ভারতবর্ষে ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের ধারা : সূচনা ও বিকাশ

তুহিন খান

( ভারতবর্ষে দেওবন্দি ঘরানায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা আলেম হিসেবে পরিচিতি পেলেও এর বাইরেও আলেমদের আরও গুরুত্বপূর্ণ ধারা আছে। যাদের সাথে দেওবন্দের সরাসরি কোনো বিরোধ নেই। এই ধারার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রবল। বাংলাদেশে নব্বই দশকের পরে ধর্মীয় শিক্ষিতদের মধ্যে সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় গতি আসে। পাশাপাশি মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় মিলনকামী ধারার সক্রিয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে প্রেক্ষিতে এই অঞ্চলের ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের ধারার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খোঁজ নেওয়া জরুরি হয়ে ওঠে। যাতে বর্তমান সাহিত্যিক-বুদ্ধিবৃত্তিক-মিলনকামী ধারার উত্তরাধিকার স্পষ্ট হয়ে যায়। ) 

বৃটিশরা এই উপমহাদেশ থেকে চলে যায় ১৯৪৭ সালে। এর মধ্যে, বৃটিশ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্কুলগুলোয় আসে বহুবিধ পরিবর্তন। প্রায় ২০০ বছরের বৃটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে এক নতুন যুগবাস্তবতার মুখোমুখী হয় প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠান ও ঘরানা। এই পরিবর্তন কারো জন্য হয়ত ভালো হয়, কারো জন্য হয়ত খারাপ। কিন্তু এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার কোন উপায় আমাদের নাই।

১৮৬৬ সালে বৃটিশ শাসন ও পশ্চিমের কালচারাল হেজিমনির বিরুদ্ধে মুসলমানদের নিজস্ব শিক্ষা, দীক্ষা ও জ্ঞানকাণ্ডের চর্চা, অনুশীলন ও সংরক্ষণের কেন্দ্র হিশাবে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক রাষ্ট্রে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিশেবে গড়ে ওঠে। ‘আধুনিক’ শিক্ষাব্যবস্থার সাথে এক ধরণের ছেদ ঘটে ধর্মীয় শিক্ষার। ভারতীয় উপমহাদেশে পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলি ‘কওমি মাদ্রাসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বিগত প্রায় দেড়শ বছর যাবত, কওমি মাদ্রাসাগুলিকেই এই উপমহাদেশের ধর্মীয় অথরিটি হিশেবে এই অঞ্চলের জনগণ মেনে নিয়েছে। যদিও আমাদের দেশে আরো অনেক ঘরানার ব্যক্তিত্বরা ছিলেন ও আছেন, কিন্তু ‘আলেমসমাজ’ বা ‘উলামা’ বলতে যে বৃহত্তর বর্গটি আমাদের এখানে ধর্মীয় সকল বিষয়-আশয়ে জনগণের নেতৃত্ব দেন, তারা মোটাদাগে কওমি মাদ্রাসারই সন্তান।

আলেম-উলামা : ঐতিহ্যবাদী ধারার বিকাশ

আগেই বলে এসেছি, বৃটিশ শাসন এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়েছে। লর্ড ম্যাকলের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থায় উপেক্ষিত হয়েছিলো দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ। পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানকাণ্ডের প্রতি এক ধরণের অভক্তি ছিল এদেশের আলেমসমাজের, সেটা ছিল একইসাথে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চেতনার অংশ। বৃটিশ অধিকৃত ভারতে ‘ইংরাজি শিক্ষা হারাম’ ফতোয়া কেবল ধর্মীয় ব্যাপারই ছিলো না, সেসময়ের প্রেক্ষাপটে এর রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল ভেবে দেখার মতই। যদিও সেসময় কেউ কেউ, যেমন স্যার সৈয়দ আহমদ, চেষ্টা করেছিলেন এই দুইয়ের সমন্বয় সাধনের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব প্রতিষ্ঠান তাদের ধর্মীয় আবেদন বা ইসলামি জ্ঞানচর্চার সিলসিলা খুব বেশি ধরে রাখতে পারে নাই। বাঙলাদেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর কথাও উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কওমি মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করে বের হওয়া ‘আলেম-ওলামা’ বর্গটিই শেষ পর্যন্ত এদেশে ধর্মীয় অথরিটি হিশেবে টিকে গেছেন।

আরও পড়ুন : জামালউদ্দিন আফগানি ও তাঁর প্যান ইসলামিজম চিন্তা 

কওমি আলেমদের মধ্যে যাদের আমরা বলছি ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ বা ‘ঐতিহ্যবাদী’, তাদের পরিচয়টা একটু বোঝা দরকার। চিন্তার সকল স্কুলেই ‘স্টাব্লিশমেন্ট’ আর ‘এন্টি-স্টাব্লিশমেন্ট’ দ্বন্দ্ব আছে। আমাদের এইখানেও, শিল্প-সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবী মহলে এই দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। ‘ঐতিহ্যবাদী’ ধারা বলতে আমরা, আলেমসমাজের ‘স্টাব্লিশড’ ধারাকেই মূলত নির্দেশ করছি (যদিও ব্যাপকতর অর্থে আলেমরা এদেশে ‘স্টাব্লিশমেন্ট’র পক্ষের লোক না, সে ভিন্ন তর্ক)।

সর্বপ্রথম আলেমদের এই বর্গ বিভাজন কে করেছিলেন, তা গবেষণাসাপেক্ষ ব্যাপার। ড. আহমদ আমিন তার ‘দুহাল ইসলাম’ এবং ‘ফাজরুল ইসলাম’ সিরিজের বইগুলোতেই সম্ভবত প্রথম ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ এবং ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ইসলামি স্কলারদের বর্গ বিভাজন করেন। তার মতে, উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফতের সময়ে, মুহাদ্দিসরা ছিলেন ট্রাডিশনালিস্ট, বিপরীতে ‘ফকিহ’ ও বিশেষত মুতাযেলিদের তিনি ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার প্রয়াস পান। তার এই বিচারের সাথে আমরা যদিও একমত নই৷ মুতাযেলি ধারায়ও অনেক ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমের দেখা আমরা পাই। সেই অর্থে, আহমদ আমিনের এই বিচারকে আমরা তার ব্যক্তিগত বিবেচনাই মনে করি।

তবে, তার এই বর্গ বিভাজন থেকে আমরা কিছুটা রসদ পেতে পারি। সাধারণত ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ বলতে আমরা বর্তমানে সেইসব আলেমদের বুঝি, যারা—

১. দেওবন্দের আদর্শ ও ঐতিহ্য, তাদের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির প্রতি ক্রিটিকাল না হয়েই, তা গ্রহণে অভ্যস্ত।

২. প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে থেকেই, দরস-তাদরিস এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই যাদের ধর্মীয় চিন্তা সীমাবদ্ধ।

৩. যারা এদেশের ‘ইসলামিক জনগণ’র মন-মানসে প্রতিষ্ঠিত পপুলার ইসলামচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন।

৪. আধুনিক ইসলামপন্থা এবং অন্যান্য প্রপঞ্চ—যেমন, শিল্প-সাহিত্য বা ক্রিটিকাল থিংকিং—এর বিপরীতে যারা ঐতিহ্যবাদী ধারার ইসলামচিন্তাকে অগ্রাধিকার দেন।

৫. রাজনৈতিক কর্মপন্থার ক্ষেত্রে, যারা বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে ইসলামের রাষ্ট্রপ্রকল্পের কোন বুদ্ধিবৃত্তিক সমঝোতা ছাড়াই বিদ্যমান রাষ্ট্রপ্রকল্পকে মেনে নেন, ইসলামের ওপর সরাসরি আঘাত না হানার শর্তে।

এগুলো মোটাদাগে ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য। প্রধানত দেওবন্দ থেকেই এই ঘরানার উত্থান ও বিকাশ। ইতিহাসের দিকে তাকালে খুব স্পষ্টই আমরা দেখতে পাই, দেওবন্দের রুহানি পূর্বসূরীদের অনেকেই এই ট্রাডিশনাল ধারার ভেতরে থেকেও ভিন্ন চিন্তাপদ্ধতিকেও গ্রহণ করেছিলেন, যেমন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবি। অবশ্য, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে, যখন ভারতকে ট্রাডিশনাল আলেমরা মনে করতেন ‘দারুল হরব’ বা ‘শত্রুকবলিত ভূমি’, তখনকার সময়ে ট্রাডিশনাল আলেমরাই বিপ্লবীদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিপরীতে, সেই সময়ে উপমহাদেশের অন্যান্য অনেক ধারার আলেমরা সরকারের পক্ষে থেকে এক ধরণের ‘স্টাব্লিশমেন্ট’র পক্ষের শক্তি হিশাবে কাজ করেন। ধরা যাক, স্যার সৈয়দ আহমদের কথাই। তার ‘আলীগড় আন্দোলন’, বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, দেওবন্দের চাইতে কম র‍্যাডিকাল ছিল বলেই আমাদের মনে হয়। বিপরীতে দেওবন্দ ঘরানার আলেমগণ সেসময় ছিলেন এন্টি-স্টাব্লিশমেন্টের ভূমিকায়। কিন্তু এটা মূলত রাজনৈতিক অবস্থানের আলাপ। এই লেখায় আমরা আলোচনা করব, প্রধাণত চিন্তা ও চর্চার জগতে ‘নন-ট্রাডিশনাল’ ধারাটি নিয়ে।

আশা করি, এ পর্যন্তের আলাপে আমরা ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ ও ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ বর্গগুলোর একটি মোটামুটি ধারণা তৈরি করতে পেরেছি। এই বর্গ বিভাজন প্রথাগত ‘স্টাব্লিশমেন্ট’-‘এন্টি-স্টাব্লিশমেন্ট’ বিভাজনের মত নয়।

এই বর্গ বিভাজন প্রথাগত ‘স্টাব্লিশমেন্ট’-‘এন্টি-স্টাব্লিশমেন্ট’ বিভাজনের মত নয়। এর চারিত্র‍্যলক্ষণে কিছু ফারাক রয়েছে। ট্রাডিশনাল আলেমরা প্রায় সকলেই যেমন এদেশে ইসলামের চর্চা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ও রাখছেন, ঠিক তেমনি, ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’রাও চিন্তা ও চর্চার ময়দানে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এই কোন বর্গেরই কোনরকম সমালোচনা আমাদের এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। উপমহাদেশে এবং বাঙলাদেশে, ইসলামি চিন্তার যে ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারাটি ইসলামি চিন্তার ইতিহাসে এখনও প্রায় অস্পষ্ট, উপেক্ষিত—তাদের আলাপে নিয়ে আসাই আমাদের এই লেখার প্রধান লক্ষ্য।

ইসলামি চিন্তার ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারা : তাঁরাও দেওবন্দেরই সন্তান

যাদের আমরা ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ বলছি, এই লেখায়, তারা বাইরের কেউ নন, দেওবন্দের ভেতরেরই সন্তান। বৃটিশ ভারতে দেওবন্দের সমান্তরালে ইসলামি চিন্তা ও চর্চার অন্য যে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলো, সেটি হল ‘নদওয়াতুল ওলামা’। দেওবন্দ ও নদওয়ার এই আলাদা দুটি স্কুল কোন ধর্মীয় মতানৈক্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বরং, ১৮৯৩ সালে মাদরাসা ফয়জ-ই-আম এর যেই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ‘নদওয়াতুল ওলামা’ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আশরাফ আলি থানুবির মত নন্দিত ব্যক্তিত্ব, যিনি দেওবন্দেরই অন্যতম একজন প্রতিনিধি। দেওবন্দী ধারার আলেমরাই তৈরি করেছিলেন নদওয়াতুল ওলামা। তাহলে নদওয়া আর দেওবন্দের ফারাক কই?

ফারাকটি হল চিন্তা ও কর্মপন্থা নির্ধারণের জায়গায়। নদওয়াতুল ওলামার মটো বা নীতিবাক্যটি হলো—’ইলাল ইসলাম মিন জাদিদ’ (ইসলামের পথে নতুন যাত্রা)। এই নীতিবাক্য থেকেই তাদের উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট হয়। দেওবন্দ ছিল আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে ইসলামের মূল শিক্ষা, কোরান-হাদিসের চর্চা এবং ট্রাডিশনাল কালচার ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিপ্লব। দেওবন্দ মোঘল আমলের সেই ইসলামি শাসন ও খেলাফতের স্বপ্নই দেখত এবং দেখাতো, রাজনৈতিকভাবে এই ছিল তাদের চর্চা। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর বাস্তবতা বিংশ শতাব্দী নাগাদ স্পষ্ট হয়ে যায়। এই আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কীভাবে ইসলামের চিন্তা ও চর্চাগুলি অগ্রসর হবে? আমরা কি আঞ্চলিকভাবে এই প্রশ্নগুলির মোকাবেলা করব, না বৈশ্বিকভাবে? সেক্ষেত্রে, শিক্ষার মিডিয়াম হিশাবে কোন ভাষাকে আমরা প্রাধান্য দেব? চিন্তা ও চর্চার কৌশল হিশাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর রুপরেখা কেমন হবে বা হওয়া উচিত? এইসব প্রশ্নের কর্মপদ্ধতিগত মতভেদ ছিল নদওয়া ও দেওবন্দের মধ্যে।

