ক্ষতির অন্ত নেই: হুমকির মুখে ধর্মীয় প্রকাশনা

রাকিবুল হাসান:

সারাবছর ইসলামি প্রকাশনীগুলোর বই বিক্রি ও প্রকাশ হলেও এর মূল মৌসুম—রমজান, শাওয়াল এবং জিলহজ। এই তিনটি মাস প্রকাশনীগুলোতে চলে তুমুল ব্যস্ততা। পাঠক ও ক্রেতাদের ভীড়। কিন্তু এবার করোনা সঙ্কটের কারণে সব থমকে গেছে। বদলে গেছে ইসলামি প্রকাশনীগুলোর পথচলার গ্রাফ ও মানচিত্র। বন্ধ হয়ে আছে কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাও। প্রকাশনা সংশ্লিষ্টগণ বলছেন, করোনা সঙ্কট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ক্ষতির পাল্লাটা তত ভারী হচ্ছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হবে অনেকদিন।

প্রকাশ করা যাচ্ছে না বই

কথা হয় মাকতাবাতুল আসলাফের কর্ণধার আবদুর রহমান মুআযের সঙ্গে। করোনার কারণে কতটুকু পিছিয়ে গেলেন—জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘রমজানে আমাদের তিনটি বই প্রকাশের কথা ছিলো। প্রোডাক্টিভ রামাদান, নবিজির সাথে রমাদান এবং যিকিরে ফিকিরে কুরআন। কিন্তু একটা বইও প্রকাশ করতে পারিনি। গত দুই মাসে আরও কয়েকটি বই আসার কথা ছিল। সব পিছিয়ে গেছে। দেশ লকডাউন, প্রোডাকশন বন্ধ, বিক্রি বন্ধ। কর্মচারীদের বেতনও বন্ধ। এক দমবন্ধ সময় কাটাচ্ছি।’

মাকতাবাতুল হাসানের পরিচালক রাকিবুল হাসান বললেন, ‘এপ্রিলে আমাদের ‘ইসলামি ইতিহাস’ নামের বিশাল বইটি বাজারে আসার কথা ছিল। দুই বছর ধরে বইটির কাজ করছি। কিন্তু করোনা এবং লকডাউনের কারণে সব আটকে আছে।’

পড় প্রকাশের স্বত্বাধিকারী আদি হাবিবুল্লাহও বললেন একই কথা। তার গলার স্বরেও খানিক আর্দ্রতা। তিনি বললেন, ‘প্রতি মাসে একটি বই প্রকাশের প্লান আমাদের। হিসেব অনুযায়ী এপ্রিলে প্রকাশ হতো আবদুর রশিদ তারাপাশির ‘গেরিলা ফাইটার’ এবং রমজানে প্রকাশ হতো ‘জুনায়েদ বাগদাদীর জীবন ও দর্শন’। কিন্তু একটা বইও প্রকাশ করতে পারিনি। সব থেমে আছে।’

ক্ষতির পাল্লা কত ভারী?

নিত্য প্রয়োজনগুলো যখন পূরণ করা যাচ্ছে না, তখন বই কেনার কথা বলা বাহুল্যই। রমজানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে বড় একটি মেলা হয়। এই মেলার দিকেই চোখ ছিল সব ইসলামি প্রকাশনীগুলোর। মেলাকে সামনে রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সবাই। কিন্তু করোনার কারণে মেলা না হওয়ায় আাশা ভেঙেছে তাদের।

মাকতাবাতুল আসলাফের কর্ণধার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমরা সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলাম রমজানের এই বইমেলার জন্য। কিন্তু সব হিসেব উলটে গেলো। করোনার কারণে সব থমকে গেলো। এটা আমাদের ইসলামি প্রকাশনীগুলোর জন্য বড় ধাক্কা। আমরা যারা দুএকবছর হলো প্রকাশনা জগতে এসেছি, তারা দিন আনি দিন খাই অবস্থা। কয়েকমাসের ভর্তুকি দেবার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই। বই বিক্রি ও প্রকাশ না হলে সব আটকে থাকে।’

পড় প্রকাশের স্বত্বাধিকারী আক্ষেপ করে বললেন, ‘মার খাচ্ছে ইসলামি প্রকাশনীগুলো। কারণ তাদের মৌসুম রমজান, শাওয়াল। রমজানের মেলার দিকে তাকিয়ে ছিলাম সবাই। কিন্তু মেলা হয়নি। এটা বিরাট ক্ষতি আমাদের। পক্ষান্তরে জেনারেল প্রকাশনীগুলোর তেমন ক্ষতি ততটা ভারী নয়। কারণ তারা ফেব্রুয়ারীতে মেলা করতে পেরেছে। মেলার পর এমনিতেই গা ছাড়া দিয়ে দুতিনমাস তাদের চলে যায়।’

মাকতাবাতুল হাসানের পরিচালক বললেন, ‘রমজানে মেলা হয়নি। কবে মেলা হবে তাও অনিশ্চিত।’

অনলাইন শপ, বিকল্প পরিকল্পনা

তবে ক্ষতির পাল্লাটা হালকা করতে অফলাইনের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে সবাই মনোযোগী হচ্ছেন অনলাইনে। সংশ্লিষ্টগণ স্বীকারও করছেন, এখন যতটুকু বই বিক্রি হচ্ছে, তা অনলাইনেই।

মাকতাবাতুল আসলাফের কর্ণধার বললেন, ‘অফলাইনের চেয়ে এখন অনলাইনেই জোর দিতে হবে।। আমরা তা দিচ্ছিও। এই সময়ে সবাই সবার পাশে দাঁড়াতে হবে। অনালইনে বইয়ের প্রচার করতে হবে। দোকানে এসে দেখে দেখে বই কিনতে পারছে না মানুষ। তাদের জানানোর জন্য পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং শুভানুধ্যায়ীদের বই প্রচারে অংশ নিতে হবে।’

মাকতাবাতুল হাসানের পরিচালক বললেন, ‘অনলাইন শপগুলোতে বই বিক্রি শুরু হয়েছে। আবার বিভিন্ন অ্যাপেও বইয়ের সফট কপি কেনা যায় এখন। দোকান ঘুরে বই কিনতে না পারলেও ওখান থেকে কেনা যাচ্ছে। তবে কাগজের বইয়ের ওপর চাপ পড়ে গেলো। অর্থনৈতিক ক্ষতি সবারই হচ্ছে। তবে কে কতটুকু স্মার্টলি হ্যান্ডেল করতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করবে সবকিছু।’

তিনি আরও বললেন, ‘সবচে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে পাঠ্যপুস্তক বিক্রয় প্রকাশনীগুলো। সৃজনশীল প্রকাশনীগুলো দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। তাদের বই অনলাইন শপেও বিক্রি হয়। তারা সঙ্কট কাটাতে পারবে, তবে যার যার কৌশলের ওপর নির্ভর করবে সবকিছু।’

খুলছে দোকান, নেই ক্রেতা

দীর্ঘ দু মাসের লকডাউন শেষে ৩১ মে সীমিত আকারে খুলেছে দোকান-পাট, মার্কেট, ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান। খুলেছে বাংলাবাজারের ৯০ শতাংশ ইসলামি প্রকাশনী। কিন্তু দোকান খুললেও নেই ক্রেতা।

পড় প্রকাশের স্বত্বাধিকারী বললেন, ‘দোকান খুলেছি, কিন্তু ক্রেতা নেই। এখনো স্কুল-কলেজ খুলেনি। মানুষও যতটুকু সম্ভব ঘরে থাকছে। ফলে বই কিনতেও আসছে না কেউ। বই প্রকাশ করবো। কাগজ কিনে রেখেছি, পান্ডুলিপি প্রস্তুত। কিন্তু এখনো সচল হয়নি প্রেস, বাঁধাইয়ের দোকান।’

মাকতাবাতুল আসলাফের কর্ণধার বললেন, আগে পার ডে বিক্রি হতো ২০ হাজার টাকার ওপর। এখন দোকান খুলেছি। বিক্রি দৈনিক মাত্র ১ হাজার, বারোশ। পুরো মাসের বিক্রির টাকা দিয়ে তো একজন কর্মচারীর বেতনও হবে না।’

-এ