তাবলীগ সম্পর্কে আল্লামা তকি উছমানির কয়েকটি মন্তব্য

সবকিছু বাদ দিয়ে একক পথ-পন্থা অবলম্বন করা দ্বীনের দাবীও না,  তাবলীগের মহান মনীষীদের কারো শিক্ষাও না৷ তাদের কেউই এমন তালিম দেননি৷ বরং এর বিপরীত বক্তব্যই আমি শুনেছি৷

কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, লেখাপড়া ছাড়া চিন্তা-ভাবনা না করে অনেকে জিম্মাদার হয়ে যাচ্ছেন, তারা না আবার দুনিয়াবাসীকে গোমারাহ করে দেন!আল্লাহর ওয়াস্তে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝুন৷ আর কেউ এখলাসের সাথে সংশোধন চাইলে, ভুল ধরিয়ে দিলে তাকে নিজের দুশমন ভাববেন না৷ তাকে নিজের বিরোধী মনে করবেন না৷

আমি পূর্ব থেকেই বলে আসছি, আলহামদুলিল্লাহ! এই (তাবলীগ) জামাতের মাধ্যমে উম্মতের যতোটা ফায়দা হয়েছে তা অন্য কোন জামাতের মাধ্যমে হয়নি৷ এটা হযরত ইলিয়াস রহ. এর অন্তরের আগুন৷ যার নূর-আভা পুরো দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে৷

কিন্তু এর মানে কি এটা যে, তাবলীগ জামাতের সকল ব্যক্তি মাসুম আনিল খতা-ভুলের উর্ধ্বে ? তাদের দ্বারা কোন ভুল হতেই পারে না! এবং তাদের ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধনও করে দেয়া যাবে না! আর যখন কেউ কোনো ভুল ধরিয়ে দেয়, তখন সে তাবলীগ-বিরোধী হয়ে যায়? আল্লাহর ওয়াস্তে এমন ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করুন৷ এমন চিন্তা আপনাদের এক ভিন্ন ফেরকায় রুপান্তরিত করবে এবং উম্মতে মুসলিমাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে৷

আর বিশেষত যারা উলামায়ে কেরাম রয়েছেন তাদের উচিত, এমন চিন্তাচেতনা-মতাদর্শের মুলোৎপাটন করে সকলকে মধ্যপন্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা৷

হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. যখন আমার সম্মানিত পিতা মুফতি শফি রহ.-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করতে আসলেন তখন তিনি অঝোরে কেঁদে ফেলে বলেন, আলহামদু লিল্লাহ! (তাবলীগ) জামাতের কাজ পৃথীবির নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে৷ কিন্তু হজরত আমার তো খুব ভয় হচ্ছে যে এটা ‘এস্তেদরাজ’ (গোমরাহি বা গোনাহের পথে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঢিল দেয়া) না হয়ে যায়! এর থেকে আল্লাহর পানাহ চাই৷

ইলিয়াস রহ. এমনটিই মনে করছিলেন৷ তখন আমার পিতাজি রহ. তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, না, এটা এস্তেদরাজ নয়৷

তিনি বললেন, দলিল কী এটার? উত্তরে হজরত শফি রহ. বলেন, যার থেকে এস্তেদরাজ প্রকাশিত হয় তার বিন্দুমাত্রও অনুভব হয় না যে, এটা এস্তেদরাজ৷ আপনি যেহেতু ভয় অনুভব করছেন তাই এটা এস্তেদরাজ নয়৷ ইলিয়াস রহ. এই কথায় খুব আশ্বস্ত হলেন৷

এরপর তিনি বললেন, হজরত! ধীরে ধীরে এই জামাত (জামাতের নেতৃত্ব) আওয়াম-সাধারণদের হাতে চলে যাচ্ছে৷ আমার তো ভয় হয়, পরবর্তীতে এরা গুলু তথা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত না হয়ে যায়! তো হজরতের সেই আশংকা বাস্তবের দিকে হচ্ছে৷

অনেকের মধ্যে সহিহ ইলম নেই, আবার ছোট ছোট কোনো কথা যদিও তা এখলাস ও মুহাব্বত-শফকতের সাথেই বলা হোক না কেনো- তাৎক্ষণিক ওই ব্যক্তিকে বিরোধিতাকারী বলে সাব্যস্ত করা হয়৷ বলে বেড়ানো হয় ওমুকে (তাবলীগ) বিরোধী৷ দোহাই আল্লাহর! এ ধরনের কাজ থেকে নিজে বিরত থাকুন অন্যকেও বিরত রাখুন৷

এখন আপনাদের (আমার নিজের সাথে ঘটে যাওয়া) একটি ঘটনা বলছি…

আমাদের এখানে প্রতি রবিবার মজলিশ হয়৷ আগে জুমার দিন হতো৷ আমাদের নাজেম সালমান মাহমুদ সাহেব করতেন৷ তিনি একবার আমাকে লাসবেলা চক করাচির মসজিদে নোমান-এ বিষয়টি ঘোষণা করে দেয়ার জন্য বললেন৷ তার নির্দেশ ছিলো তাই জুমার পরে ঘোষণা করলাম৷ ঘোষণার পরে মহল্লার কিছুসংখক তাবলীগি সাথীরা এসে আমার কাছে আবেদন করলো মজলিশ যেনো জুমার দিন না করা হয়৷

আমি বললাম, কেনো?

তারা বললো, ওই দিন আমাদের ‘গাশত’ হয়৷ আমি বললাম, তাহলে মজলিশ আমরা এমন সময় করে নেবো যাতে সাংঘর্ষিক না হয়৷ এটাও তো গুরুত্বপূর্ণ কাজ! মাগরিব ও এশার পরে গাশত হয়৷ সুতরাং বয়ান আমরা আসরের পরে করে নেবো৷

তিনি বললেন, তাহলে তো যারা আপনাদের বয়ানে আসবে তারা আমাদের গাশতে আসবে না৷
আমি বললাম, এমনটা তো হতেই পারে৷ এখানে তো খারাবি-মন্দের কিছু দেখছি না! আমরাও তো তাবলীগ করছি৷ একথা শুনতেই তার মুখ থকে বেরিয়ে এলো, ‘আপনি তো দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন… আপনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।’

এখন আপনারাই বলুন, কেবল ‘গাশত’ করা-ই দ্বীন? আর এখানে (মজলিসে) কুরআন-হাদিস শেখানো হচ্ছে, কুরআনের তাফসির করে মানুষকে শোনানো হচ্ছে, এগুলো দীন নয়!?

আমি বলবো, এগুলোই হচ্ছে গুলু-বাড়িবাড়ি৷ যা আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে৷ আর এসব কথা আলোচনা করা হলে অনেকে রেগে যান৷ (আর বলতে থাকেন) আমরা তাদের বিরোধিতা করছি৷

আল্লাহ’র ওয়াস্তে এমন সব মানসিকতা পরিত্যাগ করুন৷ অন্যথায়  এটা কাজের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দেবে৷ কাজের মধ্যে ক্ষতি সাধন করবে৷ এর মধ্যে দ্বীনের কোনো ফায়দা নেই৷

(অবস্থা এমন যে) এই কাজ (তাবলীগ করা) বিশেষ কাজে পরিণত হয়ে গেছে৷ এই কাজ করবেন তো সব ঠিক আছে৷ এর বাইরে দ্বীনের যেসব কাজ আছে তার যেনো কোনো হাকিকত-বাস্তবতা-অস্তিত্ব নেই, কোনও গুরুত্ব নেই! আল্লাহ পাক আমাদের গুলু থেকে, অতিরঞ্জন-অতি সংকোচন থেকে, সব ধরণের ফেৎনা থেকে হেফাজত করুন!

আমি আবরো বলছি, তাবলীগ জামাতের কাজ এটা মকবুল-ভালো কাজ৷ আপনাদের সাধ্যমতো অংশগ্রহণের আহ্বান করছি৷ যতোটা সম্ভব বেশির থেকে বেশি এখানে সময় লাগান৷ এতে নিজেরও ফায়দা, উম্মতেরও ফায়দা৷ কিন্তু ওই ধরনের হামাকত-আহাম্মকি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন, বিরত রাখুন৷

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদরিয়াদের সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সম্পর্কে আগ্রহী বাংলাদেশ
পরবর্তি সংবাদট্রাক উল্টে ভারতে ১৯ জন নিহত