বাঙলাদেশের মাদরাসাশিক্ষা নিয়ে আহমদ ছফার চিন্তা-ভাবনা

তুহিন খান

আহমদ ছফা গত হইছেন আজ প্রায় ১৮ বছর। ১৮ বছর আগে আহমদ ছফা যা যা বলছিলেন, বলতে চাইছিলেন বা বলি বলি কইরাও পুরাটা বলতে পারেন নাই, তার অনেকগুলিই, আহমদ ছফার বলামতে হউক বা অবলা পথেই হউক, বাস্তবে রূপ নিয়া এখন আমাদের সুমুখে হাজির। ফলে, বাঙলাদেশের একজন বুদ্ধিজীবী হিশাবে আহমদ ছফা সেসব বিষয়ে কী বলছিলেন, তার পর্যালোচনা জরুরি না হইলেও, অন্তত মৃত্যুদিবস উপলক্ষ্যে স্মরণের নিমিত্তে আলোচনাযোগ্য তো বটেই।

আহমদ ছফার চিন্তা ও চর্চার প্রসঙ্গ বিবিধ। বাঙলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলা যেসব বিষয়ে আলোচনা করাকে তথাকথিত প্রগতির অন্তরায় ভাবতেন বা ভাবেন, যেসব বিষয়ের আলোচনা বা চর্চা এই বাঙলাদেশে এখনও হয়ত ইওরোপের রেঁনেসা বা পরবর্তীতে উপনিবেশিত বাঙলার উনিশ শতকীয় রেনেসাঁর আলোকেই দেখা ও বোঝার চল আছে, উপনিবেশকের প্রতি উপনিবেশিতের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব ও সমর্পণসহ, আহমদ ছফা সেসব বিষয়ের অনেকগুলি নিয়াই খুব নিজস্ব ভঙ্গিতে বিতর্কে লিপ্ত হইছিলেন। বাঙলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলায় ফলে, আহমদ ছফা বেশ একটা অস্বস্তি তৈরি করতে সক্ষম হইছিলেন, যেকারণে তার দুর্ভোগ পোহাইতে হইছে বিস্তর, বিভিন্ন তরফেই। এমনই একটা বিষয় হল, বাঙলাদেশের মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়া আহমদ ছফার চিন্তা ভাবনা।

২.

একথা সত্য যে, আহমদ ছফার সামগ্রিক চিন্তাভাবনায় বা দৃষ্টিভঙ্গীতে, ইওরোপের এনলাইটেনমেন্টের প্রভাব ছিল প্রধান। ইওরোপ এবং বাঙলার রেনেসাঁয় বাঙলার মুসলমানের ভক্তির জরুরত নিয়া আহমদ ছফা ছিলেন মোটের উপর প্রশ্নহীন। ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে এই কথার সাক্ষ্য মেলে। ফলে, মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়া আহমদ ছফার প্রাথমিক মতামতগুলি ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ আবিষ্কারের সূত্রেই গাঁথা।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার এই বিষয়ক আলোচিত লেখা—’মাদ্রাসা শিক্ষার কথা’, যা পরে ২০০০ সনে প্রকাশিত তার প্রবন্ধপুস্তক ‘রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক প্রবন্ধ’-তে সংকলিত হয়। নব্বইয়ের দশকের প্রথমভাগে, বিএনপির শাসনামলেই, কওমি মাদ্রাসার সরকারী স্বীকৃতির দাবি প্রকাশ্যে আসতে থাকে। রাজনীতির অঙ্গনেও আশির দশক থেকেই ইসলামপন্থীদের পদচারণা এবং বেশ সফল পদচারণা শুরু হয়, যা আহমদ ছফাকে প্রভাবিত করছিল (এই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে ছফার আরেকটা লেখায়। এই লেখায় আমরা ছফার ওই প্রবন্ধ থিকাও কোট করব। তবে মূল আলাপ হবে ‘মাদ্রাসা শিক্ষার কথা’ নিয়াই)। সেসময় দেশের সুশীল সমাজে শিক্ষা এবং মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়া বর্তমানের মতই বাদানুবাদ হইয়া থাকবে অনুমান করি। আর সেই প্রেক্ষিতেই সম্ভবত জনাব আহমদ ছফা এই প্রবন্ধটা লিখতে উদ্যোগী হন।

