেলেন, মাদরাসাটি তো পরিবারতান্ত্রিক মাদরাসা!

তিনি আরও বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক আলেম ছেলেই আলেমা বিয়ে করেছে। মাদরাসার শিক্ষিকা হিসেবে তাদেরকে চাইলে তাদের পরিবার দিতে চায় না। কী এক অজানা কারণে তাদেরকে বারণ করে। শ্বশুরবাড়ি যদি আলেমাদেরকে একটু সুযোগ দিতো, তাহলে এই সংকট অনেকটা কমে যেতো।

বেতন কম

মহিলা মাদরাসার শিক্ষিকাদের বেতন পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে গ্রামের মাদরাসাগুলোতে। সেখানে শিক্ষিকাদের বেতন গড়প্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এই বেতন স্বল্পতার কারণে পরিবার ফেলে কেউ বাইরে সময় দিতে চায় না।

কথা হয় মাওলানা আতাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি মুরাদনগর থানার এক মহিলা মাদরাসার শিক্ষক। তার স্ত্রী আলেমা। তিনি ফাতেহকে বলেন, ‘গ্রামের মাদরসাগুলোতে বেতন একদম কম। ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। এত অল্প টাকার জন্য পুরো মাস দৌড়ঝাঁপ করা আমার পছন্দ না। পারিবারিক দিকটাও তো দেখতে হয়। যদি বেতন থেকে ভালো একটা সাপোর্ট পেতাম, তাহলে পরিবারের কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করানো যেতো। সেই সাপোর্ট না পেলে পরিবার চালানো মুশকিল।

সমাধান কী

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বেফাকের মজলিসে আমেলার সদস্য এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহিলা মাদরাসা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি মাওলানা মাহফুজুল হাসান ইব্রাহিমের সঙ্গে। ফাতেহকে তিনি বলেন, যদি বেতনের দিকটা সমন্বয় করা হয়, তাহলে এই সংকটা অনেকটা কেটে যাবে। বেতন কম, তাই স্বামীও তার স্ত্রীকে অনুমতি দেয় না। বেতন ভালো হলে স্বামী নিজেই বলতো, পরিবারে একটু সেক্রিফাইস করে হলেও শিক্ষকতাটা চালিয়ে যাও। আমি এমন অনেক দেখেছি, কেবল বেতন সমস্যার কারণে শিক্ষকতায় আগ্রহী হচ্ছে না। বিয়ের পর নিতান্তই সংসারী হয়ে থাকছে।

বেতন সমস্যাকে বড় সমস্যা মনে করছেন না মিরপুর ১২ নম্বরস্থ জামিয়া মিল্লিয়া মাদানীয়া আরাবিয়া আজমা মহিলা মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মুফতি ইমরান কাসেমী। তিনি ফাতেহকে বলেন, ‘মূলত সমস্যা হলো, মেয়েরা মাদরাসায় পড়ে ফরজ পরিমাণ দ্বীন শেখার জন্য। খুব কমই মাদরাসায় শিক্ষকতা করবে, এমন মানসিকতা লালন করে। প্রায় ৮০ শতাংশ ছাত্রী এই মানসিকতা লালন করে না। পিতামাতারাও মেয়েকে শিক্ষকতায় দিতে চান না। বিয়ের আগে পর্যন্ত শিক্ষকতার অনুমতি দিলেও বিয়ের পর আর দেন না। ফলে সংকট তৈরী হচ্ছে।

তিনি জানান, তার মাদরাসায় ১২০০ ছাত্রী রয়েছে। শিক্ষিকাদের এন্ট্রি লেভেলের বেতন হয় ১০ হাজার টাকা। ক্রমান্বয়ে সেটা বাড়তে থাকে।

সংকটের সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, দেশে মাদরাসার ছেলেদের স্কিল বাড়াতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করানো হয়। কিন্তু মেয়েদের ওয়ার্কশপ একদম কম, নাই বললেই চলে। আমি সামনে বছর থেকে তিন মাস পর পর একটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করব। যেন তাদের মানসিকতা বদলায়, যোগ্যতা বাড়ে। আগে তাদের মানসিকতা উন্নত করতে হবে। জ্ঞানমুখী করতে হবে। তাহলে এই সংকট আপনাতে কেটে যাবে।

বেতন সমস্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেতন সমস্যা নেই তা বলব না। গ্রামে অনেক মাদরাসায় আছে। শহরেও থাকতে পারে। শিক্ষিকা সংকটের পেছনে এটা মূল কারণ না হলেও এটাও একটা কারণ। সুতরাং বেতন সমন্বয় করতে হবে। নয়ত যোগ্যদের পাওয়া যাবে না।

আগের সংবাদবিজ্ঞপ্তি দিয়েও কেন শিক্ষক খুঁজে পাচ্ছে না ইবি
পরবর্তি সংবাদফরিদাবাদ মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মুফতি নূরুল আমীন আর নেই