মওলানা ভাসানীর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ফাতেহ ডেস্ক:

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম চেগা মিয়া। পাঁচ বছর বয়সে মক্তবে ওস্তাদের কাছে পড়ালেখায় হাতেখড়ি। তিনি মাত্র ৬ বছর বয়সে পিতৃহীন হন এবং ১২ বছর বয়সে মা মারা যান। ভাসানী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন পাননি। ওস্তাদের কাছে মক্তবের পাঠ সমাপ্ত করেন এবং নিজ প্রচেষ্টায় উর্দু, ফার্সি, হিন্দি, অসমিয়া, আরবি ও ইংরেজি ভাষা শেখেন।

ময়মনসিংহের পীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদীর সংস্পর্শে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি ১৯০৮ সালে আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি হন। ১৯১৫ সালে তিনি আসাম আঞ্জুমান ওলামার সভাপতি এবং ১৯১৬ সালে আসাম কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে পা বাড়ান। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মাওলানা আজাদ সুবহানী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে রাজনীতি করেন। ২৪ বছর বয়সের তরুণ মওলানা আসামে বাস্তুহারা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রিয় হয়ে উঠেন। ব্রিটিশ সরকার ঘোষিত কুখ্যাত ‘লাইন প্রথার’ বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন করেন। ১৯৩১ সালের এই সময়ে তিনি ব্রহ্মপুত্রের ভাসানচরে বসবাস করতেন। অসামান্য নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে জনগণ তাকে ‘ভাসানী’ উপাধি দেন।

মওলানা ভাসানী ১৯৩৭ সালে বন্যাপ্লাবিত টাঙ্গাইলে আসেন। আস্তানা স্থাপন করেন কাগমারীতে। ৩৫ বছর বয়সে বগুড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে আলেমা খাতুনকে বিয়ে করেন। তার আসামের ১৩ বছরের জীবনে ৮ বছরই কারাগারে কেটেছে। বাঙালিদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আসাম আইনসভার সদস্য ছিলেন ১১ বছর। ১৯৪৬ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে টাঙ্গাইল মহকুমায় মওলানা ভাসানী নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পক্ষে যে গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তার ফলে মুসলিম লীগের পক্ষে বিপুল ভোট পড়ে। ১৯৪৮ সালে আসামের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। সন্তোষের মাটিতে স্থাপন করেন তার তৎপরতার কেন্দ্র।

আপসহীন সংগ্রামী নেতা ভাসানী সময়োপযোগী ও অগ্রগামী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মতো দূরদর্শিতার জন্য জাতীয় নেতার মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা সফরে এলে মওলানা ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হলে তিনি দলের সভাপতি হন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি কেটে দেয়া নিয়ে সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যান্য নেতার সাথে তার মতবিরোধ ঘটে। তিনি দল ত্যাগ করে কৃষক সমিতি গঠন করেন। ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সংগ্রামের ডাক দেন। তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ গঠন করেন।

মওলানা ভাসানী ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৮ সালের আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীর সভাপতি হন। ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল ঢাকায় পল্টনের জনসভায় চোরাচালানের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব ব্যক্ত করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের দরদি বন্ধু আপসহীন মওলানা ভাসানী অনশন ধর্মঘট করেন সরকারের দায়িত্বহীনতায় দুর্ভিক্ষের প্রতিবাদে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত গঙ্গা নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার এবং মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে সে বছর ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিলের নেতৃত্ব দান করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ৯৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

বিজ্ঞাপন