প্রবন্ধের শুরুতেই আহমদ ছফা মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার বিষয়ক, বরং, আমাদের জাতীয় জীবনে শতভাগে বিভক্ত দল-মত-পথসমূহের সম্মিলনে সবচাইতে বড় বাধাটির দিকে ইঙ্গিত করছেন। সম্ভবত, মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার বিষয়ে সেসময় বিস্তর আলোচনা-গবেষণা-প্রস্তাবনা চলছিলো। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সুশীল সমাজ অনেকটা ইওরোপিয়ান স্টাইলে, মাদ্রাসাওয়ালাদের রাতারাতি ‘সভ্য’ কইরা তোলার চিন্তাভাবনা করতেছিলেন। কিন্তু বাঙলার সমাজে প্রতিষ্ঠিত এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের সামাজিক উপযোগ ও চরিত্র সম্পর্কে, তাদের কোন ধারণাই ছিল না, অন্তত তাদের মতামতে সেসবের কোন প্রভাব ছিল না। একরাশ অসভ্য, বর্বর, মধ্যযুগীয় জন্তুরে ‘আধুনিক মানুশ’ বানায়ে তোলাই ছিল এইসমস্ত প্রস্তাবনার সার। এমনকি, অন্তত আধুনিককালে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিবুলি যে গণতন্ত্র, তারেও উপেক্ষা করা হইতেছিল এইসব প্রস্তাবনা-পর্যালোচনায়। আহমদ ছফা লিখলেন, ‘……..কিন্তু মাদ্রাসার যারা ছাত্র এবং মাদ্রাসাসমূহে যাঁরা শিক্ষকতা করছেন, তাঁদের কোন মন্তব্য কিংবা পরামর্শ কোথাও চাওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।’ (মাদ্রাসা শিক্ষার কথা, আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, পৃঃ ৩১১)

আগেই বলা হইছে, আহমদ ছফা রেনেসাঁয় বিশ্বাসী মানুশ। মাদ্রাসাশিক্ষার যেসব সমালোচনা তৎকালে ছিল এবং অদ্যাবধি বর্তমান, তার সবগুলিই ছফার দৃষ্টিতে ছিল সঠিক। প্রধাণত, ‘আধুনিক জগত ও জীবন-জিজ্ঞাসা’ সিলেবাসে প্রধান্য না পাওয়া এবং এর ফলে মাদ্রাসা ছাত্রদের সমাজের প্রতি বিবিধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, আর দেশে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর জরুরত—এই দুটিই মোটাদাগে মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যাপারে আহমদ ছফার সমালোচনা ও আপত্তির জায়গা, এবং এই দুটিই মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারে ছফার আগ্রহের নেপথ্য কারণ। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩১১-১২)

বলে রাখা ভালো, মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়া লেখা বা বলার আগে ছফা, বাঙলাদেশে মাদ্রাসাশিক্ষার ধারাগুলোর ব্যাপারে এবং তাদের মন-মানসের ব্যাপারে অন্তত অনেকের চাইতে স্বচ্ছ কিছু ধারণা অর্জন করছিলেন। ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাফেজ্জি হুজুর রহ. জাসদের মেজর জলিলের চাইতে বেশি ভোট পাওয়ার পরপরই আহমদ ছফা কওমি মাদ্রাসা এবং এইকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হইয়া ওঠেন (‘কামরাঙ্গীর চরে মাদ্রাসায় শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা’, ১৯৯৮, চিন্তা ওয়েব্জিন)। এবং বলাইবাহুল্য, মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়া লেখার কালে, ছফার মাথায় প্রধাণত ছিল কওমি মাদ্রাসাগুলা, ছফার নিজের ভাষায় ‘ওয়াহাবী মাদ্রাসা’। আলিয়া মাদ্রাসাগুলি নিয়া ছফার এক ধরণের নিশ্চিন্তি ছিল, যেহেতু সেসব মাদ্রাসা ‘অনেক বেশি নমনীয় ও পরিবর্তনপন্থী।’ তবে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো যে এদেশে ধর্মীয় অথরিটির জায়গায় নাই, সেকথাও ছফা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। তাই আলিয়া মাদ্রাসাগুলার সাথে কওমিদের ক্লাসিক দ্বন্দ্বটির দিকে ইঙ্গিত করতে তিনি ভোলেন নাই—’ওয়াহাবী মাদ্রাসার শিক্ষকেরা আলীয়া মাদ্রাসাসমূহের প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে থাকেন। তাঁরা বলতেও কুণ্ঠিত হন না, …..ওয়ারেন হেস্টিংস যে মাদ্রাসা তৈরি করেছেন তার চেহারাটি ইসলামী হলেও প্রাণবস্তুর মধ্যে ইসলাম নেই।’ (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩১৪)

কওমি-আলিয়া দ্বন্দ্ব এবং কওমি মাদ্রাসাগুলোর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, চিন্তা ও চর্চার সাথে পরিচিত হয়েই ছফা এই লেখা লিখতে বসছিলেন। বাঙলাদেশে শিক্ষা বা ইসলাম প্রশ্নের মীমাংসার জন্য এদের সাথেই আলোচনা করতে হবে, এই কথা তিনি বুঝেছিলেন। ফলে মাদ্রাসাশিক্ষা বিষয়ক তার প্রায় সব প্রবন্ধেরই মূল লক্ষ্য ছিল কওমি মাদ্রসাগুলো।

৩.

এনলাইটেনমেন্টের আপাদমস্তক সাবস্ক্রাইবার হইলেও, মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যাপারে ক্রিটিকাল হইলেও, ছফা একইভাবে ছিলেন সমাজে চালু ধারণা ও বাইনারিগুলার প্রতিও ক্রিটিকাল। এনলাইটেনমেন্টজাত বিশ্ববীক্ষারে ছফা মানতেন জাতীয় মুক্তির অন্যতম শর্ত হিশাবে, কিন্তু তার মধ্যবর্তী বা ইন্টেরিম বাস্তবতাগুলারে অস্বীকার কইরা বা দমন কইরা নয়। ফলে, মাদ্রাসাশিক্ষার প্রতি ছফার অ্যাপ্রোচ ছিল সমঝোতামূলক, যার ইঙ্গিত ছফা করতেছেন এইভাবে— ‘আমি আলেম ওলামাদের সঙ্গে অনেকদিন থেকে সুসম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করে আসছি। সব আলেম ওলামারা আমাকে সহ্যও করেন না। সব মানুষ একরকম হয় না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি মৌলবাদী রাজনীতি যারা করে তাদের মধ্যেও স্বচ্ছ বিজ্ঞান-চিন্তার অধিকারী মানুষ আমি অনেক দেখেছি। প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক, কথা-বার্তায় অত্যন্ত বিপ্লবী এবং কেতাদুরস্ত তাদের মধ্যেও নচ্ছার মানুষ আমি কম দেখিনি। আমাদের দেশের মানুষ সাদাকে সাদা দেখে, কালোকে কালো। এই সাদা-কালোর মাঝখানে আরো যে কত রঙ থাকতে পারে সেইটা অনেক মানুষ ভাবতেও পারে না।’’ (‘কামরাঙ্গীর চরে মাদ্রাসায় শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা’, ১৯৯৮, চিন্তা ওয়েব্জিন)।

আলেম-ওলামাদের সাথে সুসম্পর্ক ও সুধারণা রাখলেও, পরক্ষণেই ছফা বলতে ভোলেন নাই, ‘সকলে একমত হবেন বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশের মধ্যে মোল্লা-মওলানাদের অপ্রতিহত প্রভাব রয়েছে। এ প্রভাবের অনেকখানি অংশেই আধুনিক যুগের জীবনধারার প্রতি অনুকূল এবং ইতিবাচক নয়।’’ এবং এই সমস্যার সমাধান করে একটা জাতীয় মুক্তির সর্বোচ্চ পর্যায় হিশাবে ছফার শেষ দাওয়াই ঐ রেনেসাঁ— ‘পড়াশোনা থেকে আমি এই উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছি যে, এই দেশে একটি রেনেসাঁর মত ঘটনা যদি ঘটিয়ে তোলা সম্ভব না হয় তাহলে এই জাতি, এই সমাজের মুক্তি অসম্ভব।’ (‘কামরাঙ্গীর চরে মাদ্রাসায় শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা’, ১৯৯৮, চিন্তা ওয়েব্জিন)।

এই কথা কয়টি থেকে আমরা ছফার রেনেসাঁভক্তি ও রেনেসাঁবিরোধীতার একটা হদিশ করতে পারি। ছফামানসে ইওরোপের রেনেসাঁ বা বাঙলা অঞ্চলের উনিশ শতকী রেনেসাঁ বা নিছকই ‘রেনেসাঁ’ নামের একটা আইডিয়াল ধারণা ছিল, যা জাতীয় মুক্তির জন্য জরুরি। এই রেনেসাঁর উপাদান ছফা নিছিলেন ইওরোপ থিকাই। কিন্তু, দেশের চালু বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল অংশ, যারা নিজেদের সেই রেনেসাঁরই সৈনিক ভাবতেন, ছফার চোখে তাদের অধিকাংশই ছিলেন আদতে ভণ্ড। রেনেসাঁর ধারণারে এদের হাত থেকে উদ্ধার করার কথা ভাবতেন ছফা, ভাবতেন রেনেসাঁ বা এনলাইটেনমেন্ট নামক ধর্মরে শুদ্ধ করে তোলার কথা। মূলত ছফা ছিলেন সেক্যু-লিবারাল ধর্মেরই একজন মুজাদ্দেদ বা সংস্কারক।

আর তাই, আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার কোনরুপ পর্যালোচনা ছাড়াই, আহমদ ছফা মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাব তুলছিলেন। মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কার করে ‘আধুনিক’ বানাইলে, আদতে কী হবে? ‘আধুনিক শিক্ষা’ ধারণাটি কোন নিষ্পাপ ধারণা নয়, আমরা জানি যে, উপনিবেশিত ভূখণ্ডগুলির বাস্তবতায় এই শিক্ষাপ্রক্রিয়া সরাসরি উপনিবেশ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। ভারত উপমহাদেশও তার বাইরে নয়। শিক্ষাব্যবস্থার যে গভীর কলোনাইজেশন, তা থেকে মুক্তি আমাদের এখনও মেলে নাই। ফলে, আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষা ইওরোপ ও পুঁজির একদল গোলামই উৎপাদন-পুনরুৎপাদন করতেছে কেবল। এই শিক্ষাব্যবস্থার পর্যালোচনা ছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারের চিন্তা কঠিন বৈকি।

সেইকথা ছফাও জানতেন অবশ্য। কওমি মাদ্রাসা দেওবন্দের উত্তরসূরী, এবং দেওবন্দ ছফার ভাষায় একটি ‘ওয়াহাবি মাদ্রাসা’ আর এটি ‘একটি গৌরবময় উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রাম ঐতিহ্যের দাবীদার।’ এই ইতিহাসসচেতনতার ফলে ছফা জানতেন, বাহির থেকে কোনকিছু চাপায়ে দিলেই এই প্রতিষ্ঠানের লোকেরা মানবে না। ছফার ভাষায়, তারা বলবে— ‘তোমাদের যে ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রেখেছ, সেটা যে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা একথা প্রমাণ করার উপায় কী? তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে প্রতিদিন খুনোখুনি হচ্ছে, মাসের পর মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকছে।’’ (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩১৫)

কওমি মাদ্রাসাগুলোর এই ইতিহাসের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, চেতন বা অবচেতন বা একদম অচেতন উপনিবেশ-বিরোধিতার মেজাজ ছফা ধরতে পারছিলেন। কিন্তু ছফার দৃষ্টিতে, কওমি মাদ্রাসাগুলার পরিবর্তন-বিরোধিতার এই একমাত্র কারণ নয় যে, তারা খুবই বিপ্লবী গোছের। বরং ছফার দৃষ্টিতে এর আরো অন্তত দুইটি মৌলিক কারণ আছে।

৪.

