আল্লামা শাহ আহমদ শফী : যেভাবে হয়ে উঠেছেন নিযুত মানুষের নেতা

কাজী মাহবুবুর রহমান

আল্লামা শাহ আহমদ শফী ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩৫১ হিজরি সনে ১২ আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানাধীন পাখিয়ার টিলা নামক গ্রামে এক অভিজাত সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী দীনদার আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মরহুম পিতার নাম জনাব বরকত আলি এবং মরহুমা মায়ের নাম মুসাম্মাৎ মেহেরুন্নেছা বেগম।

পিতা-মাতা শিশুকালেই তাঁকে কোরআন-শিক্ষার জন্য জনাব মৌলভি আজিজুর রহমান রহ.-এর কাছে প্রেরণ করেন এবং কোরআর শিক্ষার ফাঁকে ফাঁকে নিয়মিত চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষাও শিক্ষা দান করেন। এরপর তিনি শরফভাটা মাদরাসায় প্রাথমিক কিতাব পাঠে মনোনিবেশ করেন। ছোটবেলা থেকেই আহমদ শফী অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, চিন্তাশীল, প্রখর মেধাবী ও সুবুদ্ধির অধিকারী হওয়ায় অতি অল্প বয়সেই কোরআনের তিলাওয়াত ও প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষা সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করে কৃতিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন।

এরপর তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামস্থ ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল আরাবিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদরাসায়। জিরি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে সেখানে ৫/৬ মাস অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি ১৩৬১ হিজরিতে জনাব হাফেজ ইমতিয়াজ সাহেবের প্রচেষ্টায় এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম মুঈনুল ইসলামে ভর্তি হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর।

হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করার পর উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের অদম্য বাসনা নিয়ে ১৩৭১ হিজরী সনে ছুটে যান ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী হাদিস শিক্ষার পাদপীঠ, এশিয়া মহাদেশের শ্রেষ্ঠতম দীনি বিদ্যানিকেতন দারুল উলুম দেওবন্দে। উল্লেখ্য, দেওবন্দে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই আল্লামা শাহ আহমদ শফী শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন এবং অতি অল্প সময়েই খিলাফতপ্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

শাইখুল মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির খলিফা হলেও জমিয়তের রাজনীতির সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো সক্রিয়তা তাঁর ছিল না। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি কওমি মাদরাসার অন্য দশজন শাইখুল হাদিসের মতো সাধারণ শাইখুল হাদিসই ছিলেন। মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী এবং চিটাগাং-কেন্দ্রিক একজন অভিভাবকের জীবন যাপন করতেন। হাদিসের দরস, ব্যক্তিগত পড়াশোনা, ইসলাহি মা’মুলাত, কিছু লেখালেখি ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন৷ কিন্তু জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে জাতীর প্রয়োজনে তিনি মাঠে নেমে আসেন৷ এই মাঠে নেমে আসা শুধু নেমে আসা নয়, দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে নামিয়ে এনে এক অভাবনীয় গণজোয়ার তৈরী করা৷

বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত তিনটি গণজমায়েতের মধ্যে অন্যতম একটি ঘটেছিল ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। এই ইতিহাসের নায়ক ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। বাংলাদেশের মানুষ বহুদিন এই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

কীভাবে তিনি একজন শাইখুল হাদিস থেকে কোটি মানুষের নেতা এবং আস্থার ঠিকানায় পরিণত হলেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। অর্ধশতাব্দীর সক্রিয় রাজনীতিতেও যেই আস্থা অন্যরা সৃষ্টি করতে পারেন না, আল্লামা শাহ আহমদ শফী তা সৃষ্টি করেছেন সামান্য সময়ের ব্যবধানে।

বাংলাদেশের ইসলাম-মুসলমান ও ধর্মীয় সংস্কৃতি তখন একটা হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। মাত্র কিছু দিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.। অপরদিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে ফ্যাসিবাদের দোসর শাহবাগ আন্দোলন। মানবতা-বিরোধী অপরাধের শাস্তি চাইতে গিয়ে তারা ইসলামের উপর নগ্ন আঘাত হেনে বসে। এদের আস্ফালন এক সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশের আপামর সাধারণ মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হতে থাকে।

বিচ্ছিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং রাজধানী ঢাকাতেও আন্দোলন হয়৷ তবে দেশের সকল ইসলামি শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য একজন অবিসংবাদিত নেতার প্রয়োজন ছিল। যাঁকে নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকবে না। যাঁর পেছনে নিজেকে ভ্রষ্ট কিংবা ক্ষীণ মনে হবে না৷ এমনই এক নেতার ডাক আমরা শুনতে পেয়েছিলাম সেদিন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তাঁর ডাক সেই তেরোর রোদ-জ্বলজ্বল দিনগুলিতে সবাইকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল। হ্যামিলিওনের বংশিবাদকের সুরের মতো সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। যেন বহুদিন ধরে খুঁজতে থাকা একটি অবিসংবাদিত সুরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।

সফল নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে গেলেন বহুদূর৷ বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেল হেফাজতে ইসলামের বার্তা। পরপর এক মাসের মাথায় দুই দুইটি বিশাল গণজমায়েতের পর ক্ষমতাসীনদের অপারেশন ক্রাকডাউনের মুখে এই আন্দোলন কার্যত থেমে যেতে বাধ্য হয়।

হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন, ঐতিহাসিক লংমার্চের সফলতা কিংবা ব্যর্থতার পরিসংখ্যান সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এই আন্দোলন এক গভীর আনন্দের বার্তা আমাদের দিয়ে গেছে–বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষ আজও অভিভাবকহীন হয়ে পড়েননি। এক টুকরো মেঘ তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছে৷ সকল বিবাদ-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে তিনি আমাদের নেতা। তিনি আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা. বা.।

আগের সংবাদ‘বাঙালি, আদিবাসী ও মুসলিমদের তাড়ানোই বিজেপির প্রধান টার্গেট’
পরবর্তি সংবাদ‘গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে’