বাংলাদেশি পাসপোর্ট থেকে ইজরাইল বাদ: পক্ষ-বিপক্ষ

ইমরান আব্দুল্লাহ:

২২ তারিখ শনিবার আমরা হঠাৎ দেখলাম—ইজরাইলের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য জেরুজালেম পোস্টে’ চমকে দেয়া একটি খবর বেরিয়েছে। খবরে লিখেছে, ‘বাংলাদেশ ইজরাইলের ওপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল গিলাদ কোহেন এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। গিলাদ কোহেন বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইজরাইল যেভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরোক্কো ও সুদানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে; দুদেশের সরকারের মধ্যে তেমন আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া কোহেন এক টুইটার বার্তায় জানিয়েছেন, ‘গ্রেট নিউজ! বাংলাদেশে ইজরাইলের ওপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এটি একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এবং আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাব এ ব্যাপারে আরেকটু এগিয়ে এসে ইজরাইল সরকারর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে। যাতে আমাদের দুদেশের মানুষই উপকৃত ও উন্নতি করতে পারে।’

‘ইজরাইল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রে এই পাসপোর্ট বৈধ’—বাংলাদেশের পাসপোর্টে লেখা এই বাক্যটি থেকে বাদ পড়েছে ‘ইজরাইল ব্যতীত’ কথাটি। এই খবরে হইচই পড়ে যায় দেশে। কেউ জানলো না, কেউ শুনলো না। সবাই যখন গাজায় ইজরাইলের বোমা বর্ষণ দেখে বিমর্ষ-বিধ্বস্ত, আল আকসায় যখন ইজরাইলি সেনাদের গুলিতে রক্তাক্ত হচ্ছে মুসল্লি, মসজিদ ও জায়নামাজ, ঠিক তখনই ইজরাইলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বাতিল হলো? তাহলে কী ভেতরে ভেতরে ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে বাংলাদেশ?

জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়, ‘কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা না হলেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশটির সাপ্তাহিক ব্লিটসকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ইহুদি রাষ্ট্র ইজরাইলে ভ্রমণের সম্ভাবনা তৈরি করতে নতুন সরবরাহ করা পাসপোর্টগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে “ইজরাইল ব্যতীত” কথাটির উল্লেখ থাকছে না।’

ফিলিস্তিন কী বলছে?

বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট থেকে ‘ইজরাইল ছাড়া সব দেশে ভ্রমণ করা যাবে’ কথাটি বাদ পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ফিলিস্তিনের সম্পর্ক সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তবে পাসপোর্ট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের খবর আমাকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে।’

ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টে পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি এমন এক সময়ে এল, যখন গাজা ও এর আশপাশের এলাকায় নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে। এটা হওয়া উচিত ছিল না। কারণ, ইজরাইলি দখলদার বাহিনীর হাতে লেগে থাকা ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ত এখনো শুকায়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টের এই পরিবর্তন তো ইজরাইলের জন্য উপহার। খুশি হয়েই তো ইজরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টুইট করেছে। এই সিদ্ধান্তে ভুল বার্তা গেছে।

বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে বলে আশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশই নেবে। পাসপোর্টে পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ সরকার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তার সঙ্গে একমত নন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের যে কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। তাহলে কি বাংলাদেশ ৫০ বছর ধরে পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখেনি?

বৈশ্বিক মানদণ্ডে মালয়েশিয়ার মতো দেশের পাসপোর্টের অবস্থান ২০তম উল্লেখ করে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত বলেন, মালয়েশিয়ার পাসপোর্টে তো এখনো ইসরায়েলে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি আছে। তাহলে সে দেশের পাসপোর্টের মান এত ওপরে উঠল কীভাবে? রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশের পাসপোর্টের এই পরিবর্তনের পেছনে কী ছিল, আমার জানা নেই। তবে অনুমান করি, গুটিকয় লোক এই কাজ করেছেন।’