কওমি মাদ্রাসার পরিবর্তন-বিরোধিতার একটা অন্যতম কারণ, ছফার মতে, দেশের সুশীল সমাজের সদিচ্ছা, শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব। ছফা কারণটিরে ব্যাখ্যা করছেন এইভাবে, ‘কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত লোকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতি একটি অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে থাকে।’’ সিনেমা-নাটকে অপরাধীর চরিত্রে দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালা চরিত্র হাজির করার নেপথ্য ঘেন্নার কথা উল্লেখ কইরা ছফা তারপরে বলেন, ‘মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতি এই মারাত্মক সহানুভূতিহীনতা তাঁদের অত্যধিক পরিমাণে পরিবর্তন-বিরোধী করে তুলেছে।’’ (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩১৫-১৬)

ছফার মতে, যেকোন ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রধান শর্ত হলো ‘বিশ্বাসবোধ, আস্থা, মানবিক সম্মাননা ও শ্রদ্ধা’। কিন্তু, এদেশে মাদ্রাসাশিক্ষা বা ধর্মীয়চর্চার সাথে জড়িত লোকদের ক্ষেত্রে এইটা ঘটে নাই। তাদের সাথে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ‘প্রগতিশীল’ ও সেক্যু-লিবারালদের আচরণ অমানবিক, তাদের ব্যাপারে এদের ধারণা এইরকম যে, এরা একদল আদিম বর্বর মানুশ, এদের ইওরোপিয়ান কায়দায় ‘সভ্য’ বানাইতে হবে।

তবে, এইখানে বোধহয় বইলা রাখা ভাল ও নিরাপদ, সমস্যাটা একতরফা না। আসল সমস্যা বস্তুত ‘মিসকম্যুনিকেশান’। পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা ও শ্রদ্ধার অভাবের পেছনের কারণ এই ‘ভুল যোগাযোগ’। এই ভুল যোগাযোগ এখন সোশাল মিডিয়ার যুগে অনেকাংশেই ভাইঙা গেছে, তবে এ নিয়ে আলাপ এইখানে করব না আর।

দ্বিতীয় যে কারণের কথা ছফা নির্দেশ করছেন, পরিবর্তন-বিরোধিতার নেপথ্যে, তা হইল— রাজনৈতিক দলগুলির নিজস্ব স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার। এই অপব্যবহারের শিকার অতীতের যেকোন সময়ের চাইতে এখন হয়ত বেশি হইতেছে কওমি মাদ্রাসাগুলো, তারা পরিবর্তন-বিরোধী হবে না কেন!

৫.

আহমদ ছফা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কোন পর্যালোচনা ছাড়াই, কওমি মাদ্রাসাগুলির শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের আলাপ তুলছিলেন। মাদ্রাসাশিক্ষা আধুনিক সমাজের বিবিধ চাহিদা পূরণ করতে এবং আধুনিক জীবনবীক্ষা দানে ব্যর্থ, আর এই ব্যর্থতার ফলে সমাজ সামগ্রিকভাবে পিছায়ে যাইতেছে —এই ছিল ছফার অভিযোগ। ছফা মাদ্রাসাশিক্ষার সাথে জড়িত পলটিকাল ইকোনমির তত্ত্ব-তালাশও করছিলেন, অনেক এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তির অংশ হিশাবে যে মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়, এটিও তিনি নোটিশ করছেন। আর এজন্যেই মাদ্রাসাশিক্ষার চালু ভার্শনে নানাবিধ সংস্কার আনার কথা তুলছিলেন ছফা। এই প্রক্রিয়াটি কেমনতর জটিল আর মাল্টি-ডাইমেনশনাল, তা অবশ্য ছফা জানতেন। ছফার মতে, একদিকে সেক্যু-লিবারাল সমাজের ধর্মীয় সমাজের প্রতি অবজ্ঞাসুলভ মানসিকতা, রাজনৈতিক অসদিচ্ছা আর ‘ওয়াহাবীদের’ দীর্ঘ উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনের ঐতিহ্য— এই তিনটি কওমি মাদ্রাসার পরিবর্তন-বিরোধিতার মূল কারণ।

তাইলে উপায় কী? ছফা উপায় কী বলার আগে বলতেছেন, কোনটা উপায় না। ছফার মতে, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে কোনরুপ আলাপ-আলোচনা ছাড়া সরকারীভাবে উপর থেকে চাপায়ে দেওয়া কোন সিদ্ধান্ত মোটেই উপায় না। কারণ হিশাবে ছফা কওমি মাদ্রাসার জটিল স্ট্রাকচারের কথা বলছেন। এই প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিকভাবেই সরকারী না, সরকারের আওতাভুক্তও না। জনগণের টাকায় এরা চলে। আবার এরা পরস্পর সংযুক্ত বা এক কাঠামোর আওতাভুক্তও না। ফলে সরকার কিছু চাপায়ে দিলেই তারা মানবে কেন?

