মসজিদ কমিটি নিয়ে বিতর্ক, ভুগছেন সবাই

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশে আড়াই লক্ষেরও অধিক মসজিদ আছে। দুই/একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রতিটা মসজিদেই আছে মসজিদ-পরিচালনার জন্য আলাদা কমিটি। অঞ্চলভেদে এসব কমিটির কাঠামো ও পদ্ধতিতে ভিন্নতা থাকলেও ইমাম-মুয়াজ্জিন তথা মসজিদের স্টাফের ওপর তাদের প্রভাব ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ প্রায় সবখানেই এক ও অভিন্ন।

রাজধানী বা বড় বড় শহরগুলোতে মসজিদ কমিটির ধরণ একটু ভিন্ন থাকে। এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব যার বেশি, সে কিংবা তার পছন্দের লোকই কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারির দায়িত্বে থাকে। কোনো কোনো মসজিদে তো এমনও আছে, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস যায়, মসজিদ কমিটির সভাপতি বা সেক্রেটারিকে এর ভেতরে একবারও নামাজ পড়তে দেখা যায় না।

কমিটির প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে অধিকাংশ মসজিদেই সম্মানিত ইমাম ও মুয়াজ্জিনদেরকে কমিটির মর্জি মাফিক চলতে হয়। বরং চলতে বাধ্য করা হয়। জুমার বয়ানে স্বাধীনভাবে আলোচনা করতে পারেন না অধিকাংশ মসজিদের খতিব। কমিটির মর্জির দিকে খেয়াল রেখে মেপে মেপে কথা বলতে হয় তাঁদেরকে।

কমিটির মর্জির বাইরে ইসলামের মৌলিক নির্দেশনার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে অনেক ইমামকেই হেনস্থার শিকার হতে হয়। কিন্তু নানা কারণে এইসব খবর গণমাধ্যমে আসে না।

মসজিদগুলোতে কমিটির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকার কারণে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরিরও কোনো ভরসা নেই। কমিটির মর্জির খেলাপ চললে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই হারাতে হয় চাকরি। অকস্মাৎ চাকরি হারালে বড় একটা টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে যান ধর্মীয় এসব পেশাজীবী। স্ত্রী-সন্তান-সংসারের ভরণপোষণ দিতে গিয়ে তখন বড় এক সংকটের মুখোমুখি হন তারা।

পুরান ঢাকার ছোট্ট একটা মসজিদে ইমামতি করতেন এমনই একজন আলেম। ইমামতির সুবাদে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মসজিদের পাশেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। মসজিদ কমিটিতে প্রভাবশালী সুদখোর লোকের অন্তর্ভুক্তির কারণে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল, তিনি যেন জুমার আলোচনায় সুদ বিষয়ে কোনো কথা না বলেন। কিন্তু ওই মাওলানা ধর্মীয় দায়বোধ থেকে কমিটির নিষেধ সত্ত্বেও এক জুমায় সুদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আর এতেই খেপে যায় মসজিদ-কমিটি। মাসের মাঝামাঝি সময় ছিল, মাসটা পূর্ণ করারও কোনো সুযোগ দেয়নি, ওই দিনই তাঁকে অপমানিত করে বিদায় করে দেয় মসজিদ থেকে। এমনকি ওই এলাকায় বাসা নিয়েও আর থাকতে দেওয়া হয়নি।

মসজিদ কমিটির এই আধিপত্য কেবল যে ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেলায়ই, এমন নয়, সাধারণ মুসল্লিদেরকেও কমিটির পাওয়ারে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হয়। নানাভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়।

সচেতন মহল মনে করছেন, কমিটির এই আধিপত্যে লাগাম টানতে হলে প্রতিটা কমিটির ওপরে একজন মান্যবর ব্যক্তি রাখতে হবে। তিনি আলেম ও মুরব্বি আলেম হলে ভালো হয়। অর্থাৎ কমিটির যেন জবাবদিহিতার একটা জায়গা থাকে। এবং কমিটিতে কোনো সমস্যা হলে বা সমস্যার পর সমাধান-কল্পে এই মান্যবর ব্যক্তি যাতে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

পাশাপাশি কমিটি পুনর্গঠন বা নির্বাচনে সাধারণ মুসল্লিদের মতামতের বা বাছাইয়ের একটা অনপশনও রাখা যেতে পারে। সেটা ভোটের আদলে হোক কিংবা পরামর্শের আদলে। এতে করে মুসল্লিরাও মসজিদ কমিটির লোকজনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন এবং মুসল্লিদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ থেকে কমিটির লোকজন বিরত থাকতে বাধ্য হবে।