মাদরাসা শিক্ষা : ছফা যেভাবে দেখেছেন

হামমাদ রাগিব

মাদরাসা-শিক্ষা বিষয়ে আহমদ ছফা যে কয়টা প্রবন্ধ লিখে গেছেন, সমকালের অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের একধরনের চপেটাঘাত করেছেন প্রবন্ধগুলোতে। মাদরাসা-শিক্ষার প্রতি সুশীল শ্রেণির অবজ্ঞা, অবহেলা এবং এ শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ে তাদের প্রস্তাবনার অবাস্তবতা আলোচনা করেছেন খোলামেলাভাবে। তবে একই সঙ্গে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্যান্যদের মতো ‘মধ্যযুগীয়’ ও ‘অকর্মণ্য’ শিক্ষাব্যবস্থা বলতেও ছাড়েননি।

তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সুশীল শ্রেণি মাদরাসা-শিক্ষা সংস্কারে যে কথাগুলো স্বাধীনতার পর থেকে বলে আসছেন, এবং যে কথাগুলো এ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর মনে করেন মাদরাসা-সংশ্লিষ্টরা, ছফা এসব কথার বাইরে এসে স্বতন্ত্র একটা জায়গা থেকে কথা বলেছেন।

১৯৯৫ সালে লেখা ‘মাদ্রাসা শিক্ষার কথা’ নিবন্ধে ছফা লিখেছেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বর্তমান। সুতরাং এই শিক্ষাপদ্ধতিতে যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, এই পরিবর্তনের দাবীটি সেই বিশেষ শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত লোকদের মধ্য থেকেই সর্বপ্রথম আসতে হবে। মাদ্রাসার শিক্ষকরা এবং ছাত্রেরা যদি পরিবর্তন না চান, তাহলে ওপর থেকে শুধুমাত্র একটা পদ্ধতি চাপিয়ে দিয়ে কোনপ্রকার পরিবর্তন আনা যাবে না। এরকম ধারণা পোষণ করা অনেকটা বোকামির নামান্তর।’

কিন্তু মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে যে নারাজ এ ধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে কওমি মাদরাসার লোকজন, ছফা সে কথাও বলেছেন। বলেছেন, আলিয়া বা সরকার নিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোর সিলেবাসে পরিবর্তন আনার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকলেও কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায়, তাঁরা নিজ থেকে পরিবর্তন না আনলে কারও সাধ্যি নেই সেখানে হস্তক্ষেপের।

বর্তমানে কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারায় মুরব্বি পর্যায়ের অনেক ব্যক্তিবর্গও সিলেবাস সংস্কারে কথাবার্তা বললেও ছফা যে সময় মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে লিখেছেন, ৮০ ও নব্বইয়ের দশকে, তখন এ সিলেবাসের পরিবর্তন কিংবা সামান্যতম সংস্কারেরও তীব্র বিরোধিতা করতেন আলেম সমাজ। ছফা এ কথাটাও তুলে ধরেছেন তাঁর একটি নিবন্ধে। এবং জানিয়েছেন পুরনোকে আকড়ে ধরাটাকেই যে তাঁরা গর্বের বিষয় মনে করতেন, কোনো ধরনের সংস্কারের কথা বললে যে তাঁরা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতেন, সেই বাস্তবতাও।

সংস্কারের বিরোধিতা কেন করতেন মাদরাসা-সংশ্লিষ্টরা, তাঁর একটা কারণও বয়ান করেছেন ছফা। তাঁর ভাষায়—’কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত লোকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে থাকে। এই মনোভাব এই ধরনের লোকদের মধ্যে এতদূর গাঢ়মূল হয়েছে নাটকে, নভেলে ও সিনেমায় কোনো অপরাধীর চরিত্র দেখাতে হলে একজন দাড়িওয়ালা-টুপিওয়ালা মাওলানাকে নিয়ে আসা হয়। মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতি এই মারাত্মক সহানুভূতিহীনতা তাঁদের অত্যধিক পরিমাণে পরিবর্তন-বিরোধী করে তুলেছে।’ (মাদ্রাসা শিক্ষার কথা, ১৯৯৫)

ছফা লিখেছেন, ‘যাঁরা যুগের দাবীর তাগিদে মাদ্রাসা শিক্ষার পরিবর্তনের কথা বলেন, তাদের মধ্যে এমন একটা মনোভঙ্গী প্রকট হয়ে ওঠে—বন্যজন্তুকে ধরে শিক্ষা দিয়ে পোষ মানানোর মতো করে মধ্যযুগীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চান।… পাণ্ডিত্যাভিমানী ব্যক্তিরা মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রতি এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে থাকেন, যেরকম দৃষ্টিভঙ্গী উঁচুবর্ণের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় শূদ্র সম্প্রদায়ের প্রতি পোষণ করেন। তাই ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরা যখনই পরিবর্তনের কথা বলেন, মাদ্রাসার লোকেরা তত বেশি জেদের সঙ্গে পুরনো পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরেন।’

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষিতদের সমন্বয় সাধন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটা জায়গা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন ছফা। অকুণ্ঠ চিত্তে বলে গিয়েছেন, মাদরাসা-শিক্ষার্থীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রদের মতো তাঁরাও জাতির ভবিষ্যৎ। অবহেলা-অবজ্ঞা নয়, শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধের জায়গা থেকে তাঁদেরকে মূল্যায়ন করা দরকার, এবং তাঁদের মতামত ও সন্তুষ্টিকে ভিত্তি বানিয়ে তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে নানারকম রাজনৈতিক কূটচাল এবং স্থানীয় আধিপত্যবাদীদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে যেমন তিনি সমালোচনা করেছেন, তেম্নি ব্রিটিশখেদাও আন্দোলনে এ শিক্ষাধারা, বিশেষত কওমি তথা দেওবন্দী শিক্ষাধারার অবদানের কথা অকুণ্ঠ বয়ানে স্বীকার করেছেন।

মাদরাসা সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, মূলত এখানকার সিলেবাস ও পাঠদান পদ্ধতির সেকেলে রূপ নিয়েই বলেছেন। এ সিলেবাস ও শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন চেয়েছেন তিনি। তবে সেটা অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর মতো ধর্মীয় শিক্ষাকে সংকুচিত ও হেয় করে নয়। তাঁর মূল বক্তব্য হলো, মাদরাসা-শিক্ষার্থীরা যেন ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাটাও হাসিল করে নেয়, যাতে মানবসম্পদে রূপান্তরিত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। অথবা তাঁর মূল বক্তব্যকে এভাবেও দাঁড় করানো যায়—ধর্মীয় যে শিক্ষাটা দেওয়া হচ্ছে মাদরাসাগুলোতে, সেটার পাঠদান পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করলে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এ শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করতে পারবে।

মাদরাসা শিক্ষা বিষয়ে লিখতে গিয়ে একটা ভয় ও দায়বদ্ধতা থাকত ছফার। সেটা তাঁর লেখায়ই মূর্ত হয়ে ওঠে—’মাদ্রাসা সম্পর্কে ঢালাওভাবে খারাপ মন্তব্য করা আমার ইচ্ছা নয়। এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ মাদ্রাসার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষার একটা সংযোগ মনে মনে পোষণ করেন। সুতরাং মাদ্রাসা সম্পর্কে কোনো কিছু অন্যায্য বলে ফেললে তাঁদের প্রাণে চোট লাগার কথা। জমানা অনেক পাল্টে গেছে। আমাদের গ্রামে, গ্রামে কেন, শহরের জীবনে ক্ষমতা-কাঠামোতেও মাদ্রাসা একটি ভূমিকা পালন করছে, সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই।’ (আধুনিক আরবী-ফার্সী ও আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা, ১৯৯৪)

আহমদ ছফা এমন এক সময় এই কথাগুলো বলেছেন, যখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও কথিত বুদ্ধিজীবী সুশীল শ্রেণি মাদরাসা-শিক্ষাব্যবস্থাকে কোনো গোণায়ই ধরত না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জাড়ানো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে একপেশে ও নেতিবাচক বক্তব্য ছাড়া কোনো ধরনের আলাপই যেখানে করা হতো না, আহমদ ছফা সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি তুলনামূলক নিরপেক্ষ একটা জায়গা থেকে সেখানে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনভঙ্গিতে মাদরাসা শিক্ষিতরা খানিকটা নাখোশ হলেও ৮০ ও নব্বইয়ের দশকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে যে-কথাগুলো তিনি বলে গেছেন, আজকের এ সময়ে এসে মাদরাসা ঘরানার ভেতর থেকেই সে-রকম আওয়াজ উঠছে।

আগের সংবাদইসরাইল থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস কিনবে সৌদি আরব
পরবর্তি সংবাদবাঙলাদেশের মাদরাসাশিক্ষা নিয়ে আহমদ ছফার চিন্তা-ভাবনা