রাগিব রব্বানি:
বাংলাদেশের মাহফিল সংস্কৃতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে ওয়াজ প্রচার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের মধ্য থেকে জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য একটা অংশের ইলমি যোগ্যতা প্রয়োজন মতো না থাকবার কারণে অপ্রাসঙ্গিক, হাস্যকর এবং অযাচিত অনেক কথাবার্তার অবতারণা করেন এবং সেটাকেই ফোকাস করে ইউটিউবারদের অনেকে ভিডিও বানান।
ওয়াজ প্রচারের জন্য স্বতন্ত্র অসংখ্য চ্যানেল গড়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। যারা দেশজুড়ে অনুষ্ঠিতব্য প্রতিদিনকার ওয়াজ মাহফিলগুলো পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাভার করে থাকে। উঠতি বক্তা হলে বক্তার সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে, আর পাবলিকসমাদৃত বক্তা হলে নিজেদের গরজেই ইউটিউবাররা এসব মাহফিলের বয়ান রেকর্ড করে ইউটিউবে প্রচার করেন।
আরও পড়ুন : প্যান্ডেলের বাইরে মাইক : মাহফিলের শব্দদূষণ নিয়ে বিতর্ক
ইউটিউব ঘেঁটে দেখা যায়, ইলমি যোগ্যতার স্বাভাবিক মাপকাঠিতে অনুত্তীর্ণ অনেক বক্তার বয়ান থেকে মূর্খতার বহির্প্রকাশ ঘটে প্রায় নিয়মিতই। ধর্মীয় ঘরানার শাখাগত বিতর্ক, মিলাদ-কিয়ামকে জায়েজ প্রমাণিত করবার জন্য মূর্খতাসুলভ দলিলের অবতারণা, হিংসা ছড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার ঘটনা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন : মাহফিলে শব্দদূষণ : বক্তারা যা বলছেন
ফরিদপুরের বৃদ্ধ এক বক্তা গত বছর মনগড়া কিছু অনর্থক আরবি বাক্যে সুর দিয়ে সেটাকে কুরআনের আয়াত বলে চালিয়ে দিয়েছিল। এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে সচেতন আলেম সমাজ তুমুল প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদের মুখে সেই সময় ভুল স্বীকার করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন বয়ানে তার সেই মনগড়া তেলাওয়াতের পক্ষে মিথ্যা সাফাই গেয়ে চলেছে। এর আগে কিশোরগঞ্জের এক বক্তা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুসলমান না উল্লেখ করে বানোয়াট ও মূর্খতাসুলভ দাবি উত্থাপন করেছিল। ইউটিউবে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে কিশোরগঞ্জের স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে তাকে পাকড়াও করেন। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় সে রেহাই পায়।
এসব বক্তব্য প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে ইউটিউবে। যেখানে বাংলাভাষী ধর্মপ্রাণ শ্রেণির বিরাট এক অংশ ইউটিউব থেকে সেসব বক্তব্য শুনছেন। ফলে সমঝদার ও শিক্ষিত শ্রেণির একটা অংশের মধ্যে আলেম সমাজ ও ধর্মীয় ঘরানা সম্পর্কে নেতিবাচক একটা মনোভাব তৈরি হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষদের অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন বক্তব্যের অসাড়তা ধরতে না পেরে।
এ ছাড়া ইউটিউবে প্রচারিত ওয়াজগুলোর মধ্যে মিথ্যা এবং চটকদার শিরোনামে আপ করা হয় অধিকাংশ ওয়াজ। ভিডিও উপস্থাপনের ধরনেও থাকে নানা অসঙ্গতি। ভিডিওতে প্রদত্ত ওয়াজগুলো নানাভাবে সমস্যাজর্জিরত। কেউ বানোয়াট কেচ্ছা-কাহিনি বয়ান করছেন, তো কেউ ইসলামের নামে অবতারণা করছেন নানা অসংলগ্ন কথা-বার্তার।
বোদ্ধা পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, এসবের কোনো কিছুই ইসলামের মতো সুন্দর ও শ্বাশ্বত জীবনব্যবস্থার মেজাজের সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এতে ইসলাম ও ধর্মীয় ঘরানার ভাবমর্যাদা দিন দিন ক্ষুণ্ন হচ্ছে শিক্ষিত ও সমঝদার শ্রেণির কাছে। কারণ, ইউটিউবে সর্বমহলের মানুষের পদচারণা রয়েছে। এবং অধিকাংশ মানুষই এসব ওয়াজ-নসিহতকে ইসলামের ধারাভাষ্য বলে মনে করেন। ফলে ইসলামের মূল স্রোত থেকে যারা খানিকটা দূরে, ইসলাম বিষয়ে যাদের খুব একটা জানাশোনা নেই, ইউটিউবে প্রচারিত এসব ওয়াজ তাদেরকে ইসলাম থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। পাশাপাশি ওয়াজের নামে প্রদত্ত এসব ওজনহীন ও মূর্খতাসুলভ কথাবার্তাকে ইসলাম-বিরোধীরা ইসলামের ভাষ্য হিসেবে সাব্যস্ত করে ইসলামকে নিয়ে নানাভাবে কটূক্তি করার সুযোগ পায়।
যা বলছেন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা
এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক ও বিশিষ্ট ওয়ায়েজ ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইনের সঙ্গে।
ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, ওয়াজ হচ্ছে দীনি দাওয়াতেরই একটা প্রক্রিয়া। অতীতে আমাদের মুরব্বি বুজুর্গরা মজমা-মজলিস করে দীনি বিষয়ে সাধারণ মানুষকে কিছু কথাবার্তা বলতেন। সেখান থেকেই পর্যায়ক্রমে বর্তমান ওয়াজের রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে এবং নিকট অতীতে অনেক বুজুর্গ এই ময়দানে কাজ করে গেছেন। তাঁদের অনুসরণে আমরাও দীনের খেদমত হিসেবে বিভিন্ন মাহফিলে কিছু কথা-বার্তা মানুষকে শোনানোর চেষ্টা করি। এবং এটার একটা ইতিবাচক প্রভাব সমাজে পরিস্ফুটিত। তবে বর্তমানে কেউ কেউ হাস্য-মজাকের ছলে দীনের গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো মানুষের অন্তরে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু তাঁদের অনেকে এবং তাঁদের অনুসরণে অনেক তরুণ বক্তা হাস্যরসকে এতটাই ফোকাস করেন যে, ইসলামের যে ভাবগাম্ভীর্যতা, তাকে অনেক অংশেই নষ্ট করে ফেলেন। আলোচনায় ইসলামের মৌলিক কোনো কথাবার্তা থাকে না।
তিনি বলেন, এটা থেকে আমাদের ফিরে আসা দরকার। আমি তরুণ শ্রেণির ওয়ায়েজদের বিনীত আহ্বান জানাব, তাঁরা যেন ইসলামের সৌন্দর্য ও ভাবগাম্ভীর্যের দিকে খেয়াল করে মাহফিলে কথাবার্তা বলেন। এজন্য পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে। দুঃখজনক হলো, আমাদের বর্তমানকার ওয়ায়েজদের অনেকের আলোচনা শুনলেই বোঝা যায়, তাঁরা খুব একটা পড়াশোনা করেন না। আর এ কারণেই দেখা যায়, তাঁদের বক্তব্য আর কুরআন-হাদিসের আলোচনার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে।
আ ফ ম খালিদ হোসাইনের ব্যাখ্যা
তিনি আরও বলেন, আপনি যে সমস্যাটার কথা বললেন, ইউটিউবে মূর্খতার ছড়াছড়ি। আসলেই, প্রচুর ভিডিও আছে এই পর্যায়ের এবং সেগুলো এতো পরিমাণ মানুষ দেখছে, ভিউস দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। ইউটিউবে এই ক্যাটাগরির ওয়াজের ভিডিওগুলোর ছড়াছড়ি তুলনামূলক বেশি। এবং যতদূর জানি, এসব ওয়াজের বক্তা যাঁরা, তাঁদের অনেকেই বেশ সচেতনতার সাথে নিজ উদ্যোগে কিংবা অন্য কারও মাধ্যমে নিজেদের ওয়াজ ইউটিউবে প্রচারের ব্যবস্থা করেন।
আ ফ ম খালিদ বলেন, তাঁদের এই ওয়াজ-প্রচারে আমি আপত্তি তুলছি না, বরং তা প্রশংসনীয়ই বটে। তবে তাঁদের কাছে বিনীত আহ্বান রাখব, ইসলাম বিষয়ে নিজের বক্তব্য যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, ওয়াজে কী বলছেন না বলছেন, সে-ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকুন। দৈনন্দিন রুটিনের একটা অংশ কিতাবাদি মুতালাআর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখুন। কিতাবাদির আলোকে যখন কথা বলবেন, আমার বিশ্বাস মানুষ এমনিতেই শোনার জন্য আগ্রহবোধ করবে, তখন আর চটকদার ও মাত্রাতিরিক্ত হাস্যরসের কোনো প্রয়োজন পড়বে না।
