মনুবাদের চোখরাঙানি ও আমরা

মুসা আল হাফিজ

ওরা বলছে মন্ত্র পড়ার জন্য। ‘হিন্দু-মুসলিম যাই হোন, আপনি সাফল্য চাইলে মন্ত্রগুলো পড়ুন, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করুন।’ মন্ত্রগুলো কী?

✔️১. ঘুমাবার আগে বলুন : ওঁ শয়নে শ্রী পদ্মনাভায় নম:।
✔️২. জন্ম সংবাদ শুনলে বলুন : আয়ুষ্মান ভব।
✔️৩. মৃত্যু সংবাদ শুনলে বলুন : দিব্যান লোকান্ স গচ্ছতু।
✔️৪. খাবার আগে বলুন : ওঁ শ্রী জনার্দ্দনায় নম:।
✔️৫. বিপদে বলুন : ওঁ শ্রী মধুসূদনায় নম:।
✔️৬. হিন্দু ধর্মীয় সকলকাজ শুরুর আগে বলুন : ওঁ তৎ সৎ।
✔️৭. গৃহ প্রবেশ মন্ত্র : ওঁ শ্রী বাস্তুপুরুষায় নম:।
✔️৮. মাতৃ প্রনাম মন্ত্র : ভূমেগরীয়সী মাতা স্বাগাৎ উচ্চতর পিতা জননী জন্মভূমিশ্চ স্বগাদগি গরিয়সী। গর্ভ ধারণ্যং পোষ্যভাং পিতুমাতা বিশ্বস্তে।সর্বদেব সরুপায় স্তন্মৈমাএ নমঃ নমঃ।
✔️৯. পিতৃ প্রনাম মন্ত্র : পিতাস্বর্গঃ পিতা ধর্মঃ পিতাহিপরমংতপঃ। পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতা নমঃ পিতৃ চরনেভ্য নমঃ।
✔️১০. শ্রীকৃষ্ণ প্রনাম মন্ত্র : হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপথে। গোপেশ গোপীকা কান্ত রাধা কান্ত নমহস্তুতে। নম ব্রহ্মণ্য দেবায় গো ব্রহ্মণ্য হিতায় চ। জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গোবিন্দায় বাসুদেবায় নমো নমঃ।
✔️১১. শ্রীরাধারানী প্রণাম মন্ত্র : তপ্ত কাঞ্চন গৌরাঙ্গীং রাধে বৃন্দাবনেশ্বরী। বৃষভানু সূতে দেবী তাং প্রণমামি হরি প্রিয়ে।
✔️১২. দেহ শুচীর মন্ত্র : ওঁ অপবিত্র পবিত্রোবাং সর্বাবস্থান গতহ্বপিবা। যৎ সরেত পুন্ডরিকাক্ষং স বাহ্য অভ্যান্তরে শুচি। পাপোহং পাপ কর্মাহং পাপাত্মা পাপ সম্ভাবান্। ত্রাহি মাং পুন্ডরীকাক্ষং সর্ব পাপো হরো হরি।
✔️১৩. গুরু প্রণাম মন্ত্র : অখণ্ড মণ্ডলা কারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম। তদপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ। অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া। চক্ষুরুন্মিলিত যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ। গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর। গুরু রেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
✔️১৪. শ্রী পঞ্চতত্ত্ব প্রণাম মন্ত্র : পঞ্চতত্ত্ব আত্মকং কৃষ্ণং ভক্তরূপ স্বরূপকম্। ভক্ত অবতারং ভক্তাখ্যাং নমামি ভক্ত শক্তিকম্।
✔️১৫. সূর্য প্রণাম মন্ত্র : ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্। ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহষ্মি দিবাকরম্।
✔️১৬. গোবিন্দ প্রণাম মন্ত্র : ঔঁ ব্রহ্মাণ্ড দেবায় গোব্রাহ্মণ হিতায় চঃ। জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমঃ।
✔️১৭. তুলসী প্রণাম মন্ত্র : ঔঁ বৃন্দায়ৈ তুলসী দৈব্যে প্রিয়াঐ কেশবস্য চঃ। কৃষ্ণভক্তিপদে দেবী সত্যবত্যৈ নমঃ নমঃ।
✔️১৮. দুর্গা প্রণাম মন্ত্র : সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সবার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে।
✔️১৯. শ্রীবিষ্ণু প্রণাম মন্ত্র : অশ্বথ বৃক্ষমূলে জল দিয়ে– ওঁ অশ্বত্থ বৃক্ষরূপোহসি মহাদেবেতি বিশ্রুতঃ। বিষ্ণুরপধরোহসি ত্বং পুণ্যবৃক্ষ নমোহস্ত্ত তে।
✔️২০. বিশ্বকর্মা প্রণাম মন্ত্র : দেবশিল্পিন মহাভাগ দেবানাং কার্যসাধক। বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টফলপ্রদ।
✔️২১. গায়ত্রী প্রণাম মন্ত্র : ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

এই প্রচারকে কতিপয় বেকুবের আবেগ বলে ভাববেন না। এ প্রচার মূলত ‘জয় শ্রী রাম’ রাজনীতির প্রাথমিক সংস্করণ। ভারতে জয় শ্রী রাম বলানোর জন্য মুসলিমদের হত্যা করতে হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে মুসলিম শিশুদেরও তা বলানো যাচ্ছে খাবার দিয়ে। চট্টগ্রামের স্কুলে শিশুদের দিয়ে যার প্রদর্শনী হলো। এ প্রকল্প নিরীহ নয়, এর মধ্যে আছে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, গো-মাতা, অখণ্ড ভারত, বিচ্ছিন্ন গণহত্যা।

জানি, গরিষ্ঠ সংখ্যক হিন্দু এ প্রকল্পের অংশী নন। তাঁরা তাঁদের মন্ত্র পড়েন, কিন্তু মুসলিমদের জোর করে মন্ত্র পড়াতে চান না। জয় শ্রী রাম না বললে মেরে ফেলতে চান না। আরএসএসপন্থী এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁদের সোচ্চার হওয়া উচিত। যেমন সোচ্চার হওয়া উচিত সচেতন সকল নাগরিকের।

একে অনেকেই ধর্মপ্রচার ভাবতে পারেন। এটা ধর্মপ্রচার নয়। এ হচ্ছে গেরুয়াপন্থী, সংঘ পরিবার, বিশেষত আরএসএসের মনুবাদী রাজনীতির বাংলাদেশী সংস্করণ। এতে আছে সাংস্কৃতিক এমন এক প্রকল্প, যে দাবি করে মুসলিম হলেও আপনাকে বেঁচে থাকার জন্য জয় শ্রী রাম বলতে হবে। হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের সাথে একাকার হতে হবে। কারণ হিন্দুস্তানে বসবাসকারী হিন্দু-মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ সবার সাধারণ পরিচয় হচ্ছে হিন্দু। হিন্দু মূলত কোনো ধর্মপরিচয় নয়, হিন্দুস্তানে যারাই আছে, সকলেই হিন্দু। যেমনটি বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সকলেই তাই এক সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ হবে। হিন্দুত্ববাদ তাই এখন নিজেকে ধর্ম নয়, বরং সংস্কৃতি ও জীবনপদ্ধতি বলে পরিচয় দিচ্ছে। আর বাংলাদেশ কিন্তু মহাভারতের অংশ। যার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় শেষ করে দিয়ে তাকে মহাভারতে একাকার করে দিতে হবে। এটি কথার কথা নয়। বিজেপির অন্যতম নীতিনির্ধারক সুব্রামনিয়াম স্বামীসহ অনেকেই নানা ছুতোয় এ অভিপ্রায়ের কথা বার বার উচ্চারণ করেছেন।

বিপজ্জনক এমন এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্প বাংলাদেশে যখন পা রেখেছে, তখন সবার আগে সতর্ক ও সক্রিয় হওয়া কার দায়িত্ব? নিশ্চয় সরকারের।

চট্টগ্রামে মুসলিম শিশুদের উপর জোর করে হিন্দুত্ববাদ চাপানোর ঘটনা থেকে কী বার্তা পেলো দেশবাসী? সম্ভবত নম্র ভাষার বার্তাটি বুঝে আসেনি। যখন এ প্রকল্প কঠোর ভাষায় বার্তা দেবে, তখনই বুঝতে পারবে। কিন্তু ততক্ষণে পদ্মা-মেঘনার পানি বঙ্গোপসাগরের অনেক গভীরে হারিয়ে যাবে।

লেখক : আলেম কবি ও দর্শনবিশ্লেষক