
তুহিন খান
আজ থেকে প্রায় ১৪ শো বছর আগে আরবে জন্ম নেন ইসলাম ধর্মের নবী এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। দ্বীন প্রচারের প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে, একসময় সারা আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়, পৃথিবীজুড়ে ইসলাম একটা শক্তিশালী ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাসূলের ওফাতের পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে তৎকালীন দুই ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তি রোম ও পারস্য মুসলমানদের দখলে আসে। ইসলাম এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলামি সভ্যতার যে বুনিয়াদ আরব উপদ্বীপে রাসূলের হাতে নির্মিত হয়েছিল, ধীরে ধীরে সেই সভ্যতা মহীরুহ হয়ে উঠতে থাকে। আরব উপদ্বীপে প্রকাশিত ও প্রচারিত ইসলাম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পরে বিশ্বময়, ইসলামের আত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ ও প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপিত হয় বিশ্বের সমুখে, পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই এ পর্যন্ত গড়ে ওঠা সভ্যতা ও চিন্তাগুলোর সাথে এক অবধারিত চিন্তা ও চর্চার মিথস্ক্রিয়া অর্থাৎ গ্রহণ, বর্জন, আত্মীকরণ বা সংঘাত শুরু হয় নতুন এই সভ্যতার।
বিশ্বের নানাদেশ ও জাতির মাঝে ইসলাম পৌঁছে গেলে, সেইসব সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে ইসলামকে তুল্যমূল্য করে বিবেচনা ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইসলামের চিন্তা ও চর্চাগুলোকে, মৌল বিশ্বাস ও জীবনযাপনবিধানগুলোকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যান্য সভ্যতা, চিন্তা-দর্শন ও জীবনব্যবস্থার সাথে তুল্যমূল্য করে এই যে বিচার, ইসলামের জ্ঞানসাধনা ও অ্যাকাডেমিয়ার ইতিহাসে, ইসলামি চিন্তা ও চর্চার ইতিহাসে, একে দুইভাগে ভাগ করা হয়—এক. আকিদা বা ইসলামের বুনিয়াদি মৌল বিশ্বাসসমূহ, যেগুলো ইসলামি সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাসের প্রাণস্বরূপ, যাকে ফেকহে আকবরও বলা হয়। এই আকিদাগত বিতর্কগুলোর সূত্র ধরেই ইসলামি সভ্যতার জ্ঞানসাধনার ইতিহাসে কালামশাস্ত্রের উৎপত্তি। দুই. শরিয়ত বা ইসলাম-নির্দেশিত জীবনযাপনব্যবস্থা ও আইনি নির্দেশনা (অনেকে শরিয়ত-কে শুধু ‘আইন’ শব্দে ব্যাখ্যা করতে চান। কিন্তু সেক্যুলার অর্থে ‘আইন’ যা, তার থেকে ‘ফেকাহ’ বা ‘শরিয়ত’ আরো ব্যাপক)। একে ‘ফেকাহ’ বা ‘ফেকহে আসগর’ও বলা হয়। এই জীবনযাপনবিধান ও আইনগত বিতর্কগুলির সূত্রে গড়ে উঠেছিল ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা—ফেকাহ ও উসূলে ফেকাহ।
ইসলামের এই আকিদাগত ও বিধি-বিধান বিশ্লেষণমূলক দুইটি ধারা ব্যতীতও ইসলামি জ্ঞান ও সভ্যতার অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তবে, যে মতপার্থক্য, বিতর্ক ও বিভেদের ধারা ইসলামি সভ্যতার ভেতরে নানান মত ও পথের জন্ম দিয়েছে, সেগুলোর মূল মুখ্যত এই দুইটি শাখা থেকেই উৎসারিত। এই দুইটি মূলশাখা থেকে উৎসারিত বিতর্ক ও বিভেদ্গুলি আবার যে কেবল নিরেট ধর্মীয় ছিল অথবা ধর্মীয় অ্যাকাডেমিয়ায়ই এর প্রভাব সীমিত ছিল, তা নয়। বরং, ধর্মচিন্তা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি, এগুলো মুসলমানদের সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে আজ ইরান-সৌদি ক্ষমতার লড়াইকে আমরা সেই বিভেদের সূত্রধরে অনায়াসেই পাঠ করতে পারি।
আহলে হাদিস মতবাদ : কয়েকটি নোট
