
হামমাদ রাগিব
সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর ভারতীয় হিন্দু সমাজ শিক্ষা-দীক্ষা-চাকরি-বাকরি-ব্যবসা-বাণিজ্য—দৈনন্দিন জীবনাচারের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করলেও ভারতের মুসলমান সমাজ হয় নিদারুণ অবহেলার শিকার। বৃটিশ আমলের মতোই পিছিয়ে থাকে তাদের জীবন-মান। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাদের একমাত্র অবলম্বন কায়িক শ্রম। শরীরের তাকত খরচ করতে পারলেই কেবল দু-মুঠো অন্নের জোগান হয়। বিশেষত পশ্চিম বঙ্গের মুসলমান সমাজে এ চিত্র পরিলক্ষিত হয় সবচেয়ে বেশি। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাদের গুরুত্ব একদম শূন্যের কোঠায় ছিল একসময়।
মুসলমান সমাজের এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পশ্চিম বঙ্গের হাওড়া জেলার অজপাড়া গাঁ খলতপুরের নিতান্ত এক কিশোর, যে কি-না সবে দশম শ্রেণিতে পড়ে, সত্তরের দশকে সে উদ্যোগী হয়ে উঠল। তার নাম নুরুল ইসলাম।
নুরুল ইসলাম চাইলেন মুসলমান সমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে। একমাত্র শিক্ষাই পারে পিছিয়ে পড়া সমাজকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে। নুরুল ইসলাম পড়াশোনার পাশাপাশি নিজ গ্রাম খলতপুরের মানুষের সহায়তায় সেখানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। খলতপুর জুনিয়র হাই মাদরাসা। গ্রামের বাচ্চাদেরকে তিনি উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে। মাত্র ৭টি বাচ্চা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তাঁর এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এটা ১৯৭৬ সালের কথা।
স্কুলজীবন শেষ করে নুরুল ইসলাম কলকাতায় যান কলেজে পড়াশোনার জন্য। কলকাতায় পড়াকালীন রামকৃষ্ণ মিশনে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। রামকৃষ্ণের কারিকুলাম দেখে মুসলমান সমাজের জন্যও স্বতন্ত্র এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
১৯৮৪ সালে খলতপুর জুনিয়র মাদরাসার পরিসর আরেকটু বড় করে সেখানে ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা চালু করেন। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নামেও আনেন পরিবর্তন। নাম রাখেন ইন্সটিটিউট অফ ইসলামিক কালচার। হাওড়ার সুবিধাবঞ্চিত মুসলিম সমাজের ছেলে-মেয়েরা এ প্রতিষ্ঠানের সুবাদে ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
১৯৮৬ সালে নুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোতে আবারও পরিবর্তন আনেন। পরিসর করেন আরও বড়। সেই সঙ্গে নামেও আনেন আবারও পরিবর্তন। নতুন নাম ‘আল-আমিন মিশন’।
নুরুল ইসলামকে অক্লান্ত পরিশ্রম অব্যাহত রাখতে হয়েছে ঠিক, কিন্তু এরপরে তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সুবিধাবঞ্চিত মুসলিম সমাজের ছেলে-মেয়েরা বিপুল আগ্রহ নিয়ে আল-আমিন মিশনের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে। আল-আমিন মিশনের কার্যক্রম কেবল হাওড়ার খলতপুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত প্রতিটা জনপদে। এমনকি পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও আসামের দুটি মুসলিম জনপদেও রয়েছে তাদের কার্যক্রম।
মাত্র ৭ শিক্ষার্থী নিয়ে জীর্ণ এক ঘরে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তিন দশকের ব্যবধানে ৭০টিরও বেশি শাখায় ১৭হাজারেরও অধিক আবাসিক শিক্ষার্থী নিয়ে তা আজ পুরো পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপৃত।

আল-আমিন মিশন মেদিনীপুর শাখার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম
যে মুসলমান সমাজ কায়িক পরিশ্রমকেই নিজেদের জীবনের নিয়তি মনে করত সেই সমাজ থেকে আল-আমিন মিশনের কল্যাণে গত তিন দশকে ২০ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণী শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে এসেছে। মিশনের গত ফেব্রুয়ারির এক বিবরণী থেকে জানা যায়, এদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ডাক্তার, আড়াই হাজার ইঞ্জিনিয়ার, অসংখ্য গবেষক, প্রশাসনিক অধিকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রয়েছেন।
আল-আমিন মিশনের কল্যাণে বাটোয়া এলাকার কৈথন গ্রামের নিতান্ত দরিদ্র এক মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা ডাক্তার শেখ হাম্মাদ। দিল্লির নামজাদা এক হাসপাতালে এখন তিনি চিকিৎসাপেশায় নিয়োজিত। আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাম্মাদ বলেন, ‘আমার বাবা গ্রামের আটপৌরে এক মওলানা ছিলেন। জনা দশ মানুষের সংসার টানা-হেঁচড়া করে পরিচালনার পরে আমাকে পড়াশোনা করানোর মতো কোনো সুযোগ ছিল না। বাবা তাই একদিন আমাকে নিয়ে হাজির হলেন আল-আমিন মিশনের দরোজায়। দরোজাটা আমার জন্য খোলাই ছিল। আল-আমিন মিশনের কল্যাণেই আমার আজ এত দূর আসা।’
কালনা এলাকার প্রান্তিক কৃষক পরিবারের মুমিন মণ্ডল ১৯৯৯ সালে মিশনের হাওড়ার খলতপুর শাখায় পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। মিশনের ছায়ায় বড় হয়ে এখন তিনি চিত্তরঞ্জন মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস নিয়ে পড়াশোনা করছেন। আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি তিনি ব্যক্ত করেছেন এভাবে—’অভাবের সংসারে পড়ার কোনও সুযোগই ছিল না। মিশনে না পড়লে হয়তো মাঠে ঘাটে হারিয়ে যেতাম।’
নদিয়ার নাকাশিপাড়ার প্রত্যন্ত বানগড়িয়ার সাজ্জাদ হোসেনও এখন চিকিৎসক। একাদশ শ্রেণিতে মিশনে পা না রাখলে এখনও তাঁর কর্মস্থল যে বানগড়িয়ার কোনো কৃষিক্ষেত্রে হতো তা অবলীলায় স্বীকার করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদকের কাছে।
নিতান্তই দিন-আনা দিন-খাওয়া ঘরের এমন অজস্র হাম্মাদ-মুমিন-সাজ্জাদ ছড়িয়ে রাজ্যের আনাচ কানাচে। যাঁরা চিকিৎসা-প্রযুক্তি কিংবা শিক্ষকতার উঠোনে এক একটা পরিচিত নাম। এবং যাঁদের পেছনে অকাতর অবদান আল-আমিন মিশনের। গত তিন দশক ধরে গ্রামের দুঃস্থ মুসলিম ছেলেমেয়েদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে এর স্বীকৃতি পায় তারা। রামকৃষ্ণ মিশন আর ভারত সেবাশ্রমের সঙ্গে রাজ্য সরকার আল-আমিন মিশনকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে।
কিন্তু এই সম্মান আর কৃতিত্ব পেয়ে আত্মতৃপ্তির কোনো ঢেঁকুর তোলেনি নুরুল ইসলামের আল-আমিন মিশন। তাদের লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা মুসলিম পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া। বঞ্চনা আর অবহেলার হাত থেকে মুসলমান সমাজকে তুলে এনে অন্যরকম এক আলোয় উদ্ভাসিত করা। যার জন্য এখনও তাঁরা কাজ করে যাচ্ছে নিরলস মেহনতের মাধ্যমে।
পশ্চিম বাংলার মুসলমানদের জেগে ওঠার পেছনে আল-আমিন মিশন সত্যিই এক বিস্ময়কর গল্পের নাম।
