মাহফিলে শব্দদূষণ : বক্তারা যা বলছেন

মাহফিলে শব্দদূষণ : বক্তারা যা বলছেন

রাগিব রব্বানি :

বাংলাদেশের প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের কারণে শব্দদূষণের সৃষ্টি হয় বলে ব্যাপকভাবে অভিযোগ আছে। শহর-বন্দর বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মাহফিলগুলো এই শব্দদূষণের ফলে অনেকের কষ্ট ও বিরক্তিরও কারণ হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা পর্যায়ে বিতর্ক আছে। ধর্মীয় পরিসরের সচেতন ও উল্লেখযোগ্য একটি পক্ষ প্যান্ডেলের বাইরে মাইক ব্যবহার অনুচিত বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ কড়া সমালোচনাও করছেন অতিরিক্ত মাইক ব্যবহার প্রসঙ্গে।

আরও পড়ুন : প্যান্ডেলের বাইরে মাইক : মাহফিলের শব্দদূষণ নিয়ে বিতর্ক

মাহফিলে অতিরিক্ত মাইকের ব্যবহার এবং শব্দদূষণ প্রসঙ্গে মাহফিলগুলোর আলোচক বা বক্তা শ্রেণি কী ভাবছেন জানতে চেয়ে বেশ কয়েকজন বক্তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অনেকেই মাহফিলে অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের পক্ষপাতী নন। কিন্তু যেহেতু দেশে এটা একটা প্রচলন হিসেবে চালু হয়ে গেছে, তাই তাঁদের মতে সম্মিলিত কোনো উদ্যোগ ছাড়া তা বন্ধ করাও মুশকিল।

অনেকে আছেন, যাঁরা প্রোগ্রাম রাখার সময় আয়োজক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বেশি রাত পর্যন্ত মাহফিল না করা এবং মাইকের সীমিত ব্যবহারের শর্ত প্রদান পূর্বক প্রোগ্রাম রাখেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় তাঁদের এই শর্ত আয়োজক কর্তৃপক্ষ মাহফিলের দিন এলে রক্ষা করেন না বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে বক্তাদের মধ্যে বড় একটি শ্রেণি আছেন, যাঁরা অধিক মাইক ব্যবহার আপত্তিযোগ্য মনে করেন না। তাঁদের দাবি, দেশে আরও নানা কারণে শব্দদূষণ হয়। উচ্চ আওয়াজে গান-বাদ্য বাজানো হয়, সেগুলো বন্ধ না করে ওয়াজ মাহফিলের মাইক নিয়ন্ত্রণ করা ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করার নামান্তর।

তবে খ্যাতিমান ওয়ায়েজ মাওলানা হাবিবুর রহমান মিছবাহ (কুয়াকাটা) মনে করেন, মাহফিলে মাত্রাতিরিক্ত মাইকের ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় এবং নিন্দনীয়। একই সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত মাহফিল চালু রাখাও অনুচিত। তিনি বলেন, আমি গত কয়েক বছর ধরে যেখানেই মাহফিলে যাই, অধিকাংশ জায়গায় বয়ানের শুরুতে পাঁচ-দশ মিনিট এ প্রসঙ্গে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করি। আমার প্রোগ্রাম নেওয়ার যে ফরম, সেখানেও এই শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া আছে—প্যান্ডেলের বাইরে অতিরিক্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে না, রাত ১১টার পর মাহফিল চালু রাখা যাবে না।

মাওলানা মিছবাহ বলেন, এ শর্তগুলোর ওপর আমি বেশ কড়াকড়ি করি। ১১টার পর অনিবার্য কারণ ছাড়া কোথাও বয়ান করি না। কারণ, গভীর রাত পর্যন্ত মাহফিল করলে, মাহফিলের বাইরের লোকদের যেমন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তেম্নি মাহফিলে উপস্থিত লোকজনের পক্ষেও পরদিন ফজরের নামাজে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। তাই মাহফিল কর্তপক্ষকে এ কথা আমি জোর দিয়ে বলি, সর্বোচ্চ রাত ১১টা পর্যন্ত যেন তাঁরা মাহফিল সীমিত রাখেন। এরপরে একান্তই চালু রাখতে চাইলে প্যান্ডেলের বাইরের মাইকগুলো যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এই কথাগুলো আমি বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে নানাভাবে বলে আসছি। শীর্ষস্থানীয় আলেম, বুজুর্গ, ওয়ায়েজিন থেকে শুরু করে আমাদের সমপর্যায়ের এবং আমাদের জুনিয়র—অনেকের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করেছি। সচেতন প্রত্যেকেই আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন। তবে সাধারণ বক্তাদের অনেকে বিব্রতবোধ করেছেন এই আলাপে।

শহর-বন্দর বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্যান্ডেলের বাইরে মাইক ব্যবহারে তো অনেকের কষ্ট হয়, অনেকের বিরক্তিরও কারণ হয়। স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-পড়ুয়া শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, বাসাবাড়িতে শিশু ও অসুস্থ মানুষজন থাকেন, তাদের কষ্ট হয়। এসব সমস্যার দিকে লক্ষ্য করে প্যান্ডেলের বাইরে মাইক ব্যবহার না করার ব্যাপারে কি ওয়ায়েজিনদের পক্ষ থেকে কোনো সচেতনতা তৈরি করা যায় না? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা হাবিবুর রহমান মিছবাহ বলেন, এই সচেতনতা তৈরির জন্যই তো আমি প্রায় মাহফিলে কথা বলি, আপনাকে বললামই। কিন্তু বাইরে মাইকে ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে, এ প্রচলন একদিনে বা একবছরে বন্ধ করা যাবে না। ধীরে ধীরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তাই আমি বলি, প্যান্ডেলের বাইরে সর্বোচ্চ ৫/৭টা মাইক রাখতে। এবং সেগুলোর আওয়াজও নিয়ন্ত্রিত রাখতে। যাতে আশপাশের মানুষের কষ্ট না হয়। বাংলাদেশের যে সমাজব্যবস্থা, এখানে হুট করেই মাইকের এ প্রচলন বন্ধ করা মুশকিল। তবে কোনোভাবেই যাতে গভীর রাত পর্যন্ত মাহফিল দীর্ঘায়িত না করা হয়, দীর্ঘায়িত করলেও বাইরের মাইকগুলো যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেটা আমি জোর দিয়ে বলি।

একই কথা বলছেন তরুণ বক্তা মাওলানা রাফি বিন মুনীরও। তিনিও গভীর রাত পর্যন্ত মাহফিল দীর্ঘায়িত না করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জোর তাগিদ দেন বলে জানান। বিভিন্ন বয়ানে শ্রোতাদের উদ্দেশে আলোচনাও রাখেন এ প্রসঙ্গে। মাহফিলের মাইক থেকে সৃষ্ট শব্দদূষণের ব্যাপারে তিনি হাবিবুর রহমান মিছবাহর মতামত পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, শব্দদূষণ আমাদের দেশের কমন একটি সমস্যা। কেবল ওয়াজ মাহফিলের মাইকের ব্যবহার নয়, একই সঙ্গে গাড়ির হর্ন থেকে শুরু করে গানবাজনা ও বিভিন্ন পার্টি অনুষ্ঠানের শব্দদূষণের ব্যাপারেও আমাদের যার যার অবস্থান থেকে সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক।

আগের সংবাদনিজের মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে যা বললেন পারভেজ মোশাররফ
পরবর্তি সংবাদক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে যাওয়া দুই বাংলাদেশির টাকা ছিনতাই করল কলকাতা পুলিশ