সামনের আলোচনায় অগ্রসর হওয়ার আগে কয়েকটি কথা বলে রাখা জরুরি, যেন আলোচ্য বিষয়ে কোন অস্পষ্টতা বা ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
প্রথমত, আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, আকিদা বা ফেকহি বিতর্কের এই ধারা কেবল ধর্মীয় জ্ঞানের অঙ্গনকেই প্রভাবিত করে নাই, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এসবের প্রভাব ছিল আরো বেশি। আমাদের আলোচ্য মতবাদটি শুরুতে একটি সংস্কার আন্দোলন হিশেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে এটি মুসলিম বিশ্বের জিও-পলিটিক্সকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
দ্বিতীয়ত, আমরা এখানে যে মতবাদ নিয়ে আলাপ করব, সেটি মূলত ইসলামের মধ্যে একটা রিভাইভালিস্ট পিউরিটান মুভমেন্ট, যেটি মূলত ইসলাম ও ইসলামি সমাজব্যবস্থার একটা লিনিয়ার বা একরৈখিক রুপ, বা একটি মনোলিথিক ধরনের প্রস্তাব করে। ইসলামের সুন্নি মাযহাবি ধারার সাথে মৌলিক বিশ্বাসে এটির খুব বেশি তফাত নাই, মূলত ইসলামে শরিয়ত ও জীবনব্যবস্থার ব্যাখ্যা-বিচার পদ্ধতি কেমন হবে এবং এসবের মূলনীতি কী হবে, এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের জায়গায় তাদের সাথে হানাফি ও মাযহাবি সুন্নিদের মতভেদ। এই মতভেদই ইসলামি বিশ্বাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপনপদ্ধতি সংক্রান্ত অন্যান্য নানান মতভেদ তৈরি করেছে।
তৃতীয়ত, বিশ্বব্যাপী একটা মনোলিথিক ও একরৈখিক ইসলামের কথা বললেও, আহলে হাদিসদের নিজেদের মধ্যেও আছে অঞ্চলগত, ফিকহি ও কর্মপন্থাগত বিভক্তি। এমনকি, স্থানভেদে এই আন্দোলনের নাম ও পিউরিটানের মাত্রাগত ভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়। ফলে এর এক শাখার সাথে আরেক শাখার মিল ও অমিলের ক্ষেত্রে সতর্ক বিবেচনা জরুরী।
চতুর্থত, এই লেখায় আমরা এই মতবাদের বিকাশ ও চারিত্র্যলক্ষণ নিয়ে সংক্ষেপে আলাপ করব। উপমহাদেশে এর সূচনা ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলাপ করলেও তাই, এর বিস্তার, ব্যাপকতা, শাখা-প্রশাখা ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে এই লেখায় আমরা কোন আলাপ করব না।
আহলে হাদিস আন্দোলন : প্রাক-কথন
আহলে হাদিস আন্দোলনের ইতিহাস শুরু করার আগে বলে রাখা ভালো যে, ইতিহাস কোন একরৈখিক ব্যাপার না। আহলে হাদিস আন্দোলন ঠিক কবে থেকে শুরু হল, এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের ফর্মেশন কীভাবে হল, সেগুলি ব্যাপক ও বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়। এই লেখায় আমরা এ সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।
আগেই বলেছি, মৌল বিশ্বাস বা আকিদার ক্ষেত্রে মাযহাবি সুন্নিদের সাথে আহলে হাদিসদের পার্থক্য বিশেষ নাই। আহলে হাদিসগণ নিজেদের এই মতবাদের আদিপুরুষ মনে করেন সাহাবাদের। রাসূল স. ও খোলাফাদের শাসনামলের প্রাথমিককালে ইসলাম আরব ও তার আশপাশের অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল, ইসলামের মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক তর্কগুলি তখনো আত্মপ্রকাশ করে নাই। সাহাবায়ে কেরাম কোরান ও রাসূলের হাদিসের উপর নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী আমল করতেন। আবু সাঈদ খুদরি রাযি., ইমাম শাবি রহ. সাহাবাদের জামাতকে ‘আহলুল হাদিস’ বলতেন, নামকরণের ক্ষেত্রে সাহাবাদের যুগ থেকে এই প্রমাণ আহলে হাদিস আলেমগণ দিয়ে থাকেন (দেখুনঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন, আসাদুল্লাহ আল-গালিব, পৃঃ ৮৪)। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িনের যুগে ইসলামের যে রুপ ছিলো, সেটিকে কেউ কেউ ‘আহলুল হাদিস’ বলে অভিহিত করার সূত্রেই এই নাম তারা বেছে নিয়েছেন। তবে সত্য কথা এই যে, সাহাবি বা তাবেয়িদের যুগেও হাদিসের অনুসরণ কোন সরলরৈখিক ব্যাপার ছিল না। এমনকি খোদ রাসূলের যুগেই সাহাবিরা হাদিসের ব্যাখ্যা ও মর্ম বঝার ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একই হাদিসের উপর দুই রকম আমল করেছেন এবং রাসূল দুটোকেই সঠিক বলেছেন।
সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের যুগ থেকে নামকরণের ঠিকুজি প্রমাণের চেষটা করা হলেও, সত্য কথা এই যে, তারা কেউই এ ধরণের আলাদা কোন আন্দোলন বা নামকরণ করে যাননি বা নামকরণের উদ্দেশ্যে কোন কাজও করেন নাই। মূলত একটি মতবাদ এবং সচেতন পিউরিটান রিভাইভালিস্ট মুভমেন্ট হিশাবে এর জন্ম অনেক পরে। সেই জন্মের আলোচনার আগে এর প্রেক্ষাপট নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
হযরত ওসমান রাযি.-র মৃত্যুর পর, মুসলিম সমাজে বিভেদের দ্বার খুলে গেল। একদিকে হযরত মুয়াবিয়া তাৎক্ষণিকভাবে এর বিচার দাবি করলেন, আর হযরত আলী চাইলেন সময়। সিফফিনের যুদ্ধের পরে দুই পক্ষ আলোচনাসভা বসালে, হযরত আলীর একদল অনুসারী ‘বিচার শুধু আল্লাহর’, এই আয়াতের দলিল দিয়ে হযরত আলী ও মুয়াবিয়া দুজনকেই ফাসেক আখ্যা দিয়ে হযরত আলীর দলত্যাগ করলো। ইতিহাসে এরা ‘খারেজি’ নামে পরিচিত।
ইসলামের ইতিহাসে আকিদাগত বিভেদের সিলসিলা চালু হল। ধীরে ধীরে রাফেজি, শিয়া, মুতাযিলাসহ আরো অনেক নতুন নতুন দলের জন্ম হল, যারা ইসলামের মৌল আকিদার প্রশ্নে নতুন নতুন মত ও ব্যাখ্যা দিতে লাগল। উমাইয়া ও আব্বাসিদের শাসনামলে ইসলাম দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়লো, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রাচীন দর্শন ও চিন্তাগুলির মুখোমুখি হল ইসলাম। খলীফা মামুনের আমলে গ্রীক দর্শন এবং অন্যান্য বইপত্র আরবিতে অনুবাদের কাজ শুরু হল। ঈমান, কোরান, আল্লাহর স্বরুপ ইত্যাদি নিয়ে বহুবিধ বিতর্কে টালমাটাল মুসলিম বিশ্ব।
এসময় মুহাদ্দিসদের একটা দল এসমস্ত বিতর্ক ও মতভেদের চর্চার বিরুদ্ধে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন। তার কারণও ছিল। খলিফা মামুন থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন খলিফার শাসনকাল অবধি চলে ‘মিহনা’ বা ‘কোরান মাখলুক কিনা’ এই বিতর্ক। মুতাযেলিরা তখন শাসকগোষ্ঠীর প্রিয়ভাজন, ফলে শাসকদের কাজে লাগিয়ে তারা এ ব্যাপারে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের এই জঘন্য অত্যাচারের কবলে পড়েন অনেক মুহাদ্দিস। বিশেষত আহমদ ইবনে হাম্বলের উপর চলে অত্যাচারের স্টিমরোলার। কিন্তু তিনি তার মতে অটল থাকেন।
ইসলামের ভেতরে এই বিভিন্ন আকিদার উদ্ভব এবং এর পরিণামে মুহাদ্দিসিনের উপর শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের ফলাফল ভালো হয় নাই। মুহাদ্দিসিনদের অনেকেই এই ঘটনায় এতটাই বিরক্ত হন যে, কোরানের টেক্সট বা হাদিসের টেক্সটের কোন ব্যাখ্যা, ইন্টারপ্রেটেশন বা ইজতেহাদের প্রতি তাদের মনে এক গভীর ভীতি ও বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়। এর ফলে ফকীহগণের ব্যাপারেও তারা কঠোর হয়ে ওঠেন।
ফকিহ বনাম মুহাদ্দিস : অষ্টম শতাব্দীর ‘আহলুল হাদিসগণ’
ইসলামের ইতিহাসে ফিকহ নামে যে জ্ঞানশাখাটির উদ্ভব হয়েছিল, সেটি কোরান-হাদিসের বাইরের কিছু ছিল না। কোরান-হাদিসের ভেতর থেকে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিধি-বিধান আহরণ ও মানুশকে তা জানানোই ছিল ফকিহদের কাজ। ফকিহরা কোরান-হাদিস থেকে বিধান আহরণের ক্ষেত্রে কেবল বাহ্যিক টেক্সটের উপরই নির্ভর করতেন না, বরং, কনটেক্সট, টেক্সটের নানাবিধ পাঠ-সম্ভাবনা, টেক্সটের পেছনের প্রেক্ষাপট ও তার ভিত্তিতে মূলনীতি তৈরি—ইত্যাদি নানা পন্থায় তারা টেক্সটের বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেন।
বিপরীতে মুহাদ্দেসিনদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ট্রাডিশনালিস্ট। কোরান-হাদিস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা টেক্সটের সরল অর্থকেই প্রাধান্য দিতেন এবং কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যায় ব্যাকরণ, কালাম, মানুশের আকলের প্রয়োগকে তারা অপছন্দ করতেন। চার মাযহাবের মধ্যে হাম্বলি মাযহাবের সাথে অন্যান্য মাযহাবের তুলনা করলে এটি আরো পষ্ট হবে।
ফকিহদের সাথে মুহাদ্দিসিনদের এই চিন্তাগত মতানৈক্য জারি আছে সাহাবাদের যুগ থেকেই। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত কোন কোন হাদিসের টেক্সুয়াল ব্যাখ্যাকে তৎকালীন ফকিহ সাহাবারা নাকচ করেছেন। বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ইসলামি চিন্তা ও বিশ্বাসের বিরোধ, ইসলামের আকিদা ও বিধিবিধানকে যুক্তি ও এজতেহাদের মাধ্যমে ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে মুহাদ্দিসিনদের একটি দল অষ্টম ও নবম শতাব্দীর দিকে ঐক্যবদ্ধ হন। তারা আকিদা ও ফিকহ–উভয় শাখায়ই কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যায় বুদ্ধি, যুক্তি ও কনটেক্সটের ব্যবহারকে অস্বীকার করেন এবং কোরান ও হাদীসের সরল টেক্সটের উপর আমলের কথা বলেন। যেসব ফকিহ বিধিবিধান আহরণের ক্ষেত্রে কোরান হাদিসের টেক্সটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন তাদের এরা ‘আহলুর রায়’ (যুক্তিবাদী) এবং নিজেদের ‘আহলুল হাদিস’ (টেক্সটপন্থী) বলে পরিচয় দিতেন।
আকিদার ক্ষেত্রে এই মুহাদ্দিসিনরা মুতাযিলা ও অন্যান্য ফেরকার বিপক্ষে অবস্থান নেন। মুতাযিলারা তখন শাসকগোষ্ঠীর প্রিয়ভাজন। আব্বাসি খলিফা মামুন ছিলেন মুতাযিলাদের পৃষ্ঠপোষক। ‘খালকে কোরান’র মাসালয় এই মতানৈক্য তুঙ্গে ওঠে, দৃষ্টিভঙ্গিগত এই মতানৈক্য রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও রাজনীতির সংস্পর্শে এসে বিভেদের ক্ষত তৈরি করে। খলিফা মামুন মুতাযিলাদের পক্ষ নিয়ে মুহাদ্দেসিনের উপর অত্যাচার শুরু করেন। সবচে কঠোর নির্যাতনের মুখোমুখি হন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল। কিন্তু তিনি সমস্ত অত্যাচারের সম্মুখে অটল থেকে বিজয়ী হন, এবং তৎকালীন সাধারণ্যে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। একপর্যায়ে এই মুহাদ্দিসিনদের মধ্যে সবচে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। মুতাযেলিদের এই ফেতনা, আকিদা বিষয়ে নিত্যনতুন তর্ক যখন রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও নিপীড়নে রুপ নিলো, তখন মুহাদ্দেসিনরা এর কারণ হিশাবে কোরান-হাদিসের মূলপথ ছেড়ে যুক্তি-বুদ্ধি বা অন্যান্য বিবেচনার উপর জোর দেয়াকে দায়ী করলেন। আহমদ ইবনে হাম্বল কোরান-হাদিসের বিধিবিধান ব্যাখ্যার কাজ শুরু করেন এবং এক্ষেত্রে কোরান বা হাদিসের টেক্সট এবং ইসলামের শুরুর যুগের ট্রাডিশনকেই তিনি সবচে বেশি গুরুত্ব দেন।
পরবর্তী দশকগুলোতে ‘আহলুল হাদিস’ বলতে হাম্বলি মাযহাবকেই বোঝাত। ধীরে ধীরে সুন্নি ফিকহের অন্যান্য স্কুল হাম্বলি মাযহাবকে মেনে নয়, তাদের মতামতের উপর হাম্বলিদের ‘ট্রাডিশনালিজম’র প্রভাব পড়ে, যার বড় উদাহরণ ইমাম মালেকের ছাত্র ইমাম শাফি রহ., যিনি ‘শাফি’ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা। ইমাম মালেককে তখন ‘আহলুর রায়’ বলা হত, কিন্তু তারই ছাত্র ইমাম শাফির মতামত ও মাযহাব ছিল তারচে অনেক বেশি টেক্সটের সমান্তরাল। হাম্বলি মাযহাবের ফকিহরাও ‘কিয়াস’ বা ‘রায়’ এর ব্যবহার নানান শর্ত-কন্ডিশনের বেসিসে মেনে নেন। এভাবেই পরবর্তী দুই শতক ধরে গঠিত হয় ‘উসূলে ফিকহ’। চার মাযহাব পালনের উপর উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং আকিদার প্রশ্নে ইমাম আশআরি রহ. কালামবিদ ও আহলুল হাদিসদের মতামতের একটি সমন্বয় সাধন করেন এবং সেটিই সুন্নি মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ইবনে তাইমিয়া ও সালাফিধারা
ইবনে তাইমিয়া রহ. ছিলেন বারোশ শতকের একজন আলোচিত-সমালোচিত আলেম। তিনি সিরিয়ার হারান প্রদেশের একটি হাম্বলি পরিবারে জন্ম নেন। হারান প্রদেশ তৎকালে হাম্বলি ফেকাহর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিশেবে পরিগণিত হত।
ইবনে তাইমিয়া রহ. এই ট্রাডিশনালিস্ট পিউরিটান ইসলামের মতবাদকে বেশ শক্তিশালীভাবে আবার প্রচার করেন। মূলত ওই সময়ে মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয় এবং মুসলমানদের উপর মঙ্গলদের একের পর এক আক্রমণ ইবনে তাইমিয়ার এই সংস্কারচিন্তার নেপথ্যে ক্রিয়াশীল ছিল। ইবনে তাইমিয়া চার ইমামের অন্ধ আনুগত্য অস্বীকার করেন। শুরুতে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী হলেও শেষ জীবনে তিনি তা ত্যাগ করেছিলেন। সরাসরি কোরান ও হাদিসের অনুসরণের কথা তিনি বলতেন। ‘এজমা; বলতে তিনি কেবল সাহাবাদের কোন বিষয়ে ঐক্যমতকে বুঝতেন। ওলি-আউলিয়াদের মাধ্যমে ওসিলা গ্রহন এবং কবর যেয়ারতকে তিনি বেদাত আখ্যা দেন। ‘তাকলিদ’ বা ‘মাযহাবের অনুসরণ’কে ইবনে তাইমিয়া কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। মূলত, ইসলামের বিধি-বিধান ও জীবনপদ্ধতির ব্যাখ্যায় যুগ, প্রেক্ষাপট, যুক্তি, বুদ্ধি বা অন্য যেকোনকিছুর চেয়ে কোরান ও হাদিসের আক্ষরিক অর্থ ও ইসলামের শুরুর তিন যুগের কাজকে প্রাধান্য দেওয়াই ছিল ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাপদ্ধতি। ধর্মীয় ব্যাপারে সম্পূর্ণ নতুন এই চিন্তাধারার কারণে তার আকিদা নিয়েও সমকালে আলেমদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে এবং বেশ কয়েকটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ইবনে তাইমিয়া বেশ কয়েকবার জয়ী হন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরাজিতও হন। এবং তাকে অনেকবার কারাবরণ করতে হয়।
ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারা সমকালে তেমন সমাদৃত হয়নি। সমকালীন আলেম ও স্কলারদের প্রায় সবাই-ই ছিলেন তার বিপরীতে, যদিও সাধারণ্যে তিনি কিছুটা জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। কিন্তু তার লেখালেখি এবং চিন্তাধারা, ইসলামের রিভাইভালিস্ট পিউরিটান বাসনা, জেহাদ ও সংগ্রামের অগ্নিমন্ত্র আঠারোশ শতকে কলোনিয়ালিজম, এম্পেরিয়ালিজম ও ইওরোপের বস্তুবাদী সভ্যতার ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত ও টুকরো টুকরো হয়ে পড়া মুসলিম বিশ্বে সংগ্রামের পথ হিশেবে আবারও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আব্দুল ওয়াহাব রাহ. নজদে যে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ওয়াহাবি আন্দোলন নামে পরিচিতি পায়, তা মূলত ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। এমনকি উপমহাদেশের শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভিও ইবনে তাইমিয়ার চিন্তায় মুগ্ধ ছিলেন। এবং আরো পরে, উনিশ শতকের শেষদিকে, আব্দুল ওয়াহাবের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক তাজদিদ আন্দোলনের সারবস্তু গ্রহণ করেই, মিশরে ‘সালাফি আন্দোলন’র জন্ম হয়।
আহলে হাদিস : সূচনার ইতিহাস
বর্তমানে উপমহাদেশে ‘আহলে হাদীস’ বা ‘আহলে হাদীস আন্দোলন’ নামে আমরা যে মতবাদের কথা জানি, তার জন্ম অবশ্য বৃটিশ ইন্ডিয়ায়। আফগান, মোঘল ও পাঠান আমলের ভারতে, শিয়া ইসলাম এবং দর্শন ও কালামভিত্তিক ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা গড়ে উঠেছিল। ভারত প্রাচীনকাল থেকেই নানারকম চিন্তা ও দর্শনের দেশ, সেগুলোও প্রভাব ফেলছিলো ধর্মীয় জ্ঞামবিজ্ঞানের চর্চায়। এ পর্যায়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবি ফিকহ ও আকিদা বিষয়ে নতুন ইজতেহাদের কথা বলেন এবং ভারতে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় কোরান ও হাদিসকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ সরাসরি আরবের আলেমদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, ফলে ভারতে চর্চিত কালাম ও ফালসাফাকেন্দ্রিক জ্ঞানকান্ডকে তার ভুলপন্থা মনে হয়েছিল। তবে শাহ ওয়ালিউল্লাহ নিজে ছিলেন হানাফি ফিকহের অনুসারী।
মূলত উনবিংশ শতকে ভারতের দুই বিখ্যাত আলেম সৈয়দ নাযির হুসাইন এবং সিদ্দীক হাসান খানের মাধ্যমেই ভারতে ‘আহলে হাদীস’ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা ‘তাকলিদ’ ও ‘মাযহাব’-র কঠোর সমালোচনা করেন এবং অষ্টম শতাব্দীর ‘আহ্লুল হাদিস’ বা মুহাদ্দেসিনদের অনুকরণে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আহলে হাদিস’ মতবাদের গোড়াপত্তন করেন। এই মতবাদ নিজেদের শাহ ওয়ালিউল্লাহর লিগ্যাসি দাবি করলেও, মূলত শাহ ওয়ালিউল্লাহর প্রধান শিষ্যদের প্রায় সকলেই ‘আহলে হাদিস’ মতবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং ‘মাযহাব’ ও ‘তাকলিদ’র বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য খন্ডন করেছেন। ভারতে ‘আহলে হাদিস’ মতবাদের বিরোধী আলেমদের মূল মারকাজ ছিল মূলত দেওবন্দ।
দেওবন্দিদের সাথে আহলে হাদিসদের এই মতবিরোধের পালে হাওয়া দেয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সারা বিশ্বে তখন বৃটিশদের শাসন চলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আগে অটোমান সাম্রাজ্য প্রায় টালমাটাল। অটোমানদের বিপক্ষে আরব জাতীয়তাবাদের হাওয়া বইছে আরবজুড়ে। তাতে ইন্ধন দিচ্ছে বৃটিশরা। এই রাজনৈতিক পালাবদল প্রভাব ফেলেছিল এদেশের ধর্মচর্চার ইতিহাসেও। ধীরে ধীরে ‘আরবের ইসলাম’ আর ‘ভারতের ইসলাম’ নামে একটা বিভাজন শুরু হয়। তুর্কি, আফগান বা মোঘলদের ইসলামকে পরিশুদ্ধ করে আরবের ইসলাম বানানোর দাবি উঠতে থাকে। পৃথিবির বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে আরবের রিফর্মিস্ট ও পিউরিটান ‘ওয়াহাবি মুভমেন্ট’র আদলে সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ইসলামের পুনরুজ্জীবনের জন্য এইসব আন্দোলন জরুরিই ছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের শেষ মাকদসাদ কী হবে, তা নিয়েই বিরোধ তৈরি হয়।
দেওবন্দিরা মূলত ভারতের মানুশের মন-মেজাজ, ঐতিহ্য-ইতিহাসের সাথে মিল রেখেই, শত বছরের বৃটিশ শাসনে নিষ্পেষিত মুসলিমদের নতুন করে ধর্মের দীক্ষায় জাগানোর চেষ্টা করছিলেন। অপরদিকে, আহলে হাদিসগণ ‘মাযহাব’, ‘তাকলিদ’ ইত্যাদি বিষয়ের সমালোচনা করে ধর্মীয় পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছিলেন। ইমাম আহমদের মত কোন বৈপ্লবিক অবস্থান, ইবনে তাইমিয়ার মত প্রভাববিস্তারী চিন্তাধারা বা আব্দুল ওয়াহাবের মত সংস্কার আন্দোলন তাদের ছিল না। তারা সামাজিক পর্যায়ে, প্রধাণত ‘তাকলিদ’ ও ‘মাযহাব’ বিষয়ে হানাফিদের সাথে তর্কে লিপ্ত হলেন। তাদের আন্দোলনের প্রেরণা ইমাম আহমদ, ইবনে তাইমিয়া বা আব্দুল ওয়াহাব যেই হোন, কিন্তু তাদের নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তায় সেসবের প্রতিফলন ছিল খুব কমই। কেবল ধর্মীয় শাখা-মাসালার ক্ষেত্রে হানাফিদের সাথে তর্ক-বিতর্কই ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের বিকাশের সূত্র।
দেওবন্দি আলেমরা তখন ভারতে বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করে তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেন। কিন্তু সেসময় আহলে হাদিস মতবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ নাযির হুসাইন ভারতকে ‘দারুল ইসলাম’ বলেন, এবং বৃটিশের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। সিপাহী বিদ্রীহের পরে আবারও তাকে জিহাদের ফতোয়া দিতে বলা হলে তিনি অস্বীকার করেন এবং বিপরীতে ইংরেজ শাসনের পক্ষে ফতোয়া দেন। ফলে ইংরেজ সরকারও তার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখ চলা শুরু করে। যদিও শুরুতে তাদের এই মতবাদকে ওয়াহাবিদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখে তাকে ‘ওয়াহাবি’ বলে কারাবন্দি করা হয়েছিল। হজের সফরে জেদ্দায় গেলে, ভারতের হানাফি আলেমদের তথ্যের ভিত্তিতে অটোমান সরকার তাকে বন্দী করেছিল। পরবর্তীতে বৃটিশের মধ্যস্ততায় তিনি মুক্তি পান।
কেন আহলে হাদিস আলেমরা বৃটিশদের শাসনকে ‘দারুল কুফর’ ভাবেন নাই? ইতিহাসে এ প্রশ্নের উত্তর নাই। আহলে হাদিস মতবাদ ইতিহাসের যে ধারার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা দাবি করে, তারা তো বৃটিশ শাসনকে এতোটা ছাড় দেবার কথা নয়! সম্ভবত, এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, বৃটিশ ভারতে যারা জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন, বৃটিশ সরকার তাদের ‘ওহাবি’ আখ্যা দিচ্ছিলেন। ওহাবি আন্দোলন শুরুতে ইসলামের মূলনীতিগত সংস্কারের কথা বললেও পরে এটি একটি সহিংস আন্দোলন হয়ে ওঠে, যা বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও অনেক ক্ষেত্রে নিন্দিত হয়। দেওবন্দিদের ‘ওহাবি’ হওয়ার ভয় ছিল তুলনামূলক কম, কারণ তাদের আকিদা ও বিধি-বিধানগত ঘরানা ছিল ওয়াহাবিদের চে অনেক আলাদা। তাই, দেওবন্দিদের ওহাবি তকমা দিয়ে বৃটিশ তেমন সুবিধা করতে পারে নাই। কিন্তু আহলে হাদিসরা চিন্তা ও চেতনায় ছিল ওহাবি ও সালাফিদের নিকটবর্তী, তাই তাদের ওহাবি বানানো সহজ ছিল। এ থেকে বাঁচতেই ভারতের আহলে হাদিসরা বারবার নিজেদের ওহাবি বা সালাফিদের চে আলাদা বলেছেন, এবং সম্ভবত রকারণেই বৃটিশের পক্ষে ওই ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল, এটা প্রমাণ করতে যে, আমরা ওহাবি/সালাফিদের মত কট্টর নই, আমরা উদার।
দ্বিতীয়ত, বৃটিশ ভারতে নবগঠিত আহলে হাদিস মতবাদ নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই এমন একটি সরকারই চাইতো, যেটি দেওবন্দি/হানাফিদের আলাদা পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। যেহেতু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের নেতৃত্বে ততদিনে হানাফি বা দেওবন্দিরাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন, তাই নিজেদের মতবাদের গভীর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার দিকটি বিবেচনা করে তারা ইঙ্গরাজকে সাপোর্ট করেছিলেন।
যাই হোক, এসমস্ত কারণে দেওবন্দি-আহলে হাদিস বিভেদ বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে আহলে হাদিস মতবাদ ইসলামের একটা স্বতন্ত্র ধারা ও আন্দোলন হিশাবে উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা পায়। বর্তমানে ভারত, বাঙলাদেশ, পাকিস্তান, আফপগানিস্তান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি জায়গায় আহলে হাদিসদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে।
