কওমি শিক্ষার মানহাজ : পরিবর্তনশীল সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে

আশরাফ উদ্দীন খান

শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে মানব সভ্যতার একটি প্রাথমিক ও মৌলিক ব্যবস্থা, যা যুগে যুগে পরিবর্তন ও বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের বর্তমান রুপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবিবর্তনের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, এর প্রথম প্রধান দুই বুনিয়াদ ছিল—এবং বর্তমানেও যা অবশিষ্ট আছে—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এরপর এই দুই বুনিয়াদের সাথে যুক্ত হয় যে জিনিসটি সেটা ছিল পাঠ্যপুস্তক, অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পাঠ্যপুস্তকের সংযোগ ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বুনিয়াদ হয়ে দাঁড়ায় তিন উপাদান। এরপর ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক পরিবর্তন ও সংস্কারের সৃষ্টি হয়। তাত্বিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার দর্শন, উদ্দেশ্য ইত্যাদি নির্ধারিত হতে থাকে, অন্যদিকে ব্যবহারিক ভাবে শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার উপকরণ, শিক্ষার কৌশল, মূল্যায়নসহ নানা বিষয় নিয়ে এখানে গবেষণা ও নিত্য নতুন ধারণার সংযোজন ঘটতে থাকে। আমরা যারা বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আসন ছেড়ে এসে অন্য কোন আসনে অবস্থান করছি, তারা যদি আবার সেই বিদ্যালয়ের আসনে গিয়ে বসি, তাহলে দেখতে পাবো যে, আমাদের সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা, আর বর্তমান সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আবার এখন যারা শিক্ষাদানের পেশার সাথে জড়িত আছেন তারা যদি বর্তমান ছাত্রদের সাথে নিজেদের ছাত্রজীবন তুলনা করে দেখেন তাহলে এই দুই সময় ও জীবনের মধ্যে আমূল পরিবর্তন অনুভব করতে পারবেন। এর মাধ্যমে এই দিকে ইংগিত করা আমাদের উদ্দেশ্য যে, জীবনের অন্যান্য সকল বিষয় ও অবস্থার মত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে চলেছে, নতুন নতুন বিভিন্ন ধারা ও ধারণার সংযোজন ঘটে চলেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ব্যাপক ও প্রসারিত বিষয়, শিক্ষার সাথে যেমন বিভিন্ন বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে, ঠিক তেমনি শিক্ষা বিজ্ঞানের সাথে বিভিন্ন বিজ্ঞান ও শাস্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষার সাথে ভাষা-সংস্কৃতি, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শনসহ আরো নানা বিষয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি শিক্ষা ব্যবস্থার রুপরেখা নিয়ে যখন আলোচনা বা গবেষণা করা হয় তখন স্বাভাবিক ভাবেই নানা বিষয় ও শাস্ত্রের আলোকে সেটা সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা ও গবেষণাও এই সকল বিষয়ের সাথেই সম্পর্কিত। তবে আমরা এখানে শিক্ষার সামগ্রিক দিক নিয়ে বা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি না, বরং এখানে শুধুমাত্র শিক্ষার মানহাজ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে এখানে আমাদের আলোচনার বিষয় কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার মানহাজ বা ‘পাঠ্যবিষয়’।

মানহাজের ধারণা

‘মানহাজ’ (বহু বচন হিসাবে ‘মানাহিজ’ শব্দের ব্যবহার করা হয়) একটি আরবি শব্দ, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Curriculum, যাকে বাংলা ভাষায় ‘শিক্ষাক্রম’ শব্দে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। শিক্ষাক্রম বা মাহাজের অর্থের মধ্যে ব্যাপকতার ধারণা বিদ্যমান রয়েছে, কারণ শব্দটির মাধ্যমে একক কোন অর্থ প্রকাশ করা হয় না, বরং এর মাধ্যমে একটি ব্যাপক অর্থ ও ধারণা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। শিক্ষাক্রমের সাধারণ অর্থ হিসাবে বলা হয়ে থাকে ‘একটি ব্যাপক পদ্ধতি বা ধারা যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যম, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফলতা নিরূপণ করার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত থাকে, সেই সাথে মানহাজের মধ্যে শিক্ষার বিষয়বস্তু, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, শিক্ষাদানে ব্যবহৃত উপকরণ-প্রযুক্তি, শিক্ষা সহযোগী সকল কর্মকান্ড শামিল থাকে।’

আমরা আমাদের সাধারণ ভাষায় বলতে পারি যে, শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান পাঠ্যবিষয়, পাঠ্যপুস্তক, পাঠপদ্ধতি, পাঠদানের উপকরণ-প্রযুক্তিসহ আরো যা কিছু শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত থাকে তার সবকিছুই মানহাজে তা’লিমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এই ভিত্তিতে কওমি মাদ্রাসাসমূহে প্রচলিত পাঠ্যবিষয়, পাঠ্যপুস্তক, পাঠদানের পদ্ধতি সবকিছু মানহাজে তা’লিমের অন্তর্ভুক্ত আছে। আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকার, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, কুরআনের অনুবাদ, তাফসির, হাদিস, উসুলে তাফসির, উসুলে হাদিস, আকিদা, মিলাল-নিহাল, অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় হচ্ছে কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যবিষয়; আর এই সকল বিষয়ের নির্ধারিত কিতাব যেমন নাহভে মীর, হেদায়েতুন নাহু, কাফিয়া, মুখতাসারুল মায়ানি, হেদায়াহ, কুদুরি, উসুলুশ শাশি, নুরুল আনওয়ার, জালালাইন, বায়যাবি, আল-ফাওযুল কাবীর, মিশকাত, হাদিসের সিহাহ সিত্তা, নুখবাতুল ফিকার, আকিদাতুত তাহাভি, আকায়েদুন নাসাফি ইত্যাদি হচ্ছে পাঠ্যকিতাব—এই সবকিছু হচ্ছে মানহাজে তা’লিমের অন্তর্গত উপাদান।

কওমি শিক্ষার মানহাজ: একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ

কওমি মাদ্রাসা ধারার প্রথম মাদ্রাসা ছিল দারুল উলুম দেওবন্দ, যা ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার ‘দেওবন্দ’ নামক পল্লীতে ১৮৬৬ সালের ৩০ই মে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং শিক্ষার মানহাজ হিসাবে ‘দরসে নিজামি’ বা ‘নিজামি শিক্ষাক্রম’ গ্রহণ করে। দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুঘল সম্রাট আওরংজেবের (শাসনকাল ১৬৫৮-১৭০৭) পৃষ্ঠপোষকতায় মোল্লা নিজামুদ্দিন লাখনৌর ফিরিঙ্গি মহলে বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসার অনুসরণে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তারপরে সেই ধরণের মাদ্রাসা ভারত বর্ষের আরো অনেক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এই মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর উল্লেখযোগ্য কিতাব ছিল নিম্নরুপ—

‘কাফিয়াহ, শরহে জামি, শরহে বিকায়াহ, হেদায়াহ, জামি, তাওজিহ ও তালবিহ, শরহে শামসিয়া, শরহে মাতালি, শরহে আকায়িদ নাসাফি, মুখতাসারুল মায়ানি, মুতাওয়াল, বাইযাবি, রাসায়েলে নাকশবান্দিয়া, শরহে রুবাইয়াত মোল্লা জামি, শরহে হেদায়েতুল হিকমাত, মেশকাত, সহিহ বুখারি, শামায়েলে তিরমিজি ইত্যাদি।’ (বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব)

যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার মানহাজ কিছু মানুষের চিন্তা-গবেষণার সমষ্টি, যা শিক্ষা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ শিক্ষার বিভিন্ন উদ্দেশ্য, সমাজ ও ব্যক্তির বিভিন্ন প্রয়োজন ও জরুরত সামনে রেখে নির্ধারণ করে থাকেন। শিক্ষা শুরু হয় ব্যক্তির প্রয়োজনের ধারণা নিয়ে আর সেটা শেষ হয় সমাজ, সমষ্টি বা উম্মতের প্রয়োজনের ধারণা নিয়ে। শিক্ষা ব্যবস্থা তার মূল উপাদান সমাজ ও সামাজিক জীবন থেকে আহরণ করে থাকে। এই ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থা এক হিসাবে ব্যক্তিক আবার আরেক হিসাবে এটা সামষ্টিক। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে ব্যক্তি ও সমাজের জরুরত ও প্রয়োজন সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার রুপরেখা নির্ধারণ করতে হয়। এবং স্বাভাবিকভাবেই সময় ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে যদি কোন অবস্থায় এই জরুরত ও প্রয়োজনে পরিবর্তন দেখা যায় তাহলে সেই সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও পরিবর্তন সাধিত হওয়া স্বাভাবিক দাবী। ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে সামাজিকতা, উ’রফ (প্রথা), আহওয়াল (অবস্থা)-র পরিবর্তনের কারণে ফাতওয়ার পরিবর্তন হওয়া একটি স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত। পবিত্র কুরআনের যে আয়াতসমূহ মদিনায় হিজরতে আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর যে সকল আয়াত হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সকল আয়াতের ভাষ্য, ভাব, আহকামের মধ্যে বিরাট পার্থক্য অনুভব করা যায়। কাজেই যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার মানহাজের সংস্কার করা বা সংস্কারের জরুরত অনুভব করা একটি অতি স্বাভাবিক প্রবণতা। এখানে এমন কিছু কারণ দেখা যায় যার মাধ্যমে এই সংস্কার প্রক্রিয়া জরুরি হয়ে যায়। এই সকল কারণের কিছু হতে পারে বর্তমানের সাথে সম্পর্কিত আবার কিছু হয়ে থাকে ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত। শিক্ষা ব্যবস্থার পিছনে নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অর্জিত ফলাফল যদি সমান পর্যায়ে না হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা জরুরি হয়ে যায়, অথবা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আরো বেশি উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ও সংস্কার নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা একটি জরুরি বিষয়।

দারুল উলুম দেওবন্দ ছিল, ইসলামি ইতিহাসের প্রথম মাদ্রাসা দারুল আরকামের অনুসারে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মক্কায় দাওয়াতের কাজের জন্যে সাহাবি আরকম বিন আবুল আরকম রা. এর বাড়িতে একটি মাদ্রাসা গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকেই দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করতে থাকেন। ইসলামি ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম রা. ছিলেন প্রথম শিক্ষার্থী আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তাদের শিক্ষক। পবিত্র কুরআনের আয়াতেই বলা হয়েছে যে ‘… যিনি তাদেরকে আপনার আয়াত তেলাওয়াত করে শুনাবেন, তাদেরক কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিবেন।’ (বাকারাহ: ১২৯)

রাসুলের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। এবং রাসুলের ইন্তেকালের পরে তাদের মাধ্যমে এই শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে। সামনে আমরা সংক্ষিপ্তভাবে এই শিক্ষার সম্প্রসারণ ও বিশেষ করে মানহাজের বিবর্তনের দিকে কিছুটা ইংগিত করার চেষ্ঠা করবো।

মানহাজের ক্রমবিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ: হিজরি প্রথম শতাব্দী

প্রথমেই একটি বিষয়ে ইঙ্গিত করা জরুরি মনে করি। এখানে শতাব্দীর হিসাবে যে আলোচনা পেশ করা হয়েছে সেটা মোটেও একটি শতাব্দীর আলোচনার জন্যে যে গভীর ও দীর্ঘ আলোচনা দাবী করে, সেটা পূরণ করবে না। শুধুমাত্র আলোচনার সুবিধার জন্যে এই শিরোনামে আলোচনা পেশ করা হয়েছে।

এটা অতি সহজেই অনুমান করা যায় যে, সমাজের অবস্থা ও জরুরতের সাথে তাল মিলিয়েই শিক্ষার ধারণার উন্নতি হওয়া শুরু হয়। প্রথম দিকে খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত কুরআনের শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিকে হাদীস লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেননি, তাই প্রথম দিকে সাহাবায়ে কেরাম শুধুমাত্র কুরআনের আয়াতসমূহ লিপিবদ্ধ করতেন, এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এই অবস্থা অব্যাহত থাকে। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা. এর যুগে হযরত উমর রা. এর পরামর্শে পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ একটি মুসহাফে একত্রিত হয়, এবং তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রা. এর যুগে কুরআনের একাধিক নুসখা তৈরি করে তা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করে তা অনুসরণের নির্দেশ জারি করেন।

এরপরে মানহাজের সাথে আরেকটি বিষয়ের অন্তর্ভূক্তি ঘটে, যা ছিল আরবি ভাষার চর্চার সাথে সম্পৃক্ত। আরব-অনারব বহু জাতির মিশ্রণের কারণে আরবি ভাষার মধ্যে ভিন্নতার সৃষ্টি হতে শুরু হয়, এবং যার প্রভাব কুরআনের মধ্যে আসতে পারে এমন আশংকা করে হযরত আলী রা. এর নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে হযরত আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালী রা. আরবি ভাষার ব্যাকরণের কিছু নীতিমালা লিপিবদ্ধ করেন।

এরপরে হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয রা. এর যুগে হাদীসের চর্চা ও হাদীস সংগ্রহ ও হাদীসের কিতাব সংকলনের বিশাল খেদমত শুরু হয়। এই মর্মে হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয রা. ফরমান জারি করেন—’রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস তালাশ করে দেখ, এবং তা উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে দাও, যারা জানে না তাদেরকে শিক্ষা দাও। মনে রেখো, ইলম যখন গোপন রহস্য হয়ে যায় তখন সেটা বিলুপ্ত হয়ে যায়।’

এখানে স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় যে, সমাজের ও উম্মতের জরুরতের দিকে খেয়াল করে, আরবী ভাষার ব্যাকরণ, নিয়মনীতি ও হাদীস লিপিবদ্ধ করণের কাজ শুরু করা হয়।

দ্বিতীয় শতাব্দী

দ্বিতীয় শতকের বিদ্যমান অবস্থা এই সময়ের মানহাজ তৈরি ও তার রুপরেখা নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখে। এই সময়ে যারা শিক্ষা ও ইলমি মানহাজের রুপরেখা তৈরি ও নির্ধারণে মৌলিক ভূমিকা রাখেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ফিকহি মাজহাবের ইমামগণ। তারা তাদের ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে উম্মতের সামনে একটি স্পষ্ট মানহাজ কায়েম করেন। প্রত্যেক ইমাম ও মুজতাহিদ তাদের নিজেদের ইজতিহাদের জন্যে নিজস্ব পদ্ধতি ও মূলনীতি নির্ধারণ করেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাজহাবে ‘কিয়াস’র ব্যাপক ব্যবহার হয়। এই প্রসঙ্গে কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—’সাহাবায়ে কেরামের জন্যে যেটা যথেষ্ঠ ছিল সেটা কি আপনার জন্যে যথেষ্ঠ নয়?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই, যেটা তাদের জন্যে যথেষ্ঠ ছিল সেটা আমার জন্যেও যথেষ্ঠ, যদি আমি তাদের স্থানে থাকতাম। যে ব্যক্তি তার যুগের সমস্যার মোকাবেলা করে না এই যুক্তিতে যে, সমস্যা উপেক্ষা করার মধ্যেই মুক্তি পাওয়া যাবে, সে সেই সমস্যার প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না, বরং তার জন্যে উত্তম সমস্যার মোকাবেলা করা ও তার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে, সেটা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার চাইতে।’

এই উসুলের উপর তার শাগরিদগণ ইমাম আবু ইউসুফ রহ., ইমাম মুহাম্মাদ রহ. চলতে থাকেন। তাদের ইজতিহাদে একটি বিষয় অনুমান করা যায় যে, তাদের বিশ্বাস ছিল যে ইলম জীবন ও বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ হওয়া জরুরি, কারণ শরিয়ত দুনিয়াতে এসেছে মানুষের জীবন পরিচালনা করার জন্যে। তাই সেটা যত বেশি জীবন ঘনিষ্ঠ হবে মানুষ তত বেশি সেই ইলম থেকে উপকৃত হবে। কেউ ইমাম মুহাম্মাদ রহ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যুহদ বিষয়ে কোন কিতাব রচনা করবেন না?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘বুয়ু (ক্রয়-বিক্রয়) সম্পর্কে একটি কিতাব রচনা করেছি।’

ইমাম শাফী রহ. এর নিকট মানহাজ শুধুমাত্র শারয়ি ইলম ও ভাষার ইলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তিনি বিভিন্ন বস্তুগত ও জাগতিক ইলমের চর্চার গুরুত্বের দিকেও ইঙ্গিতত করেছেন। তার মতে, ‘যে শহরে শারীরিক ব্যাধির চিকিৎসা করার মত চিকিৎসক নেই ও শরিয়তের বিষয়ে উত্তর দেওয়ার মত ফকিহ নেই সেই শহর বসবাসের উপযুক্ত নয়।’