বাংলাদেশ সরকারের সাফাই

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশ সরকার ই-পাসপোর্ট থেকে ইজরাইল প্রসঙ্গটি বাদ দেয়। সরকার বলছে, বাংলাদেশের নাগরিকদের ইজরাইল ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এই পরিবর্তন করা হয়েছে পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানের স্বার্থে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, নতুন ই–পাসপোর্ট থেকে ইজরাইলের নাম বাদ দেওয়া হলেও দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিগত কোনো পরিবর্তন হয়নি, পররাষ্ট্র নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। কারণ, বাংলাদেশ এখনো ইজরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না। ফিলিস্তিনের প্রতি আমাদের সমর্থন অটুট আছে। উই ওয়ান্ট টু স্টেট সল্যুশন। প্যালেস্টাইন তার ১৯৬৭ সালের ম্যাপ অনুযায়ী তাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে জেরুজালেমকে রাজধানী করে। এটাই আমরা বিশ্বাস করি, মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। এটাই আমরা প্রমোট করি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, পাসপোর্টের ‘আন্তর্জাতিক মান’ রাখতে গিয়ে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশ এ শব্দটি ব্যবহার করেনি। এমনকি আরব অঞ্চলের দেশগুলোর পাসপোর্টেও এটি লেখা নেই। ই- পাসপোর্টে পরিবর্তন এলেও এমআরপিতে তা আগের মতোই রয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, পাসপোর্টের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক রীতির কারণে করা হয়েছে। এতে কোনোভাবেই ইজরাইলের উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই।ইজরাইলের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পাসপোর্টে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, বাংলাদেশিদের জন্য ইজরাইলে ভ্রমণ নিষিদ্ধ ও বন্ধই থাকছে। একইভাবে ইজরাইলি পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসাও নিষিদ্ধ থাকবে।

পাসপোর্টে পরিবর্তনের বিষয়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আইয়ুব চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকে এটা হয়েছে।

বিরোধী দলের বক্তব্য

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ইজরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা যখন মৃত্যুপুরী, সে সময়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে ইজরাইলে ভ্রমণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার ঘটনা বিশ্ব বিবেককে হতাশ করেছে।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের আমল থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীনতাপ্রিয় ফিলিস্তিনিদের প্রতি নৈতিক, আত্মিক ও সম্ভাব্য সব ক্ষেত্র নিবিড়ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ গভীর হতাশা, লজ্জা ও ক্ষোভের সঙ্গে বর্তমান অবৈধ, ভোটারবিহীন সরকার ফিলিস্তিনের নাগরিকদের ওপর ইজরাইলি হামলার বিরুদ্ধে একটি দায়সারা বিবৃতি প্রদানের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। এমনকি ইজরাইলি বিমানের মুহুর্মুহু হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে ফিলিস্তিনের গাজা নগরী যখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে, ঠিক সে সময় বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল ভ্রমণের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা হতাশ করেছে গোটা বিশ্ব বিবেককে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে দেশবাসী জেনেছে যে তৃতীয় দেশকে ব্যবহার করে ইজরাইল থেকে আড়িপাতার যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটিত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু জাতিসংঘ সরকারের ওই মিথ্যা অজুহাতকে নাকচ করে জবাব চেয়েছে সরকারের কাছে। তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিশ্বের সব মানবাধিকার সংগঠনগুলো যৌথভাবে। সরকার জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে এসব নীতিহীন ও অবৈধ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশের জনগণের বদলে এখন সীমান্তের বাইরের ক্ষমতাবানদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত।

উপসংহার

বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টে এক সময় লেখা থাকত- ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইজরাইল, তাইওয়ান অ্যান্ড দ্য রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকা’ কথাটি।

পরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাইওয়ানের নামটি ওই নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ গেলেও ইজরাইল থেকে যায়। কয়েক বছর আগে হাতে লেখা পাসপোর্ট থেকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (এমআরপি) চালুর পরও আগের মতো প্রথম পৃষ্ঠায়ই লেখাটি ছিল। বর্তমানে ই পাসপোর্টে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে লেখা হচ্ছে শুধু- ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদনাইজেরিয়ায় একদল মাদরাসা ছাত্র অপহরণ
পরবর্তি সংবাদরাজধানীতে নিজের বাসায় নারী চিকিৎসকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার