বাঙ্গি চাষে সাফল্য : রাঙ্গুনিয়ার হাজারী বিলের বাঙ্গি যাচ্ছে সারাদেশে

বাঙ্গি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘বাকী’। নামে বাকী হলেও বাস্তবে এই বাঙ্গি বিক্রি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের হাজারী বিলের কৃষকরা নগদ অর্থের সফল মালিক হয়েছেন। বাঙ্গি চাষে স্বচ্ছলতা ফিরেছে ইউনিয়নটির তিন গ্রামের প্রায় ৫’শ পরিবারের। ইউনিয়নটির বিখ্যাত গোয়াছপাড়া গ্রামের হাজারী বিলের প্রায় অর্ধশতাধিক হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে বাঙ্গি ও তরমুজ। প্রতি চল্লিশ শতক বাঙ্গি চাষে ব্যয় হয় মাত্র দশ থেকে বিশ হাজার টাকা। ফলন ফলার পর প্রতি হেক্টরেই খরচ বাদে লাভ হয় প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা।

সরেজমিনে গতকাল ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ইছামতি খালের পাড় ঘেষে পারুয়া ইউনিয়নের হাজারী বিলের গোয়াছপাড়া, পূর্ব সাহাব্দিনগর ও সৈয়দনগর গ্রামটির বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে চাষ হয়েছে বাঙ্গির। বর্তমানে গোয়াছপাড়া গ্রামে প্রায় সবাই বাঙ্গি চাষের সাথে সম্পৃক্ত। চৈত্র-বৈশাখ মাস এলেই বাঙ্গির মৌ মৌ গন্ধে মোহিত হয় গোয়াছপাড়া গ্রাম। এই গাঁয়ের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে গেলে বাঙ্গির সু-ঘ্রাণ ভেসে আসে নাকে। সকাল সকাল বাঙ্গি বাজারজাত করতে অনেক কৃষক রাতে টংঘর বেঁধে মাঠেই থেকে যায়। ভোর থেকেই মাঠে বাঙ্গি তোলতে ব্যস্ত সময় পার করেন কৃষকরা। কেউ কেউ সড়কে অপেক্ষমান সিএনজি অটোরিক্সায় তুলছেন বাঙ্গি। অনেকে কাঁদে ও মাথায় ভাড় করে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ভোর থেকেই পারুয়া ডিসি সড়কের দুই পাশে সারি সারি বাঙ্গি’র স্তুপ সাজিয়ে বসে আছেন কৃষকরা। বিভিন্ন পরিবহন নিয়ে পাইকারী বাঙ্গি কিনতে এসেছে দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা। দরদাম করে বিভিন্ন ছোট-বড় যানবাহনে হাজারী বিলে উৎপাদিত এসব বাঙ্গি চলে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে। কৃষকরা জানান, চট্টগ্রামের বাইরের কোন কোন পাইকারী ব্যাবসায়ী বিলশুদ্ধ বাকী এককালীন ক্রয় করে নিয়ে যায় ঢাকা সহ বিভিন্ন জায়গায়। প্রতিবছর পৌষ মাস আসলে কৃষকরা আগের বছরের সংগৃহীত বাঙ্গি বীজ দিয়ে শুরু হয় চাষাবাদ। লাগানো বীজ থেকে কয়েকদিনের মধ্যে বের হয় অঙ্কুর। টানা দুই থেকে আড়াই মাস পরিচর্যার পর লতা ছড়িয়ে সারা মাঠে ফুল ধরে ফলন দিতে শুরু করে। চৈত্র মাসের শুরু থেকে বাঙ্গি খাওয়ার উপযুক্ত হয়। আর তখন থেকে বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত চলে বাঙ্গির বিকিকিনি।

মুহাম্মদ আলাউদ্দিন খোকন (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ) বলেন, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর পরই জমিতে রোপণ করা হয় বাঙ্গি বীজের। ৪/৫ মাস নিয়মিত পরিচর্যা করার পর প্রথম দিকে বাঙ্গি গাছে ফুল আসে এবং ফল ধরা শুরু করে।তাতে পরিপূর্নতা আসে চৈত্র মাসে । চাষীরা পুরো এক মাস বাঙ্গি তুলতে পারেন গাছ থেকে। প্রতিটি গাছ দুই থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

৬০ বছর বয়সী কৃষক মো. ইব্রাহীম বলেন, ‘এবার তিন কানি (এক বিঘা) জমিতে বাঙ্গির চাষ করেছি। সবমিলিয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা মতো খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত আশি হাজার টাকার বাঙ্গি বিক্রি করেছি। আরো প্রায় ২০/৩০ হাজার টাকার বাঙ্গি এখনো রয়েছে।’

অপর কৃষক আব্দুল কুদ্দুছ বালি (৪০) বলেন, ‘আমাদের বাঙ্গি বীজ নিজেরাই সংগ্রহ করে রাখি পরবর্তী বছরের জন্য। গতবছর বৃষ্টি ও শীল পড়াতে বাঙ্গি চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। তবে চলতি বছরে বাঙ্গির উৎপাদন থেকে প্রচুর লাভ হয়েছে।’

পারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘উপজেলায় একমাত্র পারুয়াতেই বাঙ্গি চাষ হয়। হাজারী বিলের এই বাঙ্গি চাষের সাথে প্রায় ৫-৬ শত পরিবার সম্পৃক্ত। উৎপাদিত এই বাঙ্গি উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ আশপাশের উপজেলা ও সারা বাংলাদেশে রপ্তানি হয় পারুয়ার বাঙ্গি।’