তাই ছফার প্রস্তাবনা হইল, প্রথমত, দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ লাগবে। সকল ঘরানার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্রদের মতবিনিময় ও কালচারাল কম্যুনিকেশন লাগবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলার সদিচ্ছা লাগবে। আর তিন নম্বরে, যেহেতু জোর কইরা এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন সম্ভব না, ছফার মতে তাই ‘বোঝানোর নীতি’ গ্রহণ করা লাগবে। ডায়ালগ চালু করতে হবে। তাইলে বিশেষ ফল পাওয়া যাবে। অবশ্য, এই ‘বোঝানো’ কী জিনিশ, কে কারে বুঝাবে, ‘বোঝানো’র দায়িত্ব সরকার নেবে কিনা, ছফা তা খোলাসা করেন নাই।

৬.

মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কারে নিয়া ছফার চিন্তা তাইলে কী ছিল? সরকারীকরণ? ছফা কিন্তু তা বলেন নাই। আগেই আমরা দেখছি, রেনেসাঁরে অপরিহার্য ধরলেও, মডার্ন এডুকেশনের কোন ক্রিটিক না করলেও, ছফা মাদ্রাসাশিক্ষার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন। তাই হুট করে মাদ্রাসাগুলারে তুলে দেওয়া বা ভার্সিটি বানায়ে দেওয়ার দাবি তিনি করেন নাই। আবার আধুনিক রাষ্ট্র, বিশেষত বাঙলাদেশ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, সুশাসন বা পলিটিকাল কালচারের ধারণাও যে খুব একটা পোক্ত না, এই বাস্তবতাও তার সামনে ছিল। তাই মাদ্রাসাগুলির সরকারীকরণেও ছফার দ্বিধা ছিল।

আলোচ্য প্রবন্ধটির একদম শেষে এসে ছফা লিখছেন— ‘শিক্ষাকে সরকারীকরণ করা হলে শিক্ষার উন্নতি হয় একথা পুরোপুরি সত্য নয়। প্রাইমারি স্কুলগুলোকে সরকারীকরণ করার একটা মারাত্মক কুফল হল এই যে, আগে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সমাজের কাছে জবাব্দিহি করতে হত। বর্তমানে থানার শিক্ষা অফিসারকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই তাদের দায়-দায়িত্ব সব মিটে যায়। সমাজের কথা না ভাবলেও চলে।’’ এরপর ছফা তার নিজের সিদ্ধান্ত দিতেছেন, ‘মাদ্রাসাগুলিকে সরকারী আওতায় আনলেও যে বিশেষ সুফল পাওয়া যাবে সেকথা ঠিক নয়। মাদ্রাসাগুলো তাদের পদ্ধতি রক্ষা করে যুগের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। নিজেরা স্বতস্ফুর্ত হয়ে যদি উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাহলে বেশি ভাল ফল পাওয়া যাবে।’ (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩১৭)

অর্থাৎ, কোন সরকারী উদ্যোগ না, মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কারের ব্যাপারে ছফার নিজস্ব পক্ষপাত ছিল, কওমি মাদ্রাসাগুলি যেন নিজস্ব নিয়মেই নিজেদের ভেতর থেকে সংস্কার শুরু করেন। ছফার মতে সেইটাই অধিক ফলদায়ক ও নিরাপদ। সেজন্যেই ১৯৯৮ সালের ১৬ নভেম্বর কামরাঙ্গীরচরে হাফেজ্জি হুজুরের মাদ্রাসা থেকে যখন তিনি এই নিমন্ত্রণ পান, ‘আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিতে আধুনিক কৃৎ-কৌশল এবং ভৌতবিজ্ঞানের নানা বিষয়ক শিক্ষা দেয়ার পদ্ধতি প্রবর্তন করে একটি জামেয়া তথ্য আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিক করতে চাই। আগামী ১৯ তারিখের ইসলামি সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণাটি দিতে চাই। এ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আপনি যদি আসেন এবং আমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ দান করেন। আমরা খুবই উপকৃত হব এবং কৃতজ্ঞ থাকব’—তখন তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন এবং কওমি মাদ্রাসার ভিতর থেকেই কিছু একটা বৈপ্লবিক কাজ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। (‘কামরাঙ্গীর চরে মাদ্রাসায় শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা’, ১৯৯৮, চিন্তা ওয়েব্জিন)।

৭.

আমরা এই লেখার প্রায় শেষ অংশে চইলা আসছি। ছফা মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কার নিয়া যা যা ভাবতেন, বর্তমানে সেসবের অবস্থা কী?

সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে মাদ্রাসা-কলেজ-ভার্সিটি ইন্টারঅ্যাকশন বাড়ছে, কম্যুনিকেশন-গ্যাপ কমছে। সরকারী উদ্যোগে না হোক, অন্তত বেসরকারী উদ্যোগে মাদ্রাসা-কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রদের কালচারাল কম্যুনিকেশন-টাইপের আয়োজন হইতেছে, যদিও এইটা সংখ্যায়, মানে ও লক্ষ্যে খুব ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী না।

তাছাড়া, অবিশ্বাস কমে নাই আজও। এই ধরণের অনেক এনজিও, যারা মাদ্রাসা নিয়া কাজ করতে আগ্রহী, তাদের প্রভুসুলভ অবজ্ঞার মনোভাব, পশ্চিমের ওয়র অন টেরর প্রকল্পের হুবহু অনুকরণে সংস্কার-মডিউল তৈরি, সংস্কার-প্রস্তাবনার ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসাগুলোর বাস্তবতা ও সুবিধা অসুবিধা আমলে না আনা এবং প্রশাসনের সহায়তায় এইসব কর্মকাণ্ডের বিরোধীদের দমনাকাঙ্ক্ষা—এইগুলি তাদের ব্যাপারে লোকমনে অবিশ্বাস বাড়াইছে। যদিও সার্বিকভাবে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ুয়াদের সাথে মাদ্রাসাপড়ুয়াদের গ্যাপটা অনেক কমে আসছে।

আহমদ ছফার চাহিদামতে কোন শিক্ষা বিপ্লব তো হয় নাই। কিন্তু ঘটে গেছে অন্য এক ঘটনা। কওমি মাদ্রাসার সমন্বিত বোর্ড হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে, সিলেবাস এবং কারিকুলাম ঠিক রেখেই, কওমি মাদ্রসার দাওরায়ে হাদিসরে মাস্টার্সের স্বীকৃতি দেওয়া হইছে। এ নিয়া বিস্তর আলাপ আলোচনা আমরা আগে করেছি। কিন্তু ছফা বাঁইচা থাকলে এই ব্যাপারে কি বলতেন?

একদিকে ছফার অবশ্য খুশিই হওয়ার কথা যে, আওয়ামী লীগের হাত দিয়াই স্বীকৃতি আসলো! আবার, কোনরকম জোরজবরদস্তি ছাড়াই, শুধু ‘বোঝানো’র মাধ্যমেই যে ব্যাপারটা ঘইটা গেল, এও ছফার কাঙ্ক্ষিতই ছিল। কিন্তু, ছফা যে শঙ্কা ব্যক্ত করছিলেন, মাদ্রসার সরকারীকরণের ব্যাপারে, তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ছফা বলছিলেন, সরকারীকরণ সমাধান না, বরং সরকারীকরণের বিস্তর কুফল। সেই কুফল আমরা এখন দেখতেছি। বেফাকের প্রশ্নফাঁসের কলঙ্কিত ঘটনা, বিভিন্ন মাদ্রাসায় প্রশাসনের সাথে অতি সখ্য এবং কওমি মাদ্রাসার একটা মূল প্রতীতি যে সামাজিক দায় ও জবাব্দিহি, তা থেকে দূরে সইরা পরা, সরকার ও প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন অপকর্মে জড়ায়ে পড়া এসবই এই সরকারীকরণের কুফল। শিক্ষাব্যবস্থাও এই ক্ষতির ভাগীদার হইতেছে, হবে। সার্টিফিকেট-সর্বস্ব লেখাপরার যে ভয়াবহ কালচার এদেশের শিক্ষাব্যবস্থারে ধ্বংস করে দিতে উদ্যত, তা এখন গ্রাস করছে মাদ্রাসাগুলিরেও। উপরস্তু দুঃখের ব্যাপার, সেই সার্টিফিকেটটার মূল্যও গৌণ, এই সার্টিফিকেট যে কত খেলো, তা পদে পদে অনুভব করতেছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।

৮.

