তুরস্কে ইসলামপন্থীদের মধ্যে সম্পর্ক

প্রথমেই একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। আর তা হল বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে তুরস্কের ইসলামপন্থী দলগুলোর একটা সুস্পষ্ট প্রার্থক্য বিদ্যমান, আর তা হল আমাদের দেশের ইসলামপন্থী দলগুলো বেসিকালি দুটো কাজ করে। এক: লোক তৈরী, দুই: ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি কিংবা নির্বাচন কেন্দ্রীক কাজ। আর তুরস্কের ইসলাম দলগুলো শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করে অর্থাৎ লোক তৈরীর কাজগুলো তারা দলীয়ভাবে করে না (এটা হয়তো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য, রাজনৈতিক দল ধর্মীয় কাজ করতে পারবে না এমন ধারা সেখানে রয়েছে)। এক্ষেত্রে এখানে লোক তৈরীর কাজ করে দল সমর্থিত সিভিল সোসাইটি তথা ফাউন্ডেশন ও নানা সংগঠনগুলো (ভাকফি/ দেয়ারনেক)। এ ধরনের সংগঠন তুরস্কে প্রচুর রয়েছে। একে পার্টির এরকম উল্লেখযোগ্য সংগঠনগুলোর মধ্যে- তুর্কি ইয়ুথ ফাউন্ডেশন তথা তুগভা (http://tugva.org/), ইলিম ইয়াইমা ভাকফি/ জামায়াত (https://www.iyv.org.tr/), আনসার ফাউন্ডেশন/ এনসার ভাকফি (http://www.ensar.org), ভিরলিক ভাকফি (http://www.birlikvakfi.org.tr), ইয়েনী দুনিয়া ভাকফি (http://yenidunyavakfi.org) ইত্যাদি। সাদাত পার্টির এরকম সংগঠনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- আনাদুলু ইয়ুথ এসোসিয়েশন তথা (https://www.agd.org.tr)। রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্পর্ক যতই খারাপ থাকুন না কেন, লোক তৈরির এই সংগঠনগুলোর ইন্টারনাল সম্পর্কে খুববেশী প্রভাব পড়তে আমি দেখি নাই। তারা প্রায়শই যৌথভাবে প্রজেক্ট/ কাজ করে এবং একে অপরকে নানা কাজে সহযোগীতা করে।

এখন একটু ইতিহাসে ফিরে যাই। রাজনৈতিকভাবে তুরস্কে ইসলামী আন্দোলনের হাতেখড়ি প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের হাত ধরে সত্তরের দশকে। খেলাফত পরবর্তী আধুনিক তুরস্কে উনার পূর্বে তুরস্কে ইসলামী চেতনা ধরে রাখতে অনেক আলেমরা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী (রহ.) অন্যতম। আর রাজনৈতিকভাবে ডানপন্থী রাজনৈতিক উত্থানটা আদনান মেন্দেরেসের হাত ধরে যিনি ষাটের দশকের পুরো সময়টাতে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং আজানসহ কিছু ইসলামী চর্চা শুরু করার অনুমতি দেওয়ার অপরাধে তার সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু করা হয়েছিল এবং তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল।

ড. এরবাকান সাহেবের নেতৃত্বে গঠিত চার চারটি রাজনৈতিক দল পরপর নিষিদ্ধ হয়। সর্বশেষ ফজিলত পার্টি যখন ছিল তখন দলে দুটি গ্রুপ দেখা যায়, যার প্রথমটি গতানুগতিক ধারা আর দ্বিতীয়টি নতুন ধারা। গতানুগতিক ধারাটি আগের মতই একই পন্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন আর নতুন ধারাটি সবাইকে নিয়ে নতুনভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। দলের মুরব্বী শ্রেণীর লোকরা ছিলেন প্রথমভাগে আর তুলনামূলক যুবকরা ছিলেন দ্বিতীয়ভাগে।

উল্লেখ্য, ফাজিলত পার্টির কাউন্সিলে (২০০০ সালে) এই দুই গ্রুপ আলাদা আলাদা প্রার্থীকে সমর্থন করে। একজন ছিলেন রেজাই কুতান অপরজন ছিলেন আব্দুল্লাহ গুল। এরবাকান সাহেব ছিলেন প্রথম গ্রুপের আর এরদোয়ান সাহেব ছিলেন দ্বিতীয় গ্রুপের মূল নেতা। তারা দুজনেই তখন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার কারনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ ছিলনা। কাউন্সিলে ১০০+ ভোটের ব্যবধানে রেজাই কুতান দলীয় চেয়ারম্যান হন।

কাউন্সিলের কিছুদিন পর এই দলও সরকার কতৃক নিষিদ্ধ হলে গতানুগতিক ধারা আবারও একই পন্থায় আরেকটি দল খোলার কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু এবার নতুন ধারার লোকজন আর থেমে থাকতে চাইলেন না। তাই দুটি দলে বিভক্ত হল তুরস্কের ইসলামী দল। একটি, সাদাত পার্টি ( ২০০১ সালের ২০ জুলাই প্রতিষ্ঠা) যার চেয়ারম্যান হলেন রেজাই কুতান অপরটি একে পার্টি (২০০১ সালের ১৪ আগস্ট) যার চেয়ারম্যান হলের এরদোয়ান।

বলাই বাহুল্য, আগের দলের মুরুব্বীরা গেলেন সাদাত পার্টিতে আর তুলনামূলক ইয়াং প্রজন্ম গেলেন একে পার্টিতে। একে পার্টি তাদের দলকে সবার জন্য উন্মোক্ত ঘোষণা করলো। পাশাপাশি এরদোয়ান তার ক্যারেসমেটিক নেতৃত্বে এবং ইস্তান্বুলের মেয়র হিসেবে অভূতপূর্ব সফলতার কারনে (ইস্তান্বুল মডেল তখন জনপ্রিয় এক বাক্য ছিল) ২০০২ সালের নির্বাচনে ৩৪.৪% ভোট পেয়ে একনম্বর দলে পরিণত হল। আর সাদাত পার্টি ২.৫% ভোট পেয়ে অষ্টম দল হল (ভোট পাওয়ার দিক থেকে)। তখন তুরস্কের অবস্থা খারাপ ছিল তাই নির্বাচন পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন কোন দলই ১০% ভোট পেলনা যার ফলে সংসদে আসনও পেলনা। ১০% এর উপর ভোট শুধু একে পার্টি ও সেকুলার দল সিএইচপি/জেহেপেই পেল। যার ফলে পার্লামেন্টে আসন সংখ্যায় একে পার্টি দুই-তৃতীয়াংশের বেশী আসন পেয়ে সরকার গঠন করে ফেলল।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে তখনকার ফাজিলত পার্টির ভোট ছিল ১৫.৪% (তৃতীয় হয়েছিল) আর এরবাকান সাহেবের নেতৃত্বে তুরস্কে ইসলামপন্থী দল সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল ২১.৪% (১৯৯৫ সালের নির্বাচনে, প্রথম হয়েছিল)। এখানে যদি বিশ্লেষণ করি তবে দেখা যায় ১৯৯৯ সালের ভোটের হিসেবে, ১৫.৪% থেকে ২০০২ সালে সাদাত পার্টি ২.৫% পেলে একে পার্টি হয়তো পেয়েছিল ১২.৯%। অার বাকী ২১.৫% নতুনভাবে যোগ হয়েছে একে পার্টিতে যা এরদোয়ানের নেতৃত্ব ও ক্যারিসমার কারনে। (এ ব্যপারে বিস্তারিত পাবেন আমার লেখা এরদোয়ান : দ্যা চেঞ্জ মেকার বইতে)

ভোটের রাজনীতিতে ২০০২ সালের নির্বাচনের পর থেকে একে পার্টির ভোট ক্রমাগতই বেড়েছে যেখানে সাদাত পার্টির ভোট কমেছে। ২০০৭ সালের নির্বাচনে একে পার্টির ভোট ১২.২% বেড়ে ৪৬.৬% এ দাড়ায় যেখানে সাদাত পার্টির ভোট কিছুটা কমে ২.৩% এ নেমে আসে। এভাবে ২০১১ সালের নির্বাচনে একে পার্টি ৪৯.৮%, সাদাত পার্টি ১.৩%; ২০১৫ সালের জুনের নির্বাচনে একে পার্টি ৪১%, সাদাত পার্টি ২.২% (আরেকটি ছোট দলের সাথে জোট করে); ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে একে পার্টি ৪৯.৫%, সাদাত পার্টি ০.৭০% ভোট পায়।

