কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড : একটি পর্যালোচনা

আশরাফ উদ্দীন খান

আগের পর্ব পড়ুন : কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড : একটি পর্যালোচনা

আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম

১৭৮০ সালে যখন কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মোল্লা মাজদুদ্দিন দরসে নিজামিয়া শিক্ষাক্রমকে নতুন মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম হিসাবে গ্রহণ করেন। সেই সময়ে এই অঞ্চলের দ্বীনী মাদ্রাসাসমূহে দরসে নিজামিয়া শিক্ষাক্রম বা মানহাজ ব্যাপকভাবে অনুসরণ করা হত। এই শিক্ষাক্রমের অধীনে দ্বীনী বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক কিতাব পড়ানো হত। ‘১৭৮০ থেকে ১৭৯০ সাল অবধি মাদ্রাসার শিক্ষাপদ্ধতি বা শিক্ষা-বিষয় দরসে নিজামিয়ার অনুরূপ ছিল। এই দরসে নিজামিয়ার প্রবর্তক ছিলেন লখনৌর ছাহালী নিবাসী মোল্লা কুতুবুদ্দিনের পুত্র মোল্লা নিজামুদ্দিন ছাহালুভী (১০৮৯-১১৬১ হিঃ)। এই শিক্ষাক্রমের বিবরণ ছিল নিম্নরূপ :
১. সরফ : মিজান মুনশায়িব, সরফে-মীর, পাঞ্জেগঞ্জ, জুবদা, ফুসুলে আকবারি, শাফিয়া
২. নাহু : নাহবেমীর, শরহে মিয়াতে আ’মেল, হেদায়েতুন নাহু, ফাকিয়া, শরহে জা’মি
৩. মানতিক : ছোগরা, কোবরা, ইছাগুজি, তাহজিব, শরহে তাহজিব, কিবতি মা’মির, ছুল্লামুল উলুম
৪. হিকমাত বা বিজ্ঞান : মায়বুজি, ছোগরা, শামসে বাজিগাহ
৫. গণিত : খোলাসাতুল হিসাব, তাহরিরে আকলিদাস, তাশরিহুল আফলাক, রিসালায়ে কুশজিয়া, শারহে চগমুনী
৬. বালাগাত : মুখতাসারুল মায়া’নি, মুতাওয়াল
৭. ফিকাহ : শরহে বেকায়াহ, হেদায়া
৮. উসুলে ফিকাহ : নুরুল আনওয়ার, তাওজীহ, তালবিহ, মুসাল্লামুস-সুবুত
৯. কালাম : শরহে আকায়েদ নাসাফি, শরহে আকায়েদ জালালি, মীর জাহেদ ও শরহে মাওয়াকেফ
১০. তাফসীর : জালালাইন, বায়যাবি
১১. হাদিস : মেশকাত

১৭৯১ সালে সরকার এই পদ্ধতিকে আরো মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্ঠা করেন… কিন্তু মুসলমানগণ তাতে বাধা দেন। সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও সংশোধন করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে, মাদ্রাসার তাবৎ বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যালোচনা ও তথ্য উদ্ধারের জন্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ১৭৯২ সালের রেকর্ডপত্র হতে জানা যায় যে, মি. জিপম্যান মাদ্রাসা তদন্ত করেন এবং মাদ্রাসাটির বিশেষ অবনতি ঘটেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করেন। এই রিপোর্ট বোর্ডের সামনে পেশ করা হলে, মোল্লা মাজদুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও পদচ্যুতির জন্য গভর্নর জেনারেলের কাছে সুপারিশ করা হয়। গভর্নর জেনারেল বোর্ডের সুপারিশক্রমে মোল্লা মাজদুদ্দিনকে পদচ্যুত করে, সেই স্থলে মোহাম্মাদ ইসরাইল সাহেবকে প্রধান অধ্যাপক নিয়োগ করেন। সেই সাথে মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি মাদ্রাসার জন্যে কিছু প্রাথমিক আইন-কানুন প্রবর্তন করে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৪৩-৪৭)

মাদ্রাসার শিক্ষাক্রমে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন

আলিয়া মাদ্রাসা একটি খালেস দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও, এর অধীনে সাধারণ শিক্ষা বা পাশ্চাত্য শিক্ষা চালু করার ইচ্ছা যে ইংরেজদের মনে ছিল সেটা পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। ইতিপুর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ১৮১৩ সালের শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার পরে মাদ্রাসাকে স্থানীয় সরকারী প্রশাসন সরাসরি খবরদারীর আওতায় নিয়ে আসে। সেই সময়ে মাদ্রাসা সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের সুপারিশ হেস্টিংসের দপ্তরে পেশ করা হলে এর জবাবে তিনি বলেনঃ ‘…আমি কমিটির প্রস্তাবে একমত। মাদ্রাসার সংস্কারের ব্যাপারে কমিটি যে প্রস্তাব করেছে তাও যুক্তিযুক্ত। কিন্তু তা অত্যন্ত মন্থর গতিতে করতে হবে। কেননা এতে স্থানীয় জনগণের ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে। পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের ব্যাপারে কমিটি যে প্রস্তাব আনয়ন করেছে, তাও গভর্নর অবান্তর বলে উড়িয়ে দিতে চান না। তবে তা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য প্রয়াস। কেননা মুসলমানদের প্রচলিত এই শিক্ষাব্যবস্থা বহুকাল ধরে চলে আসছে। এই শিক্ষার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য মুসলমানদের মনেপ্রাণে মিশে আছে। অতএব এখন এই ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা ঠিক হবে না। তবে আস্তে আস্তে যখন পাশ্চাত্য শিক্ষার উপকারিতা, গুরুত্ব সম্পর্কে মুসলমানদের মানসিকতার উপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে, তখন তা কার্যকর করা কঠিন হবে না।’ (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ১২৬-১২৭)।

পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি শুধুমাত্র আলিয়া মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠিত করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই উপমহাদেশে সামগ্রিক ভাবে তাদের নিজেদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করা এবং এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে তারা তাদের কাজও শুরু করেছিল। তাই দেখা যায় যে, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইংরেজি শিক্ষার জন্যে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, রাজা রামমোহন রায় (১৮১৭ সালে) ইংরেজি শিক্ষার জন্য ‘কলিকাতা এংলো ইন্ডিয়ান কলেজ’ নামে একটি পাবলিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

‘১৮২৬ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের নির্দেশক্রমে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় একটি ইংরেজি ক্লাস খোলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আস্তে আস্তে ইংরেজিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া। কেননা, ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের জন্য সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ছিল এবং এই ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিশেষ সচেতন ছিল। ১৮২৬ সালে প্রবর্তিত এই ইংরেজি শিক্ষা ১৮৫১ আল পর্যন্ত এই পচিশ বছরে সর্বমোট ১৭৮৭ জন ছাত্র ইংরেজি শিক্ষায় অংশ নেয়। তবে এই খাতে বিশেষ অর্থ ব্যয় ও অনেক চেষ্টার ফলাফল তেমন সন্তোষজনক ছিল না। এই সময়ের মধ্যে শুধু আব্দুল লতিফ নামক একজন ছাত্র এই বিভাগে জুনিয়র স্কলারশিপ লাভ করেন। পরে তিনি মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটির পত্তন করেন এবং নওয়াব আব্দুল লতিফ সি আই এ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। অনুরূপভাবে হুগলী মোহসেনিয়া মাদ্রাসার ছাত্র সৈয়দ আমীর আলী এই বিষয়ে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৫৮)

ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মুসলমান ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ছাত্র বৃত্তি, লোভনীয় চাকুরীর কথা প্রচার করা স্বত্ত্বেও মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে এই বিষয়ে আগ্রহী করা যায়নি। তাই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হলে যত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথাই বলা হোক না কেন, ইংরেজি শিক্ষার নামে মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচার বিনষ্ট না হয় এই বিষয়ে মুসলমানেরা অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।

‘কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার মত একটি ক্ষুদ্রায়তন মুসলিম প্রতিষ্ঠানের ক’জন ছাত্র ইংরেজি বর্জন করলেও, ততদিনে অনেক প্রতিষ্ঠানে এবং পুরো হিন্দু জনগোষ্ঠী ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যায়। যারা ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী তারা সরকারী উচ্চ পর্যায়ে চাকুরি পাচ্ছে। এদের দেখাদেখি মাদ্রাসার বাইরে ইংরেজির কদর বেড়েই চলেছে। ফলে সময় বুঝেই ১৮২৯ সালের ২৬শে জুন ভারতীয় শিক্ষা কাউন্সিল ইংরেজি শিক্ষার একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করে বলে : যতদিন সরকারী কাজের ভাষা ইংরেজি না হবে ততদিন ইংরেজি ভাষা যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে না। কাজেই আগামী ৩ বছর পর সরকারী দপ্তরের কাজকর্ম ইংরেজিতে সম্পন্ন করতে হবে। প্রশাসনের ভাষা ইংরেজি হওয়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রে ফার্সি ভাষা ভবিষ্যৎহীন হয়ে যায়। ১৮৩০ সালের এক ফরমানে বলা হয়, অফিস-আদালতে ক্রমান্বয়ে ইংরেজি ভাষা ফার্সির স্থলাভিষিক্ত হবে। ১৮৩৫ সালে আরোও এক ফরমানে বলা হয়, একমাত্র ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতি শিক্ষা দেওয়া হবে। অবশেষে ১৮৩৭ সালের একটি ফরমানে বলা হয়, অফিস-আদালতে ফার্সি লেখা চলবে না, অফিস-আদালতের নথিপত্রের ভাষা ইংরেজিতে লিখতে হবে, অথবা আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে হবে। এতে মুসলমানরা ছাড়া অন্যরা ইংরেজিকে স্বাগত জানায়। মুসলিম আমলে যেমন হিন্দুরা ফার্সিতেও অনেক অগ্রসর হয়েছিল, এখন হিন্দুরা ইংরেজিতেও তেমনি এগিয়ে চলার নীতি অবলম্বন করে।’ (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৩১-১৩৩)

প্রথম ইংরেজ প্রিন্সিপালের সংস্কার প্রয়াস

‘১৮৫০ সালে শিক্ষা কাউন্সিল অন্যান্য কলেজের মত আলিয়া মাদ্রাসাতেও একজন ইংরেজ প্রিন্সিপাল নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পেশ করে। তবে উক্ত প্রিন্সিপাল ক্লাসের শিক্ষাদানের সাথে জড়িত থাকবেন না। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে, এশীয় ভাষা ও শিক্ষা বিষয়ক পণ্ডিত ড. এলায়েস স্প্রীংগার এম. এ. কে আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম প্রিন্সিপাল হিসাবে নিয়োগ করা হয়। তিনি প্রিন্সিপালের পদ গ্রহণের পর, মাদ্রাসার কিছু অভ্যন্তরীণ রদবদল ও শিক্ষা সংস্কারের একটি স্কীম তৈরি করেন। উক্ত সংস্কারের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :
১. মায়বুজি ও ছোগরা (হিকমতের দুটি কিতাব)-কে পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দেওয়া
২. প্রাচীন হিকমতকে পরিবর্তন করে নতুন হিকমত চালু করা
৩. আরবির বদলে উর্দু বিষয়ে হিকমত বা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রবর্তন
৪. আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের জন্য মি. লাওয়াল নামের একজন এংলো ইন্ডিয়ানকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করার প্রস্তাব

মাদ্রাসার ছাত্ররা এই সংস্কার প্রয়াসের তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং একে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার মধ্যে বিরাট গোলযোগের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি তদন্তের জন্যে একটি কমিটি গঠিত হয়। এবং কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা কাউন্সিল তাদের মতামত পেশ করে বলে : শিক্ষা কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ কিছুদিন হতে মোহামেডান কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষা বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছেন। এই সঙ্গে কাউন্সিল ‘হিন্দু কলেজ’ সম্পর্কেও চিন্তা-ভাবনা করছেন। কাউন্সিলের সদস্যরা মনে করেন, এই দেশের এই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করার এখন সময় এসেছে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৭৮-৭৯)

এংলো-পার্সিয়ান বিভাগ

কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শুরু থেকে দারসে নিজামির শিক্ষাক্রমের অনুসারে মূল শিক্ষা কাঠামো পরিচালিত হয়, যা আরবি বিভাগ নামে পরিচিত ছিল। ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন হয়েছিল ১৮২৬ সাল থেকে, ফলে আলিয়া মাদ্রাসায় আরেকটি বিভাগ ছিল ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট নামে। তবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ছাত্রদের অনীহা থাকা ও এই বিভাগে ছাত্র সংখ্যা অনেক কম থাকার কারণে বিকল্প কোন বিভাগ চালু করার কথা চিন্তা করা হয়।

‘শিক্ষা কাউন্সিল এই ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন যে, বাংলার মুসলমানদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবংশীয় অনেকে ক্রমান্বয়ে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এবং নিজেদেরকে অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইংরেজি শিক্ষার তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। তবে আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষার তেমন উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর কারণ ছিল দ্বিবিধ। আসলে মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আন্তরিক টান তেমন ছিল না, তেমনি এই বিভাগের বন্দোবস্তও ছিল অপ্রতুল এবং নিম্নমানের। তাই কমিটি মনস্থ করলেন যে, আলিয়া মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের মান উন্নত করতে হবে।

এই চিন্তা করে কাউন্সিল মাদ্রাসার পুরাতন বিভাগের বিলোপ সাধন করে, এংলো পার্সিয়ান নামে একটি নতুন বিভাগ পত্তনের চিন্তা করেন। এই বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্রদের শিক্ষার মান এতখানি উন্নত হতে হবে, যাতে এখান থেকে জুনিয়র স্কলারশিপের ছাত্র তৈরি করা যায়। এই বিভাগে মূলত ইংরেজির সাথে আরবি, ফার্সি, উর্দু ও মাতৃভাষা ও পড়ানো হবে। এই কোর্সে ছাত্ররা দশ-এগার বছর বয়সে ভর্তি হবে এবং পাঁচ-ছয় বছরে এই কোর্স সম্পন্ন করবে। এই কোর্স শেষ করার পর ছাত্ররা ঐচ্ছিকভাবে ইংরেজি অথবা আরবী নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করতে পারবে। যারা আরবী পড়বে তারা আলিয়া মাদ্রাসাতেই ভর্তি হতে পারবে, আর যারা ইংরেজি পড়তে চায় তারা মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হতে পারবে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৭৯-৮১)

‘১৮৫১ সালে শিক্ষা কাউন্সিল এংলো পার্সিয়ান বিভাগ খোলার প্রস্তাব করে। এই প্রস্তাবের পিছনে বৃটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবাব আব্দুল লাতিফের যথেষ্ট অবদান ছিল। ১৮৫৩ সালে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার একাংশে এংলো পার্সিয়ান বিভাগ নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান অস্তিভ্ব লাভ করে। এংলো পার্সিয়ান বিভাগে মাদ্রাসা শিক্ষার মূল কাঠামোকে ঠিক রেখে আধুনিক আরবি, পার্সি, ইংরেজি এবং উপমহাদেশের ভাষা হিসাবে উর্দু ও আঞ্চলিক ভাষা হিসাবে বাংলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী দর্শন ও বিজ্ঞান উর্দুতে অনুবাদ করে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙ্গালী মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। নবাব আব্দুল লতিফ ১৮৫৩ সালে চব্বিশ পরগনার কলারোয়া মহাকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকা অবস্থায় ‘মুসলমান ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার উপকারিতা’ শীর্ষক একটি রচনা প্রতিযোগিতার আহ্বান করেন। এইভাবে তিনি সরকারকে এংলো পার্সিয়ান বিভাগের পাঠ্যসূচী প্রবর্তন করার পাশাপাশি মুসলিম জনসাধারণকে আরবী-ফার্সির সাথে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলেন।

এংলো পার্সিয়ান বিভাগ চালু হওয়ার পর থেকেই এই বিভাগ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এই বিভাগে জুনিয়র স্কলারশিপ পাস করার পর মাদ্রাসার আরবি বিভাগে ভর্তি উন্মুক্ত রাখা হলেও, ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পাশ করে, পরবর্তীতে অন্য কোন বিষয়ে পড়াশোনা করে, এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল কলেজেও ভর্তি হতে দেখা যায়।’ (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৩৮-১৪০)

আরবী বিভাগের সংস্কার

‘শিক্ষা কাউন্সিল আলিয়া মাদ্রাসার আরবী শিক্ষার যুগোপযোগী সংস্কারের প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাচীন হেকমত ও ফালসাফা (দর্শন) আরবী বা যে কোন ভাষাতেই হোক তা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ হিসাবে বলা হয় যে, এতকাল পরও দুই হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মতবাদ বাঁচিয়ে রাখার কোন যৌক্তিকতা নাই। দুই হাজার বছরে দুনিয়া এই ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। সরকারের একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকা খুবই লজ্জাজনক। এই হেকমত ও ফালসাফার বদলে আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন বরং দেশীয় ভাষায় অনুবাদ করে অথবা পূর্ণাঙ্গ পুস্তক রচনা করা শিক্ষা বিষয় হিসাবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৮১-৮২)

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা

‘১৮৫৪ সালে ১৯ জুলাই বোর্ড অব ডিরেক্টরস ভারতীয়দের শিক্ষার সমুদয় দায়িত্ব ভারত সরকারের উপর ন্যস্ত করে। ফলে ১৮৫৪ সালের উড ডিসপ্যাচের ১১ নং শিক্ষা ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের কতিপয় উন্নতমানের মাদ্রাসাকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মাদ্রাসাসমূহের পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পাওয়ার কারণে উক্ত প্রস্তাব বাস্তবায়িত হতে পারেনি। এই উড ডিসপ্যাচের উপর ভিত্তি করে ১৮৫৭ সালে ভারত বর্ষে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। তার মধ্যে একটি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি, ফার্সির উচ্চ শিক্ষার কোন সুযোগ ছিল না।’ (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৩৮-১৪০)

আলিয়া মাদ্রাসার দ্বিতীয় প্রিন্সিপাল উইলিয়াম নাসান লিজ এংলো পার্সিয়ান বিভাগ সম্পর্কে বলেন : ‘এই বিভাগ হতে ছাত্ররা পাস করার পর প্রতি বছর ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিয়ে এন্ট্রান্স পাস করে এবং তারপর উচ্চ শিক্ষার্থে প্রসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হয়। আমি মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে পাশ্চাত্য শিক্ষার পাশে তুলনামূলক আরবী তথা মুসলিম শিক্ষার মাহাত্ম্য ব্যক্ত করেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এংলো পার্সিয়ান বিভাগের কোন ছাত্র আরবি বিভাগে ভর্তি হয় নাই। বরং তারা এই বিভাগ থেকে সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে শুরু করেছে। মাদ্রাসার প্রতি তাদের মনোযোগ খুবই কম। কেননা, মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট না থাকায় এর গুরুত্ব খুবই কম মনে হয়। অতএব মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত করা হলে, এই ছাত্রা এংলো পার্সিয়ান বিভাগ শেষ করে মাদ্রাসার আরবী বিভাগে ভর্তি হবে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৮৮)

মাদ্রাসায় কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস

‘১৮৬৬ সালে সরকারের কাছে এই মর্মে দাবী জানানো হয় যে, এংলো পার্সিয়ান বিভাগকে আরো সম্প্রসারণ করে এটাকে কলেজে উন্নীত করা হোক। সরকার এই আবেদন মেনে নিয়ে যথা নিয়মে কলেজ চালু করেন। কিন্তু এই কলেজ সাফল্য লাভ করতে পারেনি, ফলে অচিরেই কলেজ বন্ধ করে দিতে হয়। প্রথম বছরে মাত্র ছয়জন ছাত্র ভর্তি হয়েছিল, পরবর্তী বছরে তারা মাত্র তিনজন ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তারাও চলে যায়।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৯১)

মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি ১৮৭১ সাল

১৮৬৮ সালের দিকে কলিকাতার ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে কতগুলি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয় যে, মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও পড়াশুনা সন্তোষজনক হয়। এইজন্য সরকারের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যাতে এই শিক্ষা মুসলমানদের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। এই সময় স্বয়ং সরকারও মুসলমানদের শিক্ষা প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা করছিলেন। কেননা, সিপাহী বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আলেম ও মাদ্রাসার শিক্ষক ইংরেজদের সন্দেহভাজন হয়েছিলেন এবং এই পুরানো রীতির শিক্ষা চালু থাকলে অচিরেই মুসলমানরা অপর কোন বিপ্লব বাঁধিয়ে দিবে–এই ছিল ইংরেজদের আশংকা। এই পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রাসার তদন্তের জন্য সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সদস্য ছিলেন–সি এইচ ক্যাম্পবেল, জে স্টেকলিফ ও খান বাহাদুর মৌলবী আব্দুল লতিফ, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র। তদন্ত কমিটি সরকারের কাছে মাদ্রাসা সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট পেশ করেন। কমিটির পেশ করা সুপারিশের বিশেষ কতগুলো ধারা ছিল নিম্নরূপ :
* প্রভাবশালী মুসলমান ও ইংরেজদের নিয়ে গঠিত একটি পর্যবেক্ষক কমিটি নিয়োগ করতে হবে
* আরবী বিভাগকে কলেজে রূপান্তরিত করা হবে
* শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অধীনে মাদ্রাসা পরিচালিত হবে, তবে পর্যবেক্ষক কমিটি শুধু ভালমন্দ দেখাশোনা করবে
* প্রিন্সিপাল পদ বিলুপ্ত করে হেড মৌলবীর দ্বারা সে কাজ পূরণ করতে হবে

উক্ত রিপোর্ট সম্পর্কে লেঃ গভর্নরের মন্তব্য ছিল এমন– … বর্তমানে মাদ্রাসায় যেসব পাঠ্যপুস্তক রয়েছে তা যেমন যুগোপযোগী নয়, তেমনি মাদ্রাসার শুভানুধ্যায়ীদেরও মনঃপুত নয়। ছাত্রবৃত্তি, শিক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষক ও কর্মচারীদের কার্যক্রম–মোটকথা কোন দিকই সুষ্ঠ ও সন্তোষজনক হয়। লেঃ গভর্নর উইলিয়াম গ্রে মাদ্রাসার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য ভারত সরকারের কাছে ফাইল প্রেরণ করেন। ভারত সরকার লেঃ গভর্নরের মতামত অনুমোদন করেন এবং ১৮৭১ সালের ২৪ শে মার্চ, একটি ম্যানেজিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই নব নির্বাচিত কমিটি ১৮৭১ সালের ১৫ ই এপ্রিল আলিয়া মাদ্রাসা ভবনে প্রথম বৈঠকে মিলিত হয়। সেই বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটির সভাপতি হিসাবে জাস্টিস নরম্যান মনোনীত করা হয়। উক্ত কমিটি নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেশ কিছু বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করে। উক্ত রিপোর্টের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নিম্নরূপ :
১. মাদ্রাসার আরবি বিভাগের নাম আগামীতে ‘এংলো এরাবিক ডিপার্টমেন্ট’ নামে অভিহিত হবে
২. আরবি বিভাগের জামাতে হাস্তমে (অষ্টম মান ক্লাস)ভর্তির জন্যে প্রার্থীদের আরবি হরফ, নাহুর প্রাথমিক জ্ঞানসহ সামান্য ফার্সি পড়ার দক্ষতা এবং পর্যাপ্ত উর্দু জানা অপরিহার্য থাকবে
৩. বিভিন্ন ক্লাসে ছাত্রদের বয়স সীমা নিম্নরুপ হবে–
* হাস্তম জামাতঃ (অষ্টম ক্লাস) ১৩-১৫ বছর
* হাপ্তম জামাতঃ ১৪-১৬
* শশম জামাতঃ ১৫-১৭
* পাঞ্জম জামাতঃ ১৫-১৮
* চাহারাম জামাতঃ ১৫-১৯
* ছুয়াম জামাতঃ ১৫-২০
* দুয়াম জামাতঃ ১৫-২১
* উলা জামাতঃ ১৫-২২
৪. পাঠ্যপুস্তক হবে নিম্নরূপ–
* জঙ্গে ছরফ, ফসুলে আকবারি,
* জঙ্গে নাহু, হেদায়াতুন নাহু, কাফিয়া, শরহে জামি
* মিজান মান্তেক, শরহে তাহজিব, কিবতী, ছুল্লামুল উলুম
* বালাগাত, মুখতাসারুল মায়ানি, মোল্লা
* শরহে বেকায়াহ (তাহারাত, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জ, নেকাহ, রিদা’, তালাক, ইমান, মাফকুদ, শারাকাহ্‌, ওয়াকফ অধ্যায়), হেদায়াহ (বুয়ু, ইকরার, হেবা, ইজারাহ, জাবায়েহ, উযহিয়াহ, আশরিবাহ, ওহায়া অধ্যায়)
* নুরুল আনওয়ার, তাওজিহ, মুসাল্লামুস সুবুত
* নাফহাতুল ইয়ামেন, আল আজাবুল আজায়িব, ছাবয়া মুয়াল্লাকাত, মাকামাতে হারিরি, দিওয়ানে মুতানাব্বি
* তারিখুল ‍খুলাফা
* শিফা কাজি আয়াজ, শরিফা (ফারায়েজ) আখলাকে মোহসেনি, জোলায়খা, সেকান্দার নামা ও আবুল ফজল
৫. উপরের দুইটি ক্লাসে ন্যুনতম সাপ্তাহে দুই ঘণ্টা দেওয়ানী ও ফৌজদারি সম্পর্কিত নির্বাচিত ধারাবলী সম্পর্কে উর্দু অথাব বাংলায় লেকচার দেওয়ার বন্দোবস্ত করা উচিত।
৬. প্রতি ক্লাসে পরীক্ষার পুর্ণমান থাকবে ৬০০ নম্বর এবং সেটা বিভক্ত হবে এইভাবেঃ আরবী ৩০০, ইংরেজি ২০০ ও অন্যান্য ১০০
৭. আরবী বিভাগের ছাত্ররা উলা পাস করার পর, এংলো পার্সিয়ান বিভাগে দুই-এক বছর পড়ার বিষয়ে অনুমতি লাভ করবে
৮. এংলো পার্সিয়ান বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এন্ট্রান্স ক্লাস পর্যন্ত পড়ার সুযোগ থাকবে

রিপোর্ট সম্পর্কে জনশিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টরের মতামতের অংশ বিশেষ ছিল এই– ‘… মাদ্রাসার রেকর্ড থেকে এই কথা প্রমাণিত যে, মাদ্রাসা সম্পর্কে এই সংস্কার আন্দোলন ১৮৫৩ সাল থেকেই উত্থাপিত হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যেকবারেই তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বর্তমানে সংস্কার সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপুর্ণ যে সত্যটি উদঘাটিত হয়েছে তা বেশ প্রণিধানযোগ্য। মুসলমানেরা এত দিনে বেশ জাগ্রত হয়েছে এবং সবকিছু বুঝতে শিখেছে। ১৮৫৩ সাল এবং ১৮৭১ সালের মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অতএব ১৮ বছর পর এই সংস্কার প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমি স্পষ্টভাবে আমার মতামত জানাতে চাই যে, মুসলমানদের বিশেষ ধরণের এই ধর্মীয় শিক্ষার বিশেষ কতগুলি বিষয়, যেমন আকাইদ, মান্তেক, ফালসাফাহকে স্কুলের শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেওয়া অনভিজ্ঞ ও আপাতঃ দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের কাছে তেমন কোন কঠিন কাজ না, কিন্তু এতে এমন কতগুলো সমস্যার উদ্ভব হবে যা কোনক্রমেই রোধ করা সম্ভব নয়। তাই আমি বলবো এই দুটি ব্যবস্থাকে একীভূত করার কোন প্রয়োজন নেই। শিক্ষার এই দুটি ধারা অপরিবর্তিতভাবে অব্যাহত থাকুক। তবে ১৮৫৩ সালে শিক্ষা কাউন্সিলের মতামত অনুযায়ী এই দুটি শিক্ষাপদ্ধতিকে আলাদা রাখতে হবে।

‘প্রথমেই এমন ধরণের শিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে যা পার্থিব প্রয়োজনের পরিপুরক। অতঃপর শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় ও এতদসংক্রান্ত তর্কশাস্ত্র, দর্শন, বালাগাত ইত্যাদির মত কঠিনতম বিষয়গুলিতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারবে।’

এই সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদিত হওয়ার পরে, মাদ্রাসার প্রত্যেক ক্লাসে নিম্নলিখিত পুস্তকাদি পাঠ্য হিসাবে অনুমোদন করা হয়–
১. উলা (প্রথম) শ্রেণীঃ মুসাল্লামুল উলুম, মুসাল্লামুস-সুবুত, শিফা (কাজি আয়েজ), হিদায়াহ (পাঁচ অধ্যায়), মাকামাতে হারিরী, মোতাওয়াল
২. দুহাম (দ্বিতীয়) শ্রেণীঃ মুতানানবী, মুখতাসারুল মা’য়ানি, তাওজিহ, মীর কুতবি, তারিখুল খোলাফা, হিদায়াহ
৩. ছুয়াম (তৃতীয়) শ্রেণীঃ নুরুল আনওয়ার, মুখতাসারুল মায়ানি, শারহে বিকায়াহ, কুতবি, ছাব’ইয়া মুয়াল্লাকাত, তারিখাল খুলাফাহ
৪. চাহারাম (চতুর্থ) শ্রেণীঃ মেরাজি, শরহে মুল্লাজামি, নুরুল আনওয়ার (প্রথম খণ্ড), আজাবুল আজায়েব, কিবতী, শরহে বিকায়াহ
৫. পাঞ্জম (পঞ্চম) শ্রেণীঃ শরহে তাহজিব, শরহে মোয়াল্লা, আনওয়ারে সোহায়লী
৬. শশম (ছষ্ঠ) শ্রেণীঃ কাফিয়াহ, মিজান (মানতিক), ফসুলে আকবারি, নাফহাতুল ইয়ামেন, আখলাকে মুহসেনী
৭. হাপ্তমঃ হেদায়েতুন নাহু, ফসুলে আকবারি, নাফহাতুল ইয়ামেন, শরহে মিয়াতে আমেল, গুলিস্তান (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৯১-১১০)

ভারত সরকারের বিশেষ সার্কুলার

‘১৮৭১ সালে ভারতীয় মুসলমানদের শিক্ষা প্রসঙ্গ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবার সমস্যার সূত্রপাত করে। অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষা প্রতি মুসলমানদের অমনোযোগিতা আবার প্রকট আকার ধারণ করে। যার ফলে মুসলমানগণ সরকারী চাকুরি হতে বঞ্চিত হতে লাগল। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ডাব্লিও হান্টার তার গ্রন্থে লেখেন– ‘… জানি না কেন মুসলমানদের জন্য সরকারী এবং উচ্চ পদস্থ চাকুরীর দ্বার বন্ধ হয়ে আছে। আসলে মুসলমানদের মেধাশক্তির কোন দৈন্য নাই… আমাদের শাসনামলের পঁচাত্তরটি বছর, আমরা (ইংরেজরা) মুসলমানদের বিধানের অনুসরণ করেছি এবং তাদের শিক্ষা অনুযায়ী আমরা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কর্মী সৃষ্টি করেছি। কিন্তু এর পর আমরা একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা পত্তন করি এবং এক সম্প্রদায় (হিন্দুরা) যখন আমাদের শিক্ষাকে বরণ করে নিল অপর সম্প্রদায় (মুসলমানগণ) মনে করল প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা অবদমিত করেছি। যার ফলে জীবিকার ক্ষেত্রে মুসলমানরা সকল দ্বারে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে…।’

প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা প্রকাশ করে বলা হয়–‘এটা বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এই দেশের এমন একটি বিরাট সম্প্রদায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অনীহা প্রকাশ করে আছে। অথচ তাদের কাছে নিজস্ব সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতির বিরাট সম্ভাব রয়েছে। এবং এক বিশেষ শ্রেণী এই সব পৌরাণিক শিক্ষায় নিয়োজিত থেকে উপকৃত হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাকে বর্জন করে তারা নৈতিক ও সামাজিক উন্নতি হতে বঞ্চিত রয়েছে। অথচ তাদের পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায় এই শিক্ষাকে গ্রহণ করে উপকৃত হচ্ছে। গভর্নর জেনারেল আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন যে, বর্তমানে স্থানীয় ভাষায় যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে মুসলমানেরা তাতে উপকৃত হচ্ছে না। এমতাবস্থায় এই শিক্ষার সাথে যদি আরবী ও ফার্সি সুশৃংখল পদ্ধিতে প্রবর্তন করা হয় তাহলে মুসলমানদের কাছে সেটা গ্রহণীয় তো হবেই উপরন্তু তারা এর প্রতি সহযোগিতা প্রদর্শন করবেন। (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ১১১-১১২)

বাংলা সরকারের নতুন শিক্ষানীতি

ভারত সরকারের নির্দেশক্রমে বাংলা সরকার একটি নতুন শিক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করে। সেই রিপোর্ট সম্পর্কে তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক মন্তব্য করে বলেন–‘রিপোর্টের সর্বত্রই একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলমানদের আকৃষ্ট করতে পারে নি এবং মুসলমান যুবকরা সত্যিকার শিক্ষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করে নিজেদেরকে যথার্থ উপযুক্ত করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। রিপোর্টে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, সরকার দেশে যে শিক্ষা প্রবর্তন করতে সচেষষ্ট, মুসলমানগণ সেই ব্যাপারে তেমন বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন না, অবশ্য বর্তমান শিক্ষা মাধ্যমে ও পদ্ধতি সম্পর্কে তারা বিরোধিতা করেন। তাদের এই বিরোধিতার পিছনে তাদের পুরনো সংস্কার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কারণও বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বল পদ্ধতি তাদের এই অমনোযোগিতাকে দিন দিন বৃদ্ধি করেছে। উদাহরণস্বরূপ শিক্ষামাধ্যম হিসাবে যে ভাষার প্রবর্তন করা হয়েছে, মুসলমানগণ তাতে মোটেই সম্মত নন। কিন্তু এই ত্রুটিপুর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা এমন কোন জটিল ব্যাপার নয় যে, এর একটি সুচিন্তিত সমাধান করা যেতে পারে না।

‘এই ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, ১৮৭১ সালে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, স্কুলগুলিতে আরবি ও ফার্সি প্রবর্তন করা হবে। প্রয়োজন বশত মুসলমানরা স্কুলে এই উভয় ধরণের শিক্ষার সংস্পর্ষ লাভ করতে পারবে। মাদ্রাসা শিক্ষারও পুনর্বিন্যাস সাধন করতে হবে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ও এই মর্মে রাজি হয়েছে যে, ডিগ্রী পর্যায়ের পরীক্ষাগুলিতে আরবী ও ফার্সি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। গভর্নর জেনারেল ইসলামী সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলিতে চালু করার পক্ষপাতী। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যে মুসলমানদের গ্রন্থাবলী শিক্ষার বিষয়ভুক্ত করার জন্যে গ্রন্থাবলী প্রণয়ন তৎপরতা শুরু করতে হবে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ১২৩-১২৫)

১৮৮২ সালের শিক্ষা কমিশন

১৮৮২ আল্ব লর্ড রিপন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শিক্ষা কমিশনের পত্তন করেন। এই কমিশন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সামগ্রিক শিক্ষা, বিশেষভাবে মুসলমানদের শিক্ষা পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যালোচনা করবেন। ডাব্লু ডাব্লু হান্টারকে এই কমিশনের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। কমিশন বাংলাদেশের শিক্ষা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্যে এ ডাব্লু ক্রাফট এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটি এই দেশের শিক্ষা প্রসঙ্গে দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তারা ছিলেন নওয়াব আব্দুল লতিফ খান বাহাদুর ও সৈয়দ আমীর আলী।’

আমাদের এই অঞ্চলের সামগ্রিক শিক্ষা অবস্থা নিয়ে তাদের কাছে মতামত জানতে চাওয়া হয়। তারা এই অঞ্চলের মক্তব শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, মুসলমানদের মাতৃভাষা, শিক্ষা মাধ্যম, শিক্ষা উন্নয়নের নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের মতামত পেশ করেন।