চরিত্র লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য
এর আগে, প্রাক-কথন এবং অন্যান্য আলোচনায় এটা পষ্ট হয়েছে যে, ইতিহাসের কোন ধারাটি থেকে প্রেরণা নিয়ে আহলে হাদিস আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ থেকে তাদের চারিত্র্যলক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যও অনেকটাই বোঝা যায়। তবে আহলে হাদিসরা নিজেদের সবসময়ই ‘সালাফি’ বা ‘ওহাবি’ বলা থেকে বিরত থেকেছে। সম্ভবত ওহাবি বা সালাফিদের রাজনৈতিক চিন্তায় যে ভায়োলেন্সের দিক, সেটি উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে নিজেদের জন্য ক্ষতিকর ভেবেই তারা এটি করেছেন।
আহলে হাদিসগণ মূলত মাযহাব ও তাকলিদের বিরোধীতা করেন, তারা সরাসরি কোরান ও হাদিস থেকে বিধি-বিধান আহরণের কথা বলেন। আকিদার প্রশ্নে কালাম শাস্ত্রের প্রয়োগকে তারা অস্বীকার করেন। আহলে হাদিসগণ কোরানের আয়াতের বা হাদিসের মূল টেক্সটের কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যেহেতু অস্বীকার করেন, তাই তাদের ‘জাহেরি’দের সাথেও তুলনা করা হয়। এছাড়া আরবের ‘সালাফি’ বা ‘ওহাবি’ আন্দোলনের সাথেও তাদের তুলনা করা হয়, যা তারা অস্বীকার করেন। এর কারণ আমরা আগেই বলেছি। তবে, সত্তরের দশক থেকে সৌদি আরবের ফান্ডিং পাওয়ার পর থেকে সালাফি/ওয়াহাবিদের সাথে আহলে হাদিসদের পার্থক্য ধীরে ধীরে কমে আসে এবং এখন এই শব্দগুলি অনেকটাই সমর্থক অর্থে ব্যবহৃত হয়। আহলে হাদিসগণ গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচক এবং যেকোন মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ–সে যেমনই হোক–তারা অবৈধ মনে করে।
শেষ কথা
এই লেখায় আমরা সংক্ষেপে ইসলামের ইতিহাসে বিশ্বাস ও বিধিবিধান আহরণ পদ্ধতি এবং চিন্তা ও চর্চাগত পদ্ধতি সংক্রান্ত বিতর্কের উদ্ভব এবং তারই ফলশ্রুতিতে নানান ফিকহ ও আকিদাগত স্কুলের উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করে, সংক্ষেপে আহলে হাদিস মতবাদের সূচনা ও বিকাশের ঐতিহাসিক মূল খোঁজার চেষ্টা করেছি এবং উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেছি। লক্ষ্যণীয় এই যে, মুহাদ্দিসিনদের জামাত যে ফেতনা বা ইসলামের উপর নিজস্ব মতামত ও যুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে মাযহাব বা তাকলিদের বিরোধিতা করেছিলেন, এদেশে আহলে হাদিস আন্দোলনের ফলে ঠিক সেই ফেতনার দ্বারই উন্মোচিত হয়েছে। পূর্বে সাধারণ মানুশ বহুবছরের গড়ে ওঠা ইসলামি আইন ও আকিদার ব্যাপারে আলেমদের কিছু সর্বসম্মত মতামত মেনে চলত। কিন্তু আহলে হাদিস আন্দোলনের ফলে উপমহাদেশে ‘নিজে নিজে ইসলাম বোঝা’র যে ফেতনা তৈরি হয়েছিল, খেয়াল করলে বোঝা যাবে, আহমদ ইবনে হাম্বল সেই ফেতনার বিপক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন।
এবং এই নিজে নিজে ইসলাম বোঝা-র ফেতনা থেকে পরবর্তীতে আরো বেশকিছু নতুন দল ও মত তৈরি হয়েছে। এ এক মজার আয়রনি বটে। তবে, বিভিন্ন বিতর্কের পাশাপাশি উপমহাদেশের ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতায় আহলে হাদিসদের অবদানও কম নয়। তাদের কারণেই উপমহাদেশে হাদীসচর্চার ধারাগুলো আরো বেগবান হয়েছে। যুক্তি ও বৌদ্ধিক চর্চার পাশাপাশি টেক্সট পাঠ ও বিশ্লেষণ, রেফারেন্স ও দালিলিক পঠন-পাঠনের মাত্রা বেড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অবশ্য সালাফি-আহলে হাদিস-ওহাবি শব্দগুলোর নতুন নতুন অর্থ ও শাখা-সংজ্ঞা তৈরি হচ্ছে, সে স্বতন্ত্র আলাপের বিষয়।
তুহিন খান সহযোগী সম্পাদক, ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকম
