মুহাম্মদ আবদুহু : প্যান ইসলামিজমের পুরোধা পুরুষ

মুসান্না মেহবুব

মুহাম্মদ আবদুহু ছিলেন মিশরের খ্যাতিমান আইন বিশেষজ্ঞ, ধর্মীয় পণ্ডিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর ধর্মীয় সংস্কারক, ‘ইসলামি আধুনিকতা’র প্রবর্তক এবং প্যান ইসলামিজমের পুরোধা পুরুষ হিসেবে তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়। আজ ১১ জুলাই, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের এ দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর মিশরের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে আবদুহুর জন্ম। বাবা ছিলেন তুর্কি আর মা আরব বংশদ্ভূত। গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সমকালীন মিশরের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আহমদি মসজিদ থেকে। তারপর ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যুক্তি, দর্শন ও সুফিবাদ বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৭৭-এ তিনি আল-আজহার থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত হয়ে আল-আজহারের যুক্তি, ধর্মতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্র বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৮৭৮ সালে মুহাম্মদ আবদুহুকে মিশরে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কলেজ দার আল-উলুমে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। একই সাথে তিনি Khedivial School of Language-এর আরবি শিক্ষাদানে নিযুক্ত হন। রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র Al-Waqai al-MiSriyaa-তে সম্পাদক ও প্রধান হিসেবেও কাজ শুরু করেন একই সময়ে। পাশাপাশি তিনি মিশরীয় সমাজের সকল অংশকে পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষাকে সবচেয়ে উত্তম মাধ্যমরূপে তিনি বিবেচনা করতেন। শিশুর নৈতিকতাকে শক্তিশালী করার জন্য ধর্মীয় শিক্ষা এবং চিন্তার উৎকর্ষতার জন্য বিজ্ঞান শিক্ষার পক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর লেখায় দুর্নীতি, কুসংস্কার ও ধনীদের বিলাসী জীবনযাপনের তীব্র সমালোচনা আছে। উরাবি বিদ্রোহকে সমর্থন করার দায়ে ১৮৮২ সালে তাঁকে ছয় বছরের জন্য মিশর থেকে বহিষ্কার করা হয়।

আবদুহু ছিলেন দার্শনিক ও ধর্মীয় সংস্কারক মাওলানা জামালউদ্দিন আফগানির অন্যতম শিষ্য। আর আফগানি ছিলেন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের মুকাবেলায় প্যান ইসলামিজম চিন্তার গুরু।

আরও পড়ুন : জামালউদ্দিন আফগানি ও তাঁর প্যান ইসলামিজম চিন্তা

প্যান ইসলামিজম (আরবি: الوحدة الإسلامية‎‎) হচ্ছে মুসলিমদের ঐক্যকেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। একটি একক ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত বা আন্তর্জাতিক সংগঠক যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী হয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। এটি একটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। অন্যান্য প্যান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (যেমন প্যান অ্যারাবিজম) থেকে এই আন্দোলন নিজেকে আদর্শের দিক থেকে পৃথক বিবেচনা করে। এতে সাংস্কৃতিক ও জাতিতাত্ত্বিক পরিচয়কে ঐক্যের জন্য মুখ্য প্রভাবক হিসেবে ধরা হয় না। স্বেচ্ছাসেবী ইসলামি যোদ্ধাদের ধারণ প্যান ইসলামিক চিন্তার সাথে সম্পর্কিত। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসলিমরা প্রয়োজনে লড়াইয়ে যোগ দিতে পারেন।

আফগানির অনুপ্রেরণায় আবদুহু সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন। আফগানির কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণের পর তিনিও প্যান ইসলামিজম চিন্তার লালন ও বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

১৮৮৪ সালে ফ্রান্সের প্যারিস যান এবং আফগানির The Firmest Bond (আল উরয়াহ আল ওয়াতকাহ) নামক ইসলামি বিপ্লবী ধারার পত্রিকার প্রকাশনায় যুক্ত হন।

১৮৮৮ সালে আবদুহু মিশরে ফিরে আসেন এবং আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। স্থানীয় ট্রাইবুনালের বিচারক হিসেবে তাঁর নিয়োগ হয় এবং ১৮৯০ সালে তিনি আপিল আদালতের সদস্য হন। ১৮৯৯ সালে মিশরের মুফতি হিসেবে মনোনীত হন এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল থাকেন। মিশরে থাকাকালে আবদুহু আরবদের বিজ্ঞানে উন্নয়নের জন্য একটি ধর্মীয় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ও এর প্রেসিডেন্ট হন। আল-আজহারের পরীক্ষাপদ্ধতি, পাঠক্রম এবং অধ্যাপক ও ছাত্রদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার ব্যাপারে প্রস্তাব রাখেন। নানা দেশ ও অঞ্চলে সফরের ফলে তিনি এই উপসংহারে আসেন যে, মুসলিমরা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও স্বৈরাচারী শাসকদের একচ্ছত্র ক্ষমতার জন্য নির্যাতিত হচ্ছে।

১৯০৫ সালের ১১ জুলাই যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন, পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ তাঁর জন্য সমবেদনা জানিয়েছিল।

আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও সালাম।