আরও পড়ুন : হাসান তুরাবি : আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের রূপকার

নদওয়া প্রধাণত বিংশ শতকের জনপ্রিয় প্যান-ইসলামিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত ছিলো, যেখানে দেওবন্দ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে আঞ্চলিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও চর্চিত ইসলামি চিন্তার প্রতি অধিক অনুরাগী। সেই চিন্তাপদ্ধতির প্রভাব আমরা এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মিডিয়ামেও দেখি—দেওবন্দে যেখানে দীর্ঘদিন উর্দু ও ফারসিকে শিক্ষার মিডিয়াম হিশাবে প্রধান স্থানে রেখেছিল, সেখানে নদওয়া শুরু থেকেই ক্লাসিকাল ও মডার্ন আরবিকে গ্রহণ করে তাদের শিক্ষার মাধ্যম হিশেবে। ওলি-আউলিয়াদের পূণ্যভূমি ভারত উপমহাদেশ। দেওবন্দের চিন্তা ও চর্চার ভিত্তিমূলে আঞ্চলিক ওলি-আউলিয়াদের চিন্তার প্রভাব গভীর। নদওয়া আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে না একদমই। কিন্তু এর পাশাপাশি, আধুনিক রাষ্ট্রে চিন্তাপদ্ধতি যে যুক্তিবদ্ধ ও কাঠামোগত রুপ ধারণ করছিলো, নদওয়া কেবলমাত্র রুহানিয়াত দিয়ে তার মোকাবেলাকে যথেষ্ট মনে করেনি, রুহানিয়াতের সাথেসাথে, জ্ঞান, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও আধুনিক পৃথিবীর সাপেক্ষে ইসলামকে আরো অধিকতর শক্তিশালী উপায়ে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের জন্য এক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বীক্ষা ছিল তাদের আদর্শের মূলভিত্তি। বৃটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তাপদ্ধতির সাথে যে ছেদ ঘটে ধর্মীয় শিক্ষার, নতুন যুগ বাস্তবতার নিরিখে তাকে পুনঃবিবেচনা করা এবং আধুনিক চিন্তাপদ্ধতির সাথে ইসলামের বোঝাপড়ার নতুন পন্থা ও পদ্ধতি চিন্তা করাই ছিল নদওয়ার প্রধান লক্ষ্য ও আদর্শ।

সেমতে বলা যায়, ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ এই ধারাটি মোটেই দেওবন্দী ধারার বিরোধী কেউ নয়, বরং এরা দেওবন্দেরই সন্তান। কিন্তু দেওবন্দের চিন্তাভাবনা, চর্চা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে ব্যাখ্যা ‘ট্রাডিশনালিস্ট’রা দেন বা করেন, নদওয়া বা ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’রা ভাবেন, সেই চিন্তার সাথে সংযোজন, বিয়োজন বা নতুন কর্মপন্থা যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে সেগুলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার। এখানে উল্লেখ্য এই যে, ‘মোডারেট মুসলমান’ বা ‘গুড মুসলিম’ নামে যে টার্মগুলো একবিংশ শতকে রাজনৈতিকভাবে উদ্ভাবিত হয়েছে, সেগুলো নিছকই ‘ওয়ার অন টেরর’জাত রাজনৈতিক ব্যাপার। এর সাথে আমাদের আলোচিত এই ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারাটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারা : বৃটিশ ভারত

বৃটিশ ভারতে মুসলমানদের অবস্থা ছিল করুণ। ক্ষমতা ও জৌলুশ হারানো মুসলমানরা হতাশা, আত্মাভিমান আর নির্যাতনে জর্জরিত ছিলো। সেসময় আলেমসমাজের ট্রাডিশনাল-নন ট্রাডিশনাল ধারা একাকার হয়ে যায়। ঐক্যবদ্ধভাবে আলেমসমাজ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবির পুত্র শাহ আব্দুল আজিজ ভারতকে ‘দারুল হরব’ ঘোষণা করেন। সেসময় তুলনামূলক সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির পক্ষ থেকে ভারতকে ‘দারুল ইসলাম’ বলা হলেও, দেওবন্দি আলেম-ওলামাদের অবস্থান ছিল এর বিপক্ষেই।

সেসময়, এই ফতোয়া জারির কালে, এবং তারও পরে অনেক সময় পর্যন্ত, ভারতের আলেমরা মুসলিম রাজত্ব পুনরুদ্ধারের কথাই ভাবতেন। আধুনিক রাষ্ট্রের চারিত্র‍্যলক্ষণগুলি তখনও উপমহাদেশে প্রকট হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ১৮৫৭ সালে শামেলির ময়দানে পরাজয়ের পরপরই আলেমরা বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ দিয়ে এই লড়াই জয়ের স্বপ্ন আপাতত শেষ, এবং ভূ-ভারত, সমগ্র পৃথিবীর মতই, প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক নতুন বাস্তবতায়, যার রুপকার মূলত ইওরোপ। ফলে তখন থেকেই এক ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের সূচনা করেন আলেমসমাজ।

বৃটিশ ভারতে আলেমদের ঐতিহ্যবাদী ধারাটির সিদ্ধান্ত ছিল, ভারত অবশ্যই দারুল হরব, কিন্তু সরকার যতখন পর্যন্ত ইসলামের উপর সরাসরি আঘাত না করছে ও সামগ্রিক সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ ফরজ নয়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তার ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলিমস’-এ এরকমই লিখেছেন। রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র ও সরকারের সাথে সহাবস্থানের এই নীতিই তখন মূলধারার আলেমরা গ্রহণ করেন। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেওবন্দের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপই হয় ঐতিহ্যবাদী আলেমদের নীতি। বৃটিশদের ভারতত্যাগ যত এগিয়ে আসতে থাকে, এবং পাকিস্তান প্রশ্ন যত প্রকট হতে থাকে, ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ ও ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ বর্গ দুটির চারিত্র‍্যলক্ষণ—যা বৃটিশ ভারতে অতটা সুস্পষ্ট ছিল না—ততই স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।

পাকিস্তান আন্দোলন ও পাকিস্তান আমল

পাকিস্তান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও চিন্তাগতভাবে আলেমসমাজের মতানৈক্য ঘটে। দেওবন্দকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ট্রাডিশনাল আলেমদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসময় কংগ্রেসের মত অখণ্ড ভারতকে সমর্থন করেন। ভারত উপমহাদেশে সাতশো বছরের মুসলিম শাসনের সোনালি স্মৃতি এবং এই অঞ্চলে মুসলমানদের শান-শওকতের চিন্তা ও কল্পনা ‘ঐতিহ্যবাদী’ আলেমদের মধ্যে ছিল প্রবল। ফলে, বৃটিশমুক্ত ভারতকে তারা কোন শত্রুভূমি বা হিন্দুরাষ্ট্র ভাবতে পারেন নাই। কিন্তু এর বিপরীতে, বাঙলা মুলুকের অবস্থা ছিল ভিন্ন।

পূর্ব বাঙলার মুসলমানরা চিরকালই ছিল নির্যাতিত। বৃটিশ আমলে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’র ফলে হিন্দু জমিদারদের যে শোষণ-নীপিড়নের শিকার হয় তা থেকে এই অঞ্চলের দলিত হিন্দুরাও রেহাই পায়নি। ফলে, বঙ্গ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র‍্যের অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন, যা চরিত্রে ধর্মীয় হলেও এবং যার নেতৃত্ব্বে আলেমরা থাকলেও, সেগুলো তখন হয়ে উঠেছিল বাঙলাদেশের প্রাণের আন্দোলন। হাজি শরিয়তুল্লাহর (১৭৮১-১৮৪০) ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের (১৭৮২-১৮৩৮) কৃষক আন্দোলন ছিল এই ধরণের আন্দোলন। এরা দুইজনই সরাসরি আরব থেকে ধর্মশিক্ষা করেছিলেন এবং বালাকোটের শহিদ সৈয়দ আহমদ বেরলভি (১৭৮৬-১৮৩১) এর আদলে ইসলামি সংস্কার ও বৃটিশবিরোধী সংগ্রাম শুরু করেন। ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ দেওবন্দি ধারার আলেম ছিলেন না এরা। কিন্তু বাঙলার ধর্মীয় সংস্কারের ইতিহাসে এরা গুরুত্বপূর্ণ।

মোঘল আমলেও বাঙলা কখনোই রাজনৈতিকভাবে মোঘল আধিপত্য মেনে নেয় নাই। এদেশের সাধারণ মুসলমানসমাজই মোঘলদের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। বার ভূঁইয়াদের আন্দোলন এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ফলে, মোঘল এম্পায়ার নিয়ে কোন ধরণের রাজনৈতিক ফ্যান্টাশি বাঙলার মুসলমানদের ছিলো না। আবার, বৃটিশদের সমান্তরালেই হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের দ্বারাও তারা ছিলেন ব্যাপকভাবে নির্যাতিত। তাই পাকিস্তান আন্দোলনের প্রশ্নে তারা ব্যাপকভাবে মুসলিম লীগকে সমর্থন করে।

পাকিস্তান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। দেওবন্দি আলেমদের মধ্যে মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন দেন। যুফার আহমদ উসমানি, শিব্বির আহমদ উসমানি, মুফতি শফি রহ.-সহ আরো অনেক দেওবন্দি আলেম পাকিস্তান মুভমেন্টকে সমর্থন করেন। এসময় মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানির নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠিত হয়।জমিয়তে উলামায়ে বাংলা গঠিত হয় ১৯২১ সালে, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাকালীন সেক্রেটারি। এটি ছিল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দেরই প্রাদেশিক শাখা। কিন্তু সঙ্গত কারণেই, পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙলার আলেমদের এই সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে সমর্থন করে।

এমন নয় যে, যারা অখণ্ড ভারতের সমর্থক ছিলেন তারা সকলেই ট্রাডিশনাল আলেম ছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদও অখণ্ড ভারতের সমর্থক ছিলেন, বিপরীতে ট্রাডিশনাল ধারারই অন্যতম ব্যক্তিত্ব আশরাফ আলি থানুবি ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। কিন্তু, সার্বিক বিবেচনায়, পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে অংশ নেওয়া ধারাটির ভেতর থেকেই পরবর্তীতে পাক-বাঙলায় ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের ধারাটি ব্যাপকভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভারত ও পাকিস্তান আমলের কয়েকজন ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেম

আমরা যেহেতু চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের কথা লিখছি, তাই রাজনৈতিক আলাপ আর বাড়াবোনা। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার আগেও এদেশে ইসলামি শিক্ষা ও পির-মাশায়েখ ধারার বিপুল সংখ্যক আলেমদের একটি জামাত ক্রিয়াশীল ছিলেন। আবার পরবর্তীতে আলিয়া মাদ্রাসা থেকেও হক্কানি ওলামাদের একটি জামাত তৈরি হয়েছে। চিন্তা ও আদর্শিকভাবে দেওবন্দিরা আপহোল্ড করে, এমন কয়েকজন আলেমের কথাই আমরা এখানে বলব।

বৃটিশ ভারতে ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ স্কুল অব থটের মধ্যে প্রথমেই আসে নদওয়াতুল ওলামার নাম। নদওয়াতুল ওলামা এবং এর শীর্ষ মনীষী সাইয়েদ সোলায়মান নদভি (১৮৮৪-১৯৫৩), শিবলি নুমানি (১৮৫৭-১৯১৪) ও সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ. (১৯১৪-১৯৯৯) উপমহাদেশে ‘ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারার সমান্তরালেই চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির এক নতুন ধারার সূচনা করেন। এই ধারাটির বৈশিষ্ট্য ছিল মোটাদাগে এমন—

১. মূলনীতিগত প্রশ্নে কঠোর ও অবিচল থেকে পুরাতন বিশ্বের সাথে আধুনিক বিশ্ববাস্তবতার সেতুবন্ধন।

২. ঐতিহ্যবাদী ধারার শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তাপদ্ধতির আদর্শিক সমন্বয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মুসলিম সমাজ গঠন।

৩. ঐতিহ্যবাদী ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রপঞ্চগুলোকে কেবল ফিকহ ও নীতিশাস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা না করে, আধুনিক চিন্তাপদ্ধতি ও ঐতিহাসিকতার নিরিখে মোকাবেলা করা।

৪. ক্ল্যাসিক ও মডার্ন, উভয় আরবিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং একে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিশেবে গ্রহণ।

৫. প্যান-ইসলামিক মতাদর্শের অংশ হিশেবেই, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ তৈরি করা।

এদের মধ্যে যিনি ভারতের চিন্তা ও চর্চার জগতে সবচে কার্যকরী ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য অবদান রাখেন, তিনি সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি। মোঘল ও আফগানদের মাধ্যমে শাসিত ভারতবর্ষের জ্ঞানচর্চার মারকাজগুলির সাথে আরববিশ্বের আপাতঃবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, বিপরীতে ইরান ও পারস্যের সুফিবাদ ও ফালসাফাভিত্তিক ইসলামের প্রসার ঘটেছিল। আধুনিক বিশ্বে ইসলামের কার্যকরী চিন্তা ও চর্চা জারি রাখা এবং ইসলামের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে, কোন আঞ্চলিক শক্তির পরিবর্তে বৈশ্বিকভাবে একটি ইসলামি জাগরণে বিশ্বাস করতেন আলি মিয়া।

তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, এই জাগরণের নেতৃত্ব দেবে আরববিশ্বই, ভারত কিংবা ইরান নয়—যা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো’র ভূমিকা ও উপসংহারে বেশ স্পষ্ট করেই লেখা আছে। তিনি এও বিশ্বাস করতেন, আধুনিক চিন্তাপদ্ধতি ও বিশ্বব্যবস্থার সর্বাত্মক মোকাবেলার জন্য উপমহাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানকাণ্ড এদেশের জন্য উপযোগী হলেও, সার্বিক বিচারে যথেষ্ট নয়। বরং, ইওরোপের নেতৃত্বে উত্থান ঘটা এই আধুনিক বিশ্বের মোকাবেলা করার জন্য চাই আরো ব্যাপক ও সর্বাত্মক প্রস্তুতি। আলি মিয়ার সারাজীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যেই তিনি এই চিন্তার ছাপ সফলভাবে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তাই ভারতের দেওবন্দ থেকে নদওয়া, জামায়াত ইসলামি থেকে তাবলিগ জামাত, ইখওয়ানুল মুসলিমিনের নেতা সাইয়েদ কুতুব বা ইউসুফ কারজাভি থেকে সেক্যুলার আহমদ আমিন—সকলের কাছেই তিনি সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন।

বৃটিশ ভারতে, দেওবন্দিদের মধ্যে সুপরিচিত ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ আলেমদের মধ্যে আরেক বিখ্যাতজন হলেন আব্দুল মাজিদ দরিয়াবাদি রহ., যার রাহনুমা ও চিন্তা আলি মিয়া নদভির জীবনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। নদওয়ার শিক্ষক-ছাত্রদের বাইরেও, দেওবন্দের ভেতরেই ছিলেন এই ধারার আরো অনেক আলেম। মাওলানা মানাযির আহসান গিলানি (১৮৯২-১৯৫৬) ছিলেন এই ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। দেওবন্দে লেখাপড়া শেষ করে সেখানেই দরসের সাথে মাওলানা যুক্ত হন। হায়দ্রাবাদের এক সফরে শিবলি নুমানির ছাত্র ও ভাই মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহি (১৮৬৩-১৯৩০)-র সান্নিধ্যে আসেন। মাওলানা ফারাহি নিজেও ছিলেন এই ধারার মশহুর আলেম, প্রায় ৫০ বছর ধরে যিনি কোরান নিয়ে গবেষণা করেন এবং কোরানের ‘নাযম’ বা শব্দসঙ্গতি, ধারাক্রম, ঐক্য এবং সাযুজ্যের উপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে পশ্চিমা ক্রিটিকদেরও সমীহ আদায় করে নেন। ‘নাযম উল কুরান’র উপর তার এই কাজ ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারার প্রায় সকল আলেম, এমনকি মাওলানা মওদুদিরও প্রশংসা লাভ করে।

ফারাহির সান্নিধ্যে এসে গিলানি রহ. এর চিন্তাধারা নতুনভাবে গঠিত হয়। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি হায়দ্রাবাদের জামিয়া উসমানিয়ায় চলে আসেন। তার ‘নিযামে তালিম ওয়া তারবিয়াত’ গ্রন্থের উপর আলোচনা করতে গিয়ে সুলায়মান নদভী তার চিন্তাধারা সম্পর্কে বলেন, ‘মাওলানার পড়াশোনা দেওবন্দে হলেও, তার চিন্তাধার নদওয়াতুল ওলামার।’ এ নিয়ে দেওবন্দের মাওলানা সাঈদ আহমদ প্রতিবাদ করলে সেই প্রতিবাদকে গিলানি রহ. ‘অহেতুক সমালোচনা’ বলে উল্লেখ করেন। (মাকালাতে গিলানি, পৃ: ১০-১১)।

মাওলানা মানাযির আহসান গিলানি ছাড়াও, এই ধারার অন্যতম প্রধান পুরুষ ছিলেন মাওলানা মনযূর নুমানি রহ.। মাওলানার জীবন ও কর্মের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার দিকে তাকালেই এই কথার সত্যতা মেলে। দেওবন্দে আনওয়ার শাহ কাশ্মিরির কাছে হাদিসের পাঠ শেষ করে, মাওলানা নদওয়াতুল ওলামায় শায়খুল হাদিস পদে যোগ দেন। এসময় তিনি আবুল হাসান আলি নদভির ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। আলি মিয়ার ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ চিন্তাভাবনার কারণেই হয়ত, জামায়াতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

উভয়েই প্যান-ইসলামিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায়, তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। মনযূর নুমানি রহ.-ও আবুল আলা মওদুদির ঘনিষ্ঠ সাথী হয়ে ওঠেন, এমনকি, তিনি ছিলেন ‘জামায়াতে ইসলামি’র একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রতিষ্ঠাকালীন নায়েবে আমির। মওদুদির সাথে মতবিরোধের জের ধরে তিনি জামায়াত ত্যাগ করেন এবং তাবলিগের সাথে যুক্ত হোন। তার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ‘আল ফুরকান’ ভারতের ধর্মীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে আলোড়ন তৈরি করেছিল। আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদি, মানাযির আহসান গিলানি, আবুল আলা মওদুদি, আবুল হাসান আলি নদভিসহ প্রায় সকল ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারার আলেমদের অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মুখপাত্র ছিল এই ‘আল ফুরকান’।

আরও পড়ুন : কওমি শিক্ষার মানহাজ : পরিবর্তনশীল সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে

মাওলানা আবুল আলা মওদুদিও হয়ত এই ধারারই অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হতে পারতেন। কিন্তু তার প্রাথমিক পর্যায়ের কর্ম-তৎপরতা পরবর্তীতে পালটে যায়। তিনি আধুনিক যুক্তিকাঠামো এবং প্রপঞ্চের দ্বারা অতিরিক্ত প্রভাবিত হয়ে পড়েন, অথবা পরবর্তীতে তার অনুসারীরা নানা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে সঠিকভাবে তার মূল চিন্তাটিকে ধারণ করতে পারেন নাই, যেমনটি তার পুত্র সাইয়েদ হায়দার ফারুক মওদুদি বলেছেন। যার ফলে তার চিন্তাভাবনার পথ ধরেই পরবর্তীতে ‘মোডারেট’ বা ‘গুড মুসলিম’ প্রপঞ্চটি তৈরি হয়, যা ‘ওয়ার অন টেরর’র বয়ান তৈরিতে পশ্চিমাদের সাহায্য করে। এবং একারণেই ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জায়গাটিতে জামায়াত নিজেদের নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।

এই লেখায় আমরা উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে তৈরি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও যুগবাস্তবতা এবং এরই প্রেক্ষিতে এদেশের নানান রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত আলেমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারার উদ্ভব ও বিকাশের তত্ত্ব-তালাশ করার চেষ্টা করেছি। ‘নদওয়া’ বনাম ‘দেওবন্দ’ নয়, বরং এই দুটি ধারার ওভারল্যাপিং ও মিশ্রণের মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে পাকিস্তান ও বাঙলাদেশে বিকশিত হয় আলেমদের এই ‘নন-ট্রাডিশনালিস্ট’ ধারাটি। সেই আলাপ আপাতত তোলা রইল।

লেখক : কবি ও বিশ্লেষক