দাওরারে মাস্টার্সের মান দেওয়ার দাবির পেছনে সুচিন্তিত কোন মতামত কাজ করে নাই, নতুবা দাওরারে অনার্সের মান দিতে বলা হইত। আবার তড়িঘড়ি করে এই স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে সরকারের রাজনৈতিক প্রকল্পও যুক্ত ছিল। ফলে, স্বীকৃতি এবং এর প্রক্রিয়া কোনটাই খুব বেশি প্রশংসা পায় নাি, কাজেরও হয় নাই।

অবশ্য কওমি মাদ্রাসা এখনও সরকারি না। স্বীকৃতি দেওয়া হইলেও এর কারিকুলাম এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম আগের নিয়মেই বহাল। কিন্তু আর কতদিন? স্বীকৃতির ধারায় পরিবর্তনের নানামুখী জোয়ার আসতেছে কওমির উঠানে। সার্টিফিকেট সর্বস্বতা আর স্বার্থবাদীতার আঁচ লাগতেছে মাদ্রাসার ছাত্রদের মনেও। প্রশ্ন উঠছে ধাপে ধাপে অন্যান্য স্তরগুলারও স্বীকৃতির ব্যাপারে, সরকারের তরফে কারিকুলাম চেঞ্জের কথাও বলা হইছে। সম্পূর্ণ সরকারীকরণের আগেই পরিস্থিতি এই, ফলে পুর্ন সরকারীকরণের পরে কওমি মাদ্রাসার বিশেষ কোন আবেদন বা প্রতিশ্রুতি সমাজে থাকবে কিনা, তা চিন্তার বিষয়।

ছফার কথা আবারও। ছফা এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পারছিলেন। ছফা জানতেন, সরকারীকরণ হইলে হয়ত প্রতিষ্ঠানগুলা সরকারের আওতায় আসবে, কিন্তু তাতে শিক্ষা বিপ্লব হবে না, ছফার মনে লালিত যে আইডিয়াল ‘রেনেসাঁ’, সেইটা হবে না, কিছু সরকার-পক্ষীয় লোক তৈরি হবে কেবল। তাই, প্রবল সমালোচনার ঝুঁকি নিয়াও, কওমি মাদ্রাসার ভেতর থেকেই কোন বিপ্লব বা সংস্কার উদ্যোগের কথা বলছেন তিনি।

কওমি মাদ্রাসায় একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসন্ন। একটা সংস্কার খুবই অনিবার্য ও নিকটবর্তী। কথা হইল, সেই পরিবর্তন কীভাবে হবে? কওমি মাদ্রাসা কি সরকারীকরণের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে লীন হয়ে আরেকটা দুর্নীতি ও গোলাম তৈরির কারখানা হবে? সেক্ষেত্রে সমাজে কওমি মাদ্রাসা তার প্রাতিষ্ঠানিক আবেদন হারাবে। নাকি কওমি মাদ্রাসার ভেতর থেকেই আসবে কোন বৈপ্লবিক সংস্কার প্রস্তাব, যার স্বপ্ন ছফা দেখতেন? কওমি মাদ্রাসার এস্টাবলিশমেন্ট ছফার পক্ষে কথা কইবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় যে বড় পরিবর্তন আসবে, তার প্রভাব পড়বে তরুণ প্রজন্মের উপর।

কওমি মাদ্রাসার চিন্তাশীল তরুণের সংখ্যা এখন একদম কম না। এদের অনেকেই যুগচাহিদা ও ভবিষ্যত দেখতে সক্ষম। ফলে তাদের হাতেই থাকবে এই প্রশ্নের ভার। আর কোনদিন যদি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার ধারায় এই নিছক সরকারীকরণের বাইরে সেরকম কার্যকর কোন বিপ্লব ঘটে, সেদিন পরলোকে ছফার আত্মার কিছুটা হইলেও মাগফেরাত হইতে পারে।

তথ্যসূত্র
১. ‘মাদ্রাসা শিক্ষার কথা’, আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০০২), মাওলা ব্রাদার্স; পৃঃ ৩১১-৩১৮।
২. ‘কামরাঙ্গীর চরে মাদ্রাসায় শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা’ (১৯৯৮), চিন্তা ওয়েনবজিন।