অন্যদিকে ইমাম মালিক রহ. এর চিন্তায় প্রতিটি সমাজের ভিন্ন ভিন্ন জরুরত স্পষ্ট থাকার ধারণা পাওয়া যায়। তার বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মুয়াত্তা’ লিপিবদ্ধ করার পরে খলিফার পক্ষ থেকে তাকে এই আবেদন জানানো হল যে, তিনি এই কিতাবকে মুসলিম বিশ্বের সকল অঞ্চলে চালু করতে চান। তখন তিনি উত্তরে জানালেন যে, এমনটি না করে প্রতিটি অঞ্চলকে তার নিজস্ব ইমাম, মুজতাহিদ ও ফকিহদের উপর ছেড়ে দেন।

এই সকল ফকিহ ও মুজতাহিদদের মাধ্যমে ইসলামি ফিকাহ ও উসুলে ফিকাহর বিভিন্ন মূলনীতি যেমন— কিয়াস, ইসতিহসান, মাসলাহা মুরসালাহ, উ’রফ ইত্যাদি বিষয়ে গভীর ধারণা সৃষ্টি হয়। আলাদা আলাদা ফিকহি মাদরাসা বা ধারার সৃষ্টি হয়। ইজতিহাদের বাস্তব রুপরেখা উম্মতের সামনে স্পষ্ট হয়।

তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দী

এই সময়ে এসে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এক অভূতপূর্ব ইলমি জাগরণ শুরু হয়। একদিকে যেমন শারয়ি উলূমের বিভিন্ন শাস্ত্র, যেমন—ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, তাফসির, আকিদাসহ নানা বিষয়ে চরম উৎকর্ষতা হাসিল হয়, অন্যদিকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অসংখ্য ইমাম তৈরি হয়, যেমন—যাহিজ, মুবাররাদ, যুজাজ, মুহাম্মাদ বিন দুরাইর, সা’লাব রহ.; ইতিহাস শাস্ত্রে মুহাম্মাদ বিন জারির আত-তাবারি; জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যায় মুসা বিন শাকির ও তার পুত্রগণ; দর্শনে আল-কিন্দিসহ আরো অনেক ইমাম এই সময়ে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার
মাধ্যমে মুসলিম উম্মার জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেন।

পঞ্চম শতাব্দী

এই সময়ে যাদের চিন্তা শিক্ষা ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে তাদের একজন ছিলেন ইমাম মাওরদী রহ.। মানহাজের ব্যাপারে তার চিন্তাধারা ছিল এই—’…. মানহাজের শীর্ষে রয়েছে ধর্মীয় ইলম, কারণ তা সকল মুসলমানের জন্যে ফরজ। ধর্মীয় ইলমের মধ্যে রয়েছে ফিকাহ, হাদীস, আরবি ভাষা, গণিত ইত্যাদি। প্রত্যেক ইলম সন্মানিত, কারণ এর মাধ্যমে মানুষের সৌভাগ্য পরিপূর্ণ হয়ে থাকে।’

আরেক জন ছিলেন ইমাম গাজালী রহ.। শিক্ষার ব্যাপারে তার চিন্তাধারা ছিল এমন ‘… মানহাজ একটি পারস্পরিক সম্পূরক ইমারত, যেখানে ধর্মীয় ইলম ও জাগতিক জ্ঞান একে অপরের সাথে একত্রিত হয়ে থাকে। যদি কেউ শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞানে মশগুল থাকে, যেমন— ইলমুল কালাম, ইলমূল ইখতিলাফ, মানতিক, কবিতা, ইলমুন নুজুম, তাহলে সে এমন কাজে তার জীবন ব্যয় করল যা আখেরাতে তার কোন উপকারে আসবে না। আবার কেউ যদি শুধুমাত্র দ্বীনী ইলম নিয়ে মশগুল থাকে তাহলে সে দ্বীনের হাকিকত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারবে না, কারণ উলুম শারয়ি উপলব্ধি করার জন্যে উলুম আকলি জরুরি। মানবদেহের জন্যে উলুমে শারয়ি হচ্ছে খাদ্য স্বরুপ, আর উলুমে আকলি হচ্ছে পথ্যতুল্য।’

বিভিন্ন ইলমের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্যে মানদন্ড হিসাবে তার মতে দুটি বিষয় বিবেচ্য: এক. ইলমের উপকার, দুই. ইলমের প্রামাণিকতা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ধর্মীয় ইলমের উপকার অনন্ত জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত, আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপকার এই জাগতিক জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।সুতরাং ধর্মীয় ইলম চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে সম্মানিত। অন্যদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে যদি গণিতের সাথে তুলনা করি, তাহলে উপকারের দিক থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞান অধিক সম্মানিত, কারণ এর মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতা অর্জিত হয়ে থাকে, আর গণিতের মাধ্যমে কোন কিছুর পরিমাপ জানা যায়। কিন্তু অন্যদিকে প্রামাণিকতার দিক থেকে গণিতের মর্যাদা অধিক, কারণ গণিতের প্রামাণিকতার মধ্যে কোন সন্দেহ থাকে না।

ইমাম গাজালী রহ. ইলমকে বিভক্ত করেছেন এইভাবে—

এক. শরিয়তের ইলম, যার মধ্যে রয়েছে তাওহীদ, তাফসির, হাদীস, আখবার, ফিকাহ, আখলাক।

দুই. ভাষাবিদ্যা।

তিন. নিজেকে পরিচালনা করা, গার্হ্যস্থবিদ্যা, সন্তান প্রতিপালন, জীবিকা উপার্জন, পারিবারিক ও সামাজিক লেনদেন সম্পর্কিত বিদ্যা

চার. উলুম আকলি। এর মধ্যে রয়েছে গণিত, জ্যামিতি, যুক্তিবিদ্যা, হাইয়াহ।

পাঁচ. প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এর মধ্যে রয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যা, খনিজ সম্পদ, কিমিয়া।

ছয়. শিল্প ও কারিগরি বিদ্যা।

এই সকল ইলম আবার দুই ভাগে বিভক্ত। এক. বাধ্যতামূলক বা ব্যক্তিগত ফরজ (ফরজে আইন), দুই. ঐচ্ছিক বা সামষ্টিক ফরজ বা ফরজে কিফায়াহ। বাধ্যতামূলক ইলমের মধ্যে রয়েছে ইলমুল তাওহীদ, আত্মশুদ্ধি, শরিয়তের ইলম; আর ঐচ্ছিক ইলমের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, শিল্প ও কারিগরি, রাজনীতি, নাহু, ফিকাহ, তাফসির। এখানে ঐচ্ছিকতা সমাজের জরুরতের দিকে খেয়াল করে, যদি সমাজে এই পরিমান মানুষ এই সকল বিষয়ে লিপ্ত থাকে যার মাধ্যমে সমাজের সাধারণ জরুরত পূরণ হয়ে যায়, তাহলে সেটা ঐচ্ছিক পর্যায়ে থাকবে। আর যদি সেই পর্যায়ে না থাকে তাহলে সেটা বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।

ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দী

এই পর্যায়ে মানহাজের মধ্যে সীমাবদ্ধতা শুরু হয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান বা উলুমে শারয়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা বলা শুরু হয়। মানতিক, দর্শনের চর্চা নিষিদ্ধ করতে ফাতওয়া দেওয়া হয়।বলা হয় এগুলো শায়তানের ধোঁকা, সময়ের অপচয়।

এইভাবে ধর্মীয় ইলম ও জাগতিক জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হতে শুরু করে। এর বিপরীত ধারাতেও কিছু আওয়াজ ওঠে, অর্থাৎ জাগতিক ও বস্তুগত জ্ঞান যে ইসলামি ধ্যান-ধারণার পক্ষে প্রমাণ পেশ করে থাকে এবং সেই জন্যে এই ধরণের জ্ঞানের গুরুত্ব রয়েছে—এর পক্ষেও যুক্তি-তর্ক পেশ করা হয়ে থাকে। এইক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন ইমাম ফাখরুদ্দিন রাজি রহ.। দর্শন, মানতিক ও ইলমুল কালামের বিপক্ষে যারা যুক্তি পেশ করেন তিনি তাদের সেই সকল যুক্তি খণ্ডন করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে জাগতিক জ্ঞান ইমান-আকিদা বহির্ভূত কোন বিষয় নয়, উদাহরণ হিসাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমে ইমান ও বিশ্বাস আরো বেশি মজবুত ও গভীর হয়ে থাকে, কারণ রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া আল্লাহ তায়ালার রহমতের একটি বহিঃপ্রকাশ। পথ্য, খাদ্য, উদ্ভিদ, পশুপাখি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করার অর্থ আল্লাহ তায়ালার কুদরত ও তাঁর নিদর্শন নিয়ে তাফাক্কুর করা। এর মাধ্যমে মানুষের সামনে আল্লাহর কুদরত, রহমত, নিয়ামত প্রকাশ পেয়ে থাকে।

ইবনে তাইমিয়াহ রহ. এর দৃষ্টিতে মানহাজ

ইবনে তাইমিয়াহ রহ. এর মতে সমস্ত ইলম আল্লাহ তায়ালার (কালিমাহ ইলাহিয়াহ) বাণীর বহিঃপ্রকাশ। যেই বাণীর দিকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ইঙ্গিত করেছেন। এই (কালিমাহ) বাণীসমূহ দুই ধরণের—এক. ধর্মীয় বাণী, দুই. জাগতিক বাণী। ধর্মীয় বাণীর দিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে এরশাদ করা হয়েছে—’যখন ইবরাহীমকে তাঁর প্রতিপালক পরীক্ষা করলেন কয়েকটি কালিমা দ্বারা এবং তিনি সেটা পূরণ করলেন।’ (বাকারাহ: ১২৪)।

আর জাগতিক বাণীর দিকে ইঙ্গিত করে এরশাদ করা হয়েছে—’আর পরিপূর্ণ হল আপনার প্রতিপালকের উত্তম ‘কালিমা’ বনি ইসরাইলের পক্ষে, তাদের সবর করার জন্যে।’ (আ’রাফ: ১৩৭)।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দোয়াতে এই কালিমার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে— ‘হে আল্লাহ, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আল্লাহর পরিপূর্ণ ‘কালিমার’, যা অতিক্রম করার ক্ষমতা নেই কোন নেককারের বা কোন বদকারের।’

জাগতিক কালিমার বিপরীতে যাওয়ার শক্তি কোন মানুষ বা মাখলুকের নেই, কারণ এগুলো হচ্ছে জাগতিক নিয়ম ও নীতিমালা, আর যেহেতু ধর্মীয় কালিমা দ্বারা মানুষের ইমতিহান করা উদ্দেশ্য তাই এখানে মানুষকে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে সেই অনুযায়ী চলার বা তার বিপরীত চলার।

ইবনে তাইমিয়াহ রহ. এর মতে উলুম দুইভাগে বিভক্ত—এক. উলুম দ্বীনী, দুই. উলুম আকলি। উভয় প্রকার ইলম হচ্ছে শরিয়াহ ও আকলের ফসল, আর শরিয়াহ ও আকলের মধ্যে কোন বিরোধ নেই, কারণ উভয়টিই আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন প্রকাশ করে থাকে। উভয় প্রকার ইলম আবার দুই ভাগে বিভক্ত— এক. বাধ্যতামূলক, দুই. ঐচ্ছিক। এবং এখানেই এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, ঐচ্ছিক বিষয়সমূহ স্বাভাবিক জরুরতের সময় ঐচ্ছিক অবস্থাতে থাকে, যদি এইক্ষেত্রে কোন কারণে উম্মতের জরুরত পূরণ না হয়ে থাকে তাহলে সেটা বাধ্যতামূলক অবস্থায় চলে আসে।

অষ্টম শতাব্দী

এই সময়ে এসে তুরাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রতি আহবান অনেক বেশি জোরদার হয়। এবং ইলমি কাজ শুধুমাত্র আকাবিরের ফাতওয়া ও তাদের কিতাবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে অনেক কিতাব রচিত হয়, তবে তাদের অধিকাংশ কিতাব রচিত হয় আকাবিরের কিতাবগুলোকে কেন্দ্র করে। এই সময়ে যারা তারবিয়ার রুপরেখা নির্ধারণ করেন তাদের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, মানাহিজে তা’লিম শুধুমাত্র উলুম দ্বীনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। মানতিক বা যুক্তিবিদ্যার অসারতা বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করা হয়, তার চর্চা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়, ফালসাফাহ বা দর্শন জাতীয় বিষয়কে বিদয়াত ও ভ্রষ্টতা হিসাবে মনে করা হয়। যার অর্থ দাঁড়ায় এগুলো দ্বীনী ইলমের অন্তর্ভুক্ত নয়, আখেরাতের পাথেয় নয়, এগুলো এমন বিষয় যার সাথে সাওয়াব বা গুনার কোন সম্পর্ক নেই।

ইবনে খলদুন রহ. এর দৃষ্টিতে মানহাজ

ইবনে খলদুন রহ. মানাহিজ দুই ভাগে ভাগ করেন— এক. জাগতিক জ্ঞান যা মানুষ চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে অর্জন করতে পারে, দুই. শরিয়তের ইলম যার মূল ভিত্তি হচ্ছে কুরআন ও হাদীস। এই প্রকার ইলমের সাথে আরো বিভিন্ন ইলম, যেমন—আরবি ভাষা, তাফসীর, কিরায়াত, উলুমে হাদীস, ফিকাহ অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে।

নবম ও দশম শতাব্দী

এই সময়ে এসে দেখা যায় যে, অধিকাংশ ইলমি কাজ আকাবিরের তুরাসকে কেন্দ্র করে হতে থাকে। এই সময়ের কাজের ধরণ ছিল হয়ত আকাবিরের কিতাবের (তালখিস, ইখতিসার) সংক্ষিপ্তকরণ; না হয় (শরাহ) ব্যাখ্যাকরণ, যেমন—শারহু
আলফিইয়াতিল হাদীস লিল ইরাকি, মুখতাসারুল মানাহিজ, শারহুল তালখিস, শারহুল মাতালি’; অথবা (নুজুম) কোন কিতাবকে গদ্য আকারে লেখা, যেমন—নুজুম জাময়িল জাওয়ামি, মানজুমাহ ফি আকাইদিল গাজালি, মানজুমাতু ফি ইলমিল খাত; কোন কোন ক্ষেত্রে আবার শরাহ গ্রন্থের উপর হাশিয়া লেখা হত। এই হিসাবে দেখা যায় যে, এই সময়ে শরাহ, তালখিস, মানজুমাত, হাওয়াশি ইত্যাদির মধ্যেই ইলমি কাজ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

একাদশ শতাব্দী ও তার পরবর্তীকাল

আগের অবস্থাই অব্যাহত থাকে। শরাহ, মুখতাসার, হাশিয়ার মধ্যেই ইলমি কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। জামে আযহারের অবস্থাও এর বাইরে ছিল না, সেখানকার শিক্ষা মানহাজ বিভিন্ন শরাহ, হাওয়াশি, তাকরিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। দেখা যায় যে, এখানে শিক্ষা দান মূলত একটি কিতাবের ইবারতকে চার পর্যায়ে বা স্তরে চর্চা করা শুরু হয়, যথা মাতন, শরাহ, হাশিয়াহ ও তাকরির। এই জন্যে দেখা যায় যে, শায়েখ মুহাম্মাদ আব্দুহ রহ. এই ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন—’এখানে কিতাবের শিক্ষা গ্রহণ করা হয়, শাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করা হয় না, এখানে এমন এক মানহাজের অনুসরণ করা হচ্ছে যার গ্রহণযোগ্যতা ও টিকে থাকার একমাত্র কারণ হচ্ছে এর বিকল্প কোন কিছু তৈরি করতে তাদের অক্ষমতা ও অবহেলা।’

তিনি ও তার শাগরেদ জামে আযহারের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধতি নিয়ে অনেক সমালোচনা করেন ও তার সংস্কারের জন্যে চিন্তাভাবনা পেশ করেন। (তাতাওভুর মাফহুম নাজারিয়াহ আল-ইসলামিয়া)

এখানে ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু থেকে বর্তমান কালের সামান্য কিছু বিবরণ পেশ করা হল। যার মাধ্যমে এটা দেখা যায় যে, শিক্ষা মানহাজ এক অবস্থায় থাকেনি, বরং সমাজ ও বাস্তবতার আলোকে তার মধ্যে তারতম্য হয়েছে, বা মানহাজের মধ্যে বিবর্তন ঘটেছে । সকল পরিবর্তন যে সব সময় উপকারি ও উপযুক্ত হয়ে থাকে এটা না। মানুষ কোন সময় কোন পদ্ধতি, উপকরণ গ্রহণ করে থাকে এবং এর পিছনে কারণ এটাই থাকে যে তার চেয়ে অধিক উপযুক্ত কোন পদ্ধতি বা উপকরণ তাদের চিন্তায় আসেনি, বা তালাশ করে মিলেনি। শায়েখ মুহাম্মাদ আব্দুহ রহ. এর উপরে বর্ণিত মন্তব্য থেকে এমনই বুঝে আসে, যেখানে তিনি আযহারের তদানীন্তন মানহাজের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, তারা এমন এক মানহাজ অবলম্বন করছেন যার পিছনে ভিত্তি হচ্ছে তাদের অক্ষমতা ও অবহেলা।

আমরা এই আলোচনার শুরুর দিকে বলেছিলাম যে, শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তি ও সমাজের জরুরত থেকে তার ভিত্তি, গ্রহণযোগ্যতা সংগ্রহ করে থাকে। অর্থাৎ, একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কেমন হওয়া উচিত সেটা সেখান থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। এই কথাটি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সঠিক হলেও ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটা যথেষ্ঠ নয়, কারণ ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক জরুরতের আগে থাকে ধর্মীয় জরুরত। ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিধি-বিধান পালন করার উপযুক্ত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পরেই অন্য কোন জরুরত নিয়ে ভাবার পরিবেশ ও সুযোর সৃষ্টি হয়। কাজেই ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর জরুরতের প্রথম ও প্রধান দিক হচ্ছে ধর্মীয় জরুরত, আর এর পরের দিকটি হচ্ছে জাগতিক দিক, যেটাকে কোন ভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে না। ধর্মীয় জরুরত সবার আগে এই ধারণা আমাদের চিন্তায় রেখেই আমরা যদি কওমি শিক্ষা মানহাজের দিকে চিন্তা করি তাহলে আমরা উপলদ্ধি করতে পারবো, যুগ ও সমাজের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই মানহাজের মধ্যে সংস্কার সাধন করার জরুরত আছে কি না। শিক্ষা মানহাজে কেন সংস্কার সাধন করা জরুরি হয় তার কিছু কারণ সামনে আমরা পেশ করবো। সেই সকল কারণের আলোকেই আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবো।

শিক্ষা মানহাজ সংস্কারের কারণ

১. বর্তমান মানহাজের সীমাবদ্ধতা: প্রতিটি শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষা জীবনের—উদাহরণ হিসাবে—এক বছরের অধ্যায়নে কতটুকু জ্ঞান-অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারল, এবং আদৌ সে পরবর্তী স্তরে উপনীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল কি না, এটা মূলত পরীক্ষার মাধ্যমে ও পরীক্ষার মাধ্যমে লব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। পরীক্ষার মাধ্যমে যেমন একজন শিক্ষার্থীর মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি সমান যুক্তিসম্মত দাবী যে, পরীক্ষার মাধ্যমে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন করে দেখা জরুরি। একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা হয় কিছু নির্ধারিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা ও অভিলাষ নিয়ে, কাজেই একটি সময় পরে শিক্ষাবিদগণের দায়িত্ব দেখা যায় যে, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা কি আসলেই সেই সকল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারছে কি না সেটার মূল্যায়ন করে দেখা। যদি এটা গবেষণা, বাস্তবতার আলোকে অনুভূত হয় যে, বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে না তাহলে সেই অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি হয়ে যায়। এখানে শুধুমাত্র নেতিবাচক ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং এই দিকেও ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য যে, শিক্ষার পিছনে শিক্ষার্থীরা যে মেধা, শ্রম, সময় ব্যয় করছে সেই হিসাবে তাদের অর্জিত যোগ্যতা কি যথাযথ, না কি সেই শ্রম ও সময়ের সঠিক দিক-নির্দেশনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা আরো অনেক গুণ বেশি হয়ে দাঁড়াবে।

২. শিক্ষার্থীদের মন-মনন, মানসিকতা, চাহিদার পরিবর্তন: শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র হচ্ছে শিক্ষার্থী বা ছাত্র। একজন শিক্ষার্থীর ইমান-আকিদা, বোধ-বিশ্বাস, মন-মনন, শারীরিক-মানসিক কর্মযোগ্যতা সৃষ্টি করা এর উদ্দেশ্য। যুগ ও পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতার মধ্যেও পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে, তাই তাদের সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উদ্দেশ্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হয়। আশেপাশের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের ঝোঁক, প্রবণতা, চাহিদার মধ্যে গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যুগের অবস্থার দিকে তাকিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মনেই এটা আসতে পারে যে, সাংবাদিকতার মাধ্যমে সে দ্বীন ও উম্মতের খেদমত করতে পারে, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্বীন ও উম্মতের খেদমত করতে পারে ইত্যাদি।

৩. পরিবেশ, সমাজ, সাধারণ প্রবণতার পরিবর্তন: শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত চালিত হয়ে থাকে সমাজ, সময় ও পরিবেশের চাহিদা, জরুরত ও প্রয়োজনের দিকে খেয়াল করে, তাই সময়, সমাজ ও পরিবেশের সাধারণ প্রবণতা ও বৈশিষ্টের মধ্যে পরিবর্তন সৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও পরিবর্তন সাধন করা জরুরি হয়ে যায়। কোন একটি পরিবেশ ও যুগের মধ্যে যদি কবিতা-সাহিত্যের প্রাধান্য দেখা যায়, তাহলে সময় ও পরিবেশের তারতম্যের কারণে অন্য কোন পরিবেশ ও যুগে সেই স্থানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বা প্রশাসনিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার প্রবণতা অধিক হারে দেখা যেতে পারে। এক সময় মানুষ সামাজিক তারবিয়াত থেকে যে শিক্ষা ও নৈতিকতার সবক পেত এখন অনেক ক্ষেত্রে সেটা শিথিল হয়ে পড়েছে, তাই এই শিথিল অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেখানে শক্ত ভাবে চিন্তা ও বিবেচনা করতে হয়।

৪. জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি: বর্তমান যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ অর্জিত হয়েছে। যদি বলা হয় যে বিগত দুই হাজার বছরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে যে উৎকর্ষ অর্জিত হয় নি, তা বিগত মাত্র পঞ্চাশ বছরে অর্জিত হয়েছে—তাহলে সেটা ভুল বলা হবে না। প্রতি মুহূর্তে বৈজ্ঞানিক আবিস্কার, ধারণা, তথ্য, তত্ত্ব মানব জাতির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গভীর থেকে গভীরতর করে চলেছে। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে যে অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়তে হবে, সেটা আর আলাদাভাবে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। এই জন্যেই পাঠ্যবিষয়ে এই সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসাবে, সামান্য কিছু দিনের আগের পাঠ্যপুস্তকে কম্পিউটার, মোবাইল, স্যাটেলাইট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোন আলোচনা না থাকলেও বর্তমানের পাঠ্যপুস্তকে এই বিষয়ে আলোচনা রাখা জরুরি হয়েছে।

৫. শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নতুন ধারণা, উপকরণ সৃষ্টি হওয়া: শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ গবেষণা করে যাচ্ছে, কাজেই তারা তাদের গবেষণার মাধ্যমে প্রচলিত কোন পদ্ধতির দুর্বলতা যেমন অনুভব করতে পারেন, ঠিক তেমনি তাদের চিন্তার সামনে নতুন কোন উপকারী পদ্ধতি আবিস্কার হতে পারে, তাই অধিক উপকারের জন্যে সেই নতুন পথ-পদ্ধতির ব্যবহারের জরুরত অনুভব করা যায়। শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে মনোবিজ্ঞানের সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার পরে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক মৌলিক পরিবর্তন বিশেষ করে শিক্ষাদানের পদ্ধতি, উপকরণের মধ্যে সাধিত হয়। অতীতে যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র ছিল শিক্ষক বা পাঠ্যবস্তু, এখন সেখানে মূল কেন্দ্র হচ্ছে শিক্ষার্থী। তাদের যোগ্যতা, পারস্পরিক পার্থক্য বা তারতম্য, ঝোঁক-প্রবণতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

৬. ব্যক্তি ও সমাজের প্রয়োজন, প্রবণতা ও উন্নতির ব্যাপারে ভবিষ্যৎ ধারণার কারণে সৃষ্ট পরিবর্তন: মানুষ সবসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে থাকে, অনেক সময় বিভিন্ন আলামত ও নিদর্শন দ্বারা মানুষ নির্ধারণ করতে পারে যে, সামনের দিনগুলোতে এই ধরণের নতুন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ভবিষ্যৎ চিন্তার আলোকে মানুষ সামনের দিকের কর্মপন্থা ও যোগ্যতা অর্জন করার পথে অগ্রসর হয়ে থাকে। বর্তমান যুগে প্রচার মাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার দিকে খেয়াল করে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, বর্তমান যুগে নিজেদের নিজস্ব প্রচার মাধ্যম থাকা অতি জরুরি একটি বিষয়, তাই এই ক্ষেত্রে নিজেসের নিজস্ব জনবল তৈরি করা সময়ের দাবী, অন্যদিকে সমাজে বা উম্মতের সামনে আসন্ন কোন বিপদ ও দুর্যোগের আলামত অনুভব করে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থার একটি কাজ সমাজে বিদ্যমান কোন সমস্যার সমাধান পেশ করা। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা শুধুমাত্র বিদ্যমান সমস্যার সমাধানই পেশ করে না বরং নিকট বা দূর ভবিষ্যতে কী ধরণের সমস্যার আশংকা আছে সেটা নির্ধারণ করে তার সমাধানের জন্যেও চিন্তা ও গবেষণা করে থাকে।

৭. অন্য কোন উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা: অন্য কোন দেশ বা সমাজ বা শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে নিজেদের অবস্থা ও শিক্ষার মান সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়। তখন নির্ধারণ করা যায় যে, নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কী ধরণের সংস্কার সাধন করা জরুরি। উদাহরণ হিসাবে, আমাদের হিফজ খানার কুরআন হিফজ করার যে পদ্ধতি সেই পদ্ধতিতে বিশেষ যে উপকার অর্জিত হয়ে থাকে সেটা হচ্ছে হিফজ বেশ পাকাপক্ত হয়ে থাকে। সেই উপকারের কথা বিবেচনা করে আরব বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই ধরণের আবাসিক হিফজ খানা প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা ভাবনা করা হয়, বা বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। এই ভাবে অন্যদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনা করে ভাল-মন্দ বিভিন্ন দিক নির্ধারণ করে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। (উসুস বিনায়িল মানাহিজ ওয়া তানযিমাতুহা)

উপসংহার

প্রথমে আমরা ঐতিহাসিকভাবে মানহাজের বিবর্তনের দিকে সামান্য ইঙ্গিত করে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, মানহাজ যুগ ও সমাজের পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা কিছু কারণ ও যুক্তি পেশ করেছি যার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয় যে, মানহাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি হয়ে যায়। আমরা এখানে সংস্কারের কোন রুপরেখা পেশ করিনি, বরং এখানে শুধুমাত্র এতটুকু আরজ করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, শিক্ষা মানহাজের পরিবর্তন সময়ের একটি অব্যাহত দাবী। এটা শিক্ষার্থীদের জন্যে যেমন উপকারী, ঠিক তেমনি সমাজ ও উম্মতের জন্যেও সমান ভাবে জরুরি। ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্যে শিক্ষা ব্যবস্থার মত শক্তিশালী আর কোন ব্যবস্থা নেই। কাজেই পরিবর্তনশীল সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে আমাদের এই শিক্ষা মানহাজ নিয়ে সমালোচনা ও সংস্কারমূলক দৃষ্টিতে একে বিবেচনা করা একটি গুরু দায়িত্ব।

লেখক: আলেম ও প্রাবন্ধিক