ঢাকায় যেভাবে গৃহকর্মীরা নিগৃহীত হচ্ছেন

মুসান্না মেহবুব

রাজধানী ঢাকায় গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা কদিন পরপরই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কয়েকদিন এ নিয়ে হইচইয়ের পর আবার স্তিমিত হয়ে আসে আলোচনা।

সম্প্রতি রাজধানীর কাকরাইলে মানবাধিকারকর্মী পরিচয় দানকারী এক মহিলার বাসার দশম তলার কার্নিশ থেকে তাঁর কিশোরী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গৃহকর্ত্রীর ভয়ে পুলিশের কাছে মেয়েটি কোনো অভিযোগ না করলেও তার গায়ে বিভিন্ন ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এর কিছুদিন আগে রাজধানীর আদাবরেও গৃককর্মী নির্যাতনের একটি ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। পুলিশ এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছিল।

তার কিছুদিন আগে মিরপুরের এমন একটি ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে এসেছিল।

কিছুদিন পরপর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া গৃহকর্মী নির্যাতনের এমন ঘটনা কেবল রাজধানীতে নয়, দেশের অন্যান্য শহরগুলোতেও ঘটে থাকে। খবরের বাইরে থাকে আরও অসংখ্য নির্যাতনের চিত্র।

কিন্তু এসব ঘটনায় একদিকে যেমন সুষ্ঠু বিচার পায় না নির্যাতিতরা, অপরদিকে নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হলেও আইনি মারপ্যাঁচে ছাড়া পেয়ে যান দোষীরা।

এসব নির্যাতনের পরিসংখ্যান এবং এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের কাজও ধারাবাহিক নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটা জরিপে দেখা গেছে আড়াই বছরে ১৪৯ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে নির্যাতনের পর হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮৬টি। কিন্তু সংস্থাটির তথ্য বলছে, ১৪৯ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হলেও থানায় মামলা হয় ৬২টির।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫০ জন গৃহকর্মী, ধর্ষণ করা হয়েছে ১২ জনকে, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২ জনকে, নির্যাতনে পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন এবং শারীরিক নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।

সাম্প্রতিক কয়েক বছরে গৃহকর্মী হিসেবে শিশুদের নিয়োগ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এই কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার দাবি জানান মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রকল্প পরিচালক (শিশু নিরাপত্তা) রাফিজা শাহীন বলেন, ‘গৃহকর্মী শিশুকে কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয় নাই। গবেষণা নয়, আমরা সাদা চোখেই দেখতে পারি যে ওই কাজটি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক শিশু জীবনও হারাচ্ছে। কোন গৃহকর্মী যদি নির্যাতিত হয় তাহলে সে যে কোথাও রিপোর্ট করবে তেমন কোন সিস্টেম কিন্তু বাংলাদেশে নাই।’

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অপরাধের বিচার বা শাস্তির উদাহরণের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এছাড়া ফৌজদারি আইনে অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের আইনে মামলাগুলো হওয়ায় শাস্তি ও আইনি প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হয়।

হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম বলেন, ‘শিশু গৃহকর্মীদের রক্ষায় সরকার কিন্তু কোন আইন করতে পারেনি। আর যদি মেরে ফেলা হয় বা আঘাত করা হয় সেক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অথবা দণ্ডবিধি আইনে মামলা হয়ে যাচ্ছে। মামলা হওয়ার পর সেটির তদন্তে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রকল্প পরিচালক (শিশু নিরাপত্তা) রাফিজা শাহীন বলেন, ‘যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাহলে গৃহকর্মীর বয়স কত হবে সেটি সরকারকে আইন করে নির্ধারণ করে দিতে হবে। এছাড়া একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটা জায়গায় রিপোর্ট করতে পারবে যে সে ভালো আছে।’

এছাড়া শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ বন্ধে বিভিন্ন ঘটনায় আদালতের দেয়া অবজারভেশনগুলো আমলে নিয়ে আইন পরিবর্তনেও আহ্বান জানান তারা।