অগ্নি-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে ।। মাওলানা ইউসুফ সুলতান

রাগিব রব্বানি 

দেশে দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বেড়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। স্বাভাবিক মৃত্যুর বদলে অপমৃত্যুই যেন হয়ে উঠেছে এদেশের মানুষের অনিবার্য নিয়তি। একদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ঝরছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীর প্রাণ, অপরদিকে কদিন পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। বিশেষত রাজধানী শহর ঢাকা যেন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আলেম, ইথিস ভেঞ্জার্স-এর সিটিও ও শরিয়াহ-টেক কনসাল্টেন্ট এবং জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের সাবেক সহকারী মুফতি মাওলানা ইউসুফ সুলতান সাম্প্রতিক কালের অগ্নিদুর্ঘটনাকে ঢাকার প্রেক্ষাপটে জাতীয় দুর্যোগ উল্লেখ করে সামগ্রিক কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, চলমান এ ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল সরকার কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন পুরো ইকো সিস্টেমের এক সঙ্গে কাজ করা। একক কোনো প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে কাজ করলে সমস্যার সমাধান হবে না।

মাওলানা ইউসুফ সুলতান তাই সরকার, রাজউক, ভবনের মালিক, ভাড়াটে, সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকের জন্য আশু করণীয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব অগ্নি নির্বাপণ সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা আপডেটেড রাখা, তা বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনগুলোকে পর্যাপ্ত বাজেট দেয়া। বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে দুর্নীতিমুক্ত নিরীক্ষা নিশ্চিত করা।

রাজউক বা নির্মাণ পরিকল্পনা ছাড়পত্রের কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, তাদের দায়িত্ব সরকারি আইন ও নীতিমালা অনুসারে পরিকল্পনা নিরীক্ষা করা ও সুনিশ্চিত করা।

ভবনের মালিককে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালিকের কর্তব্য হলো পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা রাখা। সাধারণত আগুন লাগার পর বাইরে থেকে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস এসে থাকে। এক্ষেত্রে আধুনিক সরঞ্জামসহ সবচেয়ে দক্ষ টিম আসলেও অভ্যন্তরীণ অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকলে ন্যূনতম ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয়। তাই ভবনের অভ্যন্তরীণ প্রতি তলায় অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার এস্টিনগিসার ইত্যাদি রাখা।

পাশাপাশি বছরে ন্যূনতম একবার ‘ফায়ার ড্রিল’ ব্যবস্থা করা। ফায়ার ড্রিলের মাধ্যমে ভবনের বাসিন্দাদের দ্রুত বের করার একটা মহড়া হয়ে থাকে। এতে ভবনের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার পরীক্ষা হয়, পাশাপাশি ভবনের বাসিন্দাদেরও দ্রুত বের হওয়ার এবং আগুন লাগার পর করণীয় কী, তা জানার প্রশিক্ষণ হয়। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস মাত্র ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা করে থাকে।

ভবনে অবস্থিত অফিস/কর্পোরেট ও বাসিন্দাদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভবন কর্তৃপক্ষ তাদেরকে উপরোক্ত বিষয়াদি বাস্তবায়নে বাধ্য করবেন। কারণ, ভবনে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের ন্যায় ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করা এর অবস্থানকারীদের একটি মৌলিক চাহিদা। এ চাহিদা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত থামা যাবে না।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেট কোম্পানিগুলোকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের দায়িত্ব হলো ফায়ার সেফটি ইকুইপমেন্টে ব্যয়কে খরচ মনে না করে ইনভেস্টমেন্ট মনে করা। কোম্পানির পলিসিতে এবং বার্ষিক বাজেটে অফিসের ভেতর ছোট অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ক্রয়, তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই, কর্মীদের প্রশিক্ষণ—ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা।

মিডিয়ার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে কী হবে জানতে চাইলে তিনি নিজের অবস্থানস্থলের কথা উল্লেখ করে বলেন, মালয়েশিয়ায় জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে আগুন থেকে বাঁচার জন্য বেস্ট প্র্যাকটিসসমূহ, দুর্ঘটনার সময় করণীয় ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর অ্যাড ইত্যাদি প্রচার করা হয়। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোরও এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

ইউটিউবার/ফেসবুকারদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তাদের দায়িত্ব এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কন্টেন্ট তৈরি করা। ফায়ার সেফটি ইকুইপমেন্ট ব্যবহার, ক্রয়, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রম্য/শিক্ষণীয় নানা রকম কন্টেন্ট তৈরি করতে পারেন তারা।

স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির উদ্দেশে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিগুলোতে এ বিষয়ে রোড-শো করা হয়, ফায়ার ড্রিল করা হয়। প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের প্রত্যয়। এমন পদক্ষেপ আমাদের বাংলাদেশে নেয়াও দরকার বলে আমি মনে করি।

ইমাম-খতিব-আলেমদের জন্য কী করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষকে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান করা। জুমার খুতবা এবং মাহফিলের বয়ানে জনসচেতনতামূলক কথা বলা। আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলাম জনবিচ্ছিন্ন কোনো জীবন ব্যবস্থা নয়।

মাওলানা ইউসুফ সুলতান আরও বলেন, ‘আমি-আপনি-আমরা—আমাদের দায়িত্ব নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করা, এবং দেশ ও সমাজকে উপকৃত করা। পুরো ইকো সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আশা করতে পারব ইনশাআল্লাহ। আসুন, আমরা হাতে হাত রাখি। কেবল অন্যের সমালোচনা নয়, নিজে দায়িত্ব নিতে শিখি। এগিয়ে নিই সমাজ ও দেশকে।’

আগের সংবাদএফ আর টাওয়ার কর্তৃপক্ষকে আগেই সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস
পরবর্তি সংবাদ‘বাতিলের সঙ্গে তোমরা কখনো আপস করবে না’ : বিদায়ী ছাত্রদের উদ্দেশে আল্লামা আহমদ শফী