সদ্য প্রয়াত মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ।। আবু তাহের মিনহাজ

আবু তাহের মিনহাজ

মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া সুনামগঞ্জ জেলাধীন বিশ্বম্ভরপুর থানার বাগুয়া গ্রামে ১৯৬৫ ঈসায়ীর ১৫ ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম লাল মিয়া। মাতার নাম খায়রুন্নেছা।

নিজ জন্মস্থান বগুয়ায় প্রাথমিক লেখাপড়া সমাপ্ত করে সুনামগঞ্জের জামেয়া ইসলামিয়া আরবিয়া রামনগর মাদরাসায় নিম্নমাধ্যমিক ২য় বর্ষ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ১ম বর্ষ পর্যন্ত অধ্যয়ন করে সিলেটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহে ভর্তি হন। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক ২য় বর্ষ থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পর্যন্ত কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রতিটি শ্রেণীর পরীক্ষাতে শীর্ষস্থানের অধিকারী ছিলেন। সিলেটে কওমি মাদরাসাসমূহের শিক্ষাবোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদীসের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় রেকর্ডসংখ্যক মার্কসহ শীর্ষস্থান অর্জন করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করার পর নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১১ শাওয়াল ১৩৯৮ হিজরী সনে দরগাহ মাদরাসায় যোগদান করেন। অনন্য উপস্থাপনা, ভাষার মাধুর্যতা ও বহুমুখী যোগ্যতার কারণে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত করেন। তিনি যখন শিক্ষকতা শুরু করেন তখন সিলেটের কওমি মাদরাসাসমূহে উর্দু ভাষা কিংবা উর্দু-বাংলা মিশ্র পদ্ধতিতে শিক্ষকগণ ছাত্রদের পাঠদান দিতেন। কিন্মুততু ফতি আবুল কালাম জাকারিয়াই বৃহত্তর সিলেটের প্রথম ব্যক্তি যিনি নিরেট বাংলায় পাঠদান শুরু করেন। আর তাতেই পুরো সিলেটের কওমি অঙ্গনে একপ্রকার সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্ন মাদরাসা থেকে শিক্ষার্থীরা মাও. জাকারিয়ার ক্লাসে উপস্থিত হতো। কওমি মাদরাসার সংস্কার বিষয়ক এক নিবন্ধে ইফার হবিগঞ্জের পরিচালক শাহ নজরুল ইসলাম এ তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি নিজেও ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা আলেম, বিজ্ঞ ফিকাহবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষত বৃহত্তর সিলেটে তাঁকেই শীর্ষ মুফতি হিসেবে মনে করা হতো। বিভিন্ন মাসআলার ফতোয়া, আধুনিক ও জটিল বিষয়ের ইসলামি আইনশাস্ত্রের সমাধানে তার সিদ্ধান্তকে সকলেই মেনে নিতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনশাস্ত্রের ক্লাস (ইফতা) তিনি পড়েন নি। বরং নিজের প্রচুর পড়াশোনা, মেধা, গবেষণা ও যোগ্যতার বলে সকলের কাছে একজন প্রাজ্ঞ মুফতি হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর একান্ত শিষ্যদের বর্ণনা হলো, তাঁর মতো একজন ক্ষণজন্মা মেধাবী আলেম খুব অল্পই পাওয়া যায়। এ কারেই জামেয়া দরগাহের সাধারণ শিক্ষকতা পদ থেকে শুরু করে সর্ব্বোচ্চ পদ মুহতামিম শায়খে সানী হিসেবে সমাসীন হয়েছিলেন।

আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিলো ঈর্ষণীয়। লেখালেখিতে ছিলো তাঁর দক্ষ পদচারণা। তিন ভাষাতেই অনেক বই লিখেছেন। তারমধ্যে কয়েকটি হলো, (১) বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ, (২৮ নং পারা); ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত; (২) হায়াতে ঈসা আ.; (৩) সত্যের আলোর মুখোশ উন্মোচন; (৪) আদাবুল মুতাআল্লিমীন; (৫) প্রচলিত সাধারণ মোজার উপর মাসেহ বৈধ নয় কেন? (৬) তাক্বরীরে ক্বাসিমী শরহে তাফসীরে বায়যাবী (যা কওমি নেসাবের দুর্বোধ্য কিতাব বায়যাবীর একটি প্রশংসিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এ ছাড়াও অনেক অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে। মাসিক আল ক্বাসিম নামে একটি ইসলামিক পত্রিকা তাঁর সম্পাদনা বের হতো।

তিন পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জনক এই প্রথিতযশা আলেমে দ্বীন ১১ মার্চ ২০১৯ ঈসায়ী রোজ সোমবার সিলেটে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।

লেখক :মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া রহ-এর ছাত্র  এবং তরুণ আলেম