ইজতেমায় বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে ভোগান্তি

রাগিব রব্বানি:

গতকাল ১০ জানুয়ারি বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে টঙ্গীর তুরাগতীরে তাবলিগ জামাতের এ বছরের বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়েছে। ইজতেমা শুরুর আগের দিন বৃহস্পতিবারই মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে গেছে ১৬০ একর আয়তনের সুবিশাল ময়দান। ময়দানের ভেতর তিল ধারণের ঠাঁই নেই বৃহস্পতিবার রাত থেকেই।

ইজতেমায় নিয়মিত অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম ঘটেছে এ বছরের বিশ্ব ইজতেমায়। অতীতে এতো মানুষের সমাগম কোনো ইজতেমায় ঘটেনি। ফলে ময়দানে জায়গা না পেয়ে অসংখ্য মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে ময়দানের আশপাশের এলাকায়। অনেকে ময়দানের পার্শ্ববর্তী রাস্তার ফুটপাতে পলিথিন বিছিয়ে অবস্থান করছেন। কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা ও পৌষ শেষের ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যেই খোলা আকাশের নিচে সময় কাটাতে হচ্ছে তাঁদের। এ ছাড়া প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ ও পানির জন্য চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এ সমস্ত মুসল্লিকে।

তীব্র শীতে রাস্তায় মুসল্লিদের রাত্রিযাপন, দুর্ভোগ

ইজতেমা শুরুর দুদিন আগেই মাঠ কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার যারা ইজতেমায় গিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ময়দানে জায়গা পাননি বলে জানা গেছে। তারা ময়দানের পাশের রাস্তাগুলোর ফুটপাতে পলিথিন বিছিয়ে বৃহস্পতিবার রাত্রিযাপন করেন। ময়দানের উত্তর পাশে টঙ্গী-আশুলিয়া বাইপাস (কামারপাড়া) সড়কের ফুটপাতে অবস্থান নেয়া তাবলিগ জামাতের সাথি মোক্তার হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, তারা টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর থেকে এসেছেন। ইজতেমায় তাদের নির্ধারিত খিত্তায় জায়গা না পেয়ে ফুটপাতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। ইজতেমার ওয়াল ঘেঁষে এ ফুটপাতের ধারে পথচারীদের প্রশ্রাব জমে ছিল। তারা হাতে করে বালি এনে প্রশ্রাব ঢেকে ওপরে বিছানা করে বহু কষ্টে অবস্থান করছেন।

নওগাঁর বদরগাজী থানা থেকে আগত তাবলিগ জামাতের বৃদ্ধ সাথি খলিলুর রহমান জানান, তাদের ১৯ জনের একটি জামাত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ইজতেমা ময়দানে এসে পৌঁছান। তাদের এলাকার জন্য ময়দানের ৩৪ নম্বর খিত্তার ১৭ নম্বর খুঁটি নির্ধরিত ছিল। কিন্তু তারা নির্ধারিত ওই স্থানে গিয়ে বসা বা শুয়া তো দূরের কথা দাঁড়ানোর জায়গাও পাননি। অবশেষে তারা সড়কের ফুটপাতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। আরো পরে আসলে ফুটপাতেও ঠাঁই হতো না বলে তিনি জানান। ফুটপাতে তারা যেখানে অবস্থান করছেন এর পেছনেই ইজতেমার ১০ নম্বর তিন তলা টয়লেট ভবন। টয়লেটের দুর্গদ্ধ সহ্য করেই তাদেরকে বহু কষ্টে ফুটপাতে অবস্থান করতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থেকে আসা সুলতান উদ্দিন জানান, তাদের এলাকা থেকে ৬৫ জনের একটি জামাত বুধবার রাত ১০টায় ইজতেমায় আসে। নির্ধারিত খিত্তায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় অবশেষে তারা ফুটপাতে তাবু বিছিয়ে অবস্থান করছেন।

কর্তৃপক্ষের বাড়তি ব্যবস্থাও মুসল্লি সংকুলানে যথেষ্ট হচ্ছে না

তাবলিগের আলমি শুরার সাথিদের এবারের এই ইজতেমায় ব্যাপক লোক সমাগম হতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ আগ থেকেই অনুমান করেছিল। অনুমান অনুযায়ী আগের তুলনায় ১৭টি খিত্তা বৃদ্ধি করে বাটা, যমুনা, হুন্ডার মাঠ এবং তুরাগ নদীর ওপারেও সাথিদের অবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু লোকসমাগম হয়েছে ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। তাই প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও স্থান সংকুলান করা সম্ভব হয়নি।

শুক্রবার গাজিপুর সিটি কর্পোরেশনও নতুন করে আবার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ময়দানের আশপাশের মসজিদ-মাদরাসা ও স্কুল-কলেজের মাঠে মুসল্লিদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। উত্তরা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত এলাকা জুড়ে প্রায় দুই হাজার মাইক নতুন করে টানানো হয়। কিন্তু বাড়তি এসব ব্যবস্থাও মুসল্লিদের স্থান সংকুলানে যথেষ্ট হচ্ছে না। ময়দানের আশপাশের রাস্তায় এখনো অবস্থান করছেন অনেক মুসল্লি।

আজ শনিবার উত্তরার রানাবোলা এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান করছেন ইজতেমায় আসা মুসল্লিরা। তাঁদের কেউ গাছের নিচে, কেউবা সড়কের পাশের ঢালু জায়গায় অবস্থান করছেন। কথা হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা তাবলিগ জামাতের সাথি নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, শুক্রবার ইজতেমায় যোগ দিয়েছেন তিনি। মাঠে জায়গা পাননি, তাই চট বিছিয়ে রাত যাপন করেছেন সড়কের ঢালুতে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে আসা মুহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, ‘ভেতরে নিজেদের জামাতের লোকজনেরই জায়গা হয় না। পরে বাধ্য হয়ে বাইরে চলে আসছি। তবে আল্লাহ ও রাসুলের কথা শুনতে এসে এসব কষ্ট কোনো কষ্ট মনে হয় না। সকাল থেকেই মুরুব্বিরা বয়ান করছেন।’

মাইকের সংযোগ কেটে দিচ্ছে অজ্ঞাত একটি মহল

মাঠের বাইরে অবস্থানরত মুসল্লিদের বয়ান শোনার জন্য আশপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে সিটি কর্পোরেশন থেকে গতকাল যে দুই হাজার মাইক টানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কোনো কোনোটার সংযোগ কেটে দিচ্ছে চক্রান্তকারী একটি মহল। ফলে অনেক মুসল্লি ময়দানের বয়ান শুনতে পারছেন না।

ইজতেমার দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আলমি শুরার ইজতেমায় রেকর্ড সংখ্যক এ লোক সমাগমে হিংসাকাতর হয়ে এক শ্রেণীর লোক চক্রান্তের অংশ হিসেবে মাঠের বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাইকের সংযোগ কেটে দিচ্ছে। এতে করে বয়ান শুনতে পারছেন না অনেক সাধারণ মুসল্লি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আলমি শূরার সাথিদের অধীনে এবারের বিশ্ব ইজতেমার পূর্ণ কামিয়াবির জন্য সকলে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে বসে আছেন। এবং সকলেই দোয়া শেষ করে ইজতেমার মাঠ থেকে ফিরবেন।

আগের সংবাদনিজের মুখোমুখি সংলাপ : মুসলিম সভ্যতার শ্রেষ্ঠ পাঁচ আত্নজীবনী
পরবর্তি সংবাদক্রিকেট ও ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে স্ত্রীর আত্মহত্যা