সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ : ইসলাম যেভাবে দেখে

মুসান্না মেহবুব

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের কমন একটি সমস্যা। এই সমস্যার জন্য যতটা না রাষ্ট্রকে ভুগতে হয়, তারচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ।

দেশের প্রতিটা সেক্টরেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ আজ প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী। এ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভাঙবার, নিদেন পক্ষে দুর্বল করবার কার্যত কোনো চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় না।

ধানচালের বাজারে গেল বোরো মৌসুমে যে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল আড়তদাররা, কৃষকরা ন্যায্যমূল পাওয়া তো দূরের কথা, ধানচাষের খরচটুকুও ওঠাতে পারেননি। মজুতদাররা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ৫০০ টাকারও নিচে নামিয়ে এনেছিল ধানের দাম।

তারা চাতালমালিক, ব্যাপারী ও ফড়িয়াদের মাধ্যমে সস্তায় ধান কিনে নেয়। পরবর্তীতে যখন সরকার বাফার স্টকের জন্যে চাল কিনে তখন অনেক বেশি দামে চাল বিক্রয় করে তারা বিপুল মুনাফা তুলে নিতে সমর্থ হয়।

এদিকে কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষোভে দুঃখে নিজেদের পাকা ধানক্ষেতে আগুন লাগাবার ঘটনাও ঘটেছে এ বছর।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের আরেক খাত চামড়ার বাজার। বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্য কাঁচা চামড়ার বাজার আজ ধ্বংসের পথে। বিশ্ববাজারে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশীয় এই পণ্য প্রতাপের সাথে মাঠ অধিকার করে রেখেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে হঠাৎ করে রফতানিমুখী চামড়া ব্যবসায়ে ধস নামে। দুই-তিন হাজার টাকার একেকটি চামড়ার দাম মুহূর্তের মধ্যে মাত্র এক হাজারের নিচে নেমে আসে। বর্তমানে গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ৫০০ টাকার নিচে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা। পরের বছর ৭০-৭৫ টাকা এবং ২০১৫ সালে দাম কমিয়ে করা হয় মাত্র ৫০-৫৫ টাকা। পরের বছর দাম একই থাকে। কিন্তু ২০১৭ সালে এর দাম সর্ব নিম্ন ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা আজ অবধি অব্যাহত আছে।

একসময় দেশীয় চামড়ার বড় ক্রেতা ছিল কোরিয়া, বর্তমানে চীন। সেই চীন চামড়া পাঠায় আমেরিকায়। তারা চীন থেকে চামড়া আমদানির ওপর নতুন করে কর বসায়। এ জন্য চীন আমাদের কাছ থেকে নেয়া চামড়ার দাম কিছুটা কমিয়েছে। প্রশ্ন হলো, কত কমিয়েছে? চামড়াকে আমরা যেহেতু পরিপূর্ণ প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারি, তা হলে আমরা কেন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সরাসরি ধরছি না? তাছাড়া আমাদের নিজেদেরও প্রচুর প্রক্রিয়াজাত চামড়ার চাহিদা রয়েছে। তাহলে হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ এই পণ্যটির দাম কমল কেন? কারণ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এখানেও ‘সুপ্রতিষ্ঠা’ পেয়েছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের বকেয়া পাওনা এবং সরকারি অব্যবস্থাপনা এর জন্য দায়ী অবশ্য, কিন্তু দাম কমার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা সিন্ডিকেটেরই।

সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকে ইসলাম কীভাবে দেখে জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম সিলেটের জামিয়া কাজিরবাজারের প্রধান মুফতী মাওলানা শফিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায় এবং জনগণের হয়রানির কারণ। ইসলাম এ ব্যাপারে খুবই কঠোর। জনগণের হয়রানি ও পেরেশানির কারণ হয়, এমন যেকোনো অন্যায় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ইসলামের কঠিন হুঁশিয়ারি রয়েছে। ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হতো।

তিনি বলেন, সিন্ডিকেট ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়েও কেউ যদি কোনো পণ্য স্টক করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তার ব্যাপারেও কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে হাদিস শরিফে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন—আল মুহতাকিরু খাতিয়ুন—স্টককারী হলো অপরাধী। সুতরাং পণ্যসামগ্রী স্টক করে রাখা বা অন্য যেকোনো উপায়ে কোনো পণ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং নিষিদ্ধ।

মুফতী শফিকুর রহমান আরও বলেন, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল পণ্য সামগ্রীতেই সীমবাদ্ধ নেই, সমাজের প্রায় প্রতিটা সেক্টরে এই অসাধুতা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। যানবাহন থেকে নিয়ে সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেকটা কাজই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারীদের দখলে। জনগণকে যেন অনেকটা জিম্মি করে রাখা হয়েছে এর মধ্য দিয়ে। ইসলাম এসব অসাধু পন্থার ব্যাপারে কঠোর। আমাদের দাবি থাকবে রাষ্ট্রপক্ষও যেন এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থার প্রতি কঠোর হয় এবং এসবের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির আওতায় এনে এ ব্যবস্থাকে ভাঙার ক্ষেত্রে তৎপরতা চালায়।