‘তাদের উভয়ের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে, বাংলা সরকার এই মর্মে চিন্তা করলেন যে, মুসলমান ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষার জন্য আলিয়া মাদ্রাসাতেই যদি কলেজ চালু করা হয় তাহলে স্বল্প বেতনের মাধ্যমেই ছাত্ররা সহজে কলেজের শিক্ষা লাভ করতে পারবে। এই উত্থাপিত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৮৮৪ সালে এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এংলো পার্সিয়ান বিভাগকে উন্নত করে সেকেন্ড গ্রেড কলেজে রুপান্তরিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এই কলেজ প্রবর্তন করতে এমন কতগুলি অপ্রতিরোধ্য অসুবিধা দেখা দিল যে, অবশেষে সরকার তার সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হল। অতঃপর এই ব্যাপারে নতুন ইশতেহার প্রকাশ করা হল যে, আলিয়া মাদ্রাসাকে প্রেসিডেন্সী কলেজে রূপান্তরিত করতে হবে এবং আগামীতে আর মাদ্রাসাতে কলেজের মানের শিক্ষা প্রদান করা হবে না। অবশ্য মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য এতটুকু সুবিধা দেওয়া হবে যে, মাদ্রাসার ছাত্র হিসাবে তারা চিহ্নিত হবে এবং মাদ্রাসায় যে ধরণের নামেমাত্র বেতনে লেখাপড়া করত, প্রেসিডেন্সী কলেজেও তারা এতটুকু সুবিধা ভোগ করবে। উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পর, এই নিয়ম ১৯০৮ সাল আবধি বলবৎ ছিল। কেননা, এই বছরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসাকে একটি প্রচলিত কলেজ হিসাবে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে অসম্মতি জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মাদ্রাসা কলেজের শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ নয় মনে করেন। এই জন্য ১৯০৯ সালে মাদ্রাসার কলেজ বিভাগ চিরতরে বন্ধ করে দিতে হল। অবশ্য সরকার শেষাবধি মাদ্রাসার জন্য এতটুকু সুবিধা রাখেন যে, পুর্বেকার নিয়ম অনুযায়ী মাদ্রাসার ৩৫ জন ছাত্র প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হয়ে মাদ্রাসার মতো স্বল্প বেতন ইত্যাদি সুযোগ ভোগ করতে পারবে।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ১২৮-১৪৭)

মাদ্রাসা সংস্কারের নতুন উদ্যোগ, ১৯০৩ সাল

‘১৯০৩ সালে মুসলমানগণ সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। সেই প্রস্তাবের মোদ্দা কথা ছিল যে, মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে এবং একটি বিশেষ মান অবধি শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা বিষয় সকলের জন্য সমমানের করতে হবে। এই মানের পর থেকে শিক্ষার দুইটি শাখা প্রবর্তিত হবে। তার মধ্যে একটি ইংরেজি শিক্ষা জন্য, যেখানে ইংরেজি ও প্রাচ্য উভয় বিষয়ের শিক্ষা থাকবে। এই বিভাগের জন্যে আলিয়া মাদ্রাসার এংলো পার্সিয়ান বিভাগকে নিয়োজিত করতে হবে। দ্বিতীয় বিভাগটি থাকবে আরবি শিক্ষার জন্য। এই বিভাগ শুধু প্রাচ্য ভাষাদি বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি প্রাধান্য দিবে। কিন্তু সরকার এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে করলেন না। কারণ সরকার মনে করলেন যে, ইংরেজি শিক্ষার জন্য যত বেশী সময় ব্যয় হবে, ততই প্রাচ্য শিক্ষার বেলায় সময়ের ঘাটতি আসবে। ফলে প্রাচ্য শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে কমে আসবে এবং শিক্ষা গ্রহণের আসল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। ফলে এই ধরণের ছাত্ররা ইংরেজি বা আরবি কোনটাতেই পুরাপুরি ব্যুৎপত্তি লাভ করতে পারবে না। এই প্রস্তাবের বদলে অপর একটি প্রস্তাব পেশ করা হল যে, আরবী বিভাগের যেসব ছাত্র ইংরেজি শিক্ষা লাভ করতে চায়, তাদেরকে আগেই আরবী বিভাগের পড়া শেষ করে যথা নিয়মে এংলো পার্সিয়ান বিভাগে ভর্তি হতে হবে, পক্ষান্তরে এংলো পার্সিয়ান বিভাগের যেসব ছাত্র আরবী শিখতে ইচ্ছুক তাদেরকে এই বিভাগের পড়া সম্পন্ন করে অতঃপর যথানিয়মে আরবী বিভাগে ভর্তি হতে হবে।

‘এর কিছুদিন পর, এদেশীয় শিক্ষার পক্ষপাতী একদল লোক আবার একটি অভিনব প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে বলা হয় যে, মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষার মানকে আরো এতখানি উন্নত করা হোক যে, এখানে শিক্ষা লাভের পর, বাংলাদেশের ছাত্রদেরকে আর যেন কোথাও যেতে না হয়। কারণে সেই সময়ে কলিকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভের পরে, বহু ছাত্র ইলমে হাদিস ও তাফসীরের আরো ব্যাপক অধ্যয়নের জন্য পাক-ভারতের অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রে গমন করতেন। এই প্রস্তাবের ফলশ্রুতি হিসাবে সরকার হাদীস, তাফসীর, ইতিহাস ও ভূগোলকে সিলেবাসভুক্ত করেন।’ (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ১৫৬-১৫৭)