আচ্ছা যাই হোক, ২০০২ সালের সেই নির্বাচন থেকে আজ পর্যন্ত একে পার্টি তুরস্কের ক্ষমতায়। এখন আসি এই দুই দলের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন। আমি যতটুকু স্টাডি করতে পেরেছি কিংবা তুরস্কের দু-দলের রাজনীতিবীদদের সাথে যতটুকু কথা বলেছি তাতে এটা স্পষ্ট যে, প্রথম দিকে সম্পর্কটা বেশ খারাপই ছিল বলতে হবে। কিন্তু নির্বাচনে একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর গত ১৫-১৬ বছরে সম্পর্কটা কখনো খুব ভালো কখনো খারাপ গেছে।

সেই খারাপের মূল কারনটা কি? কেনইবা সাদাত পার্টি একে পার্টির বিরোধীতা করে? আমার কাছে যে বিষয়টা এখানে মনে হয় তা হল রাগ, দু:খ, অভিমান….। অনেকটা এরকম যে, পরিবারের দুই ভাই। বড় ভাই সাথে ছোট ভাইয়ের সম্পর্কটা যদি কোন কারনে ভালো না থাকে এবং ছোট ভাই বেশী প্রভাবশালী হয়ে যায় তখন বড় ভাইয়ের যে অবস্থা হয় সাদাত পার্টির আসলে এ অবস্থা। কিন্তু এটাই কি বাস্তবতা নয় যে, বড় ভাই কিংবা ছোট ভাই কোন বিপদে পড়লে একে অপরকে সহায়তা করে কিংবা এগিয়ে যায়। অথবা বড় ভাইদের সন্তানদেরকে কি ছোট ভাই দেখে না! আমারতো বিশ্বাস পবিরবারের ক্ষেত্রে এমতাবস্থায় বড় ভাইয়ের সন্তান যখন ছোট ভাইয়ের কাছে যায় তখন তাকে বুকে জড়িয়ে নেয় এবং সর্বাত্মক সহায়তা করে। তুরস্কের ক্ষেত্রে আসলে এ দুটি দলের এই অবস্থা। একে পার্টি যখন সবচেয়ে বিপদে পরেছিল বিশেষ করে গেজী পার্ক মুভমেন্ট ও ১৫ জুলাই ক্যুয়ের সময় তখন সাদাত পার্টি এগিয়ে এসেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে।অাবার সাদাত পার্টি ও তার সাইড সংগঠনগুলোর কাজে সরকার হিসেবে যতটুকু সহায়তা করা যায় তা একে পার্টি করেছে বিশেষ করে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে স্পন্সরশিপ দিয়ে। সাদাত পার্টির যুবকদের চাকুরীতে সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারটিও আমার দেখা আরেকটি সহায়তার মধ্যে অন্যতম। অন্তত এতটুকু আমি বুঝতে বাকী নাই যে, সাদাত পার্টির কোন নেতা যে কোন বিষয়ে একে পার্টিকে নক করেছে আর সম্ভাব্য হেল্প তারা করেনী এটা হয়তো রেয়ার।

দুটি মজার ব্যপার এখানে শেয়ার করতে চাই।

১. এটা শোনা কথা, আমার হাতে বাস্তব কোন প্রমাণ নেই। সাদাত পার্টির লোকদের কাছে শোনা। গত নির্বাচনের পূর্বে নাকি কিছু লোক সাদাত পার্টির একসময়ের চেয়ারম্যান রেজাই কুতানের সুপারিশ নিয়ে একে পার্টির এমপি হওয়ার জন্য দলে এপ্লাই করেছিল। এরদোয়ান তাদেরকে প্রার্থী করেছেন অথবা দলে পোস্ট দিয়েছিলেন দুটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এক, রেজাই কুতানের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে তিনি না করেননী আর দুই, রেজাই কুতানের পক্ষ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত লোক অন্তত খারাপ হবে না।

২. গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ান ডানপন্থী সকল দলের অফিসে গিয়েছিলেন তার প্রচারনা ও তাদের সমর্থন লাভে। এরই অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম গিয়েছিলেন সাদাত পার্টিতে। সাক্ষাত শেষে অপেক্ষমান সাংবাদিকদেরকে সাদাত পার্টির চেয়ারম্যান বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী (এরদোয়ান তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন) আজ আমাদের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছেন যেটা উনার একসময়ের বাড়ী/ প্রথম ঠিকানা…………।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদশবে বরাতে পটকা ও আতশবাজি নিষিদ্ধ করেছে ডিএমপি
পরবর্তি সংবাদবাজারে নতুন ইলিশ