ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থা রোধে কিছু পরামর্শ

মঈনুদ্দীন খান তানভীর

সুবর্ণচর। চমৎকার একটি নাম। নোয়াখালীর প্রসিদ্ধ উপজেলা। কিন্তু চমৎকার নামটি আর চমৎকার থাকেনি এরই কিছু অধিবাসীর কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে। রাজনৈতিক হানাহানির জেরে এত ধর্ষণ দেশের অন্য কোথাও হয় কিনা, আমার জানা নেই। সুবর্ণচরের রাজনীতিকরা যেন সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন একেকটা নির্বাচনকে। আর সব বাদ দিন, কেবল দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা সাম্প্রতিক ৩টা শিরোনাম শোনাই।

১. ধানের শীষে ভোট দেয়ায় ৪ সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ। (১লা জানুয়ারী জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ )
২. সুবর্ণচরের মুহাম্মদপুর ইউনিয়নে রাজনৈতিক কারণে ধর্ষণ :গৃহবধূর আত্মহত্যা (১লা মার্চ,২০১৯। ইউনিয়ন নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ)
৩. রাজনৈতিক জেরে সুবর্ণচরে ফের ৬ সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ। (১লা এপ্রিল, ২০১৯। উপজেলা নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ)

লেখাটি যখন তৈরি করছি, তখনই খবর এলো, ফেনী এক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল যৌনাচারে ব্যর্থ হয়ে তারই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীর গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। শরীরের ৭৫ভাগ ঝলসে গিয়ে মেয়েটি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে! লেখাটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে, অভাগা সেই মেয়েটি পৃথিবীর বুকে আর বেঁচে নেই।

হিপোক্রেট নারীবাদীদের দাবি, নারীর ক্ষমতায়নের অভাবেই যৌন হয়রানি বাড়ছে। যে দেশের স্পিকার থেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী–এমনকি বিরোধীদলীয় নেত্রী পর্যন্ত নারী, সেখানে আর কোন ক্ষমতায়নের অভাব, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তোঁতা পাখির বুলি হিসেবেই ওদের শ্লোগানগুলো হয়। যেন যেমনে নাচাও, তেমনি নাচি; পুতুলের কী দোষ?

সম্প্রতি গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না লেখা সম্বলিত কিছু টি শার্ট বাজারে এসেছে। এসেছে আরো কিছু অশোভন কথামালা সম্বলিত টি শার্টও। যেন পাগলকে স্মরণ করিয়ে দেয়া আর কি! এ সম্পর্কিত একটা জোকস পড়েছিলাম বেশ আগে। খানিকটা অশোভন হলেও প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ না করে পারছি না।

শালী-দুলাভাই জঙ্গল দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ শালী বলল, দুলাভাই আমার তো ভয় লাগছে। আপনি আবার আমাকে একা পেয়ে আমার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করবেন না তো?

দুলাভাই বললো আমার এক হাতে লাঠি আর মুরগি, মাথার উপর খাঁচা, অন্য হাতে ছাগল, আমি কীভাবে কি করবো?

শালী বলে, কেন দুলাভাই, আপনি যদি হাতের লাঠিটা মাটিতে গেঁথে, তার সাথে ছাগলটা বাঁধেন, আর খাঁচাটা দিয়ে মুরগিটাকে আটকে দেন, তাহলেই আপনি আমাকে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন।

গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না জাতীয় টিশার্ট দেখেও মনে হচ্ছে, এ যেন পাগলকে নৌকা ছিদ্র না করার আদেশ দেয়া হচ্ছে।

কে না জানে, শালীন পোষাকে আবৃত হলে গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না শ্লোগান নিয়ে ঘুরতে হতো না। এমনিতেই জায়গা ছেড়ে দিত যুবকেরা। এতে যে কাজের কাজ কিছুই হবে না, তা নিশ্চিত। হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বরং প্রবল। তারচেয়ে চলমান যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের সয়লাব ঠেকাতে কিছু সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভালো ফল পাবার আশা করা যায়। যেমন–

ক) এ কথা যতবার যত করেই বলি, তবু কম বলা হবে যে, ধর্ষণ-যিনা-ব্যভিচার ও যৌন হয়রানি বন্ধে শরয়ি বিচারব্যবস্থা প্রণয়নের বিকল্প নেই। আজ যদি প্রকাশ্য বিচারালয়ে বেত্রাঘাত, পাথর নিক্ষেপ, দেশান্তর ও মৃত্যুদণ্ডের মতো যথোপযুক্ত শাস্তি প্রয়োগ করা হতো, অতঃপর মিডিয়ার মাধ্যমে তা সারাদেশে প্রচার করা হতো তবে অপর আরেক অপরাধী একইরকম অপরাধে লিপ্ত হবার আগে অন্তত দশবার ভাবতো। বুক ফুলিয়ে বলে বেড়ানোর তো প্রশ্নই ওঠে না।

খ) অন্তত দেশীয় আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা মামু-খালুর জোরে আইনের ফাঁক গলে যেন কোনো অপরাধী নিষ্কৃতি না পায়, তা খেয়াল রাখতে হবে অতি অবশ্যই।

গ) সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। সামাজিক বিচার-আচার সালিশ মীমাংসা ছিল আমাদের ঐতিহ্য। উৎকোচ স্বজনপ্রীতি আপোষকামিতাসহ ইত্যাকার নানা কারণে তা প্রায় অবলুপ্ত। এক সুবর্ণচরের কথাই বা যদি বলি, ধর্ষককে সামাজিকভাবে বয়কট করা হলে এবং কেবল ২০/৫০ হাজারে যেনতেনভাবে অপরাধ ঢাকার চেষ্টা না করে আইনের হাতে তুলে দিয়ে শাস্তি নিশ্চিতকরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে কমবেশি ফলাফল তো মিলতোই।

ঘ) শুধু আইন-আদালত দিয়ে মানুষের অপরাধ প্রবণতার মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। সেজন্য চাই আল্লাহভীতি সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে হক্কানি ওলামায়ে কেরামের সুহবত, ওয়াজ-নসিহত রাখতে পারে যুগান্তকারী ভূমিকা।

ঙ) আনুষঙ্গিক উপসর্গ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। চিরায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে নাটক-সিনেমা-বইপত্রে যৌন সুড়সুড়িমূলক বিষয়াদির ব্যাপারে নজরদারি বাড়াতে হবে।

চ) ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্যের অনন্য নজির পর্দার বিধানে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতে হবে।

ছ) ব্রিটিশ প্রবর্তিত গতানুগতিক সহশিক্ষার বিপরীতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়া ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ জরুরি।

জ) পারিবারিকভাবেই ছেলেমেয়েকে আদর্শ ও মূল্যবোধের দীক্ষাদান এ ক্ষেত্রে হতে পারে অব্যর্থ মহৌষধ।

ঝ) দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর ব্যাপারটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি যাকে দেখে শিস দিচ্ছেন, টিজ করছেন, সুযোগ খুঁজছেন, নিশ্চয় সেও কারো কন্যা জায়া জননী। আপনার মা-বোন-ভাগ্নিকে কেউ একই রকম হেনস্থা করলে কেমন বোধ করবেন, ভেবেছেন তো? আজ একটা মেয়ের বিপদ দেখেও সযতনে এড়িয়ে যাচ্ছেন, আগামীকাল এরাই যে আপনার পারিবারিক সুনাম ক্ষুণ্ণের কারণ হতে পারে, ভেবেছেন কখনো?

সর্বোপরি সমাজ বদলানোর এ কর্মযজ্ঞে কেবল সাময়িক মিছিল মিটিং মানববন্ধন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আন্তরিক পদক্ষেপের সমন্বয়। আসুন নিজেকে বদলাই, সমাজ বদলে যাবে। কারণ আমি আপনি আমরা সবাই মিলেই তো সমাজ, তাই না?

লেখক : তরুণ আলেম